Home » আন্তর্জাতিক » টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদনে সুন্দরবন

টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদনে সুন্দরবন

ভারতের বাতিল প্রকল্প বাংলাদেশে চালান

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

sundarbansসুন্দরবনের কাছেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। যে বন আমাদেরকে মায়ের মতো আগলে রাখে, সেই বন ধ্বংস করার মতো কোনো পরিকল্পনা কেউ করতে পারে, তা ভাবাও যায় না। কিন্তু সরকার অনড়। তাছাড়া বাধ্যবাধতকাপূর্ণ আইনি প্রতিবন্ধকতা এবং ব্যাপকতর বিক্ষোভের মুখে গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে দুটি বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ভারত সরকারের প্রয়াস বাতিল হয়ে যায়। এমন এক প্রেক্ষাপটে প্রভাবশালী টাইম সাময়িকীতে ‘হাউ নট টু লাভ নেচার : শোভ এ কোল প্লান্ট নেক্সট টু আর্থ’স বিগেস্ট ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এখানে জ্যাসন মটলাঘের ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো।।

সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ (শ্বাসমূলীয়) বন এবং ইউনেস্কো ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ।’ মানুষখেকো বাঘ দীর্ঘ দিন ধরে এই বনের সেরা রক্ষক হিসেবে কাজ করছে। সরকারি হিসাবে এই বনে প্রতি বছর বাঘের থাবায় ২০ থেকে ৫০ জন প্রাণ হারায়। তবে বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটি অনেক বড়। আর এভাবেই সম্ভাব্য শিকারি এবং এই ছোট্ট ও জনসংখ্যার ভারে ভারাক্রান্ত দেশটির লোভাতুর দৃষ্টি থেকে বনটির ক্রমাগত কমতে থাকা সীমানা রক্ষা করে বাঘগুলো। তবে বর্তমানে আরো ভয়াবহ ছদ্মবেশি হুমকির কারণে বনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবেশবাদীরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেছেন। হুমকিটা আসছে বন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে রামপাল শহরে ১৩২০ মেগাওয়াটের বিশাল আকারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা থেকে।

ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। সরকার জোর দিয়ে বলছে, সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য দেশের অন্যতম দরিদ্র এলাকায় কেন্দ্রটি স্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু বিরোধীরা এর জবাবে বলছে, প্রতিবেশগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটির এত কাছে কয়লাভিত্তিক প্লান্ট স্থাপনের ফলে শুশুক থেকে শুরু করে কিংবদন্তিপ্রতীম রয়েল বেঙ্গল টাইগরসহ বিপুল বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণীর আশ্রম হিসেবে বিরাজমান নদীনালা ও উদ্ভিদরাজি ধ্বংস হয়ে যাবে। বাংলাদেশের নিচু এবং বন্যাপ্রবণ ওই এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনটি প্রাকৃতিক রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করে। এই বনটি না থাকলে প্রতিকূল আবহাওয়ায় এই এলাকার মানুষ আরো বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।

সুস্থ কোনো মানুষ এই প্রকল্পটির ব্যাপারে একমত হতে পারে না,’ বললেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার এবং নবগঠিত জাতীয় রক্ষা কমিটির সদস্য কল্লোল মোস্তফা।

এই প্রকল্পের বিরুদ্ধবাদীরা তাদের যুক্তির সপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েতে ১৯৭৯ সালে নির্মিত একই আকারের কয়লাভিত্তিক একটি প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরেন। তখনো কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছিল যে প্রকল্পটি স্থানীয় কৃষি উৎপাদনের ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। কর্তৃপক্ষের আশ্বাস ছিল ভুল। ২০১০ সালে বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্লান্টটি থেকে প্রতি বছর নিঃসৃত ৩০ হাজার টন সালফার ডাইঅক্সাইডের কারণে ওই এলাকার গাছপালা মরে সাবাড় হয়ে যাচ্ছে। এরপর প্রকল্পটির বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে ওঠে। প্রবল চাপের কারণে টেক্সাস বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ প্লান্টটি বন্ধ করে দিতে পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে রামপালের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বছরে ৫২ হাজার টন সালফার ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করবে বলে হিসাব করা হয়েছে।

জানুয়ারিতে প্রকাশিত সরকার পরিচালিত সমীক্ষা প্রতিবেদনে সম্ভাব্য নিঃসরণে সাধারণভাবে কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে দৃশ্যত সালফার ডাইঅক্সাইডের নিঃসরণ মাত্রা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য ওই প্রতিবেদনে রামপালকে প্রতিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বদলে ‘আবাসিক ও গ্রামীণ’ এলাকা হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা হয়। সমালোচকেরা বলছেন, এই প্রকল্পের ব্যাপারে অনেক মৌলিক প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে কে লাভবান হবে কিংবা দূষণ হ্রাসের লক্ষ্যে বর্জ্য ও পানি শোধন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা দেখা যাচ্ছে না।

তাছাড়া, ভারত তার নিজ দেশে এই পরিবেশগতভাবে ক্ষতিকর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করতে ব্যর্থ হওয়ার পর বাংলাদেশে চালান করার আগ্রহ প্রকাশ করাতেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কঠোরতর বাধ্যবাধতকাপূর্ণ আইনি প্রতিবন্ধকতা এবং ব্যাপকতর বিক্ষোভের মুখে গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে দুটি বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ভারত সরকারের প্রয়াস বাতিল হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মোশাহিদা সুলতানা রিতু বলেন, ‘এটা ভণ্ডামি। নিজের দেশে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন অন্যান্য দেশের আইন লঙ্ঘন করছে।’

তবে এর বিরোধিতা করে রামপাল প্রকল্পের প্রথম পরিচালক এবং বর্তমানে সরকারি পরামর্শক হিসেবে কর্মরত আজিজুর রহমান রাজনৈতিক কারণে জাতীয় আইন অগ্রাহ্য করা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ ওঠেছে, তা উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, তেল ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ অনেক বেশি। তাছাড়া ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কয়লার কোনো বিকল্প নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আর এই প্রকল্প নির্মাণে বাইরের কোনো চাপ নেই। ভারত সরকার তার দেশের নিয়মনীতি অনুসরণ করছে, আর আমরা অনুসরণ করছি আমাদের নীতিমালা। বিশেষজ্ঞদের একটি টিম পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষানিরীক্ষা করে এই প্রকল্প অনুমোদন করেছে। যে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করলেই ওই টিমের প্রতিবেদন এবং সমঝোতা স্মারকের শর্তাবলী পেতে পারে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানদণ্ড অনুসরণ করে আমরা অবশ্যই সব ধরনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ করব।’

তবে বাংলাদেশের ঢিলেঢালা পরিবেশগত রেকর্ডের ফলে সংশয় সৃষ্টির প্রচুর অবকাশ রয়েছে। ঢাকাভিত্তিক মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, নির্বিচারে জাহাজ চলাচলের কারণে সুন্দরবনের জলজ প্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। তাছাড়া জলাবদ্ধতা, চিংড়ি চাষ এবং মানুষের অন্যান্য জবরদখলমূলক কার্যক্রমের ফলে গত এক দশকে বনের আয়তন প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর হ্রাস পেয়েছে। অধিকন্তু সরকার সুন্দরবনের পূর্বদিকের নদীতে শিপব্রেকিং ইয়ার্ড অনুমোদন করেছে। এর মাধ্যমে সরকার কার্যকরভাবে শিল্প প্রকল্পের মাধ্যমে বনের সীমানারেখা টেনে দিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে কঠিন পরিস্থিতির আশঙ্কা ব্যক্ত করে পরিবেশবাদীরা চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকার দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন। তারা বলছেন, চট্টগ্রামে সুপারট্যাংকারগুলো থেকে নিঃসরিত বিষ স্থানীয় জনসমাজকে দূষিত করে তুলছে।

বিপদ সম্পর্কে জনসচেতনা সৃষ্টি করতে চলতি সপ্তাহে বিক্ষোভকারীরা ঢাকা থেকে রামপাল পর্যন্ত ৪০০ কিলোমিটার লংমার্চের আয়োজন করে। আবদুল্লাহ আবু দাইয়ান মনে করেন, এলোমেলোভাবে উন্নয়নশীল একটি দেশের প্রতিরক্ষা বাধ এবং পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে সুন্দরবনের গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণভাবে অনেকের মধ্যেই জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এই পরিবেশ সংরক্ষণবাদীর চাচা ১৯৭০এর দশকে প্রথম সুন্দরবন পর্যটন কোম্পানি গঠন করেছিলেন। বর্তমানে এই পর্যটন ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সত্যিকারের বন বলতে যদি কিছু থাকে তবে সেটা কেবল এই এক চিলতে ভূমিই। এটাও যদি চলে যায়, তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবেশের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হবো। কারণ আমরা যা স্পর্শ করতে পারি, অনুভব করতে পারি এবং ভালোবাসতে পারি, সেটা সম্পর্কেই কেবল ভাবি।।

১টি মন্তব্য

  1. এখনি সময় রুখে দাড়ানোর