Home » অর্থনীতি » আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (পর্ব – ৯)

আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (পর্ব – ৯)

ডেভিড লে এবং রব ইভানস, দি গার্ডিয়ান থেকে

অর্থ লেনদেনে রাখঢাক

arms tradeবিএই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার দালালদের যে সব কমিশন প্রদান করত ডিক ইভান্স চেয়ারম্যান থাকাকালে সে সব কমিশন লেনদেনের পুরোটাই সম্পন্ন হতো সুইজারল্যান্ডে। এটি যে একটি বেআইনি কাজ তা বলা যাবে না। তবে এই কাজগুলো করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছিল সেই প্রতিষ্ঠানটিকে একটি বৈশ্বিক মুদ্রা পাচার যন্ত্র হিসেবেই বর্ণনা করা যেতে পারে। নামজাদা একটি সরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করতে গিয়ে বিস্ময়েরই সৃষ্টি হয়েছিল।

বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে গিয়ে ব্রিটেনের সিরিয়াস ফ্রড অফিস পরে বলেছিল, পুরো ব্যবস্থাটিই এমন একটা রাখঢাক অবস্থার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছিল যে, শেষে অর্থ লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পুরো প্রক্রিয়াটিই নিয়ন্ত্রিত হতো বিএই’র ফার্নবরো অফিসের ওয়ারউইক হাউস নামক নিরাপদ একটি ব্লক থেকে। হাগ ডিকসনের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো ‘এইচকিউ মার্কেটিং সার্ভিসেস’টি। ডিকসন এম ১৬এর সঙ্গে কোম্পানির পক্ষ থেকে যোগাযোগ রক্ষা করারও দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। জুলিয়া আলড্রিজ দীর্ঘদিন তার ডেপুটি হিসেবে কাজ করেছেন। দলিলাদি থেকে বোঝা যায়, কোম্পানির প্রতিটি চুক্তি অনুমোদনের জন্য বোর্ড পর্যায়ের কর্মকর্তারা বৈঠকে মিলিত হতেন।

বিএই নভেলমাইট লিমিটেড নামে তার একটি অঙ্গ সংস্থা খুলেছিল। সংস্থাটি তার সুইস ব্যাংক শাখা লয়েড টিএসসি’র সহযোগিতায় নিজ ক্ষমতাবলেই জেনেভায় শীর্ষ নিরাপত্তা সংবলিত একটি অফিস ভাড়া করে। অফিসটি ৪৮ ন¤¦র রুট দ্যু একেসিয়াসের একটি ভবনের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত ছিল। সেখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি, ভিডিও ক্যামেরাসহ ফ্যাক্স ও ফোন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। সেই অফিসে নগদ অর্ধ মজদুর রাখার জন্য ভল্ট বসাতে যুক্তরাজ্য থেকে একজন বিশেষজ্ঞও উড়ে গিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৭ সালে ব্রিটেন ওইসিডি চুক্তিতে সই করার ঠিক আগে আগে কোম্পানির সব এজেন্ট সম্পর্কিত তথ্যাবলী ভর্তি ফাইলিং কেবিনেট এবং সেফগুলো একটি ভ্যানে বোঝাই করে বিশ্বস্ত কর্মচারীদের দিয়ে ফার্মবরো থেকে জেনেভায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

চুক্তিটি যখন ১৯৯৯ সালে কার্যকর হলো তখন বিএই নতুন এক গোপনীয়তার আশ্রয় নেয়া শুরু করলো। যুক্তরাজ্য রেজিস্ট্রিকৃত সংস্থাটির নভেলমাইট শাখা আনুষ্ঠানিকভাবেই বন্ধ করে দেয়া হলো। কিন্তু বিদেশী কোম্পানি হিসেবে গোপনে এটিকে আবারও রেজিস্ট্রি দেয়া হয় এবং এটি ক্যারিবীয় অঞ্চলের ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে একটি আর্থিক কৃষ্ণগহ্বর হিসেবে কাজ করতে থাকে। এখানে গোপনে অনেকের অর্থই গচ্ছিত রাখার ব্যবস্থা ছিল। ফলে এরপর থেকে কাগজেকলমে বিএই এবং নভেলমাইটের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আবিষ্কারের আর সুযোগ থাকলো না।

কোম্পানিটির চুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র সুইস আইনজীবী রেনেমার্কট এবং সিরিল এবেকাসিস দেখাশোনা করতেন। আইনজীবীরা বিদেশেও এর অনুরূপ কিছু কোম্পানি খুলেছিলেন যাতে সেগুলোর মাদ্যমে কোম্পানির এজেন্টরা তাদের পাওনা অর্থ পেতে পারে। কখনো কখনো সুইস কোনো একাউন্টেও তাদের অর্থ হমা হতো। চুক্তিপত্র স্বাক্ষর কিংবা নবায়নের জন্য প্রস্তুত হলে ডিকসন কিংবা এলড্রিজ জেনেভায় উড়ে আসেন এবং চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য রুট দ্যু একেসিয়ামের অফিসটিও খুলে দেন। চুক্তিপত্রটি জেনেভাতেই রক্ষিত ছিল এবং সেটি পরিদর্শন করতে হলে সেখানেই যেতে হতো।

এমন একটি পেঁচানো প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া যে, যুক্তরাজ্যের আইনি কাঠামোর আওতার মধ্যে এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই সব এজেন্টদের কাছে নগদ অর্থ পৌছে দেয়ার জন্য বিএইকে আবারও একটি গোপন লেনদেন পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হলো। বিএই বিদেশে স্থাপিত কোম্পানিগুলোকে আবারও কাজে লাগাতে শুরু করলো। ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেড ডায়মন্ড ট্রেডিং লিমিটেডকে বেনামে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে সচল করা হলো। এটি লন্ডন, সুইজারল্যান্ড এবং নিউইয়র্কস্থ রেড ডায়মন্ড একাউন্টসমূহের মাধ্যমে সারা বিশ্বে কমিশনের অর্থ লেনদেন করতে থাকলো। প্রতিবেদকরা দক্ষিন আমেরিকা, তাঞ্জানিয়া, রুমানিয়া, দক্ষিন আফ্রিকা, কাতার, চিলি এবং চেক প্রজাতেন্ত্র গোপন লেনদেনের সন্ধান পান।

যুক্তরাজ্যের যে সব লোক বিএই’র পরামর্শক হিসেবে কাজ করছিলেন তাদের পাওনা রেড ডায়মন্ডের মাধ্যমেই পরিশোধ করা হতো। এসব পরামর্শকের একজন ছিলেন ডেভিড হার্ট। তিনি আশির দশকে কয়লা খনিতে ধর্মঘট চলাকালে থ্যাচারকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিএই’র প্রকাশিত কোম্পানি অ্যাকাউন্টে রেড ডায়মন্ডের অস্তিত্ব কখনো প্রদর্মন করেনি এবং এমন একটি প্রতিষ্ঠান কেন চালু করা হয়েছিল সে সংক্রান্ত কোনো ব্যাখ্যাও কোনো দিন হাজির হয়েছিল সে সংক্রান্ত কোনো ব্যাখ্যা কোনো দিন হাজির করেনি। বিএই’র ব্রিটিশ ব্যাংক লয়েড টিএসবি মুদ্রা পাচারে বড় একটি ভূমিকা পালন করছিল। তবে আবারও বলছি, এ কাজটি বেআইনি না হলেও বিস্ময়কর। লয়েডের অনলাইন সফটওয়্যারের সাহায্য এমন একটি পদ্ধতি স্থাপন করা হয়েছিল যা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রেড ডায়মন্ডের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিএই’র নগদ অর্থ চূড়ান্ত গন্তব্যসমূহ পৌছে দিত।

পরের বছর বিএই কেবল সৌদি আল ইয়ামামাহ চুক্তির কমিশনের অর্থ লেনদেনের জন্যই নতুন আরেকটি কোম্পানি খোলে। পজিডন ট্রেডিং ইভেস্টমেন্টস লিমিটেড নামে এই কোম্পানিটি ১৯৯৯ সালের ২৫ জুন তারিখ থেকে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে যাত্রা শুরু করে।

কোম্পানিটির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, এর অ্যাকাউন্টসমূহের মাধ্যমে লয়েডস টিএসবি সৌদি এজেন্টদের কাছে ১০০ কোটি পাউন্ডেরও অধিক অর্থ প্রেরণ করে। এসব সৌদি কর্মকর্তা অবকাশ যাপনের জন্য ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে যেতেন তাদের পেছনে ব্যয়িত অবৈধ অর্থ লুকিয়ে রাখার জন্য ভিন্ন একটি পথও অনুসরণ করা হতো। এসব অর্থ বিএই’র তহবিলে জমা থাকতো।

সৌদি বিমান বাহিনী প্রধান যুবরাজ তুর্কি বিন নাসের যখন তার আত্মীয়স্বজন ও সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে ভ্রমণে বের হতেন তখন বিএই তাদের সীমাহীন কেনাকাটার জন্য অঢেল অর্থের বরাদ্দ রাখত। তাছাড়া তাদের জন্য বিমানের টিকেট এবং বিনামূল্যে অবকাশ যাপনেরও ব্যবস্থা করা হতো। বছরের পর বছর ধরে তারা দেদারসে খরচ করে যেতেন যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৬০ মিলিয়ন পাউন্ড। তবে বিএই নিজে সরাসরি কোনো বিলের অর্থ পরিশোধ করতো না। তারা বিল পরিশোধে দুটি ট্র্যাভেল কোম্পানিকে তাদের এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করত। কোম্পানি দুটি হলো রবার্ট লি ইন্টারন্যাশনাল এবং ট্র্যাভেলার্স ওয়ার্ল্ড।

ট্রাভেলার্স ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিটার গার্ডিনার দেখিয়েছেন বিএই’র নির্বাহীরা কীভাবে অস্বচ্ছ ইনভয়েস দেখাত। এটি তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই করত। বিলের মধ্যে তারা কেবল থাকা ও আনুষঙ্গিক সেবা কথাটি লিখে দিতো। বিএই’র অর্থ পাচার কেবল অল্পসময়ের জন্যই ফুলেফেঁপে উঠেছিল। ২০০১ সালের সেপ্টে¤¦রে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে দেয় এ সময় যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ লেনদেনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে যুক্তরাজ্যও মুদ্রা পাচারের ওপর বিধিনিষেধের কড়াকড়ি আরোপ করতে বাধ্য হয়।

২০০২ সালে প্রণীত এমনই একটি আইনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য বিদেশে ঘুষ প্রদানকে অপরাধী কর্মকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা দেয়। বিদেশে সংঘটিত দুর্নীতির ঘটনাকেও এই আইনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের কর্তৃত্বাধীনে নিয়ে আসা হয়। এ ঘটনার পর বিএইকে নতুন সঙ্কট মোকাবেলা করতে হয়। তবে নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর আস্থাশীল কোম্পানিটি শেষ পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে বেশ সফলভাবেই একটি দফারফায় পৌঁছতে সক্ষম হয়।।

(চলবে…)