Home » মতামত » বর্তমান পরিস্থিতি এবং নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা

বর্তমান পরিস্থিতি এবং নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

publicসাম্প্রতিক রাজনীতি, সম্ভাব্য নির্বাচন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দুই রাজনৈতিক দলের পরস্পরমুখী অবস্থান সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন কয়েকজন সাধারণ মানুষ। তাদের এই মতামত প্রকাশিত হলো।।

ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত মো. আবু মাসুম বলেন, বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা। একপক্ষ আরেক পক্ষকে ন্যূনতম ছাড় দিচ্ছে না। একদিকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক বা যে নামেই হোক নির্দলীয় সরকার ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, আর অন্যদিকে আদালতের দোহাই দিয়ে সংবিধান সংশোধন করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে মহাব্যস্ত আওয়ামী লীগ। প্রধান দু’দলের এই যদি হয় মানসিকতা, আর বিএনপি নির্বাচন বয়কট করা সত্ত্বেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়,তাহলে দেশেবিদেশে নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে তা সময়ই বলে দিবে। এমনকি জাতির ভাগ্যে চেপে বসতে পারে ১/১১’র মতো জগদ্দল পাথর। নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় নির্বাচন হলেও একে অপরকে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ করে। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন হলে সন্দেহের জালটি এত বিশালাকার হবে, যার ফাঁদে আটকা পড়বে প্রতিটি মানুষ তথা সারা দেশ। ক্ষমতার লোভ, বৈধঅবৈধের খেলা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের সর্বত্র বিরাজমান। এমন যেখানে অবস্থা সেখানে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন খুব বেশি দরকার হয়ে পড়েছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে কিছু নীতিমালা অবশ্যই থাকা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ বলেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ সরকারের বাইরে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত। এমনকি আওয়ামী সরকারের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনের পক্ষে কথা বলছে। কিন্তু সরকার সে দাবির প্রতি কোনো ধরনের নমনীয়তা এখনও প্রদর্শন করেনি। বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনের নেতিবাচক পথেই হাঁটছে। এদিকে দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, রাজনীতি এখন যে পথ ধরে এগুচ্ছে, যদি তার বাঁক পরিবর্তন না হয় তাহলে শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলা যায় না। সংঘাতসংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে তো উঠবেই, গণতন্ত্রও আবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। দেশের বেশিরভাগ মানুষ মনে করছেন যে, সরকার জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির বিলোপ ঘটিয়েছে। বিষয়টি উঠে এসেছে পত্রপত্রিকার সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ, টিভি চ্যানেলের টকশো, আলোচনা ইত্যাদিতে। সরকার সমর্থক ছাড়া প্রায় সবাই এক বাক্যেই বলছেন যে, দেশের শান্তিশৃঙ্খলা, উন্নয়নঅগ্রগতি অব্যাহত রাখা এবং গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে তত্ত্বাবধাক বা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার পুনঃপ্রবর্তনের ব্যাপারে সরকারের নমনীয় হওয়া দরকার। তারা এটাও বলছেন যে, সরকার একই সঙ্গে দুটো ভুল করছে, যার ফলাফল শুভ হবে না। প্রথম ভুল জনমত ও বিরোধী দলের মতামতকে উপেক্ষা করে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বাতিল করা। আর দ্বিতীয় ভুল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে শক্তি দিয়ে দমন করার চেষ্টা। এই দুই ভুলের সমষ্টি যে সরকারের জন্য ভয়াবহ সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে সেটা তাদের অনুধাবন করতে হবে।

খুলনার মাছ ব্যবসায়ী কফিল উদ্দিন বলেন, নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের এরশাদ উত্তর নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা ছিল সামরিক এবং দলীয় সরকারের অধীনে আমাদের দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত না থাকায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর স্বৈরাচারী মনোভাব ক্ষমতা লিপ্সা ও ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় নির্বাচনে সীমাহীন কারচুপির আশ্রয় নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার দাবি উঠে। এই দাবিটি প্রথমে ছিল জামায়াতের। কিন্তু পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ তা লুফে নেয় এবং কালক্রমে তা জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ এই দাবি আদায়ের জন্য হরতালঅবরোধ গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, সরকারি স্থাপনার উপর হামলা অসহযোগ এবং হরতালকালে কর্মকর্তাদের দিগম্বর করাসহ এমন কোন ধ্বংসাত্মক আন্দোলন নেইযা করেনি। এর ফলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সংবিধানের দোহাই উঠে যায় এবং ১৯৯৬ সালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর এই ব্যবস্থার অধীনে তিনটি নির্বাচন হয়েছে, দু’টিতে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে এবং একটিতে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট জয়ী হয়েছে। শেষোক্ত নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ এখনো ক্ষমতায় রয়েছে। শেখ হাসিনা বরাবরই বলছেন যে, অনির্বাচিত কেয়ারটেকার সরকারে তিনি ফিরে যাবেন না। বিরোধী নেত্রীকে তিনি ভীতিও প্রদর্শন করছেন এবং বলছেন যে, খাল কেটে কুমির আনবেন না। কারণ ঐ কুমির আপনাকেই প্রথম কামড় দেবে। এ কথা বলে সম্ভবত তিনি সেনা সমর্থিত কেয়ারটেকার আমলে তিনিসহ রাজনীতিকদের ওপর যে দমন নিপীড়ন চলেছিল তার কথাই বলতে চাচ্ছেন। এখানে একটি প্রশ্ন দেশবাসীকে সবসময় পীড়া দেয় এবং সেটি হচ্ছে তিনি অথবা তার সরকার কিংবা রাজনীতিকরা যদি দুর্নীতিগ্রস্ত না হন অথবা ক্ষমতার অপব্যবহার না করেন তাহলে তার এত ভয় কেন?

সিলেটের চাকুরিজীবি নারী মুসলিমা ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ গত সাড়ে চার বছরে দেশকে যে অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে তাতে শুধু নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করলেই যে সুষ্ঠু এবং সন্ত্রাসমুক্ত নির্বাচনের গ্যারান্টি পাওয়া যাবে তা আমি বিশ্বাস করি না। দেশ ও জাতিকে এর জন্য আরো অনেক কিছু করতে হবে। কেননা প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি পরতে দলীয়করণ বর্তমানে সর্বগ্রাসী আকার ধারণ করেছে। পুলিশ ও সিভিল প্রশাসন এবং এমনকি বিচার বিভাগও এখন ব্যাপক দলীয়করণের শিকার। নির্বাচন কমিশন সরকারের একটি আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। দলীয় কর্মী দিয়ে ভোটার তালিকা হাল নাগাদ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এতে দলীয় বলয়ের বাইরে লাখ লাখ লোক ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ছে। এর প্রতিবিধান হচ্ছে না। জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার আইডি তৈরির নামেও চলছে নৈরাজ্য ও পয়সার খেলা। ফলে তত্ত্বাবধায়ক ভিন্ন সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায় না।

বগুড়ার দোকান মালিক গফুর বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় গিয়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মীমাংসিত একটি বিষয়কে বাতিল করে দেন। এই পদ্ধতিটি ছিল জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার গ্যারান্টি। তারা এ ব্যবস্থাকে বাতিল করার অজুহাত হিসেবে আদালতের রায়ের দোহাই দিয়েছেন। আদালতের এই রায় সম্পর্কে বিভিন্ন রকমের কথা আছে। এবং সকলেই জানেন যে, কেয়ারটেকারের অধীনে আরও ২টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে আদালত তার সংক্ষিপ্ত রায়ে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য যে সংসদীয় কমিটি গঠন করেছিলেন সেই কমিটির বিভিন্ন শ্রেণীপেশা বিশেষ করে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞের সঙ্গে একাধিকবার সভায় মিলিত হয়েছিলেন এবং তাদের প্রত্যেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি রাখার অনুকূলে মতপ্রকাশ করেছিলেন। সংসদীয় কমিটির প্রধান সংবিধান সংশোধনের আগের দিন পর্যন্ত দেশবাসীকে এইমর্মে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকবে কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর সবকিছু ওলোটপালট হয়ে যায়। তিনি জানিয়ে দেন যে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা আর কোনদিন বাংলাদেশে ফিরে আসবে না। তার নির্দেশনাতেই সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি তুলে দেয়া হয়েছে। এখন তার পুনরুজ্জীবন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপরই নির্ভর করছে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সবুর হোসেন বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্যটি করলেন, তা তার সরকারের বক্তব্য বলে ধরে নেয়া ভিন্ন দ্বিতীয় কোন পথ থাকছে না। এই ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে এই ‍‌“গণতন্ত্র” শব্দটি যেভাবে হাস্যকর হয়ে উঠছে, তার সঙ্গে উন্নত বিশ্বের গণতন্ত্রকে মেলানো যাবে না। উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতন্ত্রের ভিতকে আরও শক্তিশালী করার জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি ব্যবস্থা থাকা উচিত, যার মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। আর বাংলাদেশের মতো দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ এই কথা বলা বিচিত্র হবে না। প্রধানমন্ত্রী যখন সংবাদ সম্মেলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার কথা জানালেন তখন সবাই অনেক সহজেই মনে করতে পেরেছেন ১৯৯৪৯৬ সালে তিনিই ছিলেন এর প্রবক্তা। ওই সময় আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিল। সংবিধান অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল বটে, কিন্তু আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর নিশ্চয়ই এসব ভুলে যাওয়ার কথা নয়।

রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে বসবাসরত সরকারি চাকুরিজীবি মো: নজরুল ইসলাম রনি বলেন, সম্প্রতি রাজনীতির ময়দানে অস্থিতিশীলতার প্রধান নিয়ামক নির্বাচনে দলীয় কিংবা নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার টানাপোড়েন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সন্দেহমুক্ত নয় আবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেশে বিদেশে গ্রহণযোগ্য নয়। এ অবস্থার সমাধান হওয়া জরুরি, না হলে সংঘাত অনিবার্য। দুটি বড় দলের ভিতর সংঘাত দলীয় মতাদর্শে বিভক্ত সকল পক্ষের মধ্যে বিবাদবিসংবাদ বাড়ায়। বল প্রয়োগের মাধ্যেমে সব সমস্যার সমাধানে মানুষকে উৎসাহিত করে এবং পুরো জাতির জীবনীশক্তি ও সৃষ্টিশীল উদ্যমকে নিঃশেষ করে দেয়। এ সংঘাত এড়ানোর একটা ভাল উপায় হতে পারে বিবাদমান দলগুলোর মধ্যে আলোচনা বা সংলাপ। সুষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মও এর প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করে। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে সরকার ও বিরোধী দলের সহঅবস্থান প্রয়োজন। সংসদীয় রাজনীতিতে দলীয় কর্তৃত্ব রয়েছে বটে, কিন্তু বিরোধী দলের ভূমিকাও এখানে মূখ্য। বিরোধী দলও সরকারের একটি অংশ। সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের নেতাকে বলা হয় ছায়া প্রধানমন্ত্রী। বিরোধী দলকে যদি মূল ভূমিকায় আনা না যায়, সে দেশে গণতন্ত্র বিকাশ লাভ করতে পারে না। পশ্চিম ইউরোপ, যেখানে গণতন্ত্রের ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী, সেখানে বিরোধী দলের সম্মান কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারী দলের চাইতেও বেশি। অনেক সময় বিরোধী দলের নেতা সরকারেরও প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। সেখানে সংসদেবিরোধী দলের কোনো নেতা কিংবা সংসদ সদস্যের মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এ রকম কোন ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু বাংলাদেশে এটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। তাতে বাড়ছে ক্ষোভ আর সেই ক্ষোভ জন্ম দিচ্ছে সহিংসতার। এ ধারা সাম্প্রতিক কালের নয়, এ ধারা চলে আসছে পঞ্চম সংসদ থেকে। লাগাতার সংসদ বর্জন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট হয়ে গেল বলেই মনে হয়। অতীতে আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন সংসদ বর্জন করেছিল। তার পিছনে যুক্তি কাজ করেছিল তা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন। লাগাতার সংসদ বর্জনের কারণে পঞ্চম সংসদ অকার্যকর হয়েছিল। সংবিধানের পঞ্চম সংশধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তির ফলে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সাব জানিয়ে দিয়েছেনঅনির্বাচিত কোন ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা দেয়া হবে না। আর সুপ্রীম কোর্টের রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পূর্নবহালের সুযোগ নেই। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি অতটা যুক্তিনির্ভর নয়। কারণ, তার যদি সত্যি সত্যিই অনির্বাচিত ব্যক্তিদের প্রতি অ্যালার্জি থাকে, তাহলে দেশের ৬৪ জেলায় তারা কি করে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ দিলো এবং ঢাকা সিটি করপরেশনের নির্বাচিত মেয়রকে সরিয়ে দু’জন অনির্বাচিত প্রশাসককে মেয়র খোকার স্থলাভিষিক্ত করলো? অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক বললেও উচ্চ আদালত দেশের জনগনের জানমাল ও সার্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বলেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দেশে আরও দশ বছর থাকতে পারে। বিরোধী জোটও স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পূর্নবহাল না চেয়ে আগামী দুটি নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে করতে চাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যে তত্ত্বাবধায়ক নামে হতে হবে এমন কোনো নয়, ভিন্ন নামেও হতে পারে যেমনঅন্তর্বতী সরকার, কোয়ালিশন সরকার, নির্দলীয় সরকার। বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কখনও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ১৯৮৬, ৮৮, এবং ৯৬ এর নির্বচন সে কথাই স্মরন করিয়ে দেয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদাহরণ টেনে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব বলা হলেও মনে রাখা প্রয়োজন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচনের গুরুত্ব ও প্রকৃতি এক নয়। কোন পদ্ধতিতে হলে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য হবে তা নিয়ে জাতি দ্বিধা বিভক্ত। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সরকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব জনগণের, তাই জনগণ কোন পদ্ধতিতে তাদের সরকার নির্বাচন করতে চান সে বিষয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়ভারটাও জনগণের উপরই বর্তায়। এক্ষেত্রে দৈনিক পত্রিকার অনলাইন জরিপগুলোর ফলাফল কাজে লাগানো যেতে পারে।

রাজশাহীর শাহিনুর রহমান বলেন, মূল কথাটি হচ্ছে বিশ্বাস। আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যার দরুণ এরকম একটি চাওয়া জাতীয় জীবনে গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। মূলত এ পদ্ধতিটি আওয়ামী লীগের আবিষ্কার। ১৯৯৫ সালে মেয়াদের শেষের দিকে তৎকালীন বিএনপি সরকার যখন দলীয় সরকারের অধীনে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল, সে সময় আওয়ামী লীগ, জামায়াতের ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ প্রধান প্রধান বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে রাজপথে একসঙ্গে কর্মসূচি পালন করে। বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন বয়কট ও টানা হরতালঅবরোধের মধ্যেই ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ শেষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। তবে আওয়ামীজামায়াতজাতীয় পার্টির একযোগে পরিচালিত আন্দোলনের মুখে পরাজিত সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত করে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। আদালতের রায় শিরোধার্য। যেখানে জনতার স্বার্থ, দেশের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে আদালত বলেছে যে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামোতেই অনুষ্ঠিত হতে পারে, সেখানে বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের সংখ্যাগরিষ্ট সংসদ সদস্য এতোটা কঠোর অবস্থানে যাওয়া কতোটুকু যুক্তিযুক্ত হচ্ছে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দেখা দিয়েছে। পক্ষান্তরে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ ও স্থ’ূল কারচুপি’ বলে যখন এ সরকার ব্যবস্থাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছিল। অথচ সেই পদ্ধতিকেই পূনরায় বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টাও কতোটা সঙ্গত হচ্ছে সেটাও ভাবনার বিষয়। মোদ্দকথা মানুষের, সমাজের, রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্যই যদি রাজনীতি হয়ে থাকে তাহলে এ বিষয়টির একটি কিনারা হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবী নিয়ে বিরোধী দলসমূহের আন্দোলন এবং সরকারের অনঢ় অবস্থান জাতীয় জীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।।