Home » অর্থনীতি » কর্জ করে চলছে সরকার

কর্জ করে চলছে সরকার

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

government-cartoonব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই শেষে ব্যাংক থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে ৮৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। আর আগস্টের ১৩ তারিখে সে ঋণ ৩ হাজার ৪১৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এ হিসাবে মাত্র ১৩ দিনে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৩ হাজার ৩২৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৩১৪ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৪ হাজার ৩৩৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আর এ সময়ে সরকারের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের পাওনা ৯২০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা পরিশোধ করায় গত অর্থবছরের নিট ঋণ দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ১৯৩ কোটি ২২ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে অন্যান্য উৎস তথা সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও বিদেশি অনুদান আশানুরূপ হারে না আসায় ব্যাংকিং খাতের ওপর একটু বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে। ঘাটতি মেটাতে গত অর্থবছরে (২০১২১৩) সরকার নিট ২৪ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এ ঋণের মধ্যে শুধু গত জুনেই নেয়া হয়েছিল ১২ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। ২০১১১২ অর্থবছরের বাজেটে ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা ঋণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থবছরের মাঝামাঝি সময় থেকে সরকারের ঋণের চাহিদা বেশ বেড়ে যাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ২৯ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ওই পরিমাণ ঋণ আর নিতে হয়নি। ২০১০১১ অর্থবছরের ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছিল ২০ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় বাড়ায় সরকার এ ঋণ নিচ্ছে। নির্বাচনী বছরে সরকার তার ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা দেখায়। আর এ কারণে বিভিন্ন উৎস থেকে ধার করার পরিমাণ বাড়ে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সঙ্কট না থাকায় ঋণ সরকারিখাতে দিলে তাতে খুব একটা অসুবিধা নেই। তিনি বলেন, সরকারের চাহিদামাফিক ঋণের ৬০ শতাংশ পিডি (বর্তমানে ১৩টি ব্যাংক আর ২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিডি ডিলার আওতায় আছে, সরকারের প্রয়োজনে তারা ঋণ দিতে বাধ্য) ব্যাংক পূরণ করার পর বাকি ৪০ শতাংশ ননপিডিদের ঋণ দিতে হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারের ঋণের অধিকাংশ চাপানোর এ সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে করে তেমন ক্ষতি না হলেও আগামীতে বেসরকাবি খাতে ঋণ প্রবাহে সমস্যা দেখা দিবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, নানা কারণে বেসরকারিখাতে ঋণ চাহিদা কম থাকায় সরকারের চাহিদার পুরোটাই এখন সরবরাহ করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সরাসরি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকে। আগের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে শুধু পিডি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সরকার ঋণ নিতে পারতো। সম্প্রতি ২৫টি ননপিডি ব্যাংকও এ তালিকায় সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ খানিকটা কমেছে। সরকারের চাহিদা মাফিক ঋণের ৬০ শতাংশ পিডি ব্যাংক পূরণ করার পর বাকি ৪০ শতাংশ ননপিডিদের ঋণ দিতে হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারের ঋণের অধিকাংশ চাপানোর এ সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

উন্নয়ন অন্বেষণের মতে, ২০০৯১০ অর্থবছর থেকে মোট সরকারি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং ২০১৩১৪ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় তিন হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা বেশি। সরকারি ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা ঘাটতি পূরণের জন্য রাজস্ব সংগ্রহের ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। গত তিন অর্থবছর ধরে সরকার তফসিলি ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করছে। ২০১২১৩ অর্থবছরে সরকার তার বাজেট লক্ষ্যমাত্রা থেকে পাঁচ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে। আবার ২০১৩১৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে ২৫ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এভাবে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

সরকার যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তার প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতের উপর। সরকার ঋণ না নিয়েও পারে। সরকার চাইলে টাকা ছাপিয়ে তার ব্যয় মেটাতে পারে। যার প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার কোটি টাকা (২০১২১৩ অর্থবছর)। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়ানো হয় ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। তা কমে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৯৫১ কোটি টাকায়। সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট ছিল ৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, তা কমে হয় ১ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। ব্যক্তি উদ্যোক্তারা বলছেন, ঋণের সুদ হার কমে আসছে, কমছে আমানতের সুদও। এই বাস্তবতায় বিনিয়োগের স্বার্থে বেসরকারি খাতকে বঞ্চিত রাখা ঠিক হবে না। ব্যাংক থেকে সরকার যে ঋণ নেবে তা কোন খাতে খরচ করা হবে? ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ করা যায়। কিন্তু তাতে ফল ভাল হয় না। অনেকে মনে করেন, সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা কমানো উচিত।

বেসরকারি খাতের সমস্যা অনেক। হরতাল অবরোধ যত বেশি হয় তত তাদের সমস্যা হয়। উৎপাদন কমে যায়। এক্সপোর্ট শিপমেন্ট হয় না। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ব্যক্তি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শেয়ারবাজারে ধস, শ্রমিক অসন্তোষ ইত্যাদি কারণেও ব্যক্তিখাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাংকগুলোর সামনেও নানা রকম সমস্যা। হল মার্কের কেলেংকারি বা এ ধরনের ঘটনা ব্যাংকগুলোকে সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। এই অবস্থায় সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিবে। এনিয়ে ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এতে তারা বিনিয়োগের জন্য ঋণ পেতে সমস্যা হবে। ব্যাংকগুলোর কি সরকারকে ঋণ দেয়ার মতো সক্ষমতা আছে?

২০১৩১৪ অর্থবছরের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে (প্রস্তাবিত বাজেটে) তাতে ৪৮৩৬২ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। তাতে আভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা হলো, ৩৩৯৬৪ কোটি টাকা। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়া হবে ২৫৯৯৩ কোটি টাকা। তার মধ্যে ১৪৩৫৫ কোটি টাকা নেয়া হবে দীর্ঘ মেয়াদে। ১১৬৩৮ কোটি টাকা নেয়া হবে স্বল্প মেয়াদে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে আয় ধরা হয়েছে, ৪৯৭১ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় প্রভিডেন্ড ফান্ড সহ অন্যান্য উৎস থেকে নেয়া হবে ৩ হাজার কোটি টাকা।।