Home » আন্তর্জাতিক » চীনকে ঘিরে ফেলার মার্কিন নতুন পরিকল্পনা

চীনকে ঘিরে ফেলার মার্কিন নতুন পরিকল্পনা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ফরেন পলিসি থেকে

us-chinaবিমান ঘাঁটি ও সামরিক চৌকির শৃঙ্খল দিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী চীনকে ঘিরে ফেলছে। এই পরিকল্পনার সর্বশেষ অবস্থা হলো, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্র দ্বীপ সাইপ্যানে (জনসংখ্যা মাত্র ৪৮,২২০ ম্যারিয়ানা আইল্যান্ডসে গুয়ামের পর এটাই দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ) একটি ছোট বিমান অবতরণক্ষেত্র নির্মাণ। মার্কিন বিমান বাহিনী সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের একটি পুরনো বিমানঘাঁটিকে ‘ডাইভার্ট এয়ারফিল্ডে’ রূপান্তরিত করতে ৩৩ একর জমি ৫০ বছরের জন্য লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

একুশ শতকের জন্য পেন্টাগন যে নতুন বিশাল কৌশল গ্রহণ করেছে, সেটাকে ‘এয়ারসি ব্যাটল’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। চীন বা ইরানের মতো ক্রমবর্ধমান পরাক্রমশীল দেশের প্রতিরক্ষা লাইনে আঘাত হানার লক্ষ্যে বিমান ও নৌবাহিনীর মাধ্যমে সমন্বিত হামলা চালাতে প্রণয়ন করা হয়েছে এই কৌশল। বিষয়টা উভচর কৌশলের মতো মনে হচ্ছে। অবশ্য, সত্যি বলতে কী, ‘এয়ারসি ব্যাটল’ এখনো চিন্তাভাবনাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে, এই ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইতোমধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। ‘এয়ারসি ব্যাটল’ পরিকল্পনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া অংশ হচ্ছে সামরিক বাহিনীকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা থেকে একেবারে ক্ষুদ্র পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করে দেওয়া। এর ফলে এই বাহিনীর প্রধান ঘাঁটিগুলো চীনা ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলে সদস্যরা সহজেই সরে যেতে পারবে। গুয়াম কিংবা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অন্যান্য এলাকার প্রধান প্রধান বিমানঘাঁটিগুলোতে মার্কিন বিমান যদি প্রবেশ করতে না পারে কিংবা সীমিত হয়ে পড়ে, তবেই কেবল সাইপ্যান ব্যবহৃত হবে।

মার্কিন বিমান বাহিনী সুনির্দিষ্টভাবে বিদ্যমান সাইপ্যান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট সম্প্রসারণ করতে আগ্রহী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রও এই বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেছিল। মার্কিন বিমানবাহিনীর নথিপত্রে দেখা যায়, তারা এখন কার্গো, যুদ্ধবিমান, ট্যাংকার বিমানের পাশাপাশি বিকল্প অবতরণস্থল, যৌথ সামরিক মহড়া, যৌথ ও সমন্বিত মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের জন্যও বিমানবন্দরটি নতুন করে সাজাতে চায়।

এর মানে হলো, বিমান বাহিনী সেখানে অতিরিক্ত এয়ারক্র্যাফট পার্কিং স্পেস, হ্যাঙ্গার, জ্বালানি মজুত ট্যাংক, গোলাবারুদ মজুত স্থাপনাও নির্মাণ করবে। কেবল মানোন্নয়নের মাধ্যমেই যে এতসব কাজ করা যাবে না, তা বলাই বাহুল্য, ব্যাপক নির্মাণকাজ হাতে নিতে হবে।

সাইপ্যান ছাড়াও মার্কিন বিমান বাহিনী প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় তাদের শক্তি বাড়ানোর অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এলাকার তাদের ঘাঁটিগুলোতে নিয়মিত বিমান মোতায়েন পরিকল্পনা করছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ডারউইন ও টিনডালে অবস্থিত রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান বিমানবাহিনী ঘাঁটি, সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি ইস্ট বিমানবাহিনী ঘাঁটি, থাইল্যান্ডের কোরাত বিমানঘাঁটি, ভারতের ত্রিবান্দ্রামে নিয়মিত মোতায়েন। এছাড়াও সম্ভব হলে ফিলিপাইনের কিউবি পয়েন্ট এবং পুয়ের্তো প্রিসিসা এবং ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার বিমানক্ষেত্রগুলোতে মোতায়েন। এই বছরেরই জুলাইএ এক শীর্ষ মার্কিন বিমানবাহিনী জেনারেল এসব তথ্য প্রকাশ করেন।

চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল চ্যাং ওয়ানকুয়ান মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেলের সাথে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন সফরের সময় সাইপ্যানের কথা ঘোষণা করা হয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মার্কিন ঘাঁটির বিষয়টি ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ বিষয় হিসেবে উত্থাপিত হয়নি। তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিবিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে ওয়ানকুয়ান বলেন, ‘চীন শান্তিপ্রিয় জাতি। আমরা আশা করছি, যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলের কোনো বিশেষ দেশকে টার্গেট করবে না।’

মার্কিন সামরিক বাহিনী অবশ্য জোর দিয়ে বলছে, এয়ারসি ব্যাটল এবং সামগ্রিকভাবে এশিয়ায় তাদের সামরিক উপস্থিতি চীনকে কেন্দ্র করে নয়। কিন্তু তবুও অনেকে মনে করছেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের চীনা সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে এটা একটা প্রস্তুতি।

সেন্টার ফর স্ট্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অ্যান্থনি করডেসম্যানও এমনটা মনে করেন। তিনি বলেন, ‘পুরো অঞ্চলে চীনকে আরো বেশি বিচক্ষণ হবে। কারণ মার্কিন শক্তি ইতোমধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেছে। ওই শক্তিটা দেখাও যাচ্ছে। এটা কেবল তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বাস্তব বিষয়।’

ওই অঞ্চলে আমেরিকার মিত্রদেরও বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মার্কিন প্রতিশ্রুতি আইনসম্মত।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় সমগ্র মার্কিন বিমানবাহিনী কমান্ডার জেনারেল হার্বাট ‘হক’ কার্লাইল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সাউথ প্যাসিফিক ও দক্ষিণপশ্চিম এশিয়াজুড়ে মালার মতো ঘাঁটি নির্মাণের মাধ্যমে ট্যাংকার, যুদ্ধবিমানের কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা করছে। আমেরিকান কমান্ডাদের ভাষ্যমতে, তিনিয়ান ও সাইপ্যানের মতো স্থানগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই। কিন্তু তবু এসব স্থান যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডের নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় থাকবে।

কার্লাইল বলেন, ‘আমরা মার্কিন বিমান বাহিনীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির সমর্থনে’ প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় আর কোনো ঘাঁটি নির্মাণ করতে চাই না। তবে তিনি কৌশলে সত্য কথাটাও বলে ফেলেছেন : ‘নতুন’ কোনো ঘাঁটি স্থাপন না করা হলেও বিদ্যমান বিমানবন্দরগুলো সম্প্রসারণ এবং সাইপ্যান ও তিনিয়ানের মতো স্থানে পরিত্যক্ত স্থাপনাগুলো নতুন করে নির্মাণের কাজ করা হবে। তিনিয়ানের এমন একটি ঘাঁটি মার্কিন মেরিন পুনঃর্নিমাণ করেছে, যেখান থেকে বি২৯ এনোলা জাপানি নগরী হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা ফেলার জন্য উড্ডয়ন করেছিল।

বিমানক্ষেত্রগুলোকে নতুন করে সাজানোর কথা স্নায়ুযুদ্ধকালেও শোনা গিয়েছিল। ওই সময়ে আমেরিকান ইউনিটগুলো সোভিয়েতদের ইউরোপের ভেতর ও বাইরে কোণঠাসা করে রাখতে সার্বক্ষণিক চেষ্টা চালাত। এখন নতুন শত্রু প্রতিরোধে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিমানক্ষেত্রগুলোকে মালার মতো গেঁথে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার ঘাঁটিগুলোতে অব্যাহতভাবে তাদের ইউনিটগুলো মোতায়েন করছে।

কার্লাইল বলেন, ‘স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের কথা মনে করে দেখুন। আমরা তখন চেকার্ড ফ্ল্যাগের ব্যবস্থা করতাম। এর মাধ্যমে আমরা প্রতিটি কনাসকে (কন্টিনেন্টাল ইউনাইটেড স্টেটস) ইউনিটকে পুরো ইউরোপ ঘুরাতাম। প্রতি দুই বছরে প্রতিটি ইউনিট ইউরোপের বিভিন্ন কার্যক্রম চালাত। আমরা প্রশান্ত মহাসাগরে ওই ব্যবস্থাই আবার চালু করতে চাইছি।’

এই ব্যবস্থার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল তার বিমানগুলোকে ধক্ষংসের হাত থেকেই রক্ষা করবে না, সেইসঙ্গে বিশ্বের ওই অংশের অংশিদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতেও সহায়ক হবে বলে জানিয়েছেন সেন্টার ফর স্ট্যাটেজিক অ্যান্ড বাজেটারি অ্যাসিসমেন্টসের জ্যাঁ ভ্যান টোল। ওয়াশিংটনের এই থিংক ট্যাংক পেন্টাগনকে এয়ারসি ব্যাটল ধারণা প্রণয়নে সহায়তা করেছে। তিনি জানান, এই পদক্ষেপ যেসব স্থানে সত্যিকার অর্থে যুক্তরাষ্ট্রকে লড়াই করতে হবে, সেখানে আন্তঃসক্রিয়তা, সম্পর্ক সৃষ্টি ও অভিজ্ঞতা এনে দেবে।

আর কোন কোন পুরনো ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রসারণের কথা চিন্তা করছেএই প্রশ্নের জবাবে ভ্যান টোল বলেন, ‘বিভিন্ন লোকজন তারা যেসব ঘাঁটি দেখতে চায়, সেগুলোর কথা বলবে। যেমন ওয়েক আইল্যান্ড বা পালাউ। উভয় স্থানই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে আমেরিকার এয়ারস্ট্রিপ হিসেবে বহাল রয়েছে। বস্তুত ওয়েকে আগে থেকেই খুবই সীমিত আকারে আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। আর এর মধ্যেই পালাউ প্রকাশ্যেই ফিরে এসে সেখানকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন এয়ারস্ট্রিপ ব্যাবহারের জন্য আমেরিকান সামরিক বাহিনীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

করডেসম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় এ ধরনের তিন স্তরবিশিষ্ট ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছে। কোনো কোনোটি হবে পুরোপুরি আমেরিকান, কিছু কিছু হবে অস্ট্রেলিয়ার বা ভারতের, যেগুলো পরিচালনা করবে মিত্ররা এবং আমেরিকানদের সেখানে মোতায়েনে সহায়তা করবে। তৃতীয় স্তরে থাকবে ছোট, জরুরি, গোপন ঘাঁটির সমাহার।

তিনি জানান, আপনি প্রথমে কোনো কোনো এলাকায় ঘাঁটি বানিয়ে দেখাতে পারেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের অবস্থান থেকে কাজ করতে পারে, তারপর আপনি মিত্রদের সঙ্গে মিলে শক্তি প্রদর্শন করতে পারেন। আর তারপর আনুষঙ্গিক সামর্থ্য বাড়াতে চাইবেন।

আরেকটি বিষয় হলো, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার ক্ষেত্রে পুরনোগুলোই নতুন হয়ে ফিরে আসে।।