Home » রাজনীতি » একদলীয় নির্বাচনের দিকে যাত্রাই প্রধানমন্ত্রীর আসল উপহার

একদলীয় নির্বাচনের দিকে যাত্রাই প্রধানমন্ত্রীর আসল উপহার

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

election-3ঈদুল আজহার আগে অসমাপ্ত যাত্রাবাড়ি উড়াল সড়ক উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী, দেশবাসীকে ঈদের উপহার দিলেন তিনি। কিন্ত এই মুহুর্তে জাতির কাছে যেটি সবচেয়ে প্রার্থিত ও প্রত্যাশিত, একটি নির্দলীয়নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তার ধারেকাছে দিয়েও তিনি গেলেন না! যা ঈদের আগে আগত দিনের ভয়াল শঙ্কাআতংক দুর করে জনগনকে নিয়ে যেতে পারতো সামান্য হলেও স্বস্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে। তার বদলে রূপপুর পারমানবীক প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, চট্টগ্রামে উড়াল সড়ক প্রকল্পএসবের মধ্য দিয়ে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর যে চেষ্টা করছেন, তাতে আর যাই হোক, জনগনের ভয়াল শঙ্কাআতংক দুর করতে পারছে না। পাশাপাশি নাভিশ্বাস ওঠা জনগন ঈদের আগেই প্রধানমন্ত্রী বা তার সরকারের কাছ থেকে পেয়ে গেছে আরেকটি উপহার, তা হচ্ছে পেঁয়াজের চরম ঝাঁজ, পেঁয়াজের কেজি এখন মাত্র ১১০ টাকা!

সরকার ও বিরোধীদলের ‘গিনিপিগ’ জনগনের মধ্যে এখন প্রশ্ন একটিই, ২৫ অক্টোবর কি ঘটবে? বর্তমান সরকার আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হবে, একতরফা নির্বাচন করবে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি সেই নির্বাচন প্রতিহত করবেএরকম অবস্থায় জনমনে এখন প্রশ্নের কোন শেষ নেই। বিরোধী দলের সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার দাবির মুখে ২৪ অক্টোবরের পরেও, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত সংসদের চলতি অধিবেশন চালানোর ঘোষণা এবং ঢাকায় পাল্টাপাল্টি সমাবেশ আহ্বানের কারণে ২৫ অক্টোবরকে ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা, জনমনে ছড়িয়ে পড়ছে উদ্বেগ, উৎকন্ঠা।

একথা ঠিক যে, বাংলাদেশে দিনতারিখক্ষণ ঘোষণা করে কোন দলই কিছুই করতে পারেনি যতক্ষণ না জনগন তাতে সম্পৃক্ত হয়েছে। ইতিপূর্বে বিএনপি জোট সরকারের আমলে সম্ভবত: ২০০৪ সালের ৩০ এপ্রিল সরকার পতনের ডেটলাইন ঘোষণা করেছিলে তখনকার আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক বর্তমানে প্রয়াত আবদুল জলিল। বর্তমান আমলে একাধিক ডেটলাইন দেয়ার পরে চলতি বছরের ৫ মে সরকারকে সবশেষ আলটিমেটামটি দিয়েছিলেন খোদ বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সুতরাং ২৫ অক্টোবর নিয়ে আতংকের কারণ হচ্ছে, সরকার ও বিরোধী দল রাজধানীতে শক্তি প্রদর্শনের কিংবা বড় ধরণের মহড়ার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটি নিয়ে তৈরী হয়েছে শঙ্কা ও আতংক। কারণ জনগনের স্মৃতিতে জ্বলজ্বলে রয়েছে ২০০৬ সালের আগষ্টে ‘লগিবৈঠার’ মিছিলে শক্তি প্রদর্শন এবং প্রতিপক্ষ বিএনপিজামাত জোটের শক্তির মহড়া। একদিনেই নিহত হয়েছিল ৫৩ জন মানুষ, এর চুড়ান্ত ও অবধারিত পরিনতি ছিল ১/১১ এর সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকার।

পরিস্থিতি যখন এরকম, এই চরম অনিশ্চিত পরিস্তিতিতেও প্রধান দুই দলের নেত্রীর বক্তৃতাবিবৃতির মধ্যে শান্তিস্বস্তি বজায় রাখার বিষয়টি আদৌ গুরুত্ব পাচ্ছে না। জনগনের শঙ্কার জায়গাটা সেখানেই। একতরফা নির্বাচনের উদ্যোগ কিংবা তা প্রতিহত করতে সর্বদলীয় সংগ্রামকমিটি ঘোষনার মধ্য দিয়ে আশঙকা আরো পকাপোক্ত হতে শুরু করেছে যে, দেশ এগোচ্ছে এক অনিবার্য সংঘাতের দিকে, যা থেকে সম্ভবত:এ যাত্রাও পরিত্রান নেই। একতরফা নির্বাচন হলে তা সহিংস ও প্রশ্নবীদ্দ হতে বাধ্য। ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে সে অভিজ্ঞতা এ দেশের মানুষের রয়েছে এবং সে রকম সংসদ ও সরকারের জাতীয়আন্তর্জাতিক গ্রহনযোগ্যতার বিষয়টিও সকলের ভালভাবে জানা। সে কারণে নির্বাচন হতে হবে দলনিরপেক্ষ অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। সংখ্যাগরিষ্ট ভোটার ভোট কেন্দ্রে যাবেন, সে পরিবেশ থাকতে হবে এবং এর মুখ্য দায় সরকারকেই নিতে হবে। সামরিক সরকারগুলো জনগনের ওপর জবরদস্তি নির্বাচন চাপিয়ে দিত, পরবর্তীকালে নির্বাচিত সরকারগুলো যথন সেই চেষ্টা শুরু করেছিল, তখনই জনগন তত্বাবধায়ক সরকার ব্যাবস্থার ওপর আস্থাশীল হয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীনরা সেই ব্যাবস্থা বাতিল করে দিয়ে সবার কাছে গ্রহনযোগ্য নির্বাচন ব্যাবস্থাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। বাংলাদেশে কেউ কি নিশ্চয়তা দিতে পারেন, কোন দলীয় সরকারের অধীনে কোন অবাধ, সুষ্ঠ নির্বাচন সংঘটিত হয়েছে বা আদৌ হবে?

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়ে নির্বাচনমূখী গনতন্ত্রের যে ধারাটি গড়ে উঠছিল, তাকেও হুমকির মুখে ফেলে দেয়া হচ্ছে। নির্বাচন বিষয়ক সকল জরিপ ও ধারনাগত সূচকগুলি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, মানুষ সকল দলের অংশগ্রহনে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। এখানে তো জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রশ্ন নেই। যে পারসেপশন ও বাসনা নিয়ে জনগন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, পাঁচ বছরের মাথায় সেই জনগনই যদি তাদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে থাকে সে ব্যার্থতা তো তাদেরই। আর যদি তাদের কর্মফলে জনগন যদি আবার ক্ষমতায় বসায়, নিশ্চয়ই তারা তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে পারবে। আসলে গনতন্ত্র মানে তো সমঝোতা। গনতন্ত্র যে শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়,এই সহজ সত্যের ধার ধারেনা বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন বা বিরোধীকেউই। ফলে দেশে সংবিধান আছে, সমঝোতা নেই, সমঝোতার বদলে দুই দলের যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেশ ও জনগনকে ঠেলে দিয়েছে খাদের কিনারে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীনরা প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রেখে নির্বাচনের পরিকল্পনা চুড়ান্ত করে ফেলেছে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধী দলের সমঝোতা করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর যেহেতু আগ্রহ নেই, সে কারণে দলের সকল নেতাই এখন বক্তৃতাবিবৃতিতে অত্যন্ত আগ্রাসী। ক্ষমতাসীন দল বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান ও জাতীয় সংসদ বহাল রাখার ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়ে ফেলেছে, এক্ষেত্রে জনমত যাই থাকুক। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে অনমনীয় বিএনপি একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন প্রতিহত করার আন্দোলন দমিয়ে রাখতে বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে আভাস মিলেছে।

সরকার মনে করছে, বিএনপি আন্দোলন করে সরকারকে চাপে ফেলতে পারবে না। তারা আরো মনে করেন, নির্বাচন বর্জন করলেও বিএনপি তা প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না। বিএনপিকে বাদ দিয়েই নির্বাচন করে ফেলা যাবে, এমত ধারনা নিয়েই ক্ষমতাসীনরা অগ্রসর হচ্ছে। কিন্ত এই নির্বাচনটি কখন হবে, কিভাবে হবে, সে বিষয়টিও রহস্যের জালে ঘিরে রাখা হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর শর্তে রাজী হয়ে বিরোধী দলকে নির্বাচনে আসতে হবে! এজন্য তিনি প্রতিদিন তত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরছেন, সংবিধার অনুযায়ী এক দিনের জন্য অনির্বাচিতরা দেশ চালাতে পারে না। প্রধানমন্ত্রীর কথা মেনে নিলেও একটি প্রশ্নের জবাব কি তিনি দেবেন, বছরের পর বছর ঢকা সিটি কর্পোরেশন অনির্বাচিত ব্যাক্তিরা চালাচ্ছে সংবিধানের কোন ধারা বলে? ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তো পরিস্কার বলা ছিল, স্থানীয় সরকারের সকল পর্যায়ে নির্বাচন করতে হবে। তাহলে কি জনগন বিশ্বাস করবে যে, ক্ষমতানীনরা সবসময় নিজেদের সুবিধামত সংবিধান ও আদালতের রায়কে ব্যবহার করেন!

একথা বাংলাদেশের সকলেই জানে, স্বৈরশাসকরা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনায় জনগনের ভোটের অধিকার হরণ করে। সামরিক শাসনের গর্ভে জন্ম নেয়া দলগুলি নির্বাচন নিজেদের মত করে করতে চায়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল করে যেভাবে গনতন্ত্র ও ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ কি সেই পথে হাঁটছে? প্রধানমন্ত্রী তো প্রায়শ: দাবি করে থাকেন, বহু ত্যাগ ও সংগামের মধ্য দিয়ে তিনি এবং তার দল জনগনের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই অধিকার কি আবার তিনিই হরণ করতে যাচ্ছেন! তাঁর তো জানাই রয়েছে, এতরফা নির্বাচনের ফল কি হয়, কি হতে পারে! সে রকম একটি নির্বাচনে কত মানুষের প্রাণ যাবে, কত সম্পদ বিনষ্ট হবে!

নির্বাচনের শেষ বছরে এসে প্রধানমন্ত্রী বা তার দল যতই উন্নয়নের কথা বলুক, যত উপহার দিন না কেন, ২০০৮ সালে ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারের বিপরীতে জনগনে সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা ও ‘প্রতারণার’ দায়ে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ জানে একটি সমতল মাঠে অবাধ, সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিনাম তার জন্য কতটা বিপর্যযকর হতে পারে! ২০০৮ সালে যেমনটি দাঁড়িয়েছিল বিএনপির ক্ষেত্রে। যত আত্মতৃপ্তির ঢেকুর এখন বিএনপি তুলছে আসন্ন ক্ষমতার নেশায় বিভোর হয়ে, আগামি পাঁচ বছর পরে তাদের পরিনতি তো একই রকম হবে। জনগনের বিপরীতে নেতিবাচক রাজনীতির পরিনাম কি হতে পারে, তার পূনারাবৃত্তি এ দেশে বারবার ঘটছে, ঘটতেই থাকবে, যতদিন পর্যন্ত না জনগনের চাহিদা ও দাবির পক্ষে দল এবং নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।।