Home » আন্তর্জাতিক » মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ১)

মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ১)

আইজাজ আহমদ

egypt-1গত তিন বছরের কম সময়ে (২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত) মিশরের ইতিহাসে নজিরবিহীন দুটি বিশাল গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে। প্রথম গণঅভ্যুত্থানে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে, বিশেষ করে মিশরে আনোয়ার সাদতের অভ্যুদয়ের পর থেকে, মিশরীয় রাজনীতিতে চেপে বসা জগদ্দল পাথর অপসৃত হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় হোসনি মোবারকের স্বৈরতন্ত্র উৎখাত হয়। দ্বিতীয়টি, আরো সাম্প্রতিক এবং এমনকি আরো বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থানটি, যেটাকে অনেকে ‘জুন ৩০ আন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করছে, ছিল আসলে মুসলিম ব্রাদারহুডকে (আরবিতে যার নাম ইখওয়ান, এই প্রবন্ধে দলটিকে এই নামেই অভিহিত করা হবে) তার নিজস্ব একদলীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেছে।

উভয় ক্ষেত্রেই গণআন্দোলন বিদ্যুৎ গতিতে তার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে প্রথম ক্ষেত্রে বিরাজমান স্বৈরতন্ত্রকে উৎখাত করা এবং অপর ক্ষেত্রে উদীয়মান একনায়কতন্ত্রকে হটিয়ে দেওয়া। উভয় ক্ষেত্রেই, বিশেষ করে দ্বিতীয় গণআন্দোলনে মিশরের শ্রমিক শ্রেণী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যদিও প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল এই শ্রেণীটিই চরমভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অবশ্য উভয় ক্ষেত্রেই গণআন্দোলনে প্রাথমিক সুবিধাভোগী হয়েছে পরাক্রমশালী ডানপন্থী শক্তি। তবে ২০১১ সালের ‘জনগণের বসন্তে’ তথা বাম উদার শক্তির সেক্যুলার গণঅভ্যুত্থানের সময় ইখওয়ান স্বপ্নেও ভাবেনি যে তারা মিশরে এত সহজে সরকার গঠন করতে পারবে। চলতি বছরের জুন জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান ছিল মানব ইতিহাসের সম্ভব বৃহত্তম গণবিক্ষোভ। এতে কেবল মোবারকবাদী, নাসেরবাদী এবং উদারবাদী জোটই অংশ নেয়নি, বামপন্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও যোগ দিয়েছিল। ইখওয়ানের স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল সামরিক অভ্যুত্থান তথা সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে।

জনসংখ্যাগত এবং প্রদর্শনগত বিপুলতা সত্ত্বেও এই দুই অভ্যুত্থানের কোনোটিকেই ‘গণবিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করা যায় না। এমনকি সীমিত অর্থে ১৯৫২ সালের নাসেরবাদী ফ্রি অফিসার্স এর অভ্যুত্থানের সঙ্গেও এই দুটি তুলনীয় নয়। নাসেরবাদীরা অত্যন্ত দ্রুতগতির সঙ্গে মৌলিক পদ্ধতিগত পরিবর্তন সাধন করেছিল। তারা রাজতন্ত্র সঙ্গে সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থারও উচ্ছেদ করেছিল। ভূমি সংস্কার করেছিল, পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছিল, পাবলিক সেক্টর গঠন করেছিল। তারা এমনসব নীতি গ্রহণ করেছিল, যাতে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী সুবিধা পায়। ২০১১ কিংবা ২০১৩ সালের গণঅভ্যুত্থানগুলোতে এসবের কিছুই ছিল না। এই দুই গণআন্দোলনে কেউ কেউ ওইসব কর্মসূচিকে সাধারণভাবে তাদের দাবিনামায় তুলে ধরলেও গত আড়াই বছরে যারা ক্ষমতায় ছিল বা ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছে, এমনকি ইখওয়ানকে হটিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছে তাদের কারোর মধ্যেও নাসেরের মৃত্যুর পর সাদতের উত্থান পরবর্তী ৪০ বছরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের আবির্ভাব ঘটেছে তাদের কাউকে ঘাটানোর ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। সাদতের গৃহীত দ্বিমুখী নীতিতে একদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইনফিতা (সাম্রাজ্যবাদী মূলধনের জন্য উন্মুক্ত দুয়ার নীতি) এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলি অক্ষের সঙ্গে জোট গঠন এবং উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ওপর জোর দেওয়া হয়। বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যবস্থা কায়েমে প্রতিশ্রুতবদ্ধ হিসেবে পরিচিত ইখওয়ানের আমলেও এসব কিছু পুরো মাত্রায় বহাল তবিয়তে থাকে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে থাকে ‘গণতন্ত্র’ নামের বিষয়টির ওপর। সংকীর্ণ অর্থে কেবল স্থিতিশীল নির্বাচনী ব্যবস্থা হিসেবেই একে বিবেচনা করা হতে থাকে।

২০১১ সালের পরের ঘটনা

দীর্ঘ মেয়াদে ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানটি বড় ধরনের এবং মৌলিক ঘটনা। কারণ এর মধ্যমে রাজতন্ত্র বিদায় নেওয়ার পর থেকে মিশরের রাজনীতিতে স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিরাজ করতে থাকা একদলীয় সরকারের (সাদত ও মোবারকের আমলে কঠোর স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি দুর্নীতি আর পুঁজির সেবায় নিয়োজিত ছিল) ঐতিহ্যের অবসান ঘটে। একদলীয় সরকার অবসান হওয়ায় উদার স্বাধীনতার উপাদান যুক্ত হয়েছে এবং অন্তত কাগজে কলমে হলেও সাংবিধানিক ব্যবস্থা এবং পার্লামেন্টারি নির্বাচন সমুন্নত রাখার নীতি স্বীকৃত হয়েছে। অবশ্য, একদলীয় ব্যবস্থা অবসানের পরপরই যে ব্যবস্থা ক্ষমতায় আসে সেটাকে বলা যেতে পারে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’। ২০১৩ সালের বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে সেনাবাহিনী যে ভূমিকা পালন করেছে, সেই সেনাবাহিনীই ২০১১ সালের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার তদারকি করেছিল। সেনাবাহিনীর অন্তর্বর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার প্রেক্ষাপটেই ইখওয়ান নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়েছিল।

মোবারক পতনের পরপরই গণআন্দোলন যে দাবি ব্যক্ত করেছিল তা পার্লামেন্ট নির্বাচন ছিল না। বস্তুত তখন দাবি উঠেছিল রাজনৈতিক ক্ষেত্র যতক্ষণ পর্যন্ত না সুসংগঠিত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত যেন নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়। তারা চাইছিল এমন একটি গণপরিষদ যেটা দেশের সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তির, বিশেষ করে যারা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সফলভাবে বিদ্রোহ করেছে, প্রতিনিধিত্ব করবে। তাদের চাওয়া ছিল একটি আধুনিক, সেক্যুলার, প্রগতিশীল সংবিধান যা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পূর্বশত শ্রমজীবী শ্রেণী, নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং সমাজের অন্যান্য পশ্চাদপদ শ্রেণীকে সুরক্ষা দেবে। এটাও প্রত্যাশা ছিল, যেকোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংবিধান সশস্ত্র বাহিনীর সুযোগ সুবিধা ব্যাপকভাবে হ্রাস করবে। অন্যদিকে এটাও বোঝা গিয়েছিল, যেকোনো তাৎক্ষণিক নির্বাচন আয়োজন অনিবার্যভাবে ইখওয়ান (মিশরের সবচেয়ে সুসংগঠিত ও ব্যাপকভাবে তহবিলপুষ্ট) এবং মোবারকপন্থী বুর্জোয়াদের (তারা কেবল সম্পদ এবং মোবারক আমলের ভুয়া ভোটার সংবলিত নির্বাচন পরিচালনাকারী রাজনৈতিক যন্ত্রেরই নিয়ন্ত্রণ করত না, সেইসঙ্গে বিচার বিভাগ, বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে) আনুকূল্য দেবে।

সশস্ত্র বাহিনী তাদের নেতা হিসেবে মোবারককে হারিয়ে এবং কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রবল জনমতের চাপের মুখে তারা এমন একটি নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ পেল যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের মধ্যে একদিকে মূলত ইখওয়ান ও অন্যান্য ইসলামী দল এবং অন্যদিকে মোবারকপন্থী জয় জয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। ‘গণতান্ত্রিক’ নির্বাচনের সম্ভাবনার মাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি করে গণআন্দোলনের উগ্রতা প্রশমিত করা সম্ভব। আবার নির্বাচন আয়োজন করে সশস্ত্র বাহিনীও নির্বাচনী গণতন্ত্রের রক্ষা কর্তা হিসেবে বিবেচিত হয়ে তাদের হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে পারে। আর এর মাধ্যমে চরম ডানপন্থী দুটি শক্তির একটি নতুন, নির্বাচিত, গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এ কারণে প্রথমে গণপরিষদের সভা আহক্ষান করার গণদাবি প্রত্যাখ্যাত হলো, নির্বাচনী প্রক্রিয়া গতিশীল হলো। মিশরে সার্বিকভাবে ইসলামপন্থীদের দুটি শাখা ইখওয়ান ও সালাফি পন্থীরা ছিল সত্যিকার অর্থে সুসংগঠিত। ফলে তারাই পার্লামেন্টারি নির্বাচনে খুবই ভালো করে, তিন চতুর্থাংশ আসন দখল করে।

এরপর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অবস্থাটা পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই বদলে যায়। প্রথমত ইখওয়ানের ভেতরকার দুটি ধারার মধ্যেই মৃদু চাঞ্চল্য দেখা যায়। একটি ধারার নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদ মুরসি, পরে নির্বাচনে তিনিই জয়ী হয়েছিলেন। অপর ধারাটির নেতৃত্বে ছিলেন বর্ষীয়ান আবুল ফুতুহ। তিনি ২০০৯ সালে তিনি ইখওয়ান ত্যাগ করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফুতুহ ইখওয়ানের ‘সংস্কারবাদী’ ধারার প্রতিনিধত্ব করতেন। তিনি যুক্তিযুক্ত পন্থায় ‘উদার’ ও ‘নিয়মতান্ত্রিক’ পথে চলতে চেয়েছিলেন। তিনি চাইতেন ইখওয়ানকে তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের জাস্টিস অ্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং ইউরোপের খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাসির মতো রূপান্তরিত করতে। অন্যদিকে মুরসির সম্পর্ক ছিল ঐতিহ্যবাহী দুটি শাখার সঙ্গেই। এ দুটির নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে সুপ্রিম গাইড মোহাম্মদ বদিই এবং দলে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিলিয়নিয়ার খায়রাত আল সাতির। প্রথম রাউণ্ড নির্বাচনের সত্যিকারের বিস্ময় ছিল খুবই সামান্য প্রস্তুতি সত্ত্বেও বাম নাসেরপন্থী প্রার্থী হামদিন সাবাহির ২১ শতাংশ ভোট লাভ (যেখানে মুরসি পেয়েছিলেন ২৫ শতাংশ)। সাবাহির চেয়ে বেশি ভোট পেতে মোবারকপন্থী তৈরি করা হলো। সাবাহি নির্বাচনে সেনাবাহিনী সমর্থিত মোবারকপন্থী প্রার্থীর (মোবারকবিহীন মোবারকবাদ হিসেবে আখ্যায়িত) জয়কে ওই সময়ের সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে দেখলেন। তিনি মোবারকপন্থী প্রার্থীর বিরুদ্ধে মুরসিকে ভোট দিলেন। আরো কয়েকটি প্রগতিশীল গ্র“পও একই কাজ করেছে। ফলে মুুরসি ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে গেলেন। কিন্তু তবুও সেনাবাহিনী এবং আড়ালে থাকা তাদের সমর্থকেরা ফলাফল ঘোষণা করতে প্রায় এক সপ্তাহ বিলম্ব করে। তাকে এবং ইখওয়ানের কাছে অনেক নিশ্চয়তা চাওয়া হয় এবং আমরা সবাই জানি সেইসব নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল।

এরপর পরই মুরসি ঘোষণা করলেন যে তিনি ক্যাম্প ডেভিডসহ ইসরাইলের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি মেনে চলবেন। তিনি তার ইসরাইলি প্রতিপক্ষ শিমন পেরেসকে চিঠি লিখলেন ‘আমার প্রিয় বন্ধু’ সম্বোধন করে। এছাড়া হামাসকে দামাস্কাস থেকে সরিয়ে কাতারে নিয়ে এলেন। তিনি হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে চুক্তি করার ব্যবস্থা করলেন বা ব্যবস্থা করার কৃতিত্ব নিলেন। হামাসের ওপর ইসরাইলের নৃশংস বোমা হামলার পরই ওই চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তিতে মুরসির নেতৃত্বে মিশর নিশ্চয়তা দিল যে হামাস আর কোনো রকেট হামলা চালাবে না। অথচ ইসরাইল হামলা চালাবে না এ ধরনের কোনো নিশ্চয়তা ইহুদি রাষ্ট্রটি দেয়নি। বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে হামাসকে যেসব মূল্য দিতে হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে যেসব টানেল দিয়ে গাজায় অত্যাবশ্যকীয় পণ্যরাজি পরিবহণ করা হতো সেগুলোর বেশির ভাগই বন্ধ করতে মুরসি রাজি হয়েছিলেন। তবে হামাসকে আরো বড় যে মূল্য দিতে হয়েছে তা হলো সিরিয়া ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।।

(ভারতের প্রভাবশালী ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধের ভাষান্তর)