Home » আন্তর্জাতিক » মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ২)

মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ২)

আইজাজ আহমদ

ইখওয়ান কিছু কথা

egypt-1মিশরীয় ইখওয়ানের প্রপঞ্চ ভালোমতো উপলব্ধি করা হয়নি এবং এখানে সেগুলো খতিয়ে দেখারও অবকাশ নেই। তবে কিছুটা বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রথমত তারা পুরনো আমলের আধাপাগলা কাঠমোল্লা জাতীয় লোক নন। তারা সামাজিকভাবে রক্ষণশীল হলেও তাদের নব্যঐতিহ্যবাদ পুরোপুরি আধুনিক। তাদের গণভিত্তি অবশ্যই খুবই বিস্তৃত। তাদের ক্যাডারদের বেশির ভাগই আসে শহর এলাকা থেকে। এসব ক্যাডার শিক্ষিত, পেশাদার এবং বণিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর সদস্য। প্রায় ৮০ বছর ধরে তারা সক্রিয়, ১৯৪০এর দশকের মধ্যেই তারা মিশরীয় রাজনীতিতে গণ্য করার মতো শক্তিধরে পরিণত হয়। ১৯৫০এর দশকে নাসের যখন তাদের ওপর দমনপীড়ন চালাচ্ছিলেন, তখন উপসাগরীয় অনেক রাজতান্ত্রিক দেশ (প্রধানত কয়েক দশক ধরে সৌদি আরব এবং তারপর বর্তমানে কাতার) তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। এর ফলে সংগঠনটি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। দলটির কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক নেতাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিলিয়নিয়ার ও মিলিয়নিয়ারও স্থান পান। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে এবং মিশরের অভ্যন্তরেও ব্যবসা করে অসংখ্য লোক টাকা বানাতে সক্ষম হয়। কিংবন্তীপ্রতীম খায়রাত আলশাতার (এই বিলিয়নিয়ারকে সম্প্রতি কারারুদ্ধ করা হয়েছে। তিনি ইখওয়ানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা এবং মুরসির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ) নিঃসন্দেহে এসব বিপুল সম্পদশালী ও মহাসুখী ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত।

মোবারকপন্থী বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা ছিল। তবে বুর্জোয়ারা নিজেরাই যথেষ্ট, প্রাচীনকালের বুর্জোয়ার চেয়ে নব্যউদারবাদের দিকে বেশি ঝোঁক ছিল। তবে সেটা নিশ্চিতভাবেই সশস্ত্র বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি নব্যউদার। মনে রাখতে হবে, এই বাহিনী মিসরে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের জের ধরে দেশটির অর্থনীতির অন্তত ২৫ শতাংশ (কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে ৪০ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণ করে। এ কারণে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) ইখওয়ানকে অনেক বেশি উপযোগী হিসেবে পেয়েছিল।

উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো থেকে কার্যত অসীম তহবিল প্রাপ্তির কারণে তারা তাদের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। এই তহবিলে ভর করেই তারা দেশটির নগরেগ্রামের আনাচে কানাচে সুন্দর সুন্দর অফিস খুলেছিল, দাতব্য সংস্থা, স্কুল, ক্লিনিক, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছিল, স্থানীয় ঋণদান সুবিধার সৃষ্টি করেছিল। নব্যউদারবাদী, দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্রমবর্ধমান হারে দেউলিয়া হয়ে পড়া রাষ্ট্র জনসাধারণকে মৌলিক সুযোগসুবিধাগুলো দেওয়ার কাজ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ায় ইখওয়ান সক্রিয় হয়, ধর্মীয় বক্তব্য ও সামাজিক রক্ষণশীলতা প্রচারের পাশাপাশি এসব দায়িত্বের কিছুটা পালন করে। এতে করে জনসাধারণের বিপুল অংশ তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, তারা নির্বাচনে অংশ নিলে তাদের ভোট ব্যাংক হিসেবে কাজ করে। মোবারক সরকারের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার অদ্ভূত এক সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। অনেককে সময়ে সময়ে কারাগারে পাঠানো হতো। তবে মাঝে মাঝে তাদেরকে পার্লামেন্টেও আসতে দেওয়া হতো। সাধারণভাবে তারা যতদিন নিজেদের জেহাদি কার্যক্রম সংযত রাখত, ততদিন তারা মোবারকের প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতো না। তখন তাদেরকে সমাজে তাদের ঘাঁটি ও প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ করার সুযোগ দেওয়া হতো। মোবারকপন্থী বুর্জোয়াদের সঙ্গে দহরমমহরম থাকা উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিকরা ইখওয়ানের জন্য বৃহত্তর স্বাধীনতা নিশ্চিত করত।

ইসলামপ্রীতি পুরনো সাম্রাজ্যবাদী আসক্তি। যুক্তরাষ্ট্রসৌদি সুসম্পর্কের সূচনা সেই ফাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের সময়। ট্রুম্যান ডকট্রিনের সময়ে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঢাল বিবেচিত হয়েছে রাজনৈতিক ইসলাম (নির্বাচনপন্থী ইসলাম)। ইখওয়ানের প্রথম প্রতিনিধিদলটি হোয়াইট হাউজে অবতরণ করে ডিহোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের আমলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বারাক ওবামা ২০০৯ সালে যখন মুসলিম বিশ্বের প্রতি ভাষণ দিতে কায়রো পৌঁছেন, তখন সামনের সারিতেই ছিলেন ইখওয়ান নেতারা। তাদের প্রতিই ছিল মূল বার্তা ইসলামসম্পর্কিত আপনাদের ভাষ্যই আমাদের জন্য কল্যাণকর। অবশ্য এটাই গ্রহণযোগ্য একমাত্র ভাষ্য নয়। ট্রুম্যান থেকে ওবামা পর্যন্ত ইসলামবাদের নানা ভাষ্য ভালোমতোই সাম্রাজ্যবাদের সেবা করেছে। বিভিন্ন ধরনের ইসলামপন্থীর সাহায্য ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে আফগানিস্তানে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত? আল কায়েদার নেতারা মূলত সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্সের (সিআইএ) সৃষ্টি। তারা এসেছে ইখওয়ানের ভিন্নমতালম্বী গ্রুপ থেকে। ২০১১ সালে আরব বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেওয়ার ঘটনা শুরু হয়েছিল তিউনিশিয়ায় গণআন্দোলনের মাধ্যমে। আর সেটা করেছিল আন নাহদা। এই দলটি ব্রিটিশ আর ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থার মদদ ছাড়াই সেটা করতে পেরেছে? এমনকি বর্তমান সিরিয়ায় ‘উদার’ থেকে শুরু করে জেহাদিপন্থী প্রতিটি গ্রুপের জন্ম হয়েছে ইখওয়ানের মাধ্যমে। আর বাথপন্থী সরকারকে উৎখাতে তাদেরকে সাহায্য দিচ্ছে আমেরিকা, ফ্রান্স, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার ইত্যাদি দেশ। বাথপন্থী সরকারকে উৎখাত করতে গিয়ে ইতোমধ্যেই লাখ লাখ লোক জীবন হারিয়েছে। প্রায় ২০ বছর আগে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামবাদের মধ্যে যে কুটিল প্রেমের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল আজ সিরিয়ায় তার ফল দেখা যাচ্ছে।

একইসঙ্গে একথাও মনে রাখতে হবে, যেসব দেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম কিংবা যেসব দেশে বিপুলসংখ্যক মুসলমান বাস করে, বিশেষ করে সুন্নি, সেইসব দেশের প্রতিটি ইসলামী গ্রুপ, উপদল, ধারা হয় ইখওয়ানের মিত্র বা শাখা কিংবা ভিন্ন মতালম্বী গ্রুপ। ইখওয়ানের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের বিষয়টি কোনো সামান্য বা স্থানীয় বিষয় নয়। মিশর প্রাথমিক আবাস হওয়ায় এই দেশটিই ঝড়ের চোখ। আরো অনেক কিছু রয়ে গেছে।।

(চলবে…)