Home » রাজনীতি » উৎসব নেই – ভয়ানক আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা

উৎসব নেই – ভয়ানক আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা

ফারুক আহমেদ

fearক্ষমতার শেষ দিনগুলোতে এসে নির্বিচার উদ্বোধন, ফলক উন্মোচন শাসক দলগুলোর সংষ্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের সকল মন্ত্রীই এখন সেই কাজই করে চলেছেন। রাষ্ট্রের নাম গণপ্রজাতন্ত্রী না বলে জনগণকে প্রজা বানিয়ে রাখার মানসেই বুঝি এই নামটি দেয়া হয়েছে। তাই জনগণের টাকায় কি হবে আর কি হবে না তার জবাবদিহিতা রাজারা প্রজার কাছে যতটুকু দিতে বাধ্য ছিল, ‘গণতান্ত্রিক’ বাংলাদেশের সরকার ততটুকুও বাধ্য নয়। তাই জনগণের টাকায় শাসকদল দলীয় প্রচার চালিয়ে যেতে পারে। এখন প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রী প্রকল্পের পর প্রকল্প উদ্বোধন করে বেড়াচ্ছেন জনগণের অর্থ ব্যয় করে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প উদ্বোধন করলেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসবার কালে জনগণের কাছে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিল তার মধ্যে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান ছিল জনগণের আশু চাহিদা। সরকার ক্ষমতার পাঁচ বছরের মধ্যে জনগণের এই সমস্যার সমাধান তো করতে পারেইনি বরং সঙ্কট আরো বেড়েছে। উপরন্তু এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে জনজীবনে একের পর এক সংকট সৃষ্টি করে চলেছে। ৬০ হাজার কোটি টাকা খরচের দায় জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়ে সরকার কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ চালিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়নি কিন্তু গরীব জনগণ সেই দেনার দায় বহন করছে। বর্তমানে এই সমস্যা সমাধানের কথা বলে সরকার যে সব প্রকল্পের মধ্যে যাচ্ছে তা প্রাণপ্রকৃতিপরিবেশের জন্য ভয়াবহ সংকটরে কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। পৃথিবীর মধ্যে উন্নত দেশ বলে পরিচিত যে সব দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প আগে থেকেই ছিল সে সব দেশ মারাত্মক ঝুঁকির কারণে তা পর্যায়ক্রমে বাতিল করছে। জাপান, জার্মান একের পর এক তাদের প্রকল্পগুলো বন্ধ করে চলেছে। এই সব উন্নত দেশে যা বর্তমান তা বাতিল করাতেই প্রমাণ মেলে যে, এই ধরণের প্রকল্প কতটা ভয়ানক। বাংলাদেশে এই ধরণের প্রকল্পের জন্য বিশেষজ্ঞ এবং প্রযুক্তিগত কোন দিক দিয়েই নিজস্ব বলে কিছু নেই। স¤পূর্ণ বিদেশীদের উপর নির্ভরশীল এই প্রকল্প উদ্বোধনকালে নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বললেন যে, তিনি পুতিনকে বলে দিয়েছেন যাতে নিরাপত্তার কোন অসুবিধা না হয়। সামান্য বিচারবুদ্ধির মানুষও প্রধানমন্ত্রীর এমন কথায় আতংকিত না হয়ে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী যখন এসব কথা বলে এমন ভয়ানক প্রকল্প উদ্বোধন করছেন তখন ঢাকা শহরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অন্য এক সংকটে শত শত মানুষের টেলিভিশন,রেফ্রিজা্েরটর, ¤িপউটার নষ্ট হচ্ছে। লোডশেডিং জনজীবনে এক দীর্ঘস্থায়ী সংকট সৃষ্টি করে বিদ্যমান আছে। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের জীবনে সৃষ্টি হয়েছে অন্যরকমের এক সংকট। ভোল্টেজ সংকট। যে ভোল্টেজ থাকে তাতে কোন কাজই করা যায় না একদিকে, অপরদিকে হঠাৎ করে এমন ভোল্টেজ আসে যার ফলে মানুষের প্রয়োজনীয় এসব জিনিস মুহুর্তের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সামান্য ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা যে সরকারের নেই, যে রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে নেই সেখানে স¤পূর্ণ বিদেশীদের উপর নির্ভরশীল থেকে পারমাণবিক প্রকল্পের মত একটি প্রকল্প কতটা ভয়ানক হতে পারে তা বুঝবার জন্য পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এখন মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়েছে ভোল্টেজ ওঠানামায় তার প্রয়োজনীয় জিনিসটি অচল হওয়ার আতঙ্কে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প কার্যকর করার পর মানুষের রাতের ঘুম হারাম হবে গোটা দেশ বিষ্ফেরিত হয়ে পংগুত্ব বরণের আতঙ্কে। প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্প উদ্বোধন করে যেন বাংলাদেশকেই পারমাণবিক চুল্লির উপর বসিয়ে দিলেন।

বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের গল্পের যেন কোন শুরুও নেই শেষও নেই। রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প এ গল্পের আরেক দিক। সুন্দরবন শুধুমাত্র পরিবেশ আর প্রাণপ্রকৃতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।বহু মানুষের এবং সে দিক দিয়ে গোটা দেশের অর্থনৈতিক জীবন এই বনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের গল্প শুনিয়ে সেখানে এমন প্রকল্প করতে যাওয়ায় নিশ্চিৎভাবেই এই বন ধ্বংস হওয়ার আশং‹ায় মানুষ পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ভয়ে আতংকিত।

অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্কই যেন বাংলাদেশের জনগণের ললাট লিখন। শাসক দলগুলো জনগণের ললাটে তা স্থায়ীভাবে লিখে দিয়েছে। গল্প বহু শোনানো হলেও জনগণের ললাট থেকে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির লিখন খন্ডন হয়নি। দিনে দিনে এই লিখনের ক্ষতকে গভীর থেকে গভীর করে এখন তা ক্যান্সারে রুপান্তর করা হয়েছে। এ যেন আর নিরাময় যোগ্য নয়। মানুষের আয় নেই। বলা হয়েছিল প্রত্যেক পরিবারের অন্ততঃ একজন মানুষের রোজগারের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু তা হয়নি। অথচ দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির চাপ অব্যাহত আছে। এসব চাপতো আছেই এরই মধ্যে মানুষকে নি®েপষিত হতে হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সীমাহীন অবনতিতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের কাছে মানুষ আশ্রয় খুঁজে পায় না, তারা মানুষকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। সন্তানকে শিক্ষাঙ্গনে দিয়ে বাবা, মাকে আতংকে দিন কাটাতে হয়। কখন যেন কোন ছোবল তার সন্তানের ওপর এসে পড়ে। বাবা, মা সন্তানকে শিক্ষাঙ্গনে পাঠায় সেখান থেকে শিক্ষিত হয়ে ফেরার আশায়। কিন্তু এর বাইরে তাদের দিন কাটে লাশ হয়ে নাকি মাদক আসক্ত হয়ে নাকি সন্ত্রাসীচাঁদাবাজ হয়ে তার সন্তান ঘরে ফেরে এই আশংকায়।

বাংলাদেশে সবচেয়ে অন্ধকার মনে হয় স্বাস্থ্যখাত।এর একটি প্রধান কারণ বুঝি এই যে, না খেয়ে পেটে ব্যাথ্যা হলে তাকে সম্ভবত স্বাস্থ্য খারাপ বলা হয় না। এ খাতে একদিকে বরাদ্দ কম অপর দিকে হাসাপাতালগুলোর বেহাল অবস্থা,সংশ্লিষ্টদের দায়ীত্বহীনতা এবং সেবার মান বলে দেয় যে, যেটুকু বরাদ্দ আছে তার খরচের ভারও গরীব জনগণ এ থেকে কোন সেবা না পেয়েও শুধুই বহন করে চলেছেন। সরকারী হাসপাতালগুলোতে মানুষ স্বা®’্য পরীক্ষার জন্য যায় না, যায় না দৈনন্দিক কোন অসুস্থতা নিয়ে। মানুষ সেখানে যায় তখনই যখন তার জীবন সংকটাপন্ন হয়। সেই অবস্থায় যখন সে বঞ্চিত হয় তখন তা হয় তার জীবনের সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত বঞ্চনা। মানুষ তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে তারপরও এমন চূড়ান্ত বঞ্চনা তাকে আতঙ্কগ্রস্থ করে।

দুর্নীতি যেখানে স্থায়ী আসন করে সকল প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে সেখানে সুশাসন অধরাই থেকে যায়। দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এই প্রতিষ্ঠানটিকে বলেছিলেন কাগুজে বাঘ। সেই অর্থে তার কোন কার্যক্রম থাকবার কথা নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রমে মনে হয়, এ প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতিবাজদের, বিশেষ করে সরকারের এবং শাসক দলের লোকদের দুর্নীতি থেকে দায়মুক্তির কাজ নিরলস এবং বিরামহীনভাবে করে চলেছে। কাজেই জনগণের দিক থেকে দেখলে একে বিষধর কোনকিছুর সঙ্গেই তুলনা করা যায়, এ প্রতিষ্ঠান কোনমতেই কাগুজে বাঘ নয়।

জনগণের জন্য সুশাসন সুব্যবস্থা কিছুই নেই। তবে আওয়াজ আছে। দায়ীত্বের চেয়ে আওয়াজ বড় হলে জনগণের ভোগান্তি আওয়াজহীনভাবে বাড়ে। যোগাযোগ মন্ত্রী আওয়াজ দিয়েছেন ঈদের আগের ১০ দিন এবং ঈদের পরের ৫ দিন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সকল কর্মচারীর ছুটি বাতিলের। অতীত অভিজ্ঞতা হতে দেখা যায় এসব চমক দেখানো কর্মকান্ডের খেসারত জনগণকে গুনতে হয়। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে শাসক দলের লোকেদের আওয়াজ এবং চমকের খেসারতও জনগণকে গুণতে হয়। জনগণ আতংকে থাকেন কখন কোন সময় এমন খেসারত তাকে দিয়ে যেতে হবে।

এসব সংকট, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তাতো আছেই বর্তমানে জনগণ গভীর আতংকের মধ্যে আছেন ঈদের পরে কি হয়।সংকট মাথায় নিয়ে মানুষকে ঈদ, পূজা, প্রবারণা করতে হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে সংকট বিরাজ করছে শাসক দলগুলো এখনও পর্যন্ত তার কোন সমাধান করতে পারেনি। সরকার গণতন্ত্রের দোহায় দিলেও স্বৈরতন্ত্র অনঢ় থেকে যাচ্ছে উপরন্তু তারা নানা রকমের হুমকি ধামকি দিয়ে জনগণকে আতঙ্কগ্রস্থ করছে। সরকারী কর্মকর্তাকর্মচারীদেরকে শাসক দলের লোকদের ছুড়ে দেওয়া হুমকি সামগ্রিক পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ তো বটেই কঠিন করে তুলেছে। নির্বাচন কমিশনের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করাও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ আগেই হয়েছিল। এমনিতেই প্রশাসনিক দলীয়করণ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থার এক গভীর ক্ষত। তারপরও অবশিষ্ট যা আছে তার প্রতি শাসক দলের লোকেদের এমন হুমকিতে শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যেই শুধু আতঙ্কের সৃষ্টি করেনি, জনগণকেও ভীত সন্ত্রস্ত করে ফেলেছে।

মাথার উপর এতসব আতঙ্ক, আশঙ্কা, অনিশ্চয়তার চাপের মধ্যেই প্রাকৃতিক নিয়মে সামনে একই সঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে ঈদ, পূজা, প্রবারণা। এতসব চাপের মধ্যে উৎসবের এই দিনগুলো মানুষের জীবনে আনন্দের পরিবর্তে উৎকন্ঠায় রাখবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ সবার মধ্যেই এই প্রশ্নটি রয়েছে, এই ঈদের পরে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?