Home » রাজনীতি » দুর্নীতিবাজরাই এখন সার্টিফিকেটধারী দেশপ্রেমিক!

দুর্নীতিবাজরাই এখন সার্টিফিকেটধারী দেশপ্রেমিক!

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

corruptionভারতের খ্যাতনামা সাংবাদিক খুশওয়ান্ত সিংয়ের ‘জোকস’ বইটি সুযোগ পেলেই পড়ি। বইটিতে তার দেশের নানা দূর্নীতিঅনাচার নিয়ে স্যাটায়ার করেছেন নির্বিবাদে। ভারতের সামগ্রিক দুর্নীতি নিয়ে তার রয়েছে বিখ্যাত সব রসিকতা। বাংলাদেশে পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকবাংলাদেশকানাডাএসএমসি লাভালিন আর দুদককে নিয়ে আবার নতুন করে তোলপাড়, তখনই খুশওয়ান্ত সিংয়ের বহুবার পড়া একটি জোকস্ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলো। সেটি হচ্ছে, একদিন গর্বাচেভ, রিগ্যান ও রাজীব গান্ধী ঈশ্বরের দরবারে উপস্থিত হলেন নিজ নিজ দেশের ভাগ্যে কি আছে জানতে। গর্বাচেভ জানতে চাইলেন, তার দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে কবে? ঈশ্বর জবাব দিলেন, এখন থেকে ছাব্বিশ বছর পর! রিগ্যানও একই প্রশ্ন করলে ঈশ্বরের নির্লিপ্ত জবাব, বেশ সময় লাগবে, কমপক্ষে আরেক শতাব্দী। রাজীব গান্ধী বললেন, ভারত সম্পর্কে দয়া করে বলুন। উত্তর দিতে গিয়ে ঈশ্বরের চোখে অশ্রু দেখা দিল। তিনি বললেন, ভারত কখন দুর্নীতিমুক্ত হবে তা কি আমি দেখে যেতে পারবো?

২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ওয়াদা করেছিল নির্বাচিত হলে “দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশীশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতি দফতরে গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সনদ উপস্থাপন করা হবে। সরকারি কর্মকাণ্ডের ব্যাপকভাবে কম্পিউটারায়ন করে দুর্নীতির পথ বন্ধ করা হবে”। প্রায় পাঁচ বছর শেষে এই ওয়াদা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ কোন পদক্ষেপ যে নেয়নি সেটা এখন বলাই বাহুল্য।

বছরের পর বছর ধরে সংবাদপত্রে ক্ষমতাসীন সরকারের মূল দল, অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের নানান আর্থিক দুর্নীতির খবর জনগন জেনেছে। সরকার এসব বিষয়ে স্বচ্ছসুস্পষ্ট কোন ব্যবস্থা নিয়েছে এরকম প্রমান মেলেনি। বরং জাতীয় পর্যায়ে যে সব ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সরকার তা ধামাচাপা দেয়ার লক্ষ্যণীয় প্রয়াস চালিয়েছে। সরকার সবসময় দাবী করেছে, এটি তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। যে কোন বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই সরকার সেটিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়েছে। ড. ইউনূস, বিরোধী দল, দেশিবিদেশি মহলের ষড়যন্ত্র বলে অনেকের বিরুদ্ধেই তখন বিষোদগার করা হয়েছিল। দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরকারের এই লাগাতার মনোভাব ছিল তার নির্বাচনী ইশতেহারের একেবারেই বিপরীত এবং দুর্নীতিবাজদের উৎসাহী করে তোলার সামিল। এর ফল হয়েছে, জনগনের মধ্যে সরকারের প্রতি চরম নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়েছে। তাই যখনই কোন ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে সামাজিকরাজনৈতিকঅর্থনৈতিক দুর্নীতির আলামত আছে বলে জনগন মনে করেছে, একই সঙ্গে ধরে নিয়েছে দুর্নীতিবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে। শাসক দল এবং ক্ষমতাসীন সরকার সম্পর্কে জনগনের এরকম দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য চরম আশংকা তৈরী করে। বাস্তবে ঘটেছেও তাইই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, যেখানে টাকাই দেয়া হয়নি সেখানে দুর্নীতির কথা ওঠে কি করে। এভাবেই খোদ প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বিশ্বব্যাংককে দায়ী করেছিলেন। তাদের অডিট রিপোর্ট দেখতে চেয়েছিলেন। একে ড. ইউনুসের ষড়যন্ত্র বলে দায়ী করেছেন। অভিযুক্ত মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে দেশপ্রেমিক আখ্যা দিয়েছেন। আবার সহসাই সেই অভিযোগ গিলতেও বাধ্য হয়েছেন। পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে ১০% দুর্নীতির সঙ্গে মন্ত্রী আবুল হোসেন, উপদেষ্টা মশিউর রহমান এবং সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর নাম জড়িয়ে গেছে। অবশেষে কানাডিয়ান মাউন্টেন পুলিশের মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে আবুল হাসান অভিযুক্তও হয়েছেন। এরপরে মুখ খুলেছেন, আওয়ামী লীগের মুখপত্র যুগ্ম সাধারন সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। তিনি বলেছেন, অবশেষে প্রমানিত হয়েছে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির সঙ্গে মন্ত্রীএমপিদের কেউই জড়িত ছিলেন না। দুদক অবশ্য বলেছে, তাদের তদন্তে অভিযুক্ত হলে আবুল হাসান বাংলাদেশেও আসামী হবেন। আরো কেউ জড়িত আছে কিনা সে তদন্তও চলছে।

সোনালী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের দায়ে হলমার্কের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুদক অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। সেখানে পরিচালনা পরিষদের কেউই অভিযুক্ত হননি। শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টার নামটি এই কেলেঙ্কারীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও দুদক তার কোন সংশ্লিষ্টতাই খুঁজে পায়নি। মন্ত্রী পদমর্যাদা সম্পন্ন একজন উপদেষ্টা কেন আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করার বাহানায় দিনের পর দিন সোনালী ব্যাংকে গিয়ে বসে থাকতেন কিংবা হলমার্কের যে কোন পার্টিতে উপস্থিত থাকতেন এসবের মধ্যে দুদক দোষণীয় কিছুই খুঁজে পায়নি। যেমনটি পায়নি পদ্মা সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে। ডেসটিনি’র দুর্নীতি সরকারের লোকজনের চোখের সামনেই ঘটেছে। এ নিয়েও জনমনে রয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন।

শেয়ার বাজার লুটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের কান্না, আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। তদন্তে উঠে এসেছে ক্ষমতার শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন ঘনিষ্ঠজনের নাম। নাম এসেছে জনৈক দরবেশের। জনগন এদের চেনে এবং তারা প্রভাবশালী। ভিওআইপি নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কোন পদক্ষেপ নেই। বিটিআরসিতে যাদেরকে বসানো হয়েছে অভিযোগের আঙ্গুল তাদের দিকেই। টেন্ডার ছাড়া কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র করা হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে জ্বালানী খাতে। যাতে জবাবদিহিতা করতে না হয় সেজন্য দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে এবং মেয়াদ বাড়ছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত অনেকেই থেকে গেছেন দায়মুক্ত। রেল মন্ত্রীর এপিএস নগদ টাকার বস্তাসহ ধরা পড়লেও মন্ত্রী দায়মুক্ত থেকে গেলেন, যদিও রেলওয়ে খাতে দুর্নীতির অভিযোগ এন্তার।

ক্রমাগত দায়মুক্তির এই ঘটনাগুলোর ফল হচ্ছে, জনগনের পারসেপশন দাড়িয়ে গেছে, এই সরকার তার নিজের নির্বাচনী ইশতেহারের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। দুর্নীতির কোন বিচার সরকার করবে না। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতাদের টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে অত্যন্ত বিলাসী জীবনযাপন এবং আয়ের উৎস জনগন জানলেও সরকার জানে না। ফলে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জন্ম দিচ্ছে সরকারঅতীতের সরকারগুলোর মতই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা কিছুই করবে না? প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের শাসনামলের দুর্নীতির প্রচুর উদাহরন দেন। বিরোধী দলীয় নেত্রীর পুত্রের পাচার করা টাকা ফেরত এনে সাফল্যের দাবিদার হন। কোন সন্দেহ নেই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই অর্থ পাচারের খবর পাওয়ার পরে তা ফেরত আনার কৃতিত্ব এই সরকার দাবি করতেই পারে। কারন বিএনপিজামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকতে হাওয়া ভবন হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার অনানুষ্ঠিানিক কেন্দ্র এবং ক্ষমতা ও দুর্নীতি সেখানে সমার্থক হয়ে উঠেছিল। জনগনের ভাবনায় সরকার সম্পর্কে দুর্নীতি বিষয়ক নেতিবাচক পারসেপশন তৈরী হয়েছিল।

ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইনষ্টিটিউট দশকব্যাপী (২০০১২০১২) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে বিএনপি জামায়াত ক্ষমতার শেষ বছরে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়েছে ২২ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। কৌতুহলের বিষয় হচ্ছে, ২০০৭ সালে পাচার হয়েছে ১৮ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা এবং ২০০৮ সালে ৬ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা। মহাজোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের প্রথম বছরেই তা বেড়ে যায়। বর্তমান সরকারের শাসনামলের দ্বিতীয় বছর ২০১০ সালে ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী বিদেশে পাচার হয়ে যায় ১৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। পরের বছরগুলিতে কি হয়েছে তা জানা না গেলেও জনগনের অনুমান এর পরিমান আগের টাকার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।

এই লেখাটি শেষ করবো দুর্নীতি সম্পর্কে খুশওয়ান্ত সিংয়ের আরেকটি জোকস্ দিয়ে। সেটি হচ্ছে, কেরালার এক এমপি চন্ডিগড়ে গেছেন পাঞ্জাবী মন্ত্রী বন্ধুর বাসভবনে বেড়াতে। প্রাচুর্য্য দেখে হতবাক এমপি জিজ্ঞেস করলেন, এতসব হলো কি করে? আগামীকাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করো, স্বচক্ষে দেখতে পাবে। পরদিন দু’জনে মিলে গাড়িতে করে হাইওয়ে ধরে এগুলেন কয়েক মাইল। গাড়ি থেকে নেমে মন্ত্রী বললেন, সামনে তাকাও, তুমি কি ওখানে একটা ব্রিজ দেখতে পাচ্ছো? হ্যা, পাচ্ছিএমপি’র উত্তর। এই বিজ্রের নির্মান কাজের অর্ধেক টাকা আমি বাগিয়ে নিয়েছি। চার বছর পর পাঞ্জাবী তার মন্ত্রীত্ব হারিয়েছেন। তিনিও কেরালায় গেছেন পুরানো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। বন্ধু এমপি ততদিনে মন্ত্রী হয়ে গেছেন। পাঞ্জাবী বিষ্ময়ের সঙ্গে বললেন, প্রাচুর্য্যের দিক থেকে তুমি তো আমাকেও হার মানিয়েছো। কাল সকালে বলববন্ধুর উত্তর। সকালে দু’জনে মিলে গাড়িতে চড়ে বেরোলেন। হাইওয়ে ধরে খানিকটা এগিয়ে নামলেন দু’জন। অঙ্গুলি নির্দেশ করে সদ্য মন্ত্রী বললেন, তুমি কি এখানে কোন ব্রিজ দেখতে পাচ্ছো? না তো, কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। ঠিকই আছে, কিছুই দেখবে না, কারন ব্রিজের পুরো টাকাটাই এখন আমার পকেটে।

দুর্নীতি যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায় এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে তখন ছোঁয়াচে রোগের মত ওপর থেকে নিচের দিকে ধাবমান হতে থাকে। পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি দুর্নীতি রয়েছে। কিন্তু অনেক দেশেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে রয়েছে কঠোর ব্যবস্থা ও শাস্তির বিধান। বাংলাদেশের ব্যবস্থাটি সবসময়ই উল্টো। ধরা পড়লে তাকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে সততার সার্টিফিকেট দেয়া হয়। ফলে দুর্নীতিবাজরা দৃশ্যত: ক্ষমতার অংশীদার হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী বিস্তার না থামাতে পারলে বাংলাদেশের সকল অর্জন যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় সে সত্য অনুধাবন করলেও পরিত্রানের উপায় খুঁজে না পাওয়ার ট্রাজেডি গোটা জাতিকে বহন করে যেতেই হচ্ছে।।