Home » অর্থনীতি » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

বন্ধুত্ব, যোগসাজশ আর চক্রান্তের কোনো শেষ নেই

ফারুক চৌধুরী

oil-goldমবুতুর পরে ক্ষমতায় বসানো হলো লরেন্ট কাবিলাকে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একনিষ্ঠ অনুগত মিত্র। কালিবা প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ১৯৯২ সালে একজন প্রতিনিধি পাঠালেন কানাডার টরেন্টোতে : উদ্দেশ্য বিনিয়োগ সুযোগ নিয়ে খনি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা। কাবিলার বাহিনী গোমা দখলের পর পরই ১৯৯৭ সালে আমেরিকান মিনারাল ফিল্ডস (এএমএফ) নামের কোম্পানি কাবিলার সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। এ এলাকায় দস্তা, তামা ও কোবাল্ট খনিগুলো থেকে খনিজ সম্পদ আহরণের একচেটিয়া অধিকার দেয়া হয় এএমএফকে। এ কোম্পানির প্রধান ছিলেন মাইক ম্যাকমরো। মাইক আবার যুক্তরাষ্ট্রের এর সময়ের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বন্ধু। আর এ চুক্তি সম্পাদনে কাবিলার পক্ষে আলোচনা করেছিলেন কঙ্গোর যে লোকটি, তিনি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এসব তথ্য পরিবেশিত হয়েছে আগেই উল্লেখ করা এ গেম এজ ওল্ড এজ আম্পায়ার বইতে।

ঘটনা, সম্পদ লুটের ঘটনাগুলো খেয়াল করে দেখলে এভাবে বন্ধুত্ব, যোগসাজশ ইত্যাদি চোখে পড়ে। হানাহানি, হামলা, যুদ্ধ চলতে থাকল। এ সবে সামনাসামনি জড়িয়ে থাকল উগান্ডা, রুয়ান্ডা প্রভৃতি দেশ, আড়ালে রইল বহুজাতিক করপোরেশন (বক), আর বকদের আশ্রয় দেয়া রাষ্ট্র শক্তিগুলো। উগান্ডা ও রুয়ান্ডা চেয়েছে স্ব স্ব দেশের সীমান্ত বরাবর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে। কাবিলা গোটা দেশ নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছেন। উপরে উল্লেখিত বইতে বলা হয়েছে, কাবিলার সেনাবাহিনী ও বিরোধী কোঙ্গোলিজ র‌্যালি ফর ডেমোক্র্যাসি নামের বাহিনীকে, দু’পক্ষকেই মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে সংঘাত বেড়েছে। দেশটির অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। ফলে বিদেশী প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করার জন্যই সবাই মিলে চেষ্টা চালিয়েছে দেশটিকে স্থিতিহীন রাখার।

রুয়ান্ডা ও উগান্ডার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, রুয়ান্ডার সৈন্যদের ও বিদ্রোহী সশস্ত্র দলগুলোকে যুদ্ধের নানা কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো সেনারা। রুয়ান্ডা কঙ্গোতে সেনাবাহিনী পাঠানোর আগে রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট সফর করেছিলেন পেন্টাগন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দফতর। এমনকি এ সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে যে, সরকারি ভাবে ঘোষণা দিয়ে রুয়ান্ডা কঙ্গোয় অভিযান শুরু করার আগেই ১৯৯৮ সালের ২৩ ও ২৪ জুলাই কঙ্গোতে ঢুকে পড়া রুয়ান্ডার সৈন্যদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের দেখা গেছে। আগে উল্লিখিত এ গেম এজ ওল্ড এজ আম্পায়ার বইতে এসব তথ্য রয়েছে।

এদিকে, কঙ্গোরুয়ান্ডা সীমান্তে রুয়ান্ডার সামরিক ঘাটি তৈরি করে দেয় সামরিক বিষয়ে ঠিকাদার কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুট নামে কোম্পানি। এটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কোম্পানি হ্যালিবার্টনের সাবসিডিয়ারি। এ ঘাটিতে রুয়ান্ডার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। আবার উপগ্রহের মাধ্যমে সংগ্রহ করা মানচিত্র ও ছবি কাবিলাকে যোগান দেয়, বেকটেল করপোরেশন। এগুলো কাবিলাকে দেয়া হতো যাতে মবুতুর সৈন্যদের চলাচলের হালনাগাদ খবর ও অবস্থান কাবিলা জানতে পারেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কোম্পানি বেকটেলয়ের পরিচালকমন্ডলীতে বা প্রধান পদে যারা আছেন এবং ছিলেন, তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছেন। এদের মধ্যে জর্জ শুলজ, কাসপার ওয়েইনবার্গার প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি এক সময়ে ছিলেন হ্যালিবার্টনের প্রধান। কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুটয়ের মালিক আবার হেলিবার্টন। কেইথ হারমান স্নো দ্য ওয়ার দ্যাট ডিড নট মেক দা হেডলাইনস : ওভার ফাইভ মিলিয়ন ডেড ইন কঙ্গো শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, মানবাধিকার বিষয়ে দলনিরপেক্ষ একজন তদন্তকারী দেখেছেন যে, মিলিটারি প্রফেশনাল রিসোর্সেস ইনকরপোরেটেড এবং কেলগ, ব্রাউন অ্যান্ড রুট নামে ব্যক্তি মালিকানাধীন সামরিক কোম্পানি দুটির সঙ্গে পেন্টাগনের সম্পর্ক রয়েছে।

এবার লুটের ছোট্ট একটি উদাহরণ দেয়া যাক। উগান্ডার প্রেসিডেন্ট মুসোভেনি। তার ভাই সলিম সালেহ। তিনি তিনটি বিমান ইজারা দিলেন উগান্ডার সামরিক বাহিনীকে। এ বিমানগুলো কঙ্গোতে সৈন্য ও সামগ্রী সরবরাহের কাজে লাগানো হলো। উগান্ডার সেনা কর্তাবৃন্দ, কঙ্গোর বিদ্রোহী গ্রুপগুলো ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগসাজশে সালেহ নিশ্চিত করলেন যে, ফেরত পথে বিমানগুলো যেন বোঝাই থাকে সোনা, কাঠ, কফি দিয়ে।

আরেকটি তথ্য উল্লেখ করা যাক। পাশ্চাত্যের বিশাল খনি কোম্পানি বারিক গোল্ড করপোরেশন। এটি কানাডীয় কোম্পানি কঙ্গোর খনি সম্পদে এ কোম্পানির রয়েছে বিপুল বিনিয়োগ। এ কোম্পানির পরিচালকমন্ডলীর পরিচয়? কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মুলরোনে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের উপদেষ্টা বার্নন জর্ডান। এ কোম্পানির উপদেষ্টাদের একজন হচ্ছে জর্জ হার্বার্ট ওয়াকার বুশ, যাকে সংক্ষেপে জর্জ ডব্লু বুশ বা জর্জ বুশ নামে পৃথিবীর মানুষ চেনেন।।

(চলবে…)