Home » আন্তর্জাতিক » মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ৪)

মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ৪)

মাত্র দু’টি রাজনৈতিক পক্ষ

আইজাজ আহমদ

egypt-2বেশির ভাগ পাশ্চাত্য বামপন্থীসহ পশ্চিমা দুনিয়ায় সাধারণভাবে প্রচার করা হয়ে থাকে যে, মিশরে মাত্র দুটি রাজনৈতিক পক্ষ রয়েছে : একটি ইখওয়ান এবং অপরটি সামরিক বাহিনী। পক্ষ দুটি যথাক্রমে গণতান্ত্রিক বৈধতা (মুরসির নির্বাচিত সরকার) এবং স্বৈরাচারের (আলসিসির ‘অভ্যুত্থান’) প্রতিনিধিত্ব করে বলে প্রচলিত মত রয়েছে। এই ধারণায় মজে থেকে মিশরকে তখন এই দুটি পক্ষের মধ্যকার সংগ্রামের চশমা দিয়ে দেখা হয়। আরো অনুমান করা হয়ে থাকে যে মিশর এবং আরো সাধারণভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো ইসলামবাদী বিভিন্ন গ্রুপ (জেহাদি/ওয়াহাবি/তাকফিরি ইসলাম) বনাম ‘উদার’ (নির্বাচনবাদী) ইসলামের মধ্যে ভয়াবহ লড়াইয়ে নিমজ্জিত। এই ধারণা থেকেই দ্রুত সালাফিপন্থীদের (সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত) বিপরীতে ইখওয়ান আনকূল্য লাভ করে, সেক্যুলারবাদ ব্যর্থ বলে ধরে নেওয়া হয়। এই সূত্র ধরেই ইখওয়ান তৃতীয় বিকল্প হিসেবে সোনালি মধ্যপন্থী দলের প্রতিনিধিত্বকারী বিবেচিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ পাশ্চাত্য বামপন্থী তিনটি পরিণতি মেনে নিয়েছে। প্রথমত, তুলনামূলক স্বল্পবাক বিপুল জনগোষ্ঠীর (নিজেদের মধ্যকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ) গণআন্দোলনকেযারা ইখওয়ানও নয় কিংবা স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বনকারীও নয়মূল্যায়ন না করা। দ্বিতীয়ত, ইখওয়ানকে আন্ডারডগ বিবেচনা করা। তৃতীয়ত, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে লক্ষ করছে যে, অতি সম্প্রতি ইখওয়ানের অনুসারী হওয়া পাশ্চাত্যের সরকারগুলো ইখওয়ান নেতৃত্বাধীন ‘গণতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে ‘অভ্যুত্থান’ সত্ত্বেও মিশর সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীকে সাহায্য হ্রাস করতে অনীহা প্রকাশ করা।

মিশরে কেবল দুটি প্রধান রাজনৈতিক পক্ষ (সামরিক বাহিনী ও ইখওয়ান) আছে এবং তাদের একটিকে বেছে নিতে হবেএই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। তৃতীয় একটি পক্ষ আছে এবং সেটা হলো গণআন্দোলন। প্রথম দুটি পক্ষ (সামরিক বাহিনী ও ইখওয়ান) অত্যন্ত সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এবং তারা ক্ষমতার লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার মতো সামর্থ্য রাখে। এই দুটি পক্ষের চেয়ে গণআন্দোলন অনেক বড়, তবে তারা খুবই অসংগঠিত। সন্দেহ নেই যে মিশরে একটি সুসংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে সুসংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন বেশ ভালোভাবেই আন্দোলন পরিচালনা করছে। আর ২০১১ সালের জানুয়ারির পর থেকে তারা কেবল সংখ্যাতেই বাড়েনি, অভিজ্ঞতা এবং বিচক্ষণতাও অর্জন করেছে। এছাড়াও মার্কসবাদ, সমাজতন্ত্র, ট্রটস্কিবাদসহ বিভিন্ন বাদের ছায়ায় ছোট ছোট বামপন্থী দলের অস্তিত্বও রয়েছে। এপ্রিল ৬ আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল মিশরের শ্রমিকদের ধর্মঘটের সমর্থনে। এই স্বতন্ত্র গ্রুপটি এখন গণআন্দোলনের সূচনা এবং সুসংগঠিত প্রতিবাদের মধ্যে বাস্তবসম্মত সংযোগকারীর ভূমিকা পালন করছে। নাসেরবাদীদের মধ্যে উগ্রপন্থীও রয়েছে। আরো আছে স্বায়াত্তশাসিত নারীদের গ্রুপ, ছাত্রদের সংগঠন, প্রতিবেশি কমিটি ইত্যাদি, ইত্যাদি। তাই একথা বলা যায় না যে জনগণের আন্দোলন একেবারেই সংগঠিত নয়।

অবশ্য, বারবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সাধারণ গণঅভ্যুত্থান সংগঠনকারী ব্যাপকতর এই ঐক্য এমন কোনো টেকসই সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি যা সময়ের পরিক্রমায় (মাসের পর মাস, কিংবা এমনকি বছরের পর বছর ধরেও) আন্দোলনের বক্তব্য প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থাসংবলিত জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দৃঢ় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তামারুদ হঠাৎ করেই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছিল। ৩০ জুনের মাত্র দুই মাস আগে একে দেখা গেল এবং ঘটনা পরম্পরায় প্রধান মঞ্চ দখল করে নিল। কোত্থেকে এটা শক্তি পেল? বিশ্বাসযোগ্য খবর রয়েছে যে, মোবারকপন্থী ও নাসেরবাদীরা এর তহবিল জুগিয়েছে। এই খবর সত্য হতে পারে, নাও হতে পারে। তবে সন্দেহ করার অবকাশ রয়েছে।

নেতৃত্ববিহীন আন্দোলনের সাফল্যের মতো স্বতঃস্ফূর্ত মতবাদেরও প্রচণ্ডতা আছে। গণআন্দোলনের জনসংখ্যাগত আকার ও উগ্রতা ঘটনাপ্রবাহের অবয়ব অনেকাংশেই নির্ধারণ করতে পারলেও কেবল সুসংগঠিত শক্তিই, সেটা ইখওয়ান বা সামরিক বাহিনীই হোক না কেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাবিদার হওয়ার সামর্থ্য রাখে। মোবারকের বিরুদ্ধে গণউত্থানের সময় সেক্যুলার গণআন্দোলন ইখওয়ানের সঙ্গে জোট গড়ে তুলেছিল। কিন্তু তারপরই তারা নিজেরাই অসংগঠিত হয়ে যাওয়ায় দেখতে পেল যে ইখওয়ান সুপরিকল্পিতভাবে নির্বাচনী ক্ষমতা দখল করে ফেলেছে। ইখওয়ানের ক্রমবর্ধমান স্বৈরতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিকতম আগাম আন্দোলনের সময় গণআন্দোলন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জোট গড়ে। কিন্তু তারপর নৃশংস পদ্ধতি অনুসরণ থেকে ইখওয়ান বা সামরিক বাহিনীকে বিরত রাখার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থার পরিবর্তন কেবল তখনই সম্ভব যখন গণআন্দোলন প্রগতিশীল সামাজিক রূপান্তরের জন্য তার নিজস্ব সুস্পষ্ট এজেন্ডা প্রণয়ন করতে পারে, ওই এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, এবং ডানপন্থী অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে জোট গড়তে বাধ্য না হয়েই নিজস্ব সাংগঠনিক সামর্থ্য বিকশিত করতে পারে।।

(ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে)

(চলবে…)