Home » অর্থনীতি » চে এখন কর্পোরেটদের বাণিজ্যিক পণ্য

চে এখন কর্পোরেটদের বাণিজ্যিক পণ্য

আবীর হাসান

-Che-চে গুয়েভারা বিপ্লবী চে গুয়েভারাকে নিয়ে অনেক আবেগপ্রবণ কথাবার্তা মূল কর্পোরেট দুনিয়া আর তার ভাববাদী দালালদের মুখেই শোনা যায় আজকাল! বিপ্লবী রাজনীতি বা বামপন্থী রাজনীতি যারা করেন তাদের অনেকেই খুব একটা চে’র নাম নেন না। কেননা দুই ঘরানার বামপন্থী কেউই চে’র তত্ত্বে বিশ্বাস করেননি তাঁর জীবদ্দশাতেও। সাম্রাজ্যবাদের কেন্দ্রীয় শক্তি ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় অন্তত কুড়িটা ভিয়েতনামের মতো রণক্ষেত্র খোলার কথা বলেছিলেন চে গুয়েভারা। তা কোন বিপ্লব সফল করার সমাজতন্ত্রী দেশ করতে যায়নি। তারা ‘স্নায়ু যুদ্ধ’ করেছে – ‘তারকা যুদ্ধের’ প্রস্তুতি নিয়েছে। গরিব সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে ধনী সমাজতন্ত্রীদের পার্থক্যটাও ঘোঁচাতে চায়নি কেউ আর সেটাই চেয়েছিলেন চে গুয়েভারা।

অনেকটা অনাহূতের মতোই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন চে গুয়েভারা। দেখাশোনাপাঠ যদিও যথেষ্ট ছিল কিন্তু তাঁর জীবনের না ছিল স্থিতি না ছিল কোন দলীয় ঘরানার উত্তরাধিকার। আমেরিকার প্রকৃত আয়, মানুষকে আবিষ্কারের জন্য দু’দুবার অভিযানে বেরিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা থেকে। প্রথমবার মোটর সাইকেলে, দ্বিতীয়বার সাধারণ পর্যটকদের মতোই। পেশায় ডাক্তার তাই ল্যাটিন আমেরিকার গরিব লোকগুলোর জাতপাত পুষ্টিঅপুষ্টির সমস্যা রোগশোক, বঞ্চনা এসব বিষয়গুলো দ্রুত বুঝেছিলেন। আর মার্ক্সবাদের প্রথামাফিক পাঠ থাকায় বুঝতে অসুবিধা হয়নি সাম্রাজ্যবাদী শোষণের স্বরূপ। বিশেষ করে প্রথমবারের অভিযাত্রায় নিকারাগুয়ায় দীর্ঘদিন থাকার সময়। কারণ তখন ওখানে একটা নির্বাচিত বামপন্থী সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল বিদেশি প্ররোচণায়। চিলি, পেরু, বলিভিয়া, মেক্সিকোতে লগ্নি পুঁজির শোষণ আর প্রভাব প্রতিপত্তি খুব ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছিলেন চে।

দ্বিতীয় অভিযাত্রাতেও বিপ্লবী হয়ে ওঠায় কোন অভিপ্রায়ের কথা জানা যায় না শেষ পর্ব পর্যন্ত। এমনকি ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে প্রথম দেখার পরও তেমন কোন প্রতিক্রিয়া বা আবেগ লক্ষ্য করা যায়নি চে’র মধ্যে। ভবঘুরে ডাক্তার যেখানে খুশি যেতে পারেন যে চাকরিটা মেক্সিকোতে তখন করেছিলেন তাতে পোষাচ্ছিল না। সেটাও একটা কারণ হতে পারে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দলে ভিড়ে যাওয়ার জন্য। দলে ভিড়লেন, জেল খাটলেন তারপর ছাড়া পেয়েও দল ত্যাগ করলেন না বরং উঠলেন বিখ্যাত গ্রানামায় (জাহাজ)। কিউবায় নামলেন বিপ্লবী যোদ্ধাদের সঙ্গে বিদেশি ডাক্তার সে জন্যই কিনা কে জানে, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন কয়েকজন মাত্র সঙ্গী নিয়ে পড়লেন সরকারি বাহিনীর পাতা ফাঁদে। কিন্তু অসীম সাহসে স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধ করে যুদ্ধ করে বেরিয়ে এলেন আবার দেখা সে ফিদেল বাহিনীর সঙ্গে বিজয়ী বেশে। ডাক্তার পরিচয়টা আর রইল না পুরো দস্তুর বিপ্লবী যোদ্ধা দলের জয়ের নায়ক হিসেবে।

চে কে নিয়ে সমস্যার (!) শুরু তখন থেকেই কিউবান পার্টির লোকজন চে কে যেভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন সেভাবে তো অন্য সমাজতান্ত্রিক দেশের কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন করলেন না। চে’র মন্ত্রীত্ব পাওয়া পার্টিতে তাঁর ভূমিকা সব কিছুকেই তখন বাঁকা চোখে দেখতো মস্কো এবং বেইজিং। সমাজতান্ত্রিক সমাজ এবং অর্থনীতি গঠনে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখায় চে’র ধারণা ও বক্তব্যকেও অভিনব বলে মনে করা হতো। আবার এই কারণে বিপ্লবে উন্মুখ দেশগুলোর তরুণরা চে গুয়েভারাকে বাঁচিয়ে ফেললো রোল মডেল বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকা এবং ইতালি ও পর্তুগালের তরুণরা। রেবেটা মাথায় চে’র বিখ্যাত ছবিটাও ছড়িয়ে ছিল ইতালি থেকেই। ভিন্ন ধাঁচের বিপ্লবী যে হয়ে উঠেছেন চে তা নিজেও বুঝেছিলেন এবং একই সঙ্গে লড়তে চেয়েছিলেন সাম্রাজ্যবাদ এবং বড়লোক সমাজতন্ত্রী দেশগুলোর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। শেষের ব্যাপারটিই সম্ভবত কাল হয়েছিল কিউবান ফিদেলও অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলেন ষাটের দশকের শেষদিকে। মন্ত্রীত্ব ছেড়ে চে বিপ্লব ছড়িয়ে দিতে চলে গিয়েছিলেন আফ্রিকায়। তারপর গিয়েছিলেন ল্যাটিন আমেরিকায়। বলিভিয়া ছিল তার শেষ ঠিকানা যেখানে ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর এক জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে বলিভিয়ার সরকারি বাহিনী হত্যা করে তাকে।

সংক্ষিপ্ত এই ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কিন্তু চমকপ্রদ নানা কাহিনী আছে। অসহনীয় পথের কষ্ট সওয়া, সুযোগ পেলে আনন্দফূর্তিতে মাতা, ক্ষুধাতৃষ্ণা ভুলে মানব সেবা করা কিংবা এক নাগাড়ে পড়ে চলা। বার বার পেশা পাল্টানো, প্রেমে পড়া, বিচ্ছিন্ন হওয়া এসবও আছে।

চে’র উদ্দাম যৌবনের ওই বিষয়গুলোকেই পুঁজি করে ফেলেছে পুঁজিবাদীরা। তারা চে’র মুখ ছেপে দিচ্ছে খাতার মলাটে টিশার্টে, ব্যাগে, মগে। এমনকি আমেরিকায় তার নামে চলছে বিয়ারের ব্যবসাও। শুধু ও সব দেশের দোষ দিয়ে তো কোন লাভ নেই আমাদের দেশেও চে’কে পণ্য করে ব্যবসা হচ্ছে। এখানে জন্ম মৃত্যু দিবসের অনুষ্ঠানেও করে না কোন বিপ্লবী বা বামপন্থী দল। যারা ও সব করে তারা ব্যবসাদার, কর্পোরেটদের এ দেশীয় এজেন্ট। ভাবখানা এমন যেন তারা তাদের যৌবনে অথবা জীবনের বেশ কিছুটা সময় চে’কেই আদর্শ মানতেন। চে’র নামে কিছু বললে তাদের উৎপাদিত পণ্য বা কাগজপত্রের কাটতি বাড়বে, এই মানসিকতা থেকেই চে’কে নিয়ে তাদের মাতামাতির আয়োজন করা হয়। চে’র বিপ্লবী অবদান কিংবা তার এক কুড়ি ভিয়েতনামের বার্তা তারা কখনই পৌছায় না তরুণদের কানে বলে না ধনী সমাজতান্ত্রিক আর গরিব সমাজতন্ত্রীদের দ্বন্দ্বের কথা। বলে না চে’র শেষ কথাও – ‘ব্যক্তির সর্বোচ্চ সৃজনশীল ক্ষমতা প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়।’ কিংবা এটাও বলা হয় না যে, চে চেয়েছিলেন তারুণ্য যুদ্ধ করে বিপ্লব অর্জন করলে তাদেরই দিতে হবে পরবর্তী সমাজ গঠনের ভার। শিক্ষা দিতে দিতে শিক্ষক হয়ে উঠবে তারা নিজেরাই।

ঠিক ওই সব পুঁজিবাদী কর্পোরেটদের ও তার এ দেশীয় এজেন্টদের যারা চে কে নিয়ে বাণিজ্য করে চলেছে তাদেরই কৌশলে পণ্য হয়ে যাওয়া চে যে এখন আর একটি স্মার্ট তরুণের ছবি ছাড়া আর কিছু নয়। ঘৃণা জানাই, ধিক্কার জানাই তাদের যারা এ দেশেও এ কাজটি করছে।।

(চে গুয়েভারা : জন্ম ১৪ জুন ১৯২৮, মৃত্যু ৯ অক্টোবর ১৯৬৭)