Home » রাজনীতি » গণতন্ত্রের বুলি আর অন্তরের বিশ্বাস

গণতন্ত্রের বুলি আর অন্তরের বিশ্বাস

ফারুক আহমেদ

democracyবাংলাদেশে এ পর্যন্ত শাসক দল হিসেবে যেসব দল দেশ শাসন করেছে তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় দাবিদার। আওয়ামী লীগ নিজেকে শুধু গণতান্ত্রিক দলই বলে না বাংলাদেশের একমাত্র গণতান্ত্রিক দল হিসেবেই নিজের প্রচার করে থাকে। বর্তমানে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যে সংকট তার কেন্দ্রেও আছে আওয়ামী লীগের নিজেকে একমাত্র গণতান্ত্রিক দল মনে করে অন্যদেরকে অগণতান্ত্রিক হিসেবে খারিজ করে দেওয়ার এক অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী মনোভাব। বর্তমানে আওয়ামী লীগ কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের যুক্তি একটাই। তা হলো অন্যরা যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তারা অগণতান্ত্রিকরূপেই থাকে। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন কোনভাবেই অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে পারে না। কিন্তু আওয়ামীলীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তারা বাংলাদেশের একমাত্র গণতান্ত্রিক দল হিসেবেই ক্ষমতায় থাকে। তাই তার ক্ষেত্রে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন প্রয়োজন নেই। সে যোগ্যতা আওয়ামী লীগের আছে।

অন্যরা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় বসলেও আওয়ামী লীগ তাদেরকে অগণতান্ত্রিক বলে এটাই প্রমাণ করে যে, নির্বাচিত হলেই ব্যবস্থাটি গণতান্ত্রিক হয় না। আওয়ামী লীগের এই ব্যাখ্যাটি ঠিকই। তবে এই ব্যাখ্যা করার সময় আওয়ামী লীগ নিজের চেহারার দিকে তাকায় না। আওয়ামী লীগের এই ব্যাখ্যাটি তার নিজের জন্যও যে সঠিক তা শুধু আওয়ামী লীগ মানতে চায় না। এর কারণ হলো আওয়ামী লীগ অন্যদেরকে যে অগণতান্ত্রিক বলে ঢোল পেটায় তা নিতান্তই ঝগড়াঝাটি এবং কথার কথাই তা কখনোই ধারণ করে না। এই কারণে করেনা যে, নিজেদের অগণতান্ত্রিক চরিত্র তার নিজের অজানা থাকবার কথা নয়।

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেই যে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ষোলআনা শর্ত পূরণ হবে না,এ কথা আর অন্যদের বলার প্রয়োজন পড়ছে না। কিন্তু শাসক দলগুলো নির্বাচন কেন্দ্রীক যে সংকট জনগণের উপর চাপিয়ে রেখেছে তা থেকে মুক্ত না হলে গণতন্ত্রের অন্যান্য শর্ত পূরণ বাধাগ্রস্থ হয়। এই সংকট না থাকলে সর্বস্তরের জনগণের মধ্য থেকে গণপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন, পার্লামেন্ট এবং সরকার গঠনের দাবি জোরদার হবে। মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হবে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না।তাই নির্বাচন নিয়ে জনগণের উপর সংকট চাপিয়ে রাখার অর্থই হচ্ছে গণতন্ত্রের সংগ্রাম থেকে জনগণকে ছিটকে ফেলে দিয়ে এমন একটি নির্বাচন করা যা হবে গণপ্রতিনিধিত্বহীন। বার বার শাসক দলগুলো এ কাজটিই করে চলেছে। আর এই কাজের সবচেয়ে দক্ষ কারিগর আওয়ামী লীগ।

নিজেকে একমাত্র গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পরিচয় দিলেও গণতন্ত্রের শর্তগুলো ধ্বংসের কাজ আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই করে আসছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে তাদের রচিত সংবিধান কার্যকর হয়। অল্পদিনের মধ্যে অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জরুরি অবস্থা জারিসহ নিবর্তনমূলক কালাকানুনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তারা নিজেরাই সে সংবিধান সংশোধন করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। সংবিধান রচনা এবং প্রণয়নে যেমন সর্বস্তরের গণপ্রতিনিধিত্বের কোন ভূমিকা ছিল না তেমনই সংবিধানের সংশোধনও জনগণের কোন চাহিদা ছিল না। বরং এর মধ্যদিয়ে জনগণের উপর নির্যাতন এবং জনগণের দুর্ভোগের সকল শর্তই পূরণ করা হয়েছিল। শুধু তাই নয় বাংলাদেশে পরবর্তীতে যত ধরণের শাসন চলেছে তারও শর্ত এর মধ্যেই ছিল। যে দল সংবাদ পত্র সহ বিরোধী সবকিছু বন্ধ করে দিতে পারে, সকলের কন্ঠ রোধ করতে পারে সে দল কতটা গণতান্ত্রিক? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রহসন,সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা, একদলীয় শাসন প্রবর্তন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সহ আওয়ামীলীগের বড় বড় সব অগণতান্ত্রিক চমক এদেশের মানুষ শুরুতেই প্রত্যক্ষ করেছেন। একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের হস্তান্তর, সাধারণ ক্ষমা অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধা হলেও ভিন্ন মতের মানুষদের দমন, খুন,বিনা বিচারে আইন বহির্ভুত হত্যা। এ কথা সত্য যে, এক চমক বিপরীত চমকের জন্ম দেয়। জনগণের পক্ষে চমক হয় না। চমক হলো সুযোগ সন্ধানী এবং ধোঁকাবাজদের কাজ।

গণতন্ত্রের জন্য শুধুই নির্বাচন যথেষ্ট নয়, জনগণের সকল অংশের যে গণপ্রতিনিধিত্ব গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যাত্রা সেই গণপ্রতিনিধিত্ব দ্বারা শুরু হয়নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল পরাধীন দেশের কাঠামোর মধ্যে নির্বাচনে জয়ী ব্যাক্তিদের দ্বারা। এক একটি কাঠামোর মধ্যে মানুষ এক এক বিবেচনয়ায় ভোট দেয়। কাজেই বিরাজমান কাঠামোর মধ্যে নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের জন্য জনগণের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এক কথা নয়।বাংলাদেশে পরাধীন কাঠামোর মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়ে আসা লোকদের দ্বারা যে রাষ্ট্র কাঠামো নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে পাঁচ বছরের ব্যবধানে নির্বাচন করেও গণপ্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র সম্ভব নয়। এর মধ্যদিয়ে যা সম্ভব তা হলো বিরাজমান কাঠামোর মধ্যে প্রতিনিধি পরিবর্তন। বাংলাদেশে শাসক দলগুলো সেই যোগ্যতাটুকুও আর্জন করতে পারেনি। রাজনৈতিক সংগঠন এই দলগুলো গঠন করতে পারেনি। যা গঠন করেছে তা হলো ব্যাক্তিকে ঘিরে পেশি শক্তির জোট। তাই সেই ব্যাক্তির অনুপস্থিতিতে এই জোট আর জোটবদ্ধও থাকতে পারে না। তাই শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের পর এদের ঘিরে গড়ে ওঠা জোট দাঁড়াতে পারেনি। তাই শূন্যস্থানে এরশাদ তাদের পক্ষে কর্তব্য পালন করেছেন।এরশাদের নয় বছরের সামরিক শাসনে জনজীবন দারুনভাবে আক্রান্ত হয়।সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষুব্ধ হতে থাকে। এরই মধ্য থেকে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে ঘিরে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি সংগঠিত হয়। ১৯৯০ সালে ছাত্রজনতার এক অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে এরশাদের পতন ঘটে। সংগঠিত শক্তি হিসেবে এই দুই দলই সামনে আসে।

নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ১৯৯১ সালে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনও পূর্বে তৈরীকৃত কাঠামোর মধ্যেই সংঘঠিত হয়েছিল। তাই নির্বাচন হলেও সেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল একটি সরকার ব্যবস্থা বা পার্লামেন্ট হতে পারেনি। গণপ্রতিনিধিত্বহীন ও নামে গণতন্ত্রের মধ্যে নির্বাচনী মহড়া বজার রাখার এক অভ্যন্তরীণ সংকট আছে। এই অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে শাসক দলগুলোকে যেসব কাজ করতে হয়েছে তার মধ্যে প্রধান হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাত দেওয়া। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমনভাবে হাত দিয়েছে যে, সেগুলো আর প্রতিষ্ঠান হিসেবে নেই। সেগুলো পরিণত হয়েছে যে যখন ক্ষমতায় থাকবে তার পেশিশক্তির তল্পিবাহকে। প্রশাসন,বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাসীন দলের তল্পিবাহকে পরিণত করা হয়েছে। এ গেল অভ্যন্তরীণ দিক। বাইরের দিকটাতে যা দেখা যায় তা হলো প্রতিনিধিত্বহীন পেশিশক্তিকে পুষ্টি যোগানোর চিত্র। এ চিত্র নির্বাচনের সময় প্রার্থী মনোনয়ন থেকে সর্বস্তরে বিরাজমান। তাই দেখা যায় সংসদ সদস্যকে পেশিশক্তির মাধ্যমে নিজের পেশি শক্তি প্রদর্শণ করতে। ছাত্র নেতা নামধারিকে দেখা যায় টেন্ডারবাজি করতে। শ্রমিক নেতা নামধারিকে দেখা যায় দখলে নের্তৃত্ব দিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে দেখা যায় ছাত্র নেতা নামধারিদের সামনে হাত কচলাতে,স্তুতিবাজ আর বরকন্দাজ হিসেবে। গণতন্ত্রের নামে এই সকল চর্চা দ্বারাই জনগণ আক্রান্ত।

আওয়ামী লীগ সংবিধানের দোহাই দিয়ে এবং নিজেদের দলকেই একমাত্র গণতান্ত্রিক দল হিসেবে প্রচার করে যে সংকট জনগণের উপর চাপিয়ে রেখেছে তার স্বরূপ জানবার জন্যই সংক্ষেপে পিছনের এসব কথা আলোচনার প্রয়োজন পড়ল। আওয়ামীলীগ নিজেদের প্রয়োজনে সংবিধান কাটাছেঁড়া করতে পারে,কাটাছেঁড়াকে বৈধতা দিতে পারে আবার সংবিধান অপরিবর্তনীয় বলে তারই দোহায় দিয়ে জনগণের উপর সংকট এবং দুর্ভোগ চাপিয়ে দিতে পারে। কথিত ওয়ান ইলেভেনের বেনামী সামরিক সরকারের কথা বলে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরূদ্ধে যখন যুক্তি দেয়, তখন যে এ সরকার তাদেরই আন্দোলনের ফসল তারা বলেছিল তা ভুলে যায়। পরবর্তীকালে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা অনেক কিছুই করেছে কিন্তু যে সরকারের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের যুক্তি দিচ্ছে সেই বেনামী সামরিক সরকারের কোন কর্মকান্ড তারা অবৈধ ঘোষণা করেনি। বর্তমানে জনগণের উপর নির্বাচনের সংকট চাপিয়ে রেখে আওয়ামী লীগ পূর্বের ধারাবাহিকতাতেই প্রমাণ করছে মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও জনগণের উপর তার কোন আস্থা নেই। জনগণের উপর আস্থা থাকলে তারা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধন করেও সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনগণকে সংকটের মধ্যে ফেলে রাখত না।।

১টি মন্তব্য

  1. এরশাদের ক্ষমতা দখলকে সমর্থন দেয়া, ৮৬সালে নির্বাচনে গিয়ে এরশাদকে টিকে থাকতে সহযোগীতা করা, ১৯৯৬ সালে সেনাবাহিনীর ক্যু এ সমর্থন দেয়া, ওয়ান এলিভেন কে সমর্থন দেয়া সবই এই আওয়ামীলীগের কাজ। কেউ যদি বলে, বাংলাদেশে গনতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল না শুধু আওয়ামীলীগের জন্য, ভুল বলা হবে কি?