Home » অর্থনীতি » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল কোম্পানি যখন যুদ্ধের মদদদাতা

ফারুক চৌধুরী

oilকঙ্গো থেকে সুবিধা পেয়েছে যেসব কোম্পানি, সেগুলোর অন্যতম কানাডার হেরিটেজ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। উগান্ডা আর রুয়ান্ডার সামরিক বাহিনী ১৯৯৮ সালে যখন কঙ্গোর মাটিতে পা রাখল, সে সময়েই সেখানে পৌছায় হেরিটেজ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ব্যাংক পাঁচ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ ডলার জর্জ দেয় কঙ্গোয় রুয়ান্ডা সমর্থিত বিদ্রোহী দলের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে। আর রুয়ান্ডা ও উগান্ডা যখন কঙ্গোয় লুট চালাচ্ছে, সে সময়েই এ দুই দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ছে বলে এ দু’দেশ প্রশংসা পাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের।

উপরে উল্লিখিত তথ্যগুলো পরিবেশিত হয়েছে ইতোমধ্যে উল্লেখ করা এ গেম এজ অ্যান্ডবইতে সত্য যে কোথায় কোনটি তা বুঝতে পারা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের তথ্য বিপুল। একের পর এক এসব তথ্য সাজালে সহজেই কয়েকটি বই লেখা যায়। এসব তথ্য যথাযথভাবে সংযুক্ত করলে, এগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক খুঁজে পেলে সত্য আর আড়ালে থাকে না। লুট, হামলা, পেছনে থাকা শক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রাজনীতির ভালো ভালো কথা, লেনদেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যকার সম্পর্ক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক ইত্যাদি সত্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে। তখন আর বিভ্রান্তি থাকে না এ পৃথিবীর এত শক্তিদের চেহারা চরিত্র বক্তব্য নিয়ে। তবে এক বিপুল আশ্চর্য তবুও অপেক্ষা করে। সে বিপুল আশ্চর্য হচ্ছে। আজোও দেশে দেশে এ শক্তিবর্গের মিত্ররা পরম শ্রদ্ধায় পূজা পান। তারাও ভেবে দেখেন না যে, দেশের সাধারণ মানুষ যেদিন জানতে পারবেন এ পূজনীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে এ শক্তিবর্গের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা, সেদিন সাধারণ মানুষই ধিক্কার দেবেন এ ব্যক্তিকে বা ব্যক্তিবর্গকে। আর সাধারণ মানুষ প্রতিদিন তা করেন না, মাঝে মধ্যে করেন। যেমন আমাদের এ ভূখণ্ডেই আমাদের আজকের বাংলাদেশে, ১৯৪৭ সালের আগে পরে কতই না শ্রদ্ধা পেতেন মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহ। তাকে তো এ দেশেরই মানুষ ধিক্কার দিয়েছেন, প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার কথার প্রতিবাদ করেছেন। কোনো কথাই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখতে পারেনি। একইভাবে দেশে দেশে লুটের সঙ্গে জড়িত যে রাষ্ট্র শক্তি, তার পরম মিত্র, তার আস্থাভাজন লোককে সাধারণ মানুষ কি গ্রহণ করবেন? ধিক্কারে নিন্দায় উচ্চারিত হবে সে নাম। কারণ সাধারণ মানুষ কখনই দেশের সম্মান ও মর্যাদা বলি দেন না। কঙ্গোতেও তাই হয়েছে। বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র শোম্বের নাম আজ আর কেউ উচ্চারণ করেন না শ্রদ্ধায়, সে নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণায়, ধিক্কারে। মানুষের হৃদয়ে আসন গেড়ে আছেন গ্যাট্রিস লুমুমবা।

কঙ্গোর দুর্ভোগের শেষ হয় না। কারণ তার সম্পদ কেবল সোনা, হীরা, কোবাল্টে সীমিত নেই। সেখানে আছে তেল। সে তেলের পরিমাণ একেবারে কম নয়। তাই এ তেল নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে এবং প্রতিযোগিতা প্রবল। ব্রিটেনের পত্রিকা ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক খবর থেকে জানা যায়, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ৫ নম্বর ব্লক নিয়ে শুরু হয়েছে বিরোধ। এ ব্লকে রয়েছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। সেখানে রয়েছে বন, গরিলা, হাতি। এখানে রয়েছে মহাদেশের সবচেয়ে পুরনো জাতীয় উদ্যান। এ ব্লকটি দেয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের দুটি তেল কোম্পানিকে। দেশটির আইন অনুসারে জাতীয় উদ্যানে কেবল বৈজ্ঞানিক কাজ চলানো যায়, তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদন করা যায় না। দেশটির ৪১ জন এমপি জাতীয় উদ্যানের সীমানা নতুন করে চিহ্নিত করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন পরিবেশমন্ত্রীর কাছে। প্রতিবেশী উগান্ডায় যুক্তরাজ্যের আরেকটি কোম্পানি তাল্ল অয়েল সন্ধান পেয়েছে আড়াইশ কোটি ব্যারেল তেলের। এরপর থেকেই তেল তোলার জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। এ ব্লকে তেল তোলার জন্য পার্টনারশীপ শেয়ারিং এগ্রিমেন্ট বা উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি করা হয়। এটা খুব গোপন করে রাখা হয়। এ চুক্তি অনুসারে সিগনেচার বোনাস হিসেবে উৎপাদন দেবে ২০ লাখ ডলার, প্রথম উৎপাদন বোনাস হিসেবে দেবে ২০ লাখ ডলার, আর একটি বার্ষিক কর দেয়ার পাশাপাশি এক কোটি ব্যারেল তেল কিনবে ৫০ লাখ ডলারে। মুনাফার ওপরে ভাগাভাগি আছে। এ চুক্তি সংশোধন করা হয়। সে সংশোধন অনুসারে কিছু অর্থ আবার সিগনেচার বোনাস হিসেবে দেয়া হয়। কতো পরিমাণ অর্থ দেয়া হয় তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে অনুমান করা হয়, এ পরিমাণ পাঁচ লাখ ডলার। এ অর্থ দেয়া হয় চুক্তিটি প্রেসিডেন্ট অনুমোদন করার কয়েক সপ্তাহ আগে।

এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, তেল কোম্পানিগুলো যে অর্থ দেয়, তার চেয়ে বেশি নিয়ে যায়। তা না হলে এসব কোম্পানি তেল তুলতে আসত না। কারণ কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দর্শন নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো নয়। এ লুটের কাহিনী বিশাল। তার ধরন অনেক। ব্যক্তি পর্যায়ে কোম্পানি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অনানুষ্ঠানিকভাবে আইনের ও প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায়, আইন ভেঙে লুট চলে। এ লুট এত ব্যাপক পর্যায়ে পৌছায় যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০০০ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বেআইনিভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বিষয়ে প্রতিবেদন পেশ করতে বলে। জাতিসংঘ মহাসচিব এ বিষয়ে যে প্রতিবেদন পেশ করেন তাতে এ লুটের একটি দিক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়।

এ প্রতিবেদন ছয়টি উপসংহারে উপনীত হয়। প্রথম উপসংহারেই বলা হয়, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে সংঘাত প্রধানত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের প্রাপ্তি, নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য নিয়ে। এ পাঁচটি খনিজ সম্পদ হলো কোলটান, হীরা, তামা, কোবাল্ট ও সোনা। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ এত যে হতবিহ্বল হয়ে যেতে হয়। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা ও আইনহীনতার প্রেক্ষাপটে এ সম্পদ মুঠো না করার প্রলোভন ঠেকানো কঠিন। দ্বিতীয় উপসংহারে বলা হয়, বিদেশী সেনাবাহিনীগুলো সুব্যবস্থিতভাবে কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করছে। তা লুট করা হচ্ছে। এ নিয়ে গড়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। এসব চক্রের যোগাযোগ রয়েছে বিশ্বব্যাপী। তৃতীয় উপসংহারের একটি অংশে বলা হয়, কয়েকটি কোম্পানি কঙ্গোতে যুদ্ধে জড়িত। এসব কোম্পানি যুদ্ধে সরাসরি ইন্ধন যুগিয়েছে। এসব কোম্পানি প্রাকৃতিক সম্পদের বিনিময়ে অস্ত্র যুগিয়েছে। অন্য কয়েকটি কোম্পানি দিয়েছে অর্থ। সে অর্থ খরচ হয়েছে অস্ত্র কেনায়। খনিজ সম্পদের ব্যবসা করে যে কোম্পানিগুলো, তারাই দেশটিতে বেআইনিভাবে খনিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। লুটের এ কাহিনী আগামীতে আরো তথ্য দেবে।।

(চলবে…)