Home » শিল্প-সংস্কৃতি » বাস্তবতা-অবাস্তবতার লৌহ মানবী

বাস্তবতা-অবাস্তবতার লৌহ মানবী

ফ্লোরা সরকার

the-iron-ladyতিন তিন বার নির্বাচিত ব্রিটেনের প্রথম নারীপ্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বে ‘লৌহ মানবী’ নামে খ্যাত মার্গারেট থ্যাচারের জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র “দ্য আইরন লেডি” র প্রথম দৃশ্য দেখে চমকে যেতে হয় আর সম্পূর্ণ ছবিটা দেখে হতে হয় বোকা। শুরুতেই দেখা যায় সত্তর উর্দ্ধ একজন বয়স্ক নারী (মার্গারেট থ্যাচার) একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে এক পিন্ট দুধ কেনেন। দুধের দাম ঊনপঞ্চাশ পেনি শুনে চোখ দুটো যেন বিস্ফারিত হয়ে ওঠে বৃদ্ধার। বাড়িতে যেয়ে দুধের দামের উর্দ্ধগতির কথা বিরক্তি নিয়ে স্বামীকে জানান। মার্গারেট থ্যাচার সত্তরের দশকে যখন শিক্ষামন্ত্রীর পদে আসীন ছিলেন তখন বিদ্যালয়ের দুধ বিতরণ ব্যবস্থা বন্ধ করার বিষয়টি ছবির পরিচালক ভুলে গেলেও দর্শক ভুলতে পারেননি। এমন কি সেই ব্যবস্থার জন্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা সেই সময়ে ছড়া কাটতো “Mrs Thatcher, Mrs Thatcher, Milk Snatcher” (The Penguin book of interviews, Edited by Christopher Silverstone)। তাছাড়া তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালীন সময়ের অনেক কর্মসূচী ব্রিটেনের জন্যে খুব ভালো ফল নিয়ে আসেনি। ছবিটি শুরু হয় থ্যাচার যখন তার কর্মজীবন থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন তারও বেশকয়েক বছর অতিবাহিত হবার পর থেকে। ফলে বাস্তব প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার আর পর্দার অবসরকালীন মার্গারেট থ্যাচারের মাঝে একটি মোটা দাগে পার্থক্য স্পষ্ট ধরা পড়ে। বিশেষত তার ডিমেনসিয়া বা মানসিক শক্তির দুর্বলতাজনিত রোগের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দেয়ায় অবসরকালীন থ্যাচারের চরিত্রে লৌহমানবী থ্যাচারের কিছুমাত্র রেশ আর অবশিষ্ট দেখা যায়না। এই থ্যাচার যেন ব্রিটেনের আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো একজন সাধারণ নাগরিক। শুধু তাই না, ছবির প্রায় ষাট ভাগ অংশ জুড়ে আমরা থ্যাচারের পারিবারিক এবং ব্যাক্তিগত জীবনকে অবলোকন করি। তার রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক জীবন, যে জীবনের জন্যে পৃথিবীর ইতিহাসে একইসঙ্গে নিন্দিত ও নন্দীত হয়ে আজও বিতর্কিত আছেন তার পরিচয় ছবিতে খুব একটা পাওয়া না গেলেও তার খুরধার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পরিচালক ফিলিডা লিয়ড এবং চিত্রনাট্যকার আবি মরগ্যান ভুল করেও ভুল করেন না। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে থ্যাচারকাহিনীর অতীতবর্তমানকে ভাঙ্গাগড়ার নান্দনিক আঙ্গিকে ছবিতে উপস্থাপিত করেছেন। যে কাহিনীর বেশির ভাগ অংশ জুড়ে থাকে থ্যাচার আর তার স্বামী ডেভিসের দাম্পত্য জীবনের এক সুখী সুখী চেহারা। প্রশ্ন হলো মার্গারেট থ্যাচারের মতো এমন শক্তিশালী একজন প্রধানমন্ত্রী, যিনি শুধু তার দেশ নয় আন্তর্জাতিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য পটভূমি (শীতল যুদ্ধ ও তার অবসান, সমাজতন্ত্রের পট পরিবর্তন, মধ্যপ্রাচ্যের পট পরিবর্তন, নারীবাদ ইত্যাদি) পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গত শতাব্দীর সত্তর, আশি এবং নব্বইয়ের দশকে যে বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাকে নিয়ে এমন একটি ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র কেনো নির্মাণ করা? তা কি শুধু একজন প্রতিষ্ঠিত নারীপ্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের সংকটময় চিত্র তুলে ধরার জন্যে? নাকি “লৌহমানবী” নামে খ্যাত থ্যাচারের মানবিক দিকগুলো উন্মোচনের জন্যে? না, অন্য কোন কারণ? আমাদের আজকের চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনায় এই প্রশ্নটির অনুসন্ধান করবো।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার “সায়েবদের গান্ধী” নামক প্রবন্ধে বলেন – “ভারতে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিভাবান শিল্পী থাকা সত্ত্বেও গান্ধির জীবন রূপায়নের দায়িত্ব অ্যাটেনবরোকে দেওয়া হল কেন? এর জবাব খুব সোজা। এই উপমহাদেশের শোষকশক্তি খুব প্রাচীনকাল থেকেই অত্যন্ত চতুর এবং সংগঠিত। বর্ণে বর্ণে ভাগ করে সাম্প্রদায়িক চেতনাকে উসকে দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবিত্ত মানুষকে সংগঠিত হওয়া থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা এদের অনেকদিনের। —-মানুষের প্রতিরোধক্ষমতাকে জব্দ করাই ভারতের নতুন সায়েবদের প্রধান দায়িত্ব। তখন সায়েবদের সহায়ক শক্তি হিসাবে গান্ধিকে চাগিয়ে তুলতে পারলে এই সায়েবদের বরং সুবিধা। অ্যাটেনবরোর কাছে ধরনা নাদিয়ে তাই উপায় কী?” – (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু, প্রকাশক নয়া উদ্যোগ, কলকাতা, পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০০)। ১৯৮২ সালে রিচার্ড অ্যাটেনবরো পরিচালিত “গান্ধী” ছবিটি অস্কারে শুধু মনোনীতই হয়নি, ৫৫তম অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, নির্মাতা, চিত্রনাট্য, অভিনেতা (বেন কিংসলে, যিনি গান্ধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন) সহ মোট আটটি অস্কার জিতে নেয়। আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়না সাহেবদের গান্ধী, সাহেবদের কাছে (ভারতীয় এবং পশ্চিমা সাহেব) কেনো এতো বরণীয় ও গ্রহণীয় হয়। একই ভাবে ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত “দ্যা আইরন লেডি” ছবিটি অস্কার জিতে না নিলেও ছবির প্রধান অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ (মার্গারেট থ্যাচারের ভূমিকায়) শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়া সহ ছবিটি আন্তর্জাতিক মানের অন্যান্য বহু অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়। কাজেই গান্ধীর চেয়ে থ্যাচার কাহিনী নির্মাণের পশ্চাতে ব্রিটেন এবং বাদবাকি বিশ্বের মানুষদের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে জব্দ করতে আধুনিক সাহেবরা যে আরো অধিক পরিমাণে সচেষ্ট হবেন তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। ছবিতে দেখা যায় বৃদ্ধা থ্যাচার যখন তার আত্মজীবনী “এ লাইফ অ্যাট নাম্বার টেন” বইটিতে স্বাক্ষর করতে যান ঠিক তখন থেকেই শুরু হয় ফ্ল্যাশব্যাক। যেখানে আমরা পাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ের কিশোরী থ্যাচারকে। যাকে তার বাবা মি. রবার্ট শিখিয়েছিলেন – “কখনো ‘গণ’রাস্তা ধরে চলবে না। তোমার পথে তুমি চলবে”। আর তারপরেই বর্তমান থ্যাচারের চিন্তা তরঙ্গের মাঝে ছবির বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ফ্ল্যাশব্যাক ধরে ছবির কাহিনী এগিয়ে যায়। যে এগিয়ে চলার কাহিনীতে শুধু থ্যাচারের একের পর এক উত্তোরণ ঘটতে দেখি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী হবার আগে তার দল কনজারভেটিভদের সঙ্গে একটি আলোচনা সভায় যখন হঠাৎ মুহূর্ত্তের জন্যে বিদ্যুৎ চলে যায়, থ্যাচারের হাতে মুহূর্ত্তেই টর্চ জ্বলে ওঠে। পরিচালক ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন ভবিষ্যত ইংল্যান্ডের ‘বাতিঘর’ মার্গারেট থ্যাচার। এমনকি শিক্ষামন্ত্রীকালীন সময়ে হাউজ অফ কমনস থেকে যখন একদিন থ্যাচার বের হয়ে আসেন, রাস্তায় আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব রাষ্ট্রীয় আবর্জনা (প্রতীকী অর্থে) শুধুমাত্র ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের মাধ্যমেই যে শোধিত হওয়া সম্ভব তারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তার বিপরীত চিত্র হিসেবে দেখি, ছবির শুরুতে দুধ কিনতে যাওয়া বৃদ্ধা থ্যাচার যখন টাকা পরিশোধ করতে যান, কাউন্টারে রাখা সেদিনের দৈনিকের দিকে দৃষ্টি দিলে ক্যামেরার ক্লোজে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের খবর বড় বড় শিরনামে পর্দায় ফুটে ওঠে। বাড়িতে বসে যখন টিভি দেখেন তখন আলকায়েদা কর্তৃক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের নিউজরিল চলতে দেখা যায়। নিউজরিল থেকে সরাসরি ফ্ল্যাশব্যাকে ১২ অক্টোবর ১৯৮৪ সালে সংঘঠিত ব্রিংটনের গ্রান্ড হোটেলে থ্যাচার এবং তার মন্ত্রীসভাকে লক্ষ্য করে আই.আর.. (প্রভিনশিয়াল রিপাবলিকান আর্মি) কর্তৃক বোমা বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখানো হয়। এবং তার পরদিন, প্রধানমন্ত্রী তার কেবিনেট মিটিং এ বলেন -“এসব সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে পশ্চিমা সভ্যতার অবশ্যই একটা দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া উচিত”। যদিও থ্যাচার কর্তৃক কথিত সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জবাবে আই.আর.. কর্তৃক সেইসময় একটি বিবৃতি দেয় – “মিসেস থ্যাচার এবার উপলব্ধি করবেন যে ব্রিটেন আমাদের দেশ তার দখলে রাখতে পারেননা এবং আমাদের বন্দীদের নিপীড়ন ও আমাদের নাগরিকদের উপর রাস্তায় হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারেননা। আমাদের শান্তিতে থাকতে দিন, আমরা কোন যুদ্ধ করবো না”। এসব ঐতিহাসিক তথ্যকে পাশ কাটিয়ে পরিচালক শুধু সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে সামনে নিয়ে আসেন। এরপর ফ্ল্যাশইন হলে থ্যাচারকে বলতে শোনা যায় – “তখন (১৯৮৪) আমরা কিছু একটা করতে চেষ্টা করেছিলাম আর এখন আমরা কিছু হয়ে উঠছি”। এই হয়ে ওঠার নমুনা স্বরূপ পরিচালক ফিলিডা লিয়ড আমাদের দেখান বিখ্যাত ফকল্যান্ড যুদ্ধের ইতিবৃত্ত, ছবিতে যার অনেকটা অংশ জুড়ে থাকে, তারপর একে একে প্রেসিডেন্ট রেগ্যানএর সঙ্গে তার সখ্যতা (শুধুমাত্র এক ঝলক বলডান্সের মাধ্যমে যা পর্দায় ভেসে ওঠে), ১৯৯০ এর দুই বার্লিনের একত্রিকরণের ঐতিহাসিক বার্লিন প্রাচীর ভাঙ্গনের চিত্র, ইন্দিরা গান্ধী সহ বিশ্বের অন্যান্য নেতানেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ছোট ছোট অংশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা হয়। যে সময়গুলো অর্থাৎ ১৯৮০ থেকে ১৯৯০, পৃথিবীর ইতিহাসের সব থেকে উল্লেখযোগ্য বাঁক পরিবর্তনের সময়, এই সময়গুলোকেই পরিচালক অত্যন্ত সর্তকতার সঙ্গে এড়িয়ে যান। কেনো?

১৯৭৯ সালে মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রীত্বে আসীন হয়েই যে কাজগুলো সর্বাগ্রে করলেন তা হলো প্রাইভেটাইজেশান বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন সংস্থাসমূহ ব্যক্তিগত মালিকানাধীনের আওতায় নিয়ে আসা, (রাস্তা, বিদ্যুৎ, কয়লাখনির মতো বড় ও ভারী শিল্পস্থাপনা পর্যন্ত) ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষমতা বিলুপ্ত করা, অবাধ বণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া। এসব কর্মসূচীর ফলে ১৯৭৯১৯৮১এর সাময়িক মন্দার সময় দেখা গেলো বৃহদায়তন শিল্পের প্রায় বিশ লক্ষ মানুষ চাকরিচ্যুত হলো, ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত, প্রায় এক বছর খনি শ্রমিকদের ধর্মঘট চললো, মুদ্রাস্ফীতি ১৮% থেকে ৮.% এ নেমে এলেও বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ালো ৩.৬ মিলিয়ান অর্থাৎ প্রায় পঁয়ত্রিশ লক্ষেরও অধিক মানুষ বেকার হলো। যদিও বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া এসব ধর্মঘট, প্রতিবাদ, প্রতিরোধের চিত্র ছবিতে দেখানো হয়েছে, কিন্তু তা থ্যাচারের সফলতার চিত্রের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। উপরন্তু ছবিতে ক্রোধে ফেটে পড়া প্রধানমন্ত্রী থ্যাচারকে বলতে শোন যায় – “তোমার ভাতকাপড়ের অভাব, কে দেবে? সরকার। তোমার চাকরি নেই, কে দেবে? সরকার। আহা, সরকারই যদি সব দেবে তাহলে জনগণ কি করবে?” পুঁজিবাদের কি চমৎকার সমাধান! বাস্তবের প্রধানমন্ত্রী থ্যাচারের পরস্পরবিরোধী বৈদেশিক নীতিগুলো বেশ চমকপ্রদ। একদিকে তিনি ১৯৭৯র আফগানিস্তানের উপর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের বিরোধিতা করছেন, অন্যদিকে ফকল্যান্ড দ্বীপ পুনরুদ্ধারের সময় চিলির স্বৈরশাসক পিনোশের সহযোগিতার পুরস্কার স্বরূপ ১৯৯৮ সালে তাকে গ্রেফতার না করার জন্যে অনুরোধ জানাচ্ছেন। ১৯৯০ এর জার্মানির একত্রিকরণের সময় খুব একটা সম্মতি না থাকলেও পরে তা শুধু মেনে নিচ্ছেনই না সমাজতন্ত্রের মূলোৎপাটন করছেন, গর্বাচেভের ‘পেরেস্ত্রৈকা’ আর ‘গ্লাসনস্ত’ তত্ত্বকে অভিনন্দিত করছেন। ইউরোপিয় ইউনিয়নের প্রতি প্রকৃতপক্ষে থ্যাচারের কোন আস্থা ছিলনা কোনদিন। যার প্রকাশ আমরা অনেক পরে ২০০২ সালে তার প্রকাশিত “স্টেটক্র্যাফ্ট : স্ট্র্যাটেজিস ফর এ চেঞ্জিং ওয়ালর্ড” বইয়ের মাধ্যমে আরো স্পষ্ট করে জানতে পারি। যেখানে এই ইউনিয়নকে একটি সংস্কারবিমুখ, ইউটোপিয় এবং অসার বুদ্ধিজীবীর মিলন কেন্দ্র বলে আখ্যায়িত করেন। ঐ একই বইয়ে থ্যাচার মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা একমাত্র সাদ্দাম হুসেইন এবং সাদ্দাম উৎখাতের মধ্যে দিয়েই যার সামাধান সম্ভব। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ পায় তার একটি উক্তিতে একজন সমাজতন্ত্রী ততক্ষণ পর্যন্ত সুখী যতক্ষণ সে অন্যের অর্থের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে”। সমাজতন্ত্রের উৎখাতের জন্যে ব্যক্তিতন্ত্রের ওপর থ্যাচার এতোটাই জোর দেন যে, তার সমাজ থেকে সমষ্টিগত চেতনা বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। শুধু সমষ্টিগত চেতনা বিলুপ্ত নয়, থ্যাচারের জাতীয়তাবাদী মনোভাব উগ্র জাতিবিদ্বেষে রূপান্তরিত হয়। যার প্রকাশ ঘটে ১৯৮১ সালে সংঘঠিত “অপারেশান সোয়াপ ৮১” নামে খ্যাত আফ্রিকানক্যারিবিয়ান এবং স্থানীয় পুলিশের মধ্যে সংঘঠিত রায়টের মাধ্যমে। সেই সময়ে ব্রিটেনে আন্টিফ্যাসিস্ট এবং অ্যান্টিরেসিস্ট আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। পুলিশের হাতে অগাধ ক্ষমতা দেয়া হয় অভিবাসী মানুষদের আঘাত করার জন্যে। ১৯৮৭ সালের একটি ব্রিটিশ সোশাল সার্ভেতে বলা হয়, খুব কম সংখ্যক মানুষ থ্যাচারের পৃষ্ঠপোষক ছিলো। ইয়ামন ম্যককেন তার “যে শ্রেণীভেদ আজও বিদ্যমান” শিরোনামে একটি লেখায় উল্লেখ করেন – “মার্গারেট থ্যাচার তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, কারণ তখন তার বিরোধী দল লেবার পার্টিতে উল্লেখযোগ্য কোন নেতা ছিলো না বলে”। প্রধানমন্ত্রী থ্যাচারের সমস্ত সংস্কার কর্মসূচী এতোটাই প্রভাব বিস্তার করে যে, তা “থ্যাচারিজম” নামে একটি মতবাদে রূপান্তরিত হয়। যে থ্যাচারিজম দেশের অভ্যন্তরে এবং বহির্বিশ্বে মানুষে মানুষে বিভেদের তত্ত্বই প্রসারিত করে। থ্যাচারের এসব কর্মকান্ডের কোনটারই প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়না “দ্যা আইরন লেডি” তে। শুধু দেখি একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে, যিনি তার ডিমেনসিয়া অসুখের কারণে বার বার তার সোনালী অতীতে ফিরে ফিরে যান। যাকে দেখে দর্শক হৃদয়ে শুধু সহানুভূতির উদ্রেগ ঘটে। যিনি ডাক্তারকে বলেন এখনকার মানুষ চিন্তা করতে চায় না, শুধু অনুভব করতে চায়। কিন্তু চিন্তা করাটা কত প্রয়োজন —-”। অথচ ১৯৯৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ব্রেইন ল্যাম্বকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে ল্যাম্ব তাকে ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হবে জানতে চাইলে উত্তরে বাস্তবের থ্যাচার বলেন – “যে কোন যুদ্ধ, তা শীতল বা উত্তপ্ত হোক, মানুষ এক ধরণের ইউফোরিয়া বা ভিত্তিহীন আশাবাদের দিকে ধাবিত হয়। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি এরকম ইউফোরিয়া আর হবেনা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপ ছেড়ে না আসতো তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতো না। শীতল যুদ্ধের পর প্যালেস্টইন এবং ইজরাইল সহ পৃথিবীর সর্বক্ষেত্রে শান্তি স্থাপিত হয়েছে”। সারাজীবন বিত্তবৈভবে থাকা বাস্তবের মার্গারেট থ্যাচারের মুখে মানানসই কথা বটে। কেননা, পুঁজিবাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ এই শিক্ষাই দেয় নিজে ভালো থাকা মানে জগতের ভালো থাকা। আর তাই স্বৈরাচার থ্যাচার স্বামী ডেভিসের সঙ্গে সুখী দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করার সময় তাকে কখনো মধ্যপ্রাচ্য, প্যালেস্টইন এমনকি নিজ দেশের আপন ভূমির শোষিত মানুষদের দুঃখকষ্ট স্পর্শ করেনা। বীরদর্পে ফকল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড দখলে রাখা সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবকে নিজ ভূমি বলে জায়েজ করেন। পর্দার “দ্যা আইরন লেডি” বাস্তবের থ্যাচার না হলেও পর্দার বাস্তব হয়ে ওঠেন। আর বিজিত দেশের বিজিত নেতাদের চতুর ও সংঘঠিত অনুচরেরা এভাবেই নিজেদের ইতিহাস নিজেরা নির্মাণ করেন। কিন্তু ইতিহাসের কলও সময়ে সময়ে বাতাসে নড়ে ওঠে আর সত্য ইতিহাস মাটি ফুড়ে বের হয়ে আসে।।