Home » রাজনীতি » সড়ক সন্ত্রাসী ও মদদদাতাদের মৃত বিবেকের জন্য শোক প্রস্তাব

সড়ক সন্ত্রাসী ও মদদদাতাদের মৃত বিবেকের জন্য শোক প্রস্তাব

আবীর হাসান

nusratসে আর কোনোদিন মা বলে ডাকবে না। অজান্তে, অবচেতনে মা বলে ডাক দিলেও কেউ এসে দাঁড়াবে না সামনে। নুসরাত সামিয়া নামের পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশুটির জীবন থেকে হারিয়ে গেছে মমতার পৃথিবী। জীবন টেনে চলার সংগ্রামে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে কাছের অবলম্বনটি হারিয়ে ফেলেছে সে। হারিয়েছে তার চোখের সামনে। হারিয়েছে তার নিষ্ঠুর স্বদেশের ব্যতিব্যস্ত রাজধানীর বিশৃঙ্খল সড়কে। যারা এই বিশৃঙ্খলার হোতা তাদের কোনো টু শব্দটি নেই ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর বেশ ক’দিনই তো হলো কিন্তু কই রাষ্ট্রের কেউ সরকারের কেউ, রাজনীতির কেউ তো সমবেদনার কথাও বললেন না। বলবেনই বা কেন? তারা তো সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছেন সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কোন চালককেই আইনের কোনো কঠোরতার মধ্যে ফেলবেন না। নুসরাত হয়তো বড় হলে বুঝবে এই মহানগরীর সড়ক কেমন করে কেড়ে নিয়েছিল তার মমতাময়ী মাকে। মা হয়তো বুঝতেন রিকশার ডানদিকে বসা কতোটা বিপজ্জনক। তাই তিনি ডান দিকে বসে আদরের মেয়েটিকে বসিয়েছিলেন বাম পাশে। শান্তিনগর থেকে রায়েরবাগ বেশ লম্বা রাস্তাই, অর্ধেকটা গিয়েওছিলেন। কিন্তু বাকিটুকু আর যেতে পারেননি। কমলাপুরে আইসিসি ভবনের পাশে আসতেই আনন্দ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী মিনিবাস ঝড়ো গতিতে এসে রিকশাটাকে ধাক্কা মারে, ভেঙে যায় রিকশার ডান পাশের চাকা। ছিটকে পড়েন মা রোকসানা, মিনিবাসের চাকা তাকে পিশে ফেলে। বাঁদিকে থাকায় নুসরাত রাস্তায় ছিটকে পড়লেও বেঁচে যায়। মিনিবাস থামিয়ে রেখে চালক ও সহযোগী পালিয়ে যায়। মিনিবাসটি আটক করে পুলিশ।

ভিড় জমে গিয়েছিল রাস্তায়, ছোট্ট নুসরাত কাঁদছিল মা, মা বলে। এক সহৃদয় ব্যক্তি উদ্যোগ নেন স্বজনদের খুঁজে বের করার। ছোট্ট মেয়েটির কাছ থেকে তথ্য নিয়েই তিনি খুঁজে বের করতে সক্ষম হন স্বজনদের। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোকসানার স্বজনরা নুসরাতের বড় দুই ভাই চিৎকার করে কেঁদেছিল কিন্তু নুসরাত আর কাঁদেনি। ছোট্ট মেয়েটি ক্ষুদ্র বুকে পাশানই বেঁধেছে বোধ হয়। তার বাকহীন যন্ত্রণাকাতর মুখের ছবি আমরা পরদিন পত্রিকার পাতায় দেখেছি। পড়েছি পরবর্তী ফলোআপ নিউজও।

নুসরাত নিশ্চুপ। তার অবচেতন মন কি তাকে বলে দিয়েছে এই দেশে এই শহরে মৃত্যুর জন্য কেঁদে কোন লাভ নেই? হোক না সে আপন মায়ের মৃত্যু! সে কি এখনই বুঝে ফেলেছে নিষ্ঠুর বিবেকহীন এক দঙ্গলের পাল্লায় পড়েছে এদেশের মানুষ? সে কি আঁচ করে ফেলেছে অতিমাত্রায় নিরাপত্তাহীন তার মতো শিশুরাও? সে কি তাই মায়ের মৃত্যুর অল্পক্ষণ পর থেকেই নীরবে ছোট্ট বুকের মধ্যে যন্ত্রণা সওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে? তার সারা মুখে যে প্রতিবাদের ভাষা তা কি আমরা পড়তে পেরেছি?

আমরা এদেশের মানুষ কি প্রতিবাদ করতেও ভুলে গেছি? যেকোনো ঘটনা ঘটে গেলেই আমরা তাকে তুচ্ছ করে ফেলি কেন? মৃত্যুর ঘটনাকে তুচ্ছ করে নির্মোহ থাকা যে বিবেকহীন পশুত্বের নামাত্বর! যারা সড়ককে নিরাপত্তাহীন করে ফেলেছে তাদেরকে চিনেজেনেও কেন আমাদের কিছু বলার নেই? যারা ন্যায্য কথা বলে তাদের গলায় জুতোর মালা পরানোর প্ররোচনা যারা দেয় তাদেরকেও তো আমরা বিলক্ষণ চিনি। তারা কি বিধাতার চেয়েও ক্ষমতাধর যে, মানুষ হতাহত হলেও তার জন্য দায়ীদের বিচার থেকে অব্যহতি দেয়ার অন্যায় আবদার তুলতে পারে এবং তার পক্ষে আরো আইনের প্রয়োগ রহিত করার ষড়যন্ত্রও করতে পারে?

যানবাহন চালাতে গরুছাগল চিনতে পারার নসিহতকারী মন্ত্রী, যিনি একাই তিন মন্ত্রণালয়ের খবরদারি করেন তার উর্বর মস্তিস্ক থেকেই তো বেরিয়েছে এই দাবি যে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনার জন্য সরাসরি দন্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করা যাবে না। আগে ৩০৪ () ধারা মোতাবেক তদন্ত করে তারপর মামলা করা যাবে। এই সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে জানানোর পর প্রথম বেদনাতুর ঘটনাটি হলো নুসরাতের মায়ের মৃত্যু। কিন্তু তারপরেও দেখা যাচ্ছে মন্ত্রীগণ নীরব, সরকারের দায় নেই, রাষ্ট্র চোখে ছানি পড়া বুড়ো বিড়ালের ভূমিকা নিয়েছে। মিনিবাস চালককে যে খোঁজাই হবে না সেটা প্রায় অবধারিত। চালকের নামধাম, তার লাইসেন্স ছিল কিনা সে সব ব্যাপারও যাতে না জানাতে হয় সে চেষ্টাই করে যাবে আইনের প্রয়োগকারীরা। মিনিবাসটা আটক করা হয়েছে বটে কিন্তু এখন মালিককে প্রশ্রয় দিয়ে একটা আপসরফার চেষ্টা চলবে অবধারিভাবে। এ কেমন ‘আধুনিক’ রাষ্ট্রে জন্মেছে ভাগ্যহীনা নুসরাত!

আন্তর্জাতিক মান কি এখনো জানে এ দেশের কয়জন নীতিনির্ধারক ও মন্ত্রী? অথচ প্রতিনিয়ত মৃত্যু নিয়ে একি খেলা চলছে? হত্যাকারীদের লেলিয়ে দিচ্ছে নিরপরাধ মানুষের দিকে। হ্যাঁ মানুষই যন্ত্রণাসব তৈরি করেছে তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে মানুষ এটাই নিয়ম। কিন্তু পশুকে যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়ার অর্থ হচ্ছে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সামনে মানুষকে ছেড়ে দেয়া। সেটাই করছে তারা। তারা আরেক অভিনব নিয়ম করেছে চালকদের লাইসেন্স নবায়নের ব্যাপারে কেবল চোখ পরীক্ষা করেই নাকি লাইসেন্স নবায়ন করা যাবে। ৩০২ ধারায় মামলা না করার দাবি আদায়, দীর্ঘমেয়াদী সাজা না দেয়া এবং লাইসেন্স নবায়নে কেবল চোখ পরীক্ষার দাবি আদায়ে দরকষাকষি করেছে এক মন্ত্রী আর এক মন্ত্রীর সঙ্গে এবং তার প্রায় আশি শতাংশই মেনে নেয়া হয়ে গেছে। কী আশ্চর্য! সামান্য গণতন্ত্র আছে এমন দেশেও দন্ডবিধির ধারা বাতিল বা তা প্রয়োজনীয় করা কি কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তির ইচ্ছায় হতে পারে?

প্রশ্ন আরও আছে কোন সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সাজার বিধান নেই? যুক্তরাষ্ট্রে আছে ১ বছর থেকে ৯৯ বছর পর্যন্ত সাজার বিধান। যুক্তরাজ্যে আছে ১৪ বছর পর্যন্ত সাজার বিধান, কানাডাতেও ১৪ বছর এবং মালয়েশিয়ায় ১০ বছর সাজা এবং ২০ হাজার রিঙ্গিত জরিমানার বিধান আছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে অন্য মন্ত্রীদের বিভ্রান্ত করে গণবিরোধী সিদ্ধান্ত যে নেয়া হচ্ছে তার দায় কি সঠিকভাবে সরকারের ওপর বর্তাচ্ছে না?

আমরা নুসরাতের কথায় ফিরি ছোট্ট নুসরাত এখনো জানে না বোঝে না অনিয়মকে নিয়মে পরিণত যারা করেছে তাদের পাপের দায় ভোগ করছে সে। সে হয়তো এখন মাতৃহীন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টায়রত। তার ছোট্ট বুকটা অব্যক্ত হাহাকারের বেদনায় দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। নুসরাতের যন্ত্রণাকাতর মুখটি কি এ দেশের দন্ডমুন্ডের কর্তা বনে যাওয়া ব্যক্তিদের মনে একটুও বেদনা জাগায় না? তাদের বোধবুদ্ধি কি বলে না যে ভুল হয়ে গেছে এবার শোধরাতে হবে!

নুসরাতের মাতৃহীন হওয়ার অভাব পূরণ তো কেউ করতে পারবে না কিন্তু সুসভ্যতার নিরাপত্তা দেয়ার ব্যবস্থার সামান্য হলেও নিশ্চিত করা যেতো। ছোট্ট শিশুটি যদি বড় হয়ে বুঝতে পারতো তারই নিজ রাষ্ট্র ও সরকার, রাজনীতিবিদরা তার পাশে ছিল। কিন্তু এই কপাল পোড়া দেশে কে দেবে তার গ্যারান্টি? বড় হয়ে নুসরাত, অসংখ্য নুসরাত নিশ্চয়ই হিসেব মেলাবে যে, তারা কেবলই কি সংখ্যা, শুধুই অসংখ্য মানুষের একজন।

যারা ‘সড়ক সন্ত্রাসী’ এবং এই সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ আশ্রয়প্রশ্রয়দাতা তাদের বিবেক মৃত। শুভ বুদ্ধিটুকু বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই। কাজেই আসুন ওই সড়ক সন্ত্রাসী এবং মদদদাতাদের মৃত বিবেকের জন্য শোক প্রস্তাব পাঠ করি।।