Home » রাজনীতি » কেন তারা চরম বেপরোয়া আর অসহিষ্ণু

কেন তারা চরম বেপরোয়া আর অসহিষ্ণু

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

democracyনব্বই দশকের শেষার্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ নাসিম একটি নজীরবিহীন লাঠি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মিছিলটি ছিল সর্বোচ্চ আদালতের বিপক্ষে। সে সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দায়েরকৃত আপিলের শুনানীতে কয়েকজন বিচারক ‘বিব্রত’ বোধ করছিলেন। ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে লাঠি মিছিল করে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। এমনকি, সে সময়ে আদালতের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র কিছু মন্তব্যের কারণে সুপ্রীম কোর্ট তাঁকে ‘রং হেডেড’ বলে মন্তব্য করেছিল। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আদালতের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিককালের বিএনপিজামায়াতের নেতানেত্রীরা অহরহ মন্তব্য করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ’র নেতানেত্রীরা এবং মন্ত্রীরা প্রতিনিয়ত বিচারাধীন মামলার বিষয়ে মন্তব্য করছেন।

মোহাম্মদ নাসিম এবারে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী নন, কিন্তু দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী। দলের নীতি নির্ধারনে তাঁর কি ভূমিকা রয়েছে বোঝা না গেলেও দলীয় নেত্রীর বিশ্বস্ত অনুসারী হিসেবে অন্যান্যদের জন্য অনুকরণীয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছেন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর এক আলোচনা সভায় সরকারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তার দেয়া বক্তব্য অনেকেই অতীতের ধারাবাহিকতা এবং ক্ষমতাসীনদের চরম অসহিষ্ণুতা এবং ক্ষমতার দম্ভ বলে অনেকেই মনে করছেন। ঐ সভায় নাসিম সরকারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, সরকারের কর্মকর্তা যারা আছেন, তাদের আমাদের কথা অনুযায়ী চলতে হবে। যারা নির্দেশ মানবেন না, তাদের কপালে দু:খ আছে। নির্দেশনা না মানলে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হবে। ২৪ জানুয়ারী পর্যন্ত বর্তমান সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকতে ভুলেই যান সরকারী কর্মকর্তারা সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তারা কোন দল, মত বা ব্যক্তির কর্মচারী নয়, তারা জনগনের সেবক মাত্র। এই কথাটি ভুলে যাবার কারণে ক্ষমতাসীন দল যেমন জনগনের প্রভুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তেমনি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের চরম দলীয়করণের মাধ্যমে পার্টিজান কর্মীতে পরিনত করা হয়। নাসিম তার বক্তব্যে আরো বলেছিলেন, যারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন, সেখান থেকে অপ্রয়োজনীয় কথা বলবেন না। দেশের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীসহ আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। সুতরাং অহেতুক কথা বলে আমাদের বিপদে ফেলবেন না।

মোহাম্মদ নাসিম সরকারী কর্মকর্তাদের তরফ থেকে কি কোন বিপদের আশংকা করছেন? কিংবা সরকারী কর্মকর্তাদের তরফে কোন ধরনের আদেশ অমান্যের আগাম কোন সংকেত কি তিনি পেয়েছেন? নাকি ১৯৯৬ সালের মত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মত কোন ‘জনতার মঞ্চ’ গড়ে ওঠার আভাস পেয়েছেন। যেখানে এসে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা আনুগত্য বদলে ফেলবেন? ২৪ জানুয়ারী’র সভা নাসিমের দেয়া এই বক্তব্যকে অসাংবিধানিক, শিষ্টাচার বহির্ভূত ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল বলে বিএনপি প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি অবশ্য দু’দলের মল্লযুদ্ধের ব্যাপার, কারণ বিএনপিও ক্ষমতায় থাকাকালে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দলীয় ব্যক্তিতে পরিনত করে এবং বিরোধী দলীয় নেতা কিছুদিন আগেও সরকারী কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে দলীয় কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জনগন মনে করে, লাগাতার দলীয়করণের ফলে আমাদের বিচার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্রসহ প্রতিটি স্তরে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোন উপায়ের কথা না ভেবে মোহাম্মদ নাসিম এরকম মন্তব্য করতে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। কারণ অতীত অভিজ্ঞতায় তারা জানেন, সরকারী কর্মকর্তাদের দল বদল বা রং বদল মূহুর্ত মাত্রের ব্যাপার। আর সেই সুযোগটি তারা খুঁজতে থাকেন। এর ফলে সবসময় সত্যিকারের প্রজাতন্ত্রের যোগ্য কর্মচারীরা চাকুরীতে সবধরনের সুযোগ বঞ্চিত থাকেন। অতীত এবং বর্তমানে এ ধরনের ভুরি ভুরি নজীর রয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং মন্ত্রীরা এখন জনগনের বিপরীতে কতটা বেপরোয়া এবং অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছেন তার নমুনা প্রতিদিন তারা কোথাও না কোথাও রাখছেন। আমাদের নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, যিনি একাধারে সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতা, সম্প্রতি তিনি আত্মপ্রকাশ করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিকদের নেতা হিসেবে। সরকারের হয়ে বিতর্কের জন্ম দিতে তার জুড়ি মেলা ভার। যিনি টিভি টক শোতে শত শত দর্শকের সামনে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম মিঞার চোখ উপড়ে নেবার হুমকি দিতে পারেন।

অতি সম্প্রতি তার বায়নার কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০২ ধারায় (হত্যার অভিযোগ) মামলা নেয়া হবে না এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন। লেখকগবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ এর উত্তরে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রাস্তাঘাটে যানবাহন যেমন বেপরোয়া তেমনি সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও বেপরোয়া। দুর্ঘটনার বিচারে কোন ধারার মামলা হবে, কি শাস্তি হবেসেটি আইন ও আদালতের বিষয়। এ বিষয়ে মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি এখতিয়ার বহির্ভূত। আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য তারানা হালিম সাহস করে বলেই ফেলেছেন, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্বহীন মন্তব্য সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াবে। এতে ১৬ কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়বে।

দেশের দু’জন মন্ত্রীর ক্ষমতার বদান্যতায় বেপরোয়া চালকরা খুনের দায়ে লঘুদন্ড পেয়ে পার পেয়ে যাবে, এতটাই নিরাপত্তাহীনতায় সারা দেশের জনগনকে বসবাস করতে হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে মোটর শ্রমিকদের মন জয় করার লক্ষ্যে সরকারের এরকম সিদ্ধান্তে চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর আশংকার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ঝুঁকিও বাড়বে। সড়ক দুর্ঘটনায় এখন কেউ নিহত হলে ফৌজদারী কার্যবিধির ৩০২ ধারায় আর মামলা নেয়া হবে না। শুধু তাই নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় যে ৫টি মামলা ৩০২ ধারায় বিচারাধীন রয়েছে সেগুলোও প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। জনগনের দাবি দাওয়ার বিপরীতে সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষে একজন মন্ত্রীর হুমকির মুখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতি শিকার যেমন বিপদজনক ও জনস্বার্থবিরোধী।

যে সংবিধান থেকে প্রধানমন্ত্রী একচুলও নড়বেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন, তার মন্ত্রী এবং নেতারা সেই সংবিধানের অধীন নীতি ও আইনের বিরুদ্ধাচারন প্রতিদিন করে যাচ্ছেন সে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল কিভাবে এড়িয়ে যাবেন? প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের হুমকি দিচ্ছেন, বাড়ি পাঠিয়ে দেবার কথা বলছেনকোনটাই কি আইনসঙ্গত:। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগ বাড়িয়ে বলছেন, কোন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহন না করেন, তিনি নির্বাচনে বা ভোট দিতে বাধা দিতে গেলে রাষ্ট্রের সর্বাত্মক চেষ্টা দিয়ে তাদের প্রতিরোধ ও দমন করা হবে। কোন গণতান্ত্রিক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তারমধ্যে যদি সামান্য রাজনৈতিক চেতনা থাকে, তাহলে তিনি এরকম ভাষায় কথা বলতে পারেন কিনাএটি জনগনের কাছে একটি বড় প্রশ্ন? যদি সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয় তাহলে নির্বাচনকালে তার মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের অধীন থাকবে। তিনি কমিশনের অনুমতি ছাড়া কি কিছু করতে পারবেন? অবশ্য বর্তমান ফরম্যাটের নির্বাচনে অতীতের মত তিনিও হয়তো সরকারের আজ্ঞাবহই থাকবেন যা সংঘাত কমানোর বদলে অনেক বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে তার শিকার তো ইতিমধ্যেই একবার হয়েছিলেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, /১১ এর সরকারের বদৌলতে।

আমাদের রাজনীতিতে এখন আর শিষ্টাচার বলতে কোন কিছু অবশিষ্ট নেই। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে শিষ্টাচার শব্দটি মুছে ফেলতে প্রায় ‘শৈল্পিক’ দক্ষতার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। পরস্পরকে আক্রমন করতে গিয়ে যে ভাষায় তারা কথা বলছেন, পৃথিবীর অন্য কোন অভিধানে তা খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের প্রধান নেতানেত্রীরা সংসদ বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানকোথাও দেখা হলে একে অপরের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলাপ পর্যন্ত করেন না। বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে যে, তারপরেও তারা দাবী করে থাকেন যে, জাতির ভাগ্য তারা বদলে দিতে সক্ষম। তাদের এই অভব্য ও নেতিবাচক কথাবার্তা এবং আচরন জনগনকে প্রতিদিনই হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করছে। এ কথা জনগন বুঝে গেছেন যে, তাদের পরস্পরের প্রতি এই যে লাগামহীন আক্রমন, তা আসলে ক্ষমতারই লড়াই। ক্ষমতার বাইরে ও ভেতরে তাদের মধ্যে জনগনের বিপরীতে অবস্থান নেয়ার অভূতপূর্ব ঐক্য থাকলেও মানুষের চরম দুর্দশার কারণে দশকের পর দশক ধরে এই ধরনের বর্বরতা তারা অব্যাহত রাখতে সমর্থ হচ্ছেন।

অতীতে সামরিক স্বৈরাচারী সরকারগুলোর আমলে জনগনের প্রতি নিষ্ঠুর এবং নির্মম অবহেলা দেখে দেখে অভ্যস্ত আমরা গণতান্ত্রিক স্বৈরাচারের রূপটিও প্রায় একই রকম প্রত্যক্ষ করছি। অস্মানজনক রাজনৈতিক আপোষ ও আত্মসমর্পনে অভ্যস্ত রাজনীতিবিদদের কন্ঠস্বর মিশ্রিত প্রতিপক্ষকে হিংস্র আক্রমন তাদের নেতানেত্রীকে হয়তো সন্তুষ্ট করতে পারে কিন্তু দেশের জনগনের জন্য সেটি কেবল ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

আমাদের মনে পড়ছে, খ্যাতনামা বাম রাজনৈতিক নেতা শহীদ সিরাজ শিকদারকে হত্যার পরে শেখ মুজিব জাতীয় সংসদে দম্ভভরে বলেছিলেন, ‘কোথায় আজ সিরাজ শিকদার’। দেশের প্রধান নেতার এই দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সেটা জনগন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরেও শিক্ষা না নেয়ার রাজনীতি বারবার প্রমান করেছে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ইতিহাস থেকে কেউ কিছু শেখে না’।।