Home » রাজনীতি » জয়ের চমক – শঙ্কিত মানুষ

জয়ের চমক – শঙ্কিত মানুষ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

এক.

joyআমাদের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। প্রায় আশি বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সবটা জুড়েই ছিল চমক আর চমক। পাকিস্তান জন্মের পর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রথম থেকে শুরু করে মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে শেষ চমকটি তিনি দিয়ে গেছেন জাতিকে ফারাক্কা মিছিলের মধ্য দিয়ে। তখন তার বয়স ৯৬ বছর। যে আওয়ামী মুসলিম লীগ’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ভাসানী, ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। কারন, সিয়াটোসেন্টো চুক্তিতে পাকিস্তানের স্বাক্ষর করা এবং সদস্য হওয়ার প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দী’র সঙ্গে তার চূড়ান্ত মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল, ভাসানী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার ও চুক্তির চরম বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন। পঞ্চাশ দশকের রাজনীতিতে এটি ছিল দুনিয়া জোড়া চমকের একটি।

১৯৬৭ সালে স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠিকে ওয়ালাইকুম আসসালাম বলে যে অভাবনীয় চমকের জন্ম দিয়েছিলেন তা ছিল এই ভূখন্ডের স্বাধীনতার পক্ষে ষাট দশকের সবচেয়ে সচকিত উচ্চারণ, যা পরবর্তীতে গোটা বাঙালী জাতির মুক্তি এবং স্বাধীনতার আকাঙ্খায় রূপান্তরিত হয়েছিল। পাকিস্তানী নেতৃত্ব তাকে উপাধি দিয়েছিল, ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’, কারন তিনি উণসত্তরের সহিংস ও রক্তাত্ত গণঅভ্যূত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে সাধারন নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগকে যে ঐতিহাসিক ছাড় দিয়েছিলেন সেটি ছিল পরাধীন দেশে তার শেষ রাজনৈতিক চমক। এই চমকের পরিনতি এবং ইতিহাস সকলের জানা। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল এবং অন্তিমে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটেছিল।

মাওলানা ভাসানীর গোটা রাজনৈতিক জীবনে এতসব ইতিবাচক ইতিহাস কাঁপানো চমকের পাশাপাশি সম্ভবতঃ সবচেয়ে নেতিবাচক চমকটি ছিল ষাট দশকের পাকিস্তানী সামরিক ডিক্টেটর আইয়ুব খানের প্রতি তার রহস্যময় নীরব সমর্থন ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব! ইতিহাস বলছে, চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে আইয়ুবের উষ্ণ সম্পর্কের কারণে সমাজতন্ত্রের প্রতি দুর্বল ভাসানী নীরবতা অবলম্বন করেছিলেন। এইজন্যই সম্ভবতঃ তিনি এর দায় পরিশোধ করেছিলেন, উণসত্তরের গণঅভ্যূত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে।

স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি তৎকালীন ভারত সরকারের প্রতি ক্ষমতাসীনদের পদলেহী ভূমিকার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আগেই বলা হয়েছে, এর ধারাবাহিকতায় মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে ফারাক্কার পানি বন্টনে ভারতের চরম বৈষম্যর বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করেছিলেন, যার চূড়ান্ত পরিনতি ছিল ঐতিহাসিক ফারাক্কা মিছিল। এভাবেই তিনি একের পর এক জনগণের পক্ষে চমকের পর চমক সৃষ্টি করেছিলেন, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য কখনই ক্ষমতায় যাওয়া নয়, শুধুমাত্র জনগণের অধিকার আদায় এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি।

দুই.

গত চার দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতানেত্রীরা এরকম অনেক রাজনৈতিক চমকের জন্ম দিয়েছেন। কেউই বলতে পারবেন না, এসব চমকের লক্ষ্য জনগণ ছিল কিংবা ছিল ইতিবাচক। ক্ষমতা এবং শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার তীব্র বাসনায় কেবল একের পর এক গণবিরোধী ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে জনগণ। খ্যাতনামা কথা সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক প্রয়াত: আহমদ ছফা এরকম গণবিরোধী চমকের বিষয়ে ক্ষোভের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলেরই কালচার বা সংস্কৃতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক চিন্তার শত্রু, সরাসরি সামন্ততান্ত্রিক চিন্তার একটি প্রকাশ। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন মহারাজা কালচার। এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, আমি যদি আগামি লেখাটি ভাল না লিখি লোকে আমাকে প্রত্যাখ্যান করবে। আমাকে প্রতিদিন লড়াই করতে হয় আহমদ ছফার পরিচয় টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু খালেদা জিয়াকে এটি করতে হবে না। কারন জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করে তিনি সারা জীবনের গ্যারান্টি পেয়ে গেছেন এবং শেখ হাসিনাকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। তিনি বঙ্গবন্ধুর তনয়া এবং তার কোন ভুল হতে পারে না।

প্রয়াত: আহমদ ছফা’র সুরে সুর মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের কোন গ্যারান্টি নেই। প্রতিদিনের জীবন যাপনে তাকে অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়। যাপিত জীবনে ক্লেদ কষ্ট ছাড়া কোন চমকও থাকে না। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার ধারাবাহিকতা তারেক রহমান নামক চমক জনগণ ইতিপূর্বে প্রত্যক্ষ করেছে এবং হালে সজিব ওয়াজেদ জয় নামের চমক প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব চমকের কোনটিই কি জনগণকে উজ্জীবিত করতে পেরেছে বা পারছে? এক্ষেত্রে জনগণের চিন্তায় একটি অভূতপূর্ব ঐক্য রয়েছে খালেদা তনয় বা হাসিনা তনয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হচ্ছে ক্ষমতা এবং ক্ষমতা, কখনই জনগণ নয়, এর মধ্যে কোন চমকই তারা দেখেন না।

আমাদের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সজিব ওয়াজেদ জয়ের আগমন চমক তো নয়ই, অপ্রত্যাশিতও নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে জনগণ ধরেই নিয়েছিল সক্রিয় রাজনীতিতে জয়ের আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানেরও রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভাব ঘটেছিল দোদণ্ডপ্রতাপ নিয়ে, ‘কিং মেকার’ হিসেবে। দলে অভূতপূর্বভাবে তার জন্য একটি পদ সৃষ্টি হয়েছিল সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। অনুরূপভাবে নির্বাচনের বছরে পিতৃভূমি রংপুরের পীরগঞ্জে প্রধানমন্ত্রী মায়ের সঙ্গে জনসভায় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জয় অনানুষ্ঠানিকতা থেকে আনুষ্ঠানিকতায় আসলেন। জনগণের কাছে এর মধ্যে কোন চমকও ছিল না, না ছিল ধারাবাহিকতার কোন অভাব। মহারাজা কালচারে অভ্যস্ত বাংলাদেশের জনগণ যুগের পর যুগ এই ধারাই প্রত্যক্ষ করে আসছেন। এখন বা আগামিতে এদেশের মানুষ জানে না, তৃণমূল থেকে কোন মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিব, নিদেন পক্ষে বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের মত কোন নেতা উঠে আসবেন কিনা? উত্তরাধিকারের রাজনীতি সে রকম সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে তিরোহিত করে দিয়েছে।

তিন.

আমাদের ক্ষমতার রাজনীতিতে ক্ষমতা ধরে রাখতে কিংবা ক্ষমতায় যেতে দু’নেত্রী একের পর এক তথাকথিত চমক সৃষ্টি করার প্রয়াস পাচ্ছেন। এর সবশেষ উদাহরন হচ্ছে, শেখ হাসিনা বলেছেন সংবিধান থেকে তিনি একচুলও নড়বেন না। কারন ক্ষমতা ধরে রাখার বাসনায় তার এ মেয়াদেই জনগণের কোন মতামতকে তোয়াক্কা না করেই ‘ব্রুট মেজরিটি’র জোরে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করে দেশশুদ্ধই নাড়িয়ে দিয়েছেন। সেজন্যই তিনি সংবিধান থেকে এখন আর একচুলও নড়বেন না এটিই স্বাভাবিক। অন্যদিকে খালেদা জিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর রংপুরের জনসভায় বলেছেন ভোট চাইতে আসেন নি, একদলীয় ভোট রুখে দিতে এসেছেন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মাত্র দু’দশকের মধ্যে যে পুনরাবৃত্তি প্রত্যক্ষ করছে বাংলাদেশের মানুষ, সেখানে ক্ষমতার উদগ্র বাসনায় ভূমিকার বদল দেখছে মাত্র। ৯৬ সালে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধারণার বিরোধী ছিলেন আর শেখ হাসিনা আন্দোলন করছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতা নেত্রীরা কোন দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় বছরের পর বছর ধরে রাজনীতিতে এরকম গণবিরোধী চমকের জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন। আপামর জনসাধারন এর নির্বাক দর্শক বনে গেছে। যদিও পাঁচ বছর পরে রাজনীতিবিদদের কৃতকর্মের একটি জবাব দেবার সুযোগ তাদের কাছে আসে, ক্ষমতার খেলায় তাও প্রায়ই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। তাদের দেখতে হচ্ছে, ভোটে নির্বাচিত তাদের প্রতিনিধিরা এক ঘন্টার নোটিশে গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে একদলীয় শাসন বাকশাল প্রবর্তন করতে পারেন, সামরিক শাসনসহ সকল অগণতান্ত্রিক শাসনকে বৈধ করে দেন, দিনের পর দিন সংসদ বর্জনের চমক দেখাচ্ছেন, হাওয়া ভবন তৈরি করে সরকারের ভেতরে সরকার সৃষ্টি করছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুন্ঠনের মহোৎসবে মেতে উঠছেন, স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন বা বিতাড়নের খেলা খেলছেন, যোগ্য নেতৃত্বের বদলে উত্তরাধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করছেন, ক্ষমতাসীনরা গণতন্ত্রের নামে একের পর এক স্বৈরতান্ত্রিক ইচ্ছার বাস্তবায়ন করছেন এসবই হচ্ছে আমাদের ক্ষমতাসীন বা বিরোধী রাজনীতিবিদদের চমকের পর চমক।

তারা যত চমক দেখাচ্ছেন জনগণ ততই আশংকিত হচ্ছেন, হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হচ্ছেন। সেজন্যই জনগণ এখন আর শেখ হাসিনা এবং তার তনয় জয়ের কিংবা খালেদা জিয়া এবং তার তনয় তারেকের আর কোন চমক দেখতে চাচ্ছে না। তারা চাচ্ছে, একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ নির্বাচন, যেটির মাধ্যমে তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারবেন। যদিও জানা রয়েছে তাদের, বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে বারংবার প্রতারিত হয়েছেন, ভবিষ্যতেও হবেন। কিন্তু তাদের এর বাইরে যাওয়ার এই মূহুর্তে আর কোন বিকল্পও নেই।

চার.

গত ১৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে সিপিবিবাসদের জনসভায় ছাত্রলীগ সশস্ত্র হামলা চালিয়ে সবশেষ গণবিরোধী চমক সৃষ্টি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে! আমাদের বাম ধারার রাজনীতিবিদরা এখন অনেক বেশি নিরীহ। সরকারের বিরুদ্ধে তারা খুব উচ্চকিত নয়। তারপরেও নানা মতভেদ, সংকট, সমস্যা থাকা স্বত্বেও জনগণের পক্ষে দাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বা রাখছেন, এটি সরকারের ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন ছাত্রলীগের সহ্যের বাইরে চলে যাওয়া এটি বোধহয় বড় চমক! সজিব ওয়াজেদ জয় যে চমকের কথা বলেছেন সেটির শুরু এই হামলার মধ্য দিয়ে কিনা, তা প্রমাণ করার দায় তার এবং আওয়ামী লীগের।।