Home » আন্তর্জাতিক » মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ৩)

মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ৩)

আইজাজ আহমদ

স্বেচ্ছাচারী, একনায়কতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইতিহাসে বৃহত্তম নগর বিক্ষোভ

egypt-3মুরসির দল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট সংগ্রহ করতে পেরেছেএই কারণে তিনি মিশরের প্রেসিডেন্ট হননি, কিংবা মোবারকপন্থীদের ক্ষমতা দখল ঠেকাতে অন্যান্য রাজনৈতিক দল তাকে ভোট দিয়েছিল কেবল সেই কারণেও নয়। বরং তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার মূল কারণ ছিল তিনি সেনাবাহিনী এবং সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে আপস করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট সবার জন্য তাকে দিয়ে সরকার গঠন করা এবং গণআন্দোলনকে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার প্রতি মোহাবিষ্টে আবিষ্ট করা সহজ ছিল। গণআন্দোলনটির স্থানীয়করণ ছিল প্রকৃত বিষয়। মুরসি কিভাবে তার ওপর ন্যস্ত প্রধান কাজটি করলেন বা কিভাবে কাজটি সমাধা করতে ব্যর্থ হলেন? মূলত তিনি তার কট্টর ইখওয়ানিদের ছাড়া বাকি সবাইকে আলাদা করে ফেলেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি তার সব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন এবং নিজের পতনের রাস্তা তৈরি করেন।

ইখওয়ান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা স্বতন্ত্র সদস্যদের জন্য নির্ধারিত আসনগুলোতে প্রার্থী দেবে না। কিন্তু তারা ওইসব আসনে প্রার্থী দিয়েছিল এবং সেখানে থেকে কয়েকটিতে জয়ীও হয়েছিল। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সংবিধান রচনার জন্য কাজ করবে। কিন্তু এর বদলে তারা শ্রমিক, নারী, কপ্টিক সংখ্যালঘু এবং গণআন্দোলনের অন্যান্য উপাদানসহ অন্যদের বাদ দিয়ে কেবল নিজস্ব লোক দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। তারা যে সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, সেটা ছিল কেবল তাদের চাহিদার উপর ভিত্তি করে এবং সেটা পাস হয়েছিল মাত্র ৩০ শতাংশ লোকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে। সত্যিকার অর্থে মোট ভোটারের মাত্র এক চতুর্থাংশ ওই সংবিধানের পক্ষে রায় দিয়েছিল। সংবিধান প্রণয়ন কমিটি থেকে দুই ডজন সদস্যের পদত্যাগ করার বিষয়টিকে তিনি পাত্তা দেননি, বরং এটাকে সুযোগ মনে করে তিনি আরো কঠোর ইসলামি সংবিধান প্রণয়ন করলেন। বিচার বিভাগও এই গণভোট তদারকির কাজটি করতে অস্বীকার করেছিল। ফলে এই সংবিধান হয়ে পড়েছিল আইনগতভাবে অবৈধ। সেনাবাহিনীর বিশেষ অধিকারও সংরক্ষিত থাকে। সাধারণ মানুষের বিপুল অংশ এইসব সুবিধা প্রদানের পক্ষে ছিল না। তারা এতে ক্রুদ্ধ হয়।

তারপর মুরসি আলংকারিক উচ্চকক্ষকে প্রকৃত পার্লামেন্ট ঘোষণা করে নিজের জন্য একটি আইন পরিষদ উদ্ভাবন করলেন। তিনি নিজেই এর বেশির ভাগ সদস্যকে নিয়োগ দেন, বস্তুত এদের মাত্র সাত শতাংশ ছিলেন নির্বাচিত। তিনি বিচারকদের অবসরগ্রহণের বয়স কমিয়ে বিপুলসংখ্যক বিচারপতিকে অবসর দেন এবং বিচার বিভাগে তার নিজস্ব লোক নিয়োগ করেন। কপ্টিক স্কুলশিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগ আনেন, গণআন্দোলনের প্রখ্যাত সদস্যদের অন্তর্ঘাতমূলক কাজে অভিযুক্ত করেন। তিনি জানতেন যে ইখওয়ান রাজনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু এবং তিনি অন্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু তবুও তিনি তাকে ভোট প্রদানকারী ভিন্ন মতালম্বীদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের কাজে অগ্রসর না হয়ে প্রায় পুরোপুরি ইখওয়ান সদস্যদের থেকে মন্ত্রী নিয়োগ করেন। তিনি সাধারণ মানুষের অনুকূল অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের প্রচণ্ড গণদাবি এড়িয়ে সরকারি ব্যয় কমিয়ে দেন, জাতীয় অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক অংশজুড়ে বিস্তৃত সরকারি খাত হ্রাস করেন। চাকরি সৃষ্টিকারী সমন্বিত নীতিও অনুসরণ করেননি। বরং ‘কৃচ্ছ সাধন’ নীতি গ্রহণ করে আইএমএফকে খুশি করার চেষ্টা করেন। ২০১২ সালের নভেম্বরে মুরসি আকস্মিকভাবে নিজের জন্য সর্বোচ্চ আইনসভা কর্তৃত্ব ধারণ করার কথা ঘোষণা করে জানালেন, তার নির্বাহী ডিক্রি চ্যালেঞ্জ করার কোনো এখতিয়ার বিচার বিভাগের নেই। তারপর একই রকম আকস্মিকভাবে তিনি ডজন খানেক প্রাদেশিক গভর্নর নিয়োগ করেন। এদের বেশির ভাগই ছিলেন ইখওয়ান বা সালাফিপন্থী। এদের একজন ছিলেন সত্যিকার অর্থে জিহাদি সংগঠন আলগামা আল ইসলামিয়ার সদস্য।

এ ধরনের স্বেচ্ছাচারী, একনায়কতান্ত্রিক পদক্ষেপের তালিকা বেশ দীর্ঘ। সংক্ষেপে বলা যায়, মুরসি এমনভাবে কাজ করতে থাকেন যে মনে হতে থাকে মিশরকে ইখওয়ানের নেতৃত্বে প্রায় ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রে পরিণত করার সর্বাত্মক ম্যান্ডেট তিনি পেয়ে গেছেন। জুয়ান কোল সঠিকভাবেই মুরসির কার্যক্রমকে ‘হামাগুড়ি দিয়ে আসা অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্তর্বর্তী সেনাশাসন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কালে কিংবা মুরসির আমলেকোনো সময়েই ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা সত্যিকার অর্থে গতি হারায়নি। মুরসির দৌরাত্ম্য যত বাড়ছিল, তার বিরুদ্ধে জোট তত বড় হওয়া শুরু করছিল। গণবিক্ষোভ পঞ্জিভূত হওয়ার পাশাপাশি এলিট রাজনীতিবিদদের মধ্যেও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছিল। মুরসির মধ্যে ঔদ্ধত্য ও অযোগ্যতার বিশেষ সম্মিলন এবং ইখওয়ানের প্রাধান্য নিশ্চিত করা এবং একদলীয় শাসন কায়েমের এক দফা এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীতি গ্রহণের ফলে সমাজের অন্য সব শক্তি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নজিরবিহীন সুযোগ পায়। মোবারকপন্থী ও নাসেরপন্থী, এপ্রিল ৬ আন্দোলন, সালাফিপন্থী নূর পার্টি, বিভিন্ন যুব গ্রুপ, কপ্টিক চার্চ এবং বিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, বিপুলসংখ্যক লিবারেল এলিট এবং ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো মুরসির বিরুদ্ধে এবং আরো বিশেষভাবে ইখওয়ানের বিরুদ্ধে জোট পাকায়।

প্রায় ছয় মাস ধরে অব্যাহত বিক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং ধর্মঘটের পর ৩০ জুনের মহা গণআন্দোলন ফেটে পড়ে। এর নাম দেওয়া হয় ‘তামারুদ’ (আক্ষরিক অর্থ বিদ্রোহ। অবশ্য ইংরেজি মিডিয়ায় প্রায়ই একে বলে বিদ্রোহী।)। ১ মে এটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সংগঠনটি মুরসির বিরুদ্ধে গণসাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শুরু করে। ৩০ জুনের গণসমাবেশ আয়োজনের পেছনে কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল ইখওয়ানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সব রাজনৈতিক শক্তি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৬ এপ্রিল আন্দোলন তার দেশব্যাপী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তামারুদের জন্য ২০ লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিল।

সব ধরনের ব্যক্তিত্বই জড়ো হলেন। তামারুদ ১৬ মিলিয়ন লোক সমবেত হবে বলে জানিয়েছিল। সমাবেশের পর ঘোষণা করা হলো, ৩৩ মিলিয়ন লোক জড়ো হয়েছে, যা মিশরের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ। আর ২০ মিলিয়ন লোক স্বাক্ষর করে মুরসিকে পদত্যাগ, শূরা কাউন্সিল ভেঙে দেওয়া এবং সংশোধিত সংবিধান প্রণয়ন ও নতুন পার্লামেন্টারি নির্বাচন আয়োজনের জন্য সাংবিধানিক আদালতের প্রধানকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট করার আহ্বান জানিয়েছিল। সত্যিকার অর্থে কতজন ৩০ জুনের সমাবেশে যোগ দিয়েছিল কিংবা কতজন স্বাক্ষর করেছিল তা যাচাই করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ঘোষিত সংখ্যাটি নিশ্চিতভাবেই অতিরঞ্জিত ছিল। তবে সংখ্যাটি যদি অর্ধেকও হয় (এক দিনে ১৬ মিলিয়ন লোকও সমবেত হয়) তবুও বলা যায়, ৩০ জুনের আন্দোলনটি ইতিহাসে বৃহত্তম নগর বিক্ষোভ।

এমনকি মুরসির জনপ্রিয়তায়ও ধস নামে, তার দায়িত্ব গ্রহণের সময়ের ৬০ ভাগ থেকে এক বছর পর নেমে আসে মাত্র ১৯ ভাগে। এমনকি বিক্ষোভ বাড়তে থাকায় জুন মাসে দেশটি অচল হয়ে পড়তে থাকলেও মুরসি ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব নিয়ে কথা বলতে থাকেন, আপোসরফামূলক বক্তব্য প্রদান করতে ব্যর্থ হন। ২৩ জুন সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আলসিসি মুরসিকে জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে সঙ্কটটির সমাধান করতে হবে। মুরসি ছোটখাট ছাড় দেওয়ার কথা বলেন। ওই সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পর ৩০ জুন এলো। আলসিসি তখন ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিলেন। খেলা শেষ হয়ে গেল।

সামরিক অভ্যুত্থানের পর আলসিসি এবং তার লোকেরা যে ‘রোডম্যাপ’ ঘোষণা করলেন, তা পুরোপুরি তামারুদের দাবিনামার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে বোঝা যায়, আরো আগেই ইখওয়ানের ক্রমবর্ধমান একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অভ্যুত্থানের ব্যাপারেও তাদের মধ্যে ভিন্নতা ছিল না। সৌদি আরব অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নতুন জান্তাকে স্বীকৃতি দেয়। এই সরকারকে সমর্থন জোগাতে সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নগদ অর্থ, তেল, বিনিয়োগের আকারে ১৬ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজের কথা ঘোষণা করে। সৌদিরা এমনও ঘোষণা করে যে পাশ্চাত্যের দেশগুলো যদি মিশরে সাহায্য হ্রাস করে, তবে তারাই আরো সাহায্য দিয়ে সেটা পুষিয়ে দেবে।

ইসরাইল কূটনীতিক অভিযান শুরু করে, ওয়াশিংটনে ইসরাইলি লবি মিশরে মার্কিন সাহায্য স্পর্শ না করতে ওবামা প্রশাসনকে অনুরোধ করে। ওবামার ওই ধরনের কোনো ইচ্ছা ছিল তা কিন্তু নয়। জুনের শেষ সপ্তাহে কায়রোতে যখন অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি চলছিল, তখন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সৌদি আরবসহ কয়েকটি বিশেষ দেশ সফর করছিলেন। অভ্যুত্থানের পরপরই তার প্রতিক্রিয়া ছিল যে মিশরীয় সেনাবাহিনী ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিপুলসংখ্যক ইখওয়ান সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। রহস্যজনক এবং এখনো ব্যাখ্যাহীন ঘটনায় কাতারের আমির (এখনো সুস্থসবল রয়েছেন) তার কোমল স্বভাবী ছেলের অনুকূলে ক্ষমতা ত্যাগ করলেন। বলা হয়ে থাকে, সিআইএ তাকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তিনি ইখওয়ান এবং সিরিয়াসহ পশ্চিম এশিয়াজুড়ে জেহাদিদের সমর্থন দিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। বেশ ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে, এত দিন যে সাহায্য জেহাদিদের দিকে যেত, এখন তা হ্রাস পাবে এবং উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর অর্থ প্রধানত তথাকথিত ফ্রি সিরিয়ান আর্মির কাছে যাবে। পাশ্চত্যের অস্ত্র সাহায্যের ওপর নির্ভর করে থাকা এই ভুতুরে সংগঠনটি খুব সম্ভবত এখন থেকে জর্ডানের মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম চালাবে। এই অঞ্চলের একমাত্র প্রধান দেশ হিসেবে মিশরের সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তুরস্ক। ইখওয়ানের ‘উদার’ সংস্করণ দলের মাধ্যমে পরিচালিত তুরস্ক তার সেক্যুলার সেনাবাহিনীর প্রায় ৪০০ সদস্যকে কারারুদ্ধ করেছে। এরদোগানের জন্য সুখকর ব্যাপার হলো, এ ধরনের অভ্যুত্থান তুরস্কেও হতে পারেএই আশঙ্কায় দেশটির সব রাজনৈতিক দলও মিশরের অভ্যুত্থানের নিন্দা করেছে।।

(ভারতের প্রভাবশালী ফ্রন্টলাইন পত্রিকা থেকে ভাষান্তর)