Home » রাজনীতি » শুধুই প্রতিশ্রুতি আর ভিত্তিপ্রস্তরের রাজনীতি

শুধুই প্রতিশ্রুতি আর ভিত্তিপ্রস্তরের রাজনীতি

আবীর হাসান

politicsকথা ছিল উন্নয়নের জন্য একটি উপযুক্ত কৌশলপত্র পাওয়ার, যার মূলে থাকবে পরিবর্তন ও দিনবদলের অঙ্গীকার। এ তো মুখের কথা নয় একেবারে লিখিত ব্যাপার ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছিল তার মধ্যেই লেখা ছিল এ কথাটি। এর সঙ্গে এও লেখা ছিল যে, ‘কৌশলপত্রে থাকবে দীর্ঘমেয়াদী পরিপ্রেক্ষিত এবং স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা।’ পৌনে পাঁচ বছর পর এখন পর্যন্ত ও রকম কোনো কৌশলপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার বদলে দেখা যাচ্ছে এখানে ওখানে বিচ্ছিন্নবিশৃঙ্খলভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তুর উন্মোচন করা হচ্ছে।

অনেকেই মনে করেছিলেন আগে যা হওয়ার হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর ২ বছরে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো তাতে করে আর ফাঁকা বুলি আওড়াবে না তারা, অন্তত উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার কাজগুলো নিজেদের অঙ্গীকার মোতাবেক করবে নির্বাচনকালীন ফাঁকা বুলি মনে হবে না অঙ্গীকারগুলোকে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেই লিখেছিল ‘আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশের সামনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সঙ্কট জাল ছিন্ন করে উন্নয়নের গতিপথে দেশকে পুর্নস্থাপিত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।’

এখন সবাই বুঝতে পারেন উন্নয়ন কতোটা হয়েছে আর কতোটা হয়নি কিংবা কতোটা হওয়া উচিত ছিল। ক্ষমতাসীনরাও বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন এবং পারছেন বলেই প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্থানে উন্নয়নের প্যাকেজ নিয়ে ছুটে যাচ্ছে এবং যা উন্নয়ন এতদিনে হওয়া উচিত ছিল সেই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নতুন করে দিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতির ভিত্তিফলক উন্মোচন করে আসছেন। গত ২৯ আগস্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ৯টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও চারটির ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন। যার মধ্যে আছে হালিশহর ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৯১টি খাদ্য গুদাম, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবনির্মিত পাঁচতলা ডেন্টাল ভবন, চট্টগ্রাম কলেজের নতুন প্রশাসনিক ভবন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হোস্টেল, চান্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্প, লোহাগাড়া উপজেলা ট্রমা সেন্টার, ফটিকছড়ি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, রফিকুল আনোয়ারমোর্শেদা ট্রাস্ট, সিবিএ স্কয়ার (আবাসিক) ফ্ল্যাট প্রকল্প।

গত ৩ সেপ্টেম্বর রামুউখিয়ায় গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ১৯টি পুনর্নিমিত বৌদ্ধবিহার উদ্বোধন করেন তিনি। কক্সবাজারে শেখ কামাল স্টেডিয়ামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এছাড়া আরও প্রায় ৫০টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর বাগমারায় যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানেও দেখা যাচ্ছে ৩৮টি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন করেছেন তিনি।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন সিলেটের গোলাপগঞ্জে। সেখানেও একটি প্যাকেজ নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি এবং প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিফলক ডিজিটাল পদ্ধতিতে উন্মোচন করেন।

এসব সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে এটাই বোঝা যায়, যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো করা উচিত ছিল, কিন্তু সরকার পৌনে পাঁচ বছরে করেনি, সেগুলোর ব্যাপারেই জনসাধারণকে এখন একটা ‘বুঝ’ দেয়ার চেষ্টা চলছে। তাদেরকে বলা হচ্ছে, ‘এতো শত কোটি টাকা ব্যয়ে এসব আমরা করব আমাদের ভোট দিলে।’ জনসাধারণ শোনে, আজকাল জনসভায় উপস্থিত জনগণই কেবল নয় তাৎক্ষণিকভাবেই সারা দেশের মানুষ শোনে এবং দেখে ও সবাই বোঝে। বরাবরের মতো এসবও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যতোই ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফলক উন্মোচন হোক না কেন, নির্বাচন গেলেই এগুলোর ওপর ধুলো জমতে থাকবে এবং আবার একটা নির্বাচন এলে তখন আরো নতুন কিছু প্রতিশ্রুতি পাওয়া যাবে।

এ রকম অনেক প্রতিশ্রুতিই তো এদেশের জনগণ পেয়েছিল গত নির্বাচনের আগে। ২০০৮এর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল ‘ভোক্তাদের স্বার্থে ভোগ্যপণ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলা হবে। সর্বোপরি সরকার ও চাহিদার ভারসাম্য সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য কমানো হবে। সবাই এখন জানে, বাজার নিয়ে সরকার কী করেছে আর দ্রব্যমূল্য কতোটা কমেছে। বলা হয়েছিল (ইশতেহার দফা ২) দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? আমরা গত পৌনে পাঁচ বছরে যা ইতোপূর্বে কখনই শুনিনি সেই আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারি পদ্মা সেতু, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনির মতো অর্থ কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিসহ অসংখ্য ঘটনা যা ইতোপূর্বে আর এ দেশে দেখা যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার বদলে একটি কাগুজে বিড়ালে পরিণত করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সম্পর্কে ইশতেহারের ৩.১ দফায় বলা হয়েছিল ‘২০১০ সালের মধ্যে ৭ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০২১ সালের মধ্যে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। সবাই এখন জানে উৎপাদন বৃদ্ধির নামে কুইক রেন্টালের অপকাণ্ডের আর লক্ষ্যমাত্রা পূরণের হিসাবের শুভঙ্করের ফাঁকির কথা। খোদ রাজধানী ঢাকা এবং রাজধানীর বাইরে অসহনীয় লোডশেডিং আওয়ামী লীগের দেয়া প্রতিশ্রুতিকে ব্যঙ্গ করেছে। আর ডিজিটাল বাংলাদেশের কমপিউটারগুলো যে দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে বিদ্যুতের অভাবে!

নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত সার্বিক জ্বালানি নীতিমালা গ্রহণ এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়ন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এই বিদ্যুৎ খাত দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। কুইক রেন্টাল দিয়ে যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল সেই স্বপ্নের মূল্য এখন দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকিতে। আর এই টাকা যাতে নির্বিঘ্নে লোপাট করা যায় তার জন্য কুইক রেন্টালের টেন্ডারে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে এবং নতুনের বদলে পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে এখন চলছে সে সব কুইক রেন্টাল। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীকেই এখন ঘোষণা দিতে হচ্ছে লোডশেডিং থাকবেই। কি আশ্চর্য এক দেশ!

ইশতেহারের ৪.১ দফায় বলা হয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বলা হয়েছিল ২০১৩ সালের মধ্যে দারিদ্র্যসীমা ও চরম দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ২৫ ও ১৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। যদিও এক বছর ঝড়জলোচ্ছ্বাস, বন্যা খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ খুব বেশিমাত্রায় হয়নি। তারপরও দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দাবি করতে পারছে না সরকার। বাড়িখামারের প্রতিশ্রুতি এখন দিবাস্বপ্নও না। আর বয়স্ক ভাতা, দুস্থ ভাতা যে দলীয় লোকজন খেয়ে ফেলছে তা প্রায় প্রতিদিনের পত্রিকাতেই দেখা যাচ্ছে।

ইশতেহারের ৪.২ দফায় বলা হয়েছে, বেকারের সংখ্যা ২.৮ কোটি থেকে ২০১৩ সালে ২.৪ কোটিতে নামিয়ে আনা হবে। ওই অঙ্গীকারের স্বপক্ষে কী প্রমাণ সরকার দেখাতে পারে? ইশতেহারের ১৪ দফায় বলা হয়েছে, বছরে ন্যূনতম ১০০ দিন কর্মসংস্থানের জন্য প্রত্যেক পরিবারের অন্তত একজনের কর্মসংস্থান করা হবে। কোথায় সে অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন? ইশতেহারের ৫.২ দফায় বলা হয়েছিল, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।

.৪ দফায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্ঠাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা হবে এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিষিদ্ধ করা হবে। একটি সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

আহা! শিষ্ঠাচার ও সহিষ্ণুতার কী যে সব উদাহরণ তৈরি হয়ে চলেছে তা আর লেখার উপায় নেই। এখন তেঁতুল তত্ত্ব, চুল তত্ত্ব, অপপ্রচার তত্ত্ব থেকে, মেরুদন্ড ও মাথার গোলমাল তত্ত্বে ‘উত্তোরণ’ ঘটেছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির। আর খিস্তিখেউরে সয়লাব সারাদেশ। বিরোধী দল এবং পক্ষকে প্রতিহত করার জন্য যে দমনপীড়ন চালানো হয়েছে, তা নজিরবিহীন। এ কাজে শুধু যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই দলীয় বাহিনীর মতো ব্যবহার করা হচ্ছে না, ছাত্রলীগযুবলীগকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ইশতেহারের ৫.৬ দফায় বলা হয়েছে, দলীয়করণমুক্ত, অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা ঠিক এর উল্টো চিত্রটি দেখতে পাই।

.৭ দফায় বলা হয়েছে, জনজীবনের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, হত্যা, গুম, খুন, গণপিটুনি, যৌন সন্ত্রাসসহ হেন অপকর্ম নেই যা এই সরকারের সময় রেকর্ড সৃষ্টি করেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কতোটা ঘটেছে তা লিখে বর্ণনা করার বোধ করি ঠিক হবে না। কারণ গুটিকয়েক ক্ষমতাসীন বাদে সবাই এই পরিস্থিতির ভুক্তভোগী।

ওই ইশতেহারের ৭.২ দফায় বলা হয়েছিল, বর্গাচাষীদের জন্য ঋণ, ক্ষেতমজুরদের কর্মসংস্থান ও তাদের পল্লী রেশনের আওতায় আনা হবে। কোথায় সেই পল্লী রেশন? আর ক্ষেতমজুরদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কে দিচ্ছে? উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা কি হয়েছে?

ইশতেহারের ১৮ দফায় বলা হয়েছিল, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম্পদ সুরক্ষার কথা। অথচ তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই রক্ষা করতে পারছে না সরকার। টেকনাফের উখিয়ায় ১৯টি বৌদ্ধ মন্দির পুনর্নিমাণ করা হয়েছে। কিন্তু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মনের এই ক্ষত কী জীবনে ঘুচবে? আর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সহায়সম্পত্তি কারা দখল করছে? সংখ্যালঘুদের পক্ষ থেকে প্রধানত ক্ষমতাসীনদের দায়ী করে বেশ কয়েকবার সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। এবং ওই সংবাদ সম্মেলন থেকে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

ইশতেহারের ১৯ দফায় বলা হয়েছিল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার কথা। অথচ এখন গণমাধ্যমে প্রকৃত সংবাদ এবং তার ভাষ্য সহিষ্ণুতার সঙ্গে দেখে না রাষ্ট্র। তথ্য প্রযুক্তি আইন নামে যা করা হয়েছে, তা পুলিশ নির্ভর কালাকানুন ছাড়া তো আর কিছুই নয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এতোটাই নিশ্চিত করা হয়েছে যে, সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়েছে, বন্ধ করা হয়েছে টেলিভিশন। বন্ধ করা হয়েছিল ফেসবুক, ইউটিউব। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী অসংখ্যবার টেলিভিশন টকশোর অনুষ্ঠান সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন এবং টকশোতে যারা অংশ নেন তাদের সম্পর্কে এমন সব মন্তব্য করেছেন, যা অনাকাঙ্খিত।

ইশতহারের ২৩ দফায় বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার কথা। কিন্তু সেটা করতে পারেনি এ সরকার। বরং পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেকর্ড সংখ্যক বিদেশ সফর করেছেন। এককেন্দ্রীক বিশ্বে কেন্দ্রীয় শক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গেই সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে। বরং সরকার নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে একটি দেশের উপরে। তাদের করিডোর দেয়া হয়েছে, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেয়া হয়েছে, যোগাযোগের যাবতীয় ব্যবস্থা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছে কাঁটাতারের বেড়ার উপরে ফেলানীর মৃতদেহ। শুধু এক ফেলানী নয়, অসংখ্য বাংলাদেশী নাগরিক সীমান্ত হত্যার শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে। ভারতকে চাহিদা মতো বন্দর ব্যবহারসহ সব কিছুই দেয়ার পরেও বাংলাদেশ তিস্তার সামান্য পানি কিংবা সীমান্ত সমস্যার সমাধান পায়নি। বাংলাদেশ এমনভাবে চুপচাপ হয়ে বসে আছে মনে হয় দেশের নাগরিকরা নিজ দেশে পরবাসী।

অথচ ফেলানীর বয়সী নতুন প্রজন্মের জন্যই নাকি উৎসর্গীকৃত ছিল ইশতেহারটি। শুধু তো তাই নয়, বলা হয়েছিল রূপকল্পের কথাও। কিন্তু আদতে হয়তো রূপকল্পটি ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছাপত্র। যে কারণে অঙ্গীকার ও কর্মসূচি ঘোষণার প্রথমেই বলা হয়েছিল, ‘‘সঙ্কটের আবর্তে নিমজ্জমান অবস্থা থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করে একটি উন্নত সমৃদ্ধ সুখী সুন্দর জীবন গড়ে তোলাই হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একমাত্র ব্রত। আগামী ২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আর ২০২০ সাল হবে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী।’’

অর্থাৎ ওই সময় পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিল আওয়ামী লীগ কেবল ৫ বছরের জন্য নয়! সে জন্যই কী আবার এত সময় নিয়েছে উন্নয়নের অঙ্গীকার পূরণের জন্য? এখন যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে তাও কি পরবর্তী ৫ বছরের জন্য না আরো আগামী আট বছরের জন্য অর্থাৎ ২০২১ সাল পর্যন্ত? সে লক্ষ্যেই তো এতো ভিত্তিফলক উন্মোচন আর তুষ্ট করার প্যাকেজ সমারোহ! পঞ্চদশ সংশোধনী এবং নির্বাচনী বিধির অভিনব সংস্কারও তো ওই ইচ্ছাপত্র বাস্তবায়নের জন্যই নয় কি!