Home » আন্তর্জাতিক » এশিয়ায় ধর্ষণের মহামারী

এশিয়ায় ধর্ষণের মহামারী

বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে একজন যৌন নির্যাতনকারী

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

rapeসম্প্রতি এশিয়ায় যৌন নির্যাতনবিষয়ক একটি সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। ল্যানসিট গ্লোবাল হেলথ জার্নালে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে পাপুয়া নিউ গিনিতে ৫৯ শতাংশ পুরুষ স্বীকার করেছে, তারা যৌন নির্যাতন চালিয়েছে। একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষই নিজেদের নির্যাতনকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই সমীক্ষায় ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এশিয়াপ্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় যৌন সহিংসতার প্রকৃতি জানতে জাতিসংঘ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ওই সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। সমীক্ষাটিতে অংশ নেয় ছয়টি দেশের ১০ হাজার পুরুষ।

এতে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি ও শ্রীলঙ্কার ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী পুরুষদের সাক্ষাতকার নেওয়া হয়েছিল। প্রশ্নকারীরা কেবল পুরুষদেরই সাক্ষাতকার নিয়েছে। তারা স্পষ্টভাবে ‘ধর্ষণ’ শব্দটি উল্লেখ না করে বরং কোমলভাবে জানতে চেয়েছিল, ‘স্ত্রী বা গার্লফ্রেন্ড ভিন্ন অন্য কোনো নারীর সঙ্গে কোনো সময় বলপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিল কি না?’

যে সংখ্যাটি স্বীকারোক্তি করেছে, তা যেকোনো বিচারে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। সমীক্ষাধীন অঞ্চলে ১০ শতাংশ পুরুষ জানিয়েছেন, তারা পরনারীকে ধর্ষণ করেছে এবং প্রায় প্রতি চারজনের একজন (২৪ শতাংশ) সঙ্গীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। অর্ধেকই জানিয়েছে, তারা ওই অপকর্মটি জীবনে মাত্র একবারই করেছে।

বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে প্রায় একজন যৌন নির্যাতনের কথা স্বীকার করেছে। শ্রীলঙ্কায় সংখ্যাটি ১০ শতাংশেও ওপরে। সমীক্ষায় তিন চতুর্থাংশ জানিয়েছে, তাদের ধর্ষণ করার কারণ হলো তারা এটাকে তাদের অধিকার মনে করেছে। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ডা. এমা ফুলু বলেন, ‘তারা বিশ্বাস করেছে যে নারীদের সম্মতি ছাড়াই তাদের যৌনকাজ করার অধিকার রয়েছে।’ তিনি আরো জানিয়েছেন, ধর্ষণের পেছনে দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় যে কারণটি কাজ করেছে, তা হলো পুরুষেরা এটাকে বিনোদন মনে করছে। তারা নাকি একঘেয়েমিতে ভুগছিল। তা থেকে রেহাই পেতে তারা এই অপকর্ম বেছে নিয়েছিল বলে স্বীকার করেছে। অনেক পুরুষ নারীর ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে শাস্তি দিতে ধর্ষণ করার কথাও জানিয়েছে। অ্যালকোহলের প্রভাবে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে সবচেয়ে কমসংখ্যক পুরুষ।

সমীক্ষায় আরেকটি বিষয় ফুটে ওঠেছে তা হলো, যেসব পুরুষ শৈশবে সহিংসতার শিকার হয়েছে, তারাই বেশি ধর্ষণ করেছে। সমীক্ষার সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো, বিভিন্ন দেশে যৌন হামলার মাত্রার পার্থক্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের পল্লী এলাকায় পরনারী ধর্ষণের হার যেখানে ৫.৪ শতাংশ, সেটা ইন্দোনেশিয়ার জয়পুরায় দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশ এবং পাপুয়া নিউ গিনিতে হয়ে গেছে ৪১ শতাংশ। প্রশ্ন জাগে, সাংস্কৃতিক পার্থক্যই কি ধর্ষণ ঘটনার হারে এমন পার্থক্য সৃষ্টি করেছে?

এই প্রশ্নটির মীমাংসা বেশ কঠিন। অবশ্য প্রশ্নটি নতুন নয়। ১৯৭০এর দশকের শেষ দিকে নৃতত্ত্ববিদ পেজি রিভস সানডে ধর্ষণের সামাজিকসাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন। এ ধরনের গবেষণায় তিনিই পথিকৃত। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, তিনি বিষয়টিকে সামাজিকজীববিজ্ঞানসংক্রান্ত প্রেক্ষাপট থেকে সরিয়ে ‘যৌনকাজে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পুনঃউৎপাদনশীলতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সানডে বলেছেন, ‘ধর্ষণপ্রবণ’ সমাজের পেছনে প্রধান যেসব উপাদান কাজ করে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরুষদের কঠোরতার আদর্শগত দর্শন, সহিংসতার ঐতিহ্য, রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের অভাব। এসবের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর নির্ভর করে ধর্ষণের প্রবণতা।

ল্যানসিটের সমীক্ষাতেও এসব বিষয় উঠে এসেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সানডে তার সমীক্ষায় ‘স্ত্রী সংগ্রহের জন্য অন্যান্য গ্রুপে অভিযান’ চালানোর কথা উল্লেখ করেছিলেন। আর ল্যানসিটের সমীক্ষায় বাগানভিলা (পাপুয়া নিউ গিনি) ও জয়পুরায় (ইন্দোনেশিয়া) ধর্ষণের হার বেশি থাকার কারণ হলো ধর্ষণের মাধ্যমে এসব সমাজে পূর্বেকার বিরোধের প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়।

সানডে তার সমীক্ষায় নারী রাজনীতিবিদদের স্বল্প উপস্থিতির সঙ্গে উচ্চহারে ধর্ষণের মধ্যে সম্পর্ক দেখতে পেয়েছিলেন। ল্যানসিটের সমীক্ষাতেও এর প্রতিধ্বনি রয়েছে। জাতিসংঘ সমীক্ষাটিতে যে দেশটি ধর্ষণের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থানে রয়েছে সেটি হলো পাপুয়া নিউ গিনি। এই দেশটির নারীরাই বিশ্বে সবচেয়ে কম হারে পার্লামেন্টে (মাত্র ২.৭ শতাংশ) প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।

সানডের সমীক্ষায় যৌন সহিংসতা নিরুৎসাহিত করার পেছনে যেসব কারণের উল্লেখ করেছিলেন, তাও পাওয়া গেছে ওয়েস্ট সুমাত্রার মিনাঙকাবাউ সংস্কৃতিতে। মাতৃতান্ত্রিক এই সমাজে নারীরাই বিয়েসহ (পারিবারিক মতামতে বিয়ে, যৌতুক ইত্যাদি। অনেক গবেষক মনে করেন, পাপুয়া নিউ গিনিতে এগুলোই জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বাড়িয়ে দেয়) সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। মিনাঙকাবাউ সংস্কৃতিতে ভূমি ও বাসগৃহের মালিকানার ক্ষেত্রে নারীরা ব্যাপক ক্ষমতা পেয়ে থাকে। এই সমাজে বিয়ের পর পুরুষেরা নারীদের বাড়িতে চলে আসে। অথচ পাপুয়া নিউ গিনি ও ইন্দোনেশিয়ায় যেসব অঞ্চলে ধর্ষণের ঘটনা বেশি, সেখানে নারীরা অনেকভাবেই পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতার কারণেই সেখানে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটে।

সানডে’র সমীক্ষা নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে সমালোচনা হয় তা হলো, তিনি ধর্ষণের পেছনে আইনের ভূমিকা এবং যৌন হয়রানি প্রতিকারে কঠোর শাস্তির বিষয় নিয়ে আলোচনা করেননি। তিনি সামাজিক শক্তির ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। জাতিসংঘও কিন্তু ওই পথেই হেঁটেছে। আলোচিত সমীক্ষাটি পরিচালিত হয়েছে ২০১২ সালে নয়া দিল্লিতে এক ছাত্রীর ওপর গণধর্ষণের ঘটনার পর। বিশ্বব্যাপী যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ কিভাবে করা যেতে পারে, সেই সমাধানের একটি পথ খোঁজার চেষ্টাতেই হয়েছে এই সমীক্ষা।

সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও ধর্ষণের হারে পার্থক্য ঘটাতে পারে। পাপুয়া নিউ গিনির যে এলাকায় সমীক্ষা চালানো হয়েছে, সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীলতা রয়েছে।।

পুরুষদের ধর্ষণ স্বীকারোক্তির হার

পাপুয়া নিউগিনির বাগানবিলা আইল্যান্ড

৬২ শতাংশ

ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রদেশ

৪৮.৬ শতাংশ

ইন্দোনেশিয়ার নগর এলাকা

২৬.২ শতাংশ

চীনের নগর/পল্লী

২২.২ শতাংশ

কম্বোডিয়া

২০.৪ শতাংশ

ইন্দোনেশিয়ার পল্লী

১৯.৫ শতাংশ

শ্রীলঙ্কা

১৪.৫ শতাংশ

বাংলাদেশের পল্লী

১৪.১ শতাংশ

বাংলাদেশের নগর

.৫ শতাংশ

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)