Home » প্রচ্ছদ কথা » প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের হুমকি – ক্ষমতাসীনরা যখন রাষ্ট্রের চেয়েও ক্ষমতাবান

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের হুমকি – ক্ষমতাসীনরা যখন রাষ্ট্রের চেয়েও ক্ষমতাবান

আমীর খসরু

আমাদের নিজেদের পর্যবেক্ষণ এরূপ সাক্ষ্য দেয় যে, প্রত্যেকটি রাষ্ট্র হচ্ছে কোন উত্তম উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মানুষের সমবায়ে গঠিত একটি সংস্থা।।

এ্যারিস্টটল, (পলিটিকস্ প্রথম পুস্তক প্রথম অধ্যায়)

common-peopleরাষ্ট্রের গঠন, উদ্দেশ্যে এবং জনগণের কল্যাণে কার্যক্রমসহ এ যাবতীয় বিষয় নিয়ে কয়েক হাজার বছর ধরে চিন্তাবিদ, দার্শনিক আর রাষ্ট্র নায়করা বিস্তর চিন্তাভাবনা করেছেন, ব্যাপৃত থেকেছেন এই ব্যবস্থাটির আরো উন্নয়নের। কিন্তু একটি সত্যই বেরিয়ে এসেছে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্র যদি কতিপয়ের বা এককের না হয়ে জনগণের কল্যাণার্থে হয় তাহলে রাষ্ট্রটি সত্যিকার অর্থেই ‘উত্তম সাধনের’ জন্য মানুষের সমন্বয়ে গঠিত একটি সর্বোচ্চ সংস্থা। পরবর্তীকালে মেকিয়াভেলী থেকে শুরু করে জ্যঁ জ্যঁ রুশো পর্যন্ত সবাই রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে আরেক দফা চিন্তাভাবনা করেন। শেষমেষ রুশোর তত্ত্বের (দ্য সোসাল কন্ট্রাক্ট) গুঢ় কথা মানুষ এবং রাষ্ট্রের মধ্যে যে সামাজিক চুক্তি হবে যাতে ব্যক্তি তার আপন আপন স্বাধীনতা একক ও যথেচ্ছভাবে প্রয়োগ না করে একটি সংঘবদ্ধ শক্তির (যাকে রাষ্ট্র বলা হয়েছে) কাছে হস্তান্তর করা হয় তাহলে সে সংস্থাই ব্যক্তির সামগ্রিক অধিকার, স্বাধীনতা, চাহিদা নিশ্চিত করবে। রুশো এও বলেছেন, স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার, কিন্তু তবুও সর্বত্রই সে শৃংখলিত। আবার আরো পরে চিন্তাবিদ, দার্শনিকরা এও বলেছেন যে, রাষ্ট্র হচ্ছে নিপীড়নের যন্ত্র। নিপীড়নের যন্ত্র হয়েছে এ কারণে যে, জনগণ তার আপন অধিকার হস্তান্তর করেছে ঠিকই বা তাদের অধিকার ওই ব্যবস্থাটি কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু ওই জনগণের ওপরই নিপীড়ননির্যাতন, অত্যাচার এবং অধিকার বঞ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করা হয়।

রাষ্ট্র একটি সংঘবদ্ধ সংস্থা এবং তার কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য এর ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে সরকার। রাষ্ট্রটি পরিচালনার জন্য আইনসভা, বিচার বিভাগও রয়েছে। তবে রাষ্ট্রটি পুরো মাত্রায় প্রজাতন্ত্র। অর্থাৎ জনগণই ক্ষমতার মূল শক্তি।

কিন্তু বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটিতে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে শাসকদের মধ্যে শুধু এমন চিন্তাই কাজ করেছে যে, রাষ্ট্র তাদের, জনগণের কোনো অংশীদারিত্বই নেই। আর এ কারণেই স্বাধীনতার পর থেকে এমন স্বৈরতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিবাদী চিন্তা শাসকদের মাথার মধ্যে ভন ভন করে ঘুরছে যে, ‘আমিই রাষ্ট্র, আমিই সরকার, আমিই দল, আমিই সার্বভৌম।” আর এর মাধ্যমে তাদের চিন্তা জগতে যে বৈকল্য এবং মনস্তাত্বিক জটিলতা কাজ করছে তারই বহিঃপ্রকাশ স্বাধীনতার পরেও দেখা গেছে, এরপরে এবং বর্তমানেও ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। যার সবশেষ বহিঃপ্রকাশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের এই বলে হুমকি দিয়েছেন যে, “সরকারের কর্মকর্তা যারা আছেন, তাদের আমাদের কথা অনুযায়ী চলতে হবে। যারা নির্দেশ মানবে না তাদের কপালে দুঃখ আছে। তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হবে।” মোহাম্মদ নাসিম যে কথাটি নতুন বলেছেন তা নয়, এ রকমটি প্রায়শই ক্ষমতাসীনদের মুখ থেকে শোনা যায়।

প্রশাসন গঠিত হয়েছে শত শত বছরের নানা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যদিয়ে। আর এটা উত্তম বলে প্রমাণিত হয়েছে যে, যে কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনে প্রশাসন তাই জনগণের। কিন্তু কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ইচ্ছাধীন নয়। অবশ্য নিয়ম অনুসারে এমনটাই সভ্য দুনিয়ায় চলে এসেছে। নিয়ম না মানলে ওই যে হুমকিধামকি এ রকমটা শোনা যাবেই। আমরা শুনতে থাকবো এসব ভয়ঙ্কর হুশিয়ারি।

বর্তমান ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধানের এমন মাত্রায় দোহাই দিচ্ছেন যে, এখন বোধ করি তারা না হলেও জনগণই ক্লান্ত, অবসন্ন, বিসন্ন, উৎকণ্ঠিত, শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অথচ এই সংবিধানেরই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ২১ () অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে সকল সময় জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’

সংবিধানের ১৫২ () অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মচারী বলতে কি বোঝায় তার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘সরকারি কর্মচারী’ অর্থ প্রজাতন্ত্রের কর্মে বেতনাদিযুক্ত পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত কোনো ব্যক্তি;

সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদেও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী সম্পর্কে বলা হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের কর্মকর্তাকর্মচারীদের জন্য যে বিধিবিধান রয়েছে তাতে তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী কোনো ব্যক্তি বা ক্ষমতাসীন দলের কর্মচারী বা আজ্ঞাবহ কেউ নন। কাজেই এ ধরনের হুঙ্কার এবং হুমকি চরম স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবস্থা যে বিদ্যমান সে ধারণাই স্পষ্ট করে দেয়।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শুধু প্রশাসন নয়, সামগ্রিকভাবে প্রশাসন বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের যেভাবে যথেচ্ছভাবে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং করছে তা শুধু অনাকাক্সিক্ষতই নয় কল্পনাতীতও। বেসামরিক প্রশাসন নিয়ে কি হচ্ছে, তাদের কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা সবারই জানা। পুলিশর‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তারা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে।

১৯৯৬ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধানে, আহ্বানে ‘সরকারি কর্মচারী কোনো সরকারের কর্মচারী নয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ বলে জনতার মঞ্চ তৈরি করেছিল। আর এটার যিনি প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি এখন মন্ত্রী। তিনি এখন সরকারি কর্মচারী আর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর পার্থক্যের বোধ বুদ্ধিটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন ক্ষমতার মোহে। তিনি এখন সে দিনের কথা মনেও করতে চান না। সেদিন রাজপথে নেমে, একটি রাজনৈতিক দলকে প্রত্যক্ষ সমর্থন দিয়ে এদেশের প্রশাসনের যে চরম ও সীমাহীন ক্ষতি করা হয়েছিল সেই ক্ষতির ক্ষত তো শুকাইনি বরং দিনে দিনে তা ব্যাপক বিস্তারি রোগে রূপ নিয়েছে। এটা ভবিষ্যতে কোনো সরকার আসলেও থামবে এমনটা হলফ করে বলার কোনো উপায় নেই। প্রধানমন্ত্রীও এখন বলছেন, প্রশাসনকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই দায়িত্ব পালন জিনিসটি কি তা ক্ষমতাসীনদের কথায় স্পষ্ট হয়ে যায়। আর এই যথাযথ দায়িত্ব পালন করানোর জন্য সব প্রশাসনেই একজন করে উপদেষ্টা বসিয়ে দেয়া হয়েছে। বেসামরিক প্রশাসনে ওএসডির সংখ্যা রেকর্ড ছুঁয়েছে, পদোন্নতি বাধ্যতামূলক অবসর কতো কিছুই না হচ্ছে। অথচ নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগই বলেছিল এর ৬ দফা দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ এবং পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে। পুলিশ প্রশাসন সম্পর্কে বলা হয়েছিল এর ৭ দফা জনজীবনের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। কিন্তু অতিশয় দুর্ভাগ্যের ব্যাপার এই প্রতিশ্রুতি কেন কোনো প্রতিশ্রুতিই মানা হয়নি।

ক্ষমতার স্বার্থে ক্ষমতাসীনদের কারণে সংবিধানের এখন দ্বৈত প্রয়োগ হচ্ছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বলা হচ্ছে, সংবিধান মেনে নিলেই নির্বাচন হবে। পঞ্চদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাদ দিয়ে যে সংবিধান, তাকে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিষয়ে সংবিধানে যা বলা হয়েছে তা কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আসেনি। ১৯৭২এর মূল সংবিধানেই ছিল এর প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদ। তাহলে এটা মানা হচ্ছে না কেন?

এটা তাদের জন্য নতুন কোনো সংস্কৃতি নয়। স্বাধীনতার পরে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েমের পরে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওই দলে যোগ দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। সেদিনের ক্ষতিও কি এখন পর্যন্ত কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়েছে।

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিজস্ব নিয়মকানুন আইন অনুযায়ী তারা তাদের কর্ম সম্পাদন করবেন এটাই হচ্ছে নিয়ম। কিন্তু তাতে বাধা দিলে মামলারও বিধান আছে। দন্ডবিধির ১৮৬ ধারায় বলা হয়েছে সরকারি কর্মচারীর সরকারি কার্য সম্পাদনে বাধা দান : যদি কোন ব্যক্তি কোন সরকারি কর্মচারীর সরকারি কর্তব্যকার্য সম্পাদনে ইচ্ছাপূর্বক বাধাদান করে, তাহা হইলে সেই ব্যক্তি তিন মাস পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ডে কিংবা পাঁচশত টাকা পর্যন্ত যেকোন পরিমাণ অর্থদণ্ডে কিংবা এতদুভয় দন্ডেই দন্ডিত হইবে। ওই দন্ডবিধিরই ১৮৯ ধারায় বলা হয়েছে সরকারি কর্মচারীর প্রতি ক্ষতিসাধনের হুমকি : কোন সরকারি কর্মচারী হিসাবে তাহার সরকারি কর্তব্য সম্পাদনের সহিত সংশ্লিষ্ট কোনো কার্য করিতে প্রবৃত্ত করিবার উদ্দেশ্যে, কিংবা কোন কার্য করা হইতে বিরত হইবার বা করিতে বিলম্ব করিবার জন্য বাধ্য করিবার উদ্দেশ্যে, যদি কোন ব্যক্তি উক্ত সরকারি কর্মচারীকে কিংবা অপর যে ব্যক্তির সহিত উক্ত সরকারি কর্মচারীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট, সেই অপর ব্যক্তিকে ক্ষতিসাধনের হুমকি প্রদর্শন করে, তাহা হইলে সেই ব্যক্তি দুই বৎসর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম কারাদন্ডে কিংবা অর্থদন্ডে কিংবা এতদুভয় দন্ডেই দন্ডিত হইবে।

কিন্তু যারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের হুমকিধামকি দেন তাদের তো কিছুই হবে না। কারণ এর আগেরবারেও ক্ষমতায় আসার পরে পুরো সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় এবং ডঃ কামাল হোসেনের বাড়িতে বস্তি বসিয়ে, লাঠি মিছিল করে যে তাণ্ডব সৃষ্টি করেছিল তখন তাদের তো কিছু হয়নি। কারণ এরা সনদপ্রাপ্ত দায়মুক্তিধারী।

আর ক্ষমতাসীনদের কিছুই হয় না এ রকম একটা পরিবেশে। স্বৈরশাসনের চরম পর্যায়ে পৌছালে প্রথমে দল, সরকার ও রাষ্ট্রকে তারা একাকার করে ফেলে। রাষ্ট্র, সরকার, দল ও ব্যক্তি যে আলাদা আলাদা সত্ত্বা তা বোঝার এতটুকু হিতাহিত জ্ঞান পর্যন্ত তাদের থাকে না। শেষে ব্যক্তি আর কতিপয় নিজেদের রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি ক্ষমতাশালী, শক্তিশালী ও বড় বলে মনে করতে থাকে। যেমনটি হয়েছিল স্বাধীনতার পরে। বর্তমানও তার ব্যতিক্রম নয়।।