Home » প্রচ্ছদ কথা » শেষ পর্যন্তও দিল্লির জন্য অপেক্ষা

শেষ পর্যন্তও দিল্লির জন্য অপেক্ষা

আমীর খসরু

hasina-manmohan-3প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য বিরাট লাটবহর নিয়ে নিউইয়র্কে গেছেন রোববার রাতে। সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের বাইরে তিনি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংএর সঙ্গেও বৈঠক করবেন। মনমোহন সিংএর সঙ্গে বৈঠকটি অনুষ্ঠানের কথা ছিল দিল্লিতে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। কর্মসূচি প্রায় ঠিকঠাক হয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ওই সময় দিল্লি সফর করবেন। কিন্তু সে সফরটি হয়নি। জাতিসংঘে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের উদ্দেশে হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় এসে ভারতের কাছ থেকে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি ও স্থল সীমান্ত সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা।

এই চুক্তি দুটির একটিও নতুন নয়। অনেক দিন ধরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ নিয়ে নানা চেষ্টা তদবির চলছে। এমনকি ২০১০ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময়ে যে যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে খুব শিগগিরই তিস্তার নদীর পানি বণ্টনের চুক্তির বিষয়টির উল্লেখ ছিল। তিস্তার পানি চুক্তির সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশ উদগ্রীব হয়ে বসেছিল ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথমাংশে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংএর ঢাকা সফরের সময়। কিন্তু তখন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হলো, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এই চুক্তিতে রাজি নন বলে তিনি ওই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হননি। এরপর দীর্ঘকাল মমতার কথা বলে তিস্তার ধারে কাছেও না যাওয়ার চেষ্টা চলতে থাকলো। দিল্লির পক্ষ থেকে এমনটা বাংলাদেশকে বোঝানো হলো যে, মমতা তিস্তা নিয়ে এমন অগ্নিমূর্তি হয়ে বসে আছেন যে, তার ধারে কাছেও যাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় ঢাকা থেকে ছোটাছুটি শুরু হলো কলকাতায়। কেন্দ্র দিল্লি তখন বিষয়টি চালান করে দিল কলকাতার ওপরে। ঢাকা থেকে প্রধানমন্ত্রীর দু’জন উপদেষ্টা কলকাতা গেলেন। অন্যান্যরা যে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনিই একবার কলকাতা ঘুরে এসেছেন যদি মমতা ব্যানার্জিকে রাজি করানো যায়। কিন্তু এরই মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় পানি উন্নয়ন সংস্থা তিস্তার উজানে সিকিমে কমপক্ষে পাঁচটি বাঁধ নির্মাণ অব্যাহত রাখে। এমনকি বেসরকারি উদ্যোগেও নির্মিত হতে থাকলো এ ধরনের বাঁধ। আরো বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হলো সে দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে তিস্তার ওপরে। তিস্তার বাংলাদেশ অংশ এখন পানি শূন্যই বলা যায়। এরপর ভারতের পক্ষ থেকে হঠাৎ করে বলা হলো দুই দেশের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পর্যায়ে সব কিছু চূড়ান্ত করবে শিগগিরই। সে মতে ভারতীয় মন্ত্রীর ঢাকায় আসার কথা ছিল মাস কয়েক আগে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে যোগ দেয়ার জন্য। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মন্ত্রী জানিয়ে দিলেন তিনি আসবেন না। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকটি আর হলো না। তিস্তা কাহিনী ওখানেই পড়ে রইলো। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার আশার বিপরীতে আশা ত্যাগ করেনি। শেষ মুহূর্তেও দিল্লির জন্য অপেক্ষা।

সীমান্ত চুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পরপরই। তৎকালীন শেখ মুজিব সরকারের সময় অর্থাৎ ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশভারত সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ তড়িঘড়ি করে বেরুবাড়ি ভারতের হাতে হস্তান্তর করে। কিন্তু সেই থেকে এখন পর্যন্ত ভারত ওই চুক্তি আর তাদের পার্লামেন্টে অনুমোদন বা রেটিফিকেশন করেনি। সবশেষ এ বছরে চুক্তিটি সে দেশের পার্লামেন্টে উঠলেও পাস হয়নি। ভারতীয় রাজনীতির এ এক অদ্ভুত ঐক্য। যারা ভারতীয় রাজনীতির ছিটেফোটাও খবরাখবর রাখেন তারা এই ম্যারপ্যাচ কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারেন।

কিন্তু এই দফায় আওয়ামী সরকার এসে প্রথম থেকেই ‘চাহিবামাত্র’ ভারতকে সব কিছু দিয়ে বসে আছে। নৌ, সড়ক, রেল, আকাশ সব ভাবেই করিডোর দেয়া হলো। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বন্দর তারা ব্যবহার করছে, বন্দী প্রত্যর্পনের বিষয়টিও সমাধা হয়েছে। সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। যা দৃশ্যমাণ তার সবই ভারতের চাহিদা অনুযায়ী তাদের দেয়া হয়েছে। কিন্তু সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ কর্তৃক শত শত নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যাযজ্ঞ নিয়ে সরকার কখনই কার্যকরি ভাবে কোনো প্রতিবাদ করেনি। বিএসএফের গুলিতে পঞ্চদশী ফেলানির মৃতদেহ যখন কাঁটাতারের বেড়ার উপরে ঝুলছে, তখনও সরকার নীরবতা পালন করেছে। বিভিন্ন স্থানে বিএসএফ যখন বাংলাদেশীদের উপরে নির্যাতননিপীড়ন করেছে তখনও এই নীরবতা ভাঙেনি। বিএসএফ আদালতে ফেলানীর মামলায় যখন অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস দেয়া হলো তখনও সরকার চুপচাপ। ভারত সরকার সীমান্তে ড্রোন মোতায়েন করবে এমন সিদ্ধান্তের কথা যখন সবাই জানলো, ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হলো, বিশ্বময় খবর হলো তখনো ঢাকা দিল্লির কাছে কার্যকরভাবে এর ব্যাখ্যা পর্যন্ত চায়নি। যে সামান্য ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছিল, দিল্লি তা জবাব দেয়নি। কারণ সরকার শেষ পর্যন্ত দিল্লির অপেক্ষায় আছে এই ভেবে যে, যদি তিস্তা ও স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হয় তাহলে আগামী নির্বাচনে তারা লাভবান হতে পারবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে সব সময়ের আশ্বাসের মতো এবারও আমাদের ভারতীয় আশ্বাসে নিঃশ্বাস ফেলতে হবে।

আওয়ামী লীগ গত নির্বাচনের আগে যে নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিল তার ২৩ দফায় বলা হয়েছিল সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। অঙ্গীকার করা হয়েছিল, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন অঞ্চলের দেশের সঙ্গে উন্নততর সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। সামগ্রিক বিচারে বাংলাদেশ একটি মাত্র দেশ ছাড়া বন্ধুহীন একটি দেশে পরিণত হয়েছে।

অথচ এই বন্ধুহীন অবস্থায়ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪০ জন সফরসঙ্গী নিয়ে নিউইয়র্কে গেছেন। অতীতে এত বড় প্রতিনিধি দল নিয়ে বাংলাদেশী কোনো রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান জাতিসংঘ তো বটেই, কোনো দেশও সফর করেননি।।

১টি মন্তব্য

  1. দিল্লির জন্য অপেক্ষা বাংলাদেশের জন্য বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ।।