Home » অর্থনীতি » আবারও গার্মেন্টস খাত প্রশ্নের সম্মুখীন

আবারও গার্মেন্টস খাত প্রশ্নের সম্মুখীন

. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

garment-workers-revoltবাংলাদেশে পোশাক খাতের উত্থান, বিকাশ এবং বিস্তৃতি শহরকেন্দ্রিক। অবকাঠামোগত সুবিধা, শহরমূখী কর্মপ্রার্থী লোকের সহজ প্রাপ্যতা এবং দেশে ও বিদেশে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি কারণে পোশাকখাত শহরমূখী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এ কারণে এখাতে নিযুক্ত লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে শহরাঞ্চলে বাস করতে হচ্ছে। আরও পরিষ্কার করে বললে, দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল দুটি শহর ঢাকা ও চট্টগ্রাম এবং এর পাশ্ববর্তী এলাকায় শ্রমিকদের বাস করতে হচ্ছে। এর ফলে শ্রমিকদের ওপর চাপ পড়ছে জীবন ব্যয় মেটানোতে। আবার পোশাক কারখানার মালিকদের ওপর চাপ বাড়ছে শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরী দেবার ক্ষেত্রে। অবশ্য শ্রমিকদের প্রত্যাশা মতো মজুরী মালিকদের পক্ষে দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এসব কারণে মজুরী পুনর্নির্ধারণকালে শ্রমিকরা সবসময় তাদের দাবীর ব্যাপারে সোচ্চার থাকেন।

শহরাঞ্চলে বসবাসকারী শ্রমিকের জীবনব্যয় একজন গড়পড়তা একই আয়ের গ্রামে বসবাসকারী থেকে ভিন্ন। গ্রাম ছেড়ে শহরাঞ্চলে একজন শ্রমিক কাজের উদ্দেশ্যে এলে সে গ্রামে তার বিকল্প জীবিকার চেয়ে অধিক আয়ের প্রত্যাশা নিয়ে আসে। এ কারণে কারখানায় সদ্য আগত একজন শ্রমিককে “কর্মহীন” শ্রমিকের পোশাকখাতে কাজে যোগদান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ কম। এসব কারণে শ্রমিকের জীবনমান সম্পর্কিত ধারনারও পরিবর্তন হচ্ছে ধীরে ধীরে। শহুরে শ্রমিকের জীবন যাপন ব্যয় কাঠামোতে তাই খাদ্য এবং খাদ্য বর্হির্ভূত ব্যয় সমান গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্যব্যয়: শ্রমিকের প্রতিদিনের (সাপ্তাহিক ছুটি বাদে) দীর্ঘ শ্রমঘন্টায় কাজে নিয়োজিত থাকতে যে পুষ্টিমান সম্পন্ন খাবার প্রয়োজন হয়, তার সীমিত আয়ে তা যোগান দেয়া সম্ভব হয় না। শ্রমিকের খাদ্য তালিকায় শর্করার আধিক্যের মধ্যেও আমিষ জাতীয় খাদ্য যেমন: মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ইত্যাদি দেখা যায় সপ্তাহে এক বা দুই দিন। কিন্তু শ্রমিকের দুশ্চিন্তা হলো অতি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যেমন, পিয়াজ, আলু, মসলা বা চিনি ইত্যাদি পণ্যের দামের ওঠা নামা। উদাহরনস্বরূপ, বর্তমানে পেয়াজের উচ্চমূল্য শ্রমিকের খাদ্যব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ শ্রমিক সৃষ্টি করছে। একই অবস্থা দেখা গেছে পূর্বে চালের মূল্য বৃদ্ধির সময়ে।

খাদ্য বর্হির্ভূত ব্যয়: খাদ্যবর্হির্ভূত ব্যয় শ্রমিকের ব্যয়ের অন্যতম অংশ। এর মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা ব্যয় এমনকি মোবাইল বিল ইত্যাদি। বাড়ি ভাড়ার জন্য শ্রমিকদের মোট খাদ্যবহির্ভূত ব্যয়ের ১৫ শতাংশ, শিক্ষার জন্য ১৩ শতাংশ, এবং চিকিৎসা ব্যয় ৫ শতাংশ ইত্যাদি ব্যয় হয়। দেখা গেছে, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই হয়ে থাকে। বিশেষত শ্রমিকদের মজুরী পুনর্নির্ধারণ সময়কালে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রবনতা সবচেয়ে বেশি থাকে। স্থানীয় বাড়ীর মালিকদের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে আনা গেলে হঠাৎ করে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির চাপ কমতে পারে। শ্রমিকদের বিশেষত: নারী শ্রমিকদের চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যগত কারণে বেশ ব্যয় হয়; এছাড়া শ্রমিকের পরিবারের সন্তানদের চিকিৎসা ব্যয়ও রয়েছে। সন্তানদের শিক্ষা বাবদ ব্যয় কম নয়। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে বেসরকারি বা কিন্ডার গার্টেন এ সন্তানকে অধিক ব্যয়ে পড়ানো এবং সন্তানের কোচিং এ পড়ানোর ব্যয় শ্রমিকের খাদ্য বহির্ভূত ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। শ্রমিকপ্রধান অঞ্চলগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্র/হাসপাতাল না থাকাএ ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

দেখা যাচ্ছে শহরাঞ্চলে বসবাস করার কারণে শ্রমিকরা শহুরে জীবনের প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো এড়িয়ে থাকতে পারছেন না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সন্তানের উপযুক্ত শিক্ষা, চিকিৎসা, এবং পোশাকপরিচ্ছদ জনিত ইত্যাদি। উপার্জিত আয়ে এসব ব্যয় পূরন না হলে ধারকর্জ করে বাড়তি ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের জীবন যাত্রার ব্যয় নির্ধারনের সবচেয়ে বড় অংশ আসে তার মজুরী থেকে। মজুরী পুর্ননির্ধারণকালে শ্রমিকরা চেষ্টা করেন বাড়তি ব্যয় মেটানোর অন্তত: কাছাকাছি মজুরী নিয়ে যেতে সচেষ্ট থাকতে।

শ্রমিকদের এসব যৌক্তিক দাবী দাওয়া মেটানো সার্বিকভাবে সামাজিক কমপ্লায়েন্স পূরনের অংশ বা তার চেয়েও বেশি। এ মুহূর্তে রানা প্লাজা, তাজরিন ফ্যাশনসসহ বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপি যে আলোড়ন চলছে, পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত মজুরী নির্ধারন করা না গেলে সৃষ্ট অসন্তোষের কারণে আরও একবার বাংলদেশের পোশাকখাত প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। একারণে উপযুক্ত মজুরী পুনঃনির্ধারণ করা জরুরি।।