Home » অর্থনীতি » পারমাণবিক বিদ্যুৎ – ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ

পারমাণবিক বিদ্যুৎ – ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

nuclear১৯৮৬ সালে চেরনোবিল এবং ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো হয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অথবা ভবিষ্যতে নতুন করে আর স্থাপনের পরিকল্পনা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৫০এর দশক থেকে ২০১০ পর্যন্ত হিসেবে দেখা গেছে যে, বেসামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কমপক্ষে ২৮টি পারমাণবিক কেন্দ্রে দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিজ্ঞান এবং কারিগরি দক্ষতার উৎকর্ষ সাধনকারী দেশ জাপান ফুকুশিমা নিয়ে এখনো পর্যন্ত সীমাহীন সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। ফুকুশিমার চতুর্থ যে রিঅ্যাক্টর তার বর্জ্য সরানো ও ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য অতিসম্প্রতি সে দেশের সরকার বাড়তি ৫০ কোটি ডলার ব্যয়ের কথা ঘোষণা করেছে। কিন্তু গত ৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে বলেছে, এর ফলেও তেজষ্ক্রিয়তা মুক্ত হওয়া সম্ভব হবে না। গত আগস্টে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘টেপকো’ জানিয়েছে, তিনশ টন তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত পানি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে গেছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে। জাপানের ঊর্ধ্বতন দুই হাজার বিজ্ঞানীর সংগঠন সায়েন্স কাউন্সিল অফ জাপান এক গবেষণায় বলেছে, আগামী এক জনমেও ফুকুশিমা আর বসবাস যোগ্য হবে না। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস সম্প্রতি বলেছে, ফুকুশিমার ট্র্যাজেডির পরে এটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে যে, পারমাণবিক কেন্দ্র আসলেই মারাত্মক পর্যায়ে বিপজ্জনক। বিশ্বে যে ৪৩৬টি রিঅ্যাক্টর রয়েছে তা কোনোক্রমেই মানুষের ভুলত্রুটি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা বিপর্যয়ের ঊর্ধ্বে নয়। গ্রিনপিস আরো জানিয়েছে, ফুকুশিমার মানুষ ভয়াবহ পর্যায়ে ক্ষতির শিকার হয়েছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার পরে ওই শহরের এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের উইক্রেনের চেরনোবিলে যে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে তা শুধুমাত্র এই দেশটিরই ক্ষতি করেনি, ক্ষতি করেছে সমগ্র বিশ্বের। চেরনোবিল শহরটি আজও পরিত্যক্ত হয়ে আছে। আর পরিত্যক্ত থাকবে আরো বহু যুগ। ২০১২ সালের ২২ মে সায়েন্স ডেইলি এক সংবাদ নিবন্ধে বলেছে, পশ্চিম ইউরোপ বড় মাত্রায় পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে। নিবন্ধে আরো বলা হয়, প্রতি ১০ থেকে ২০ বছরে বড় ধরনের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে। এই যখন পরিস্থিতি তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জোর দিয়ে বলেছেন, ঝুঁকি রোধ করা হবে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি কেমন করে এই নিশ্চয়তা দেন? তাছাড়া নির্মাণ ব্যয়, পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যগতদিকসহ সামগ্রিক বিষয়গুলো বিবেচনা করলে এ কথা বলতেই হবে জেনেশুনে বাংলাদেশ এক চরম ঝুঁকির মধ্যে প্রবেশ করলো।

পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি

ইউরেনিয়াম মাইনিং, পরমাণু রিঅ্যাক্টর নির্মাণ, টাওয়ার শীতলীকরণ, পরমাণু বর্জ্যরে পরিবহন ইত্যাদি বিষয়গুলো আমলে নিলে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বায়ুমন্ডল, পরিবেশ ও প্রাণীর ক্ষতি করে সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই। ১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকলে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঈষবধহ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঢ়ৎড়ারংরড়হ থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হয়। জন উইলিয়াম এবং ফিলিপ স্মিথ ২০০৪এর এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে কয়েক হাজার গুণ ক্ষতিকর সিএফসি অর্থাৎ ক্লোরোফ্লোরোকার্বন নিঃসরিত হয় যাকে ‘মনট্রিল প্রটোকলে’ পরিবেশ দূষণের দায়ে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও পরমাণু রিঅ্যাক্টর প্রতি বছর বায়ুমন্ডলে ও পানিতে প্রায় মিলিয়ন কুরি (তেজস্ক্রিয়তার একক) তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ছড়ায়। এসব আইসোটোপের তালিকায় আছে ক্রিস্টন, জেনন, আর্গনের মতো নিস্ক্রিয় গ্যাসসমূহ, যেগুলো চর্বিতে দ্রবণীয় এবং রিঅ্যাক্টরের আশপাশে বসবাসকারী কোনো লোক তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে তা তার ফুসফুসের মাধ্যমে প্রজনন অঙ্গসহ দেহের চর্বিযুক্ত টিস্যুতে স্থানান্তরিত হতে পারে। তদুপরি তেজস্ক্রিয় মৌলগুলো হতে নিঃসরিত গামা রশ্মি ডিম্বাণু ও শুক্রাণুতে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটিয়ে সূচনা করতে পারে বংশানুসৃত রোগের। ট্রিটিয়াম নামক হাইড্রোজেনের একটি আইসোটোপও আমরা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পাই যা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় পানি উৎপন্ন করে। এই পানি ত্বক, ফুসফুস এবং পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে লোকজনের দেহে প্রবেশ করে আর ডিএনএ মলিকিউলে ঢুকে যেতে পারে যার পরিণাম বড় ধরনের বিপর্যয়।

২০০৮ সালে জার্মান সরকার তার বাণিজ্যিক ১৬টি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশে বসবাসকারী শিশুদের ওপর একটি গবেষণা চালায়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে যতোই যাওয়া যায় শিশুদের দেহে ক্যান্সার বিশেষত লিউকোমিয়ায় আক্রান্তের ঝুঁকি ততো বাড়তে থাকে। ওই গবেষণা থেকে জানা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মাঝে বসবাসকারী শিশুদের লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তার বাইরে বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় অন্ততপক্ষে দ্বিগুণ। গবেষণায় দেখা যায়, পরমাণু রিঅ্যাক্টরের আশপাশে অবস্থিত লোকালয়গুলোতে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ২৬২৮ জন, যখানে গড়পড়তা স্তন ক্যান্সারজনিত মত্যুহার হচ্ছে প্রতিলাখে ২০২১ জন। এই গবেষণাটি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যারা বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ডিপার্টমেন্টের গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে পুরনো পরমাণু কেন্দ্রগুলোর আশপাশে স্তন ক্যান্সারজনিত মৃত্যুহার ১৯৫০৫৪ থেকে ১৯৮৫৮৬ সময়কালে বেড়েছে ৩৭ শতাংশ, যেখানে পুরো আমেরিকারজুড়ে গড়ে তা বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ।

২৬ এপ্রিল ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কিয়েভ শহরের চেরোনোবিলে একটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারটি রিঅ্যাক্টরের একটি বিস্ফোরিত হয় এবং তেজস্ক্রিয় মৌল ছড়িয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু অঞ্চলে। আজও চেরোনবিল শহর পরিত্যক্ত। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চেরোনোবিল দুর্ঘটনায় সব কিছু মিলিয়ে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। শুধু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে বন্ধ করতেই লেগেছিল ৪০০ কোটি ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার থ্রি মাইল আইল্যান্ডে ১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ একটি পরমাণু দুর্ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনার পর এখন পর্যন্ত নতুন আর কোনো পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮০ সালে থ্রি মাইল আইল্যান্ড ঘটনার পরপরই সুইডেন রেফারেন্ডামে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিষিদ্ধ করার দাবি তোলে। ১৯৮৬ সালের চেরোনোবিল দুর্ঘটনার পর সবাই ধরে নিয়েছিল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিন বুঝি এবার ফুরাচ্ছে। জার্মানি কেবল নতুন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধই করেনি। সেই সঙ্গে একে একে বন্ধ করে দিচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রগুলো। বেলজিয়াম, তাইওয়ান, জাপানও ক্রমে সরে আসছে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে। এমনকি নিজস্ব বিদ্যুতের শতকরা ৭৭ ভাগ পরমাণু শক্তি থেকে পাওয়া ফ্রান্সের জনগণ সেদেশের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করার জন্য সরকারকে ব্যাপকভাবে চাপ দিচ্ছে। ফ্রান্সের ফ্লামেনভিলেতে ১৬৩০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয় ২০০৬ সালে। এটি নির্মাণে প্রারম্ভিক ব্যয় ধরা হয় ৩৩ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা এবং ২০১২ সালের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা বলা হয়। কিন্তু নানা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা সংযোজন এবং ফুকুশিমা দূর্ঘটনার পরে আরো আধুনিকভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬২ হাজার কোটি টাকা এবং এখন তা ২০১৬ সাল নাগাদ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্রাজিলের অ্যাংরো১ পরমাণু কেন্দ্রটি কিছুদিন পর পর যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ার কারণে দুই হাজার সালের মে’ তে হাজার হাজার গ্যালন তেজস্ক্রিয় নোনাপানি প্ল্যান্ট থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং খোদ ব্রাজিলে এই খবর চার মাস অপ্রকাশিত ছিল। পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানিটি এই খবর সরকারকে জানায়নি। এর ফলে ব্যাপক স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হয় বিপুলসংখ্যক মানুষ।

সবাই যখন একের পর এক পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে সেখানে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দিগি¦জয় করেছে এমনটা ফলাও করে প্রচার করছে। এতে জনগণ ভীতসন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়েছে। প্রতিটি এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম এ রূপ দুটো ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে ২০২১ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে তিন থেকে চারশ কোটি ডলার। আর রাশিয়া এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং এর সার্বিক তত্ত্বাবধান করবে। অর্থাৎ রাশিয়া যেমন রিঅ্যাক্টর দেবে এবং স্থাপন করবে তেমনি এর কাঁচামাল ইউরেনিয়ামও বিক্রি করবে। স্বাস্থ্যগত, আর্থিকসহ সামগ্রিক ক্ষতির বিষয়টি যদি বাদও দেয়া হয় তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, রাশিয়া থেকে যে পরমাণু পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে তার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কোনো সামর্থ্য কি বাংলাদেশের আদৌ আছে? বাংলাদেশে কি এমন প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে যারা এ কাজ করতে পারবেন? কাজেই এই প্রকল্পটির জন্য বাংলাদেশ চিরদিনের জন্য রাশিয়া নির্ভর হয়ে পড়বে। পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানির উৎস ইউরেনিয়াম এবং সেই ইউরেনিয়ামের কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণের সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশ পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছে সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।

পৃথিবীতে ইউরেনিয়ামের পরিমাণও স্বল্প। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, হাই গ্রেড ইউরেনিয়ামের মজুদ আছে প্রায় ৩৫ লাখ টন। বর্তমানে প্রতি বছর ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ৬৭ হাজার টন। এই হারে ব্যবহার হলে বর্তমানে মজুদ ৫০ বছরের মধ্যে শেষ হবে। আর যদি পৃথিবীর বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় সবটাই যোগাতে হতো পরমাণু বিদ্যুতকে তবে তা দিয়ে চলত মাত্র নয় বছর। হাই গ্রেড লো গ্রেড মিলিয়ে এই মুহূর্তে ইউরেনিয়ামের মোট মজুদ প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ টন যার বেশির ভাগ থেকেই ইউরেনিয়াম উত্তোলন করা ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। অনেক খনি আবার ইতোমধ্যে পরিত্যক্তও হয়ে গেছে।

জাপানে ২০১১ সালের সুনামিতে ফুকুশিমা পারমাণবিক প্লান্টের ক্ষতিটি ছিল বিপর্যয়কর। ওই এলাকার আশপাশে প্রবীণ লোকদের মৃত্যুহার তিন গুণ বেড়েছে। পঙ্গু শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তেজস্ক্রিয় মাটিতে খেলার কারণে শিশুদের পা খোঁড়া হয়ে যাচ্ছে। ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয়তার শিকার হচ্ছে অন্য দেশের নবজাতকেরা পর্যন্ত। শিশুদের কণ্ঠস্বরে নানা ধরণের সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

ফুকুশিমার পাশ্বপ্রতিক্রিয়া খাদ্য শৃঙ্খলেও দেখা যাচ্ছে এবং তা বেশ ভালোভাবেই। জাপানে উৎপাদিত সবজি পর্যন্ত বিকৃত হয়ে গেছে। টমেটোতে পিণ্ড, দ্বিগুণ আকারের পিচ, বিশালাকার পাতাকপি, পাঁচটি আঙুলযুক্ত শালগম, বীভৎস রূপের সূর্যমুখী ইত্যাদি এখন সাধারণ দৃশ্য। ফুকুশিমা পারমাণবিক প্লান্টের কাছে ভূগর্ভস্থ পানিতে উচ্চমাত্রায় বিষাক্ত তেজষ্ক্রিয় আইসোটোপ পাওয়া গেছে। এই দূষিত পানি পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এত দিন পরও ফুকুশিমা পারমাণবিক চুল্লি বিপর্যয়ের রেশ কাটেনি।

এমনকি প্লান্টটি থেকে এখনো মাঝে মাঝে তেজস্ক্রিয় পানি নির্গত হয়। প্লান্টটির পরিচালনা কোম্পানি টেপকো অবশ্য মনে করছে, বৃষ্টি পানি বাষ্পীভূত হয়ে সাম্প্রতিকতম তেজস্ক্রিয় নির্গমনের কারণ ঘটিয়েছে। জাপানের কর্মকর্তারা অনেকবারই আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন যে বাণিজ্যি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্লান্ট কখনো বিস্ফোরিত হয় না। কিন্তু তাদের এই আশ্বাসের বিপরীতে সুনামিতে এক, দুই ও তিন নম্বর চুল্লি বিস্ফোরিত হয়েছিল। টেপকো প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল, ২০১১ সালের ১১ মার্চের বিপর্যয়ের পর থেকে সাগরের পানিতে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল। বিপর্যয়ের মাত্র তিন দিনের মাথায় অকুস্থলের কাছাকাছি একটি স্থানে সিজিয়ামের মাত্র ৯০ গুণ বেশি দেখা গিয়েছিল।

প্লান্টটিতে এবং আশপাশে কর্মরতদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাছাড়া আরেকটি বিপর্যয় এখনো ওত পেতে আছে। সুনামিতে চার নম্বর ইউনিটটি বিস্ফোতি হয়নি। তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভবনটির কাঠামোতেও ক্ষতি ঘটেছিল। সেখানে জমা থাকা কয়েক টন উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় বড় ধরণের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ফুকুশিমা ট্র্যাজেডির পর জাপানের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় তহুকো’র উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যের ৭০৮০ ভাগ বাজার চলে গেছে চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দখলে। এমনকি তেজস্ক্রিয়তার কারণে দূর্ঘটনা অঞ্চলের ৩০০ কিলোমিটার দূরবর্তী কায়াসু কোম্পানীর উৎপাদিত দ্রব্যের বিক্রি কমে গেছে দুইতৃতীয়াংশ। কেমন হবে যদি আমাদেরকেও এমনি কোন দূর্ঘটনার পর ষোল কোটি মানুষের চাল আমদানী করতে হয় ভিয়েতনাম কিংবা ভারত থেকে আর গম আমদানী করতে হয় অস্ট্রেলীয়া কিংবা চীন থেকে?

বিশ্ব এখন পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এ ধরণের বিপদের আশঙ্কা অনেক বেশি। মেইঞ্জের ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর কেমিস্ট্রির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো পারমাণবিক দুর্ঘটনা। এমনকি আগে যেমনটা আশা করা হয়েছিল, বিপদের ঝুঁকি তার চেয়ে ২০০ গুণেরও বেশি। মেইঞ্জের ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, আগে যতোটুকু মনে করা হতো, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক বিপর্যয়ের শঙ্কার তার চেয়ে অনেক বেশি। ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও গবেষক দলটির প্রধান জস লেলিভেল্ড বলেন, ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর এর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কার সৃষ্টি হয় এবং আমাদের পারমাণবিক মডেলে তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করি। সমীক্ষায় দেখা যায়, বিশ্বে এখন যতোগুলো পারমাণবিক চুল্লি সক্রিয় রয়েছে, তার একটিতে ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একবার দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ৪৪০টি পারমাণবিক চুল্লি সক্রিয় রয়েছে এবং আরো ৬০টি পরিকল্পনায় আছে।

আর্থিক দায়

পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং প্রযুক্তিগত অদক্ষতা ছাড়াও বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বৈদেশিক ঋণের জালে আটকে গেছে। বৈদেশিক ঋণ এবং শর্তের জালে আবদ্ধ দেশের জন্যে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাড়তি বিপদ হলো এর আর্থিক দায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় এককালীন বিনিয়োগের পরিমাণ বিপুল। আবার শুরুতে যে পরিমাণ অর্থের কথা বলা হয় তাও ঠিক থাকে না, দিন যত যায়, ততই বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়তে থাকে। পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বাংলাদেশকে সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট নিতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ যে সব দেশ সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট কিংবা নানান ব্যাংক ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেখানেই শাসক শ্রেণী লাভবান হয়েছে, জনগণ হয়েছে আরো বেশি ঋণগ্রস্ত। এর বিনিময়ে জনগণ যে নিরাপদ, নিশ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহ পেয়েছে তাও নয়।

ব্রাজিলের উদাহরণ যদি আমরা দেখি, ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত রিওডি জেনিরোতে তাদের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২ কোটি মার্কিন ডলার। ১৯৮৩ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এটির নির্মাণ ব্যয় দাঁড়ায় ২১০ কোটি ডলার। ১৯৮৩ সালে তাদের দ্বিতীয় পরমাণু কেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬০ কোটি ডলার। নির্ধারিত সময়ের ১৮ বছর পর এর ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার কোটি ডলার। তৃতীয় পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের প্রায় ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ করতেই ব্যয় হয় ২ হাজার কোটি ডলার। ব্রাজিল সরকার পরে এটি বন্ধ করে দেয়।

ফিলিপাইনে ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল ইলেকট্রিক ৭০ কোটি ডলার খরচে দুটি পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। ১৯৯২এর শেষে সবকিছু মিলিয়ে এই পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে খরচ দাঁড়ায় ২৫০ কোটি ডলার। ফিলিপাইন সরকার নিয়োজিত একটি কমিশন কেন্দ্রটিতে প্রায় ৪ হাজার ত্রুটি খুঁজে পায় এবং একে অপারেশনে যাওয়ার জন্য অনুপযোগী বলে ঘোষণা দেয়। ফিলিপাইনের বাতান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শেষ হয় ১৯৮৫ সালে। কিন্তু নিরাপত্তা ও ব্যয়জনিত কারণে এর পরিচালনা স্থগিত করা হয়। এই কেন্দ্রের কারণে ফিলিপাইন সরকার ৫ হাজার কোটি ডলার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে ফিলিপিনের জনগণের কাঁধে সুদের বোঝা চেপেছিল দৈনিক ১৭ হাজার ডলার, ২০০৩এর বছর শেষে যা গিয়ে দাঁড়ায় ১২০ কোটি ডলার। এই বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ফিলিপাইন সরকার ও ওয়েস্টিংহাউস শেষ পর্যন্ত আদালতে মুখোমুখি হয়। এক পর্যায়ে ১৯৯৫ সালে ফিলিপাইন সরকার ওয়েস্টিংহাউসকে ১০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ এবং এর সঙ্গে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব ধরনের দায়দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালে অপর একটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫০ কোটি ডলার। শেষ পর্যন্ত এর নির্মাণ ব্যয় দাঁড়ায় ৮০০ কোটি ডলার। নির্ধারিত সময়ের ১০ বছর পরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করেছিল।

ফিনল্যান্ডের অলকিলিওতোতে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে এখনো চলছে। এটি নির্মাণ করছে ফ্রান্সের বৃহৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোম্পানি ‘আরেভা’। ফিনিশ সরকারের নিকট ‘আরেভা’ পূর্ব নির্ধারিত ব্যয় দেখিয়েছিল ২৫০ কোটি ডলার যা এরই মধ্যে ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এরই মধ্যে ‘আরেভা’ অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন না করলে কাজ বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছে।

নির্মাণ খরচ : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় তিনশ থেকে চারশ কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এ কেন্দ্র থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হওয়ার কথা। কাজেই নির্মাণ ব্যয় যে কতো গুণে বাড়বে তা অপরাপর দেশের উদাহরণেই স্পষ্ট। তাছাড়া এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যে কতো হবে তা হিসেব বাংলাদেশের কাছে নেই বলেই মনে হয়।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) ২০০১ সালের এক সমীক্ষায় (ঘঁপষবধৎ চড়বিৎ রহ ঙঊঈউ) দেখা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি কিলোওয়াটে যেখানে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ডলার (নির্মাণকালীন সময়ে ঋণ নেয়া সুদের হিসাব নিলে অঙ্কটা আরো বড় হবে) ও সেখানে কয়লাতে গড়ে ১ হাজার ২০০ ডলার এবং কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস প্ল্যান্টে পড়ে ৫০০ ডলার।

২০০৩ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় সাপেক্ষ। বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন ব্যয়, উচ্চ নিরাপত্তা রক্ষা ব্যবস্থা ব্যয়, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়, ইনসুরেন্স আর ঋণ পরিশোধের খরচ হিসাবে আনলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোনভাবেই সাশ্রয়ী নয়। বরং তা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল এবং অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টিকারী। তাইতো এমআইটি’র (ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি) গবেষণায় পরমাণু বিদ্যুৎ সবচেয়ে বেশি খরচ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানিয়েছে, যদি নতুন জেনারেশনের পরমাণু চুল্লি তৈরি করা যায়, তার খরচ হবে গ্যাস, কয়লা ও বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়ে দুই থেকে চার গুণ বেশি। তাছাড়া পরমাণু ইঞ্জিনিয়ারিং এজেন্সি ও আইএইএ’র হিসাব অনুযায়ী, ২০০৪ সালে পৃথিবীতে মোট মজুদ পরমাণু চুল্লির জ্বালানি ইউরেনিয়ামের পরিমাণ ছিল এক কোটি ৪৪ লাখ টন। প্রতি কেজি ৮০ ডলারের কম দামে আকরিক হিসাবে উদ্ধার করা যাবে ৩৫ লাখ টন। আরো বেশি ইউরেনিয়াম পেতে গেলে খরচ বাড়বে বলে ইউরেনিয়ামের দামও বেড়ে যাবে, আর ইউরেনিয়ামের দাম বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ। আর সেই খরচ তুলতে সরকারকে বাড়াতে হবে বিদ্যুতের দাম।

১৯৭৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চালু পরমাণু চুল্লির সংখ্যা ছিল ৬৭টি আরো ১৫৬টি তৈরির তোড়জোড় চলছিল। পরবর্তীতে আরো প্রায় ২০০টি চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল যাতে করে দুই হাজার সাল নাগাদ ৪শটি চুল্লি স্থাপন করা যায়। বর্তমানে সে দেশে ১০৪টি চুল্লি থেকে ৯৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে টেনেসির ওয়াটসবার পরমাণু চুল্লির কাজ শেষ হয়েছিল, তারপর থেকে এখন পর্যন্ত পরমাণু চুল্লি নির্মাণের কাজ পুরোপুরি বন্ধ। ১৯৭৮ সালের পর থেকে সে দেশে ১২০টি চুল্লি স্থাপনের প্রস্তাব ও পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। বাতিল করার কারণ হিসেবে অত্যধিক খরচ, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ সংরক্ষণের সমস্যার কথা বলা হয়েছে। অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ বলে অন্তত ৫টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েকটি ক্ষেত্রে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করার পর সমাপ্ত প্রায় কেন্দ্র নির্মাণের কাজ বাতিল করা হয়েছে। ১৯৭১ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারে সমুদ্রতটের কাছে দুটি পরমাণু চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। খরচ ধরা হয়েছিল ৯০ কোটি ডলার। ১৯৮৮ সালে যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লাইসেন্স পাওয়া যায় ততদিনে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬০০ কোটি ডলারে। কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। লং আইল্যান্ডের শোরহ্যামে পরমাণু চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হলে ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। মামলাটি দীর্ঘদিন চলে। এর মধ্যে কেন্দ্রটি নির্মাণের খরচ দাঁড়ায় ৫৪০ কোটি ডলারে। কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মুখে ওই কেন্দ্রটি নিউইয়র্ক কর্তৃপক্ষ মাত্র এক ডলার মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছিল। ১৯৮২ সালে এনআরসি ১০ লাখ ডলার ব্যয়ে কেন্দ্রটির ডিকমিশনিং অনুমোদন করে।

সুইডেনে শেষ পরমাণু চুল্লি নির্মাণের কাজ হয়েছিল ১৯৮৫ সালে, স্পেনে ১৯৮৮, জার্মানিতে ১৯৮৯, ইংল্যান্ডে ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৮ সালে জার্মান সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, সে দেশের সবকটি চুল্লি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেয়া হবে। দুই হাজার সালের মধ্যে ফ্রান্সে দুশটি পরমাণু চুল্লি চালু হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে চালু চুল্লির সংখ্যা মাত্র কয়েকটি। নতুন চুল্লি নির্মাণেরও পরিকল্পনা নেই। ফ্রান্সে ইলেকট্রিসাইট দ্য ফ্রান্সের মতো সরকারি সংস্থা বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার মালিক হওয়া সত্ত্বেও বিপুল খরচের দায়ে তারা দিশেহারা। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের বর্তমান ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৩শ কোটি ডলার।

বিকল্প পন্থায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বর্তমান হিসাব অনুযায়ী ৪শ কোটি ডলার খরচ করে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, বিভিন্ন দেশের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক যে হিসাব দেয়া হয় শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় কয়েকগুণ বেশি। অথচ ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে খরচ হয় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৪শ কোটি ডলার বা প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এ রকম ২৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সম্ভব, যেখান থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় অনেক গুণে বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) কয়লা, গ্যাস ও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয়ের যে হিসাব দিয়েছে, সেখানেও দেখা যায়, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ খরচ অনেক বেশি। আইইএ হিসাব মতে, একটি ২৫০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের খরচ হয় ১ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে আইইএ’র হিসাবে ২৫০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে খরচ হয় ১ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। তাহলে দেখা যাচ্ছে, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিকল্প হিসেবে অন্য পথ গ্রহণ করলেই ঝুঁকিবিহীন বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এছাড়া বায়ু ও সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ খরচ আরো কম। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালনা ব্যয় জ্বালানি তেল, কয়লা, গ্যাস, পানি, বায়ু ও সোলার এনার্জির চেয়ে অনেক গুণে বেশি। এখানে স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্ভাবনাও নেই। তাহলে বাংলাদেশ এই বিপজ্জনক ও বাড়তি খরচের পথে এগুচ্ছে কেন?

শেষ কথা : পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে আধুনিক সকল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, কাজেই এতে আর কোন ঝুঁকি নেইকথাটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন। কিন্তু জাপানের মতো দেশে প্রযুক্তি যখন ফুকুশিমা ট্রাজেডি ঠেকাতে পারে না তখন বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় এবং ভবিষ্যৎ কি হতে পারে তা যেকোনো বুদ্ধিজ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরই বোঝার কথা। ফুকুশিমা ট্র্যাজেডির পূর্বে এত বিশাল পরিমাণ ধবংসযজ্ঞের কোন ধারণাই তাদের ছিল না। ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল পারমাণবিক দূর্ঘটনার পর সকল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভবিষ্যৎ যে কোন ধরণের ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুত বলা হলেও ২০১১ তে এসে জাপানের মত প্রযুক্তিতে উৎকর্ষতা অর্জনকারী দেশে বিপর্যয়কারী ফুকুশিমা দূর্ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যা ঘনত্বের কারণে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। এদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে গড়ে বাস করে প্রায় ১২০০ জন। যে কোন পারমাণবিক দূর্ঘটনার প্রথম ধাক্কাতেই কয়েক হাজার মানুষ মারা যাবার সম্ভাবনা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক। ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল দূর্ঘটনার সময় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে স্থানীয় জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল মাত্র ৬৩ জন। দূর্ঘটনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রাইপাট নগরীকে ঘিরে আশেপাশের ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূর্গত অঞ্চল ঘোষণা দিয়ে প্রায় আড়াই লক্ষ বাসিন্দাকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। সেই দূর্গত অঞ্চল আজও পরিত্যক্ত, জনমানবহীন।

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোনো দুর্ঘটনায় যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে তা সামাল দেয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। জাপানের মতো উন্নত দেশও এখন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপর্যয় এড়াতে পারছে না। ফুকুশিমা,চেরোনোবিল, থ্রি মাইল আইল্যান্ডের মতো বড় বড় দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে প্রযুক্তির দিক দিয়ে শীর্ষে অবস্থানকারী দেশগুলোতে। যারা নিজস্ব দক্ষতাকে কেন্দ্র করে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল। আর বাংলাদেশের মতো দেশের যেখানে সামান্য পানি, তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো দু’দিন পর পর বিকল হয়ে যায় এবং মেরামতের অভাবে পড়ে থাকে বছরের পর বছর সেখানে পরমানু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি ভালোভাবে চলবে সেটা কল্পনাও করা যায় না।

বিদ্যুৎ বিশেজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় খাতে যে একত্রিশটি কেন্দ্র রয়েছে তার পেছনে মাত্র ১৩শ কোটি টাকা খরচ করলে এবং কিছু লোকবল বাড়ালে ২১শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হতো। বর্তমানে গ্যাসের অভাবে এক হাজার মেগাওয়াট এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মেরামত না করায় ১১শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। বিশেষজ্ঞ বি ডি রহমতউল্লাহ বলেন, সর্বোচ্চ ৩শ কোটি টাকা ব্যয় করে মেরামতী কাজ সম্পন্ন করলে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে ১১শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেতো। আর বাপেক্সকে সর্বোচ্চ ১ হাজার কোটি টাকা এবং লোকবল শ দেড়েক বাড়ালে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতো। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে (ভবিষ্যতে যার ব্যয় আরো বাড়বে) মাত্র ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, একই অর্থ ব্যয়ে ডিজেল বা গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলে ১ হাজার ৭শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে ‘সুনির্দিষ্ট কারণেই’ রাশিয়া থেকে ঋণ এনে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। বি ডি রহমতউল্লাহ আরো বলেন, সরকার কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থাপনের কারণে ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকা বেশি গচ্চা দিয়েছে। এই ৬০ হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যয় করলে কতো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেতো? কুইক রেন্টাল নিয়েও অনেক কথা শোনানোর মাধ্যমে চরম লুটপাট শেষে এখন প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।।