Home » রাজনীতি » বিপজ্জনক বাঁকে দেশ – ২৫ অক্টোবর এবং পরের দিনগুলো

বিপজ্জনক বাঁকে দেশ – ২৫ অক্টোবর এবং পরের দিনগুলো

আবীর হাসান

election-cartoon-2ছুটিটা দীর্ঘ বটে। কিন্তু এ ছুটিতে কর্মহীন শান্তি, স্বস্তি বা আনন্দ কোনটাই বাংলাদেশের মানুষের মনে নেই। পূজার ছুটির সঙ্গে ঈদের ছুটির জোড় লেগেছিল অর্থাৎ এদেশের প্রধান দুই ধর্মাবলম্বী মানুষের ‘আনন্দ উৎসব’ এক সঙ্গে এসেছে। কিন্তু দুশ্চিন্তাহীন উদযাপনের ভাগ্য ছিল না কারোরই। কারণ রাজনীতিটাই গোলমেলে হয়ে রয়েছে যা এ দেশের মানুষকে সবচেয়ে আতঙ্কিত করে। অনাগত নিকট ভবিষ্যতের জন্যই আতঙ্ক বেশি। আর সে কারণেই নাড়ির টানে যাতায়াতেও দেখা গেছে মানুষের ব্যতিব্যস্ততা। অস্থিরতার কাঁটা খুঁচিয়ে চলেছে সবাইকে ক্রমাগত।

এ দেশের তাবড় তাবড় রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিংবা তুখোড় টকশো স্পেশালিস্ট কেউই বলতে পারছেন না কী হবে। অনেকে বলছেন দুই বড় দল পরস্পরের বিরুদ্ধে নোংরা কাদা ছোঁড়াছুড়ি করছে একে বাদ দিয়ে ওকে আনলেও কোন লাভ হবে না; তাই চাই তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু এটা সম্ভবত এখনকার সঙ্কট মোচন করতে না পারার প্রতিক্রিয়ায় অক্ষম তত্ত্ব। ওই তৃতীয় চতুর্থ বা পঞ্চম অনেক দূরের ব্যাপার, আগে তো দূর করতে হবে এখনকার অচলাবস্থা অথবা সঙ্কট।

সঙ্কট নেই’ যারা বলছেন সেই সরকার দলীয় নেতারা, তারাও যে একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তা অস্বীকার করতে পারছেন না তাদের এই অস্থিরতার বর্হিপ্রকাশ ঘটেছে গত ৯ অক্টোবর জাতীয় সংসদে এবং মেঠো বক্তৃতায়। সব কিছু বহাল এবং জারি রেখেই নির্বাচন পর্যন্ত বলতে চান তারা। সেটা পারলে মন্দের ভালো। কিন্তু ‘ঘরোয়া ধরণের’ যে রাজনীতিটা এতদিন চলছিল সেটা আর থাকছে না জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিভিন্ন লাউঞ্জ অথবা ডিআরইউতে। দেয়াল ঘেরা অবস্থান ছেড়ে রাজনীতি বেরিয়ে আসছে রাজপথে এবং তা সম্ভবত ২৫ অক্টোবরেই। ওই দিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সমাবেশ ডেকেছে আওয়ামী লীগ আর স্থান নির্ধারিত না হলেও রাজধানীতে শোডাউন করার অভিপ্রায় আছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের।

এ যেন এক মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। ইউরোপ আমেরিকার দিকে গিয়ে লাভ নেই। এই উপমহাদেশের একটি মহাভারতের উদাহরণ যদি আমরা টানি তাহলে দেখতে পাব কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধও অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের পর পরই ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে যায় যদিও দিনক্ষণের ঠিক ছিল না তখনও। তারপর জতুগৃহদাহ আর খান্ডবদাহনের পর যুদ্ধের প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন কুরুপান্ডবের মহারথীরা যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। হ্যাঁ এখনও আমরা যেমন বলছি তখনও প্রবীণ মহারথী ভীষ্ম, দ্রোন এবং অন্যান্যরা আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু কার সঙ্গে কার আলোচনা? দুই পক্ষের রাজন্য বর্গ যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কিন্তু আলোচনায় সমাধানের আশা ছাড়েননি। তবে সব সম্ভাবনার দীপ যখন নিভে গেল, তখন কর্ণকুন্তী সংলাপ অর্থাৎ ছেলের সঙ্গে মায়ের সংলাপের কথা বলেছিলেন কেউ কেউ। পঞ্চপান্ডবের মা কুন্তীরই আর এক সন্তান (সূর্যদেবের ঔরষে) ছিলেন কর্ণ। কুরু পক্ষের প্রধান যোদ্ধা তিনি, দুর্যোধনদের পক্ষ নিয়েছিলেন নানা বঞ্চনঅভিমান এবং ক্রোধবশত। কিন্তু মা কুন্তীকে তিনি সম্মান করতেন। সে কথা মেনেই প্রস্তাবটা দেয়া হয়েছিল কুন্তীকে যেন তিনি ভ্রাতৃঘাতী ওই যুদ্ধ বন্ধে কর্নের সঙ্গে কথা বলেন। কুন্তী রাজিও হয়েছিলেন এবং সবাই জানত কুন্তীর আদেশ বা অনুরোধ একেবারে অমান্য করবেন না কর্ণ। অন্তত তাকে নিরপেক্ষ রাখা যাবে। কুন্তী তৈরি কিন্তু বাধ সাধলেন শ্রী কৃষ্ণ। তিনি বললেন, ‘কর্ণকুন্তী সংলাপে একচুল যুদ্ধ ফিরবে না।’ ফেরেওনি। সংলাপ হয়েছিল কিন্তু যুৎসই কোন ফল ফলেনি।

আমরাও এখন সংলাপ নিয়ে আলোচনা করছি, বলছি সংলাপ হতে হবে। দোহাই পাড়ছি গণতন্ত্রের দোহাই দিচ্ছি সহিষ্ণুতার সদমনোবৃত্তির। কিন্তু কার সঙ্গে কার সংলাপ? ছুটির ক’দিন আগে চীনা রাষ্ট্রদূতের একটি প্রস্তাব নিয়ে মৃদু আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাবটা ছিল মহাসচিব পর্যায়ের আলোচনা প্রসঙ্গে। চীনা রাষ্ট্রদূত বিরোধী দলীয় নেত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। কিন্তু তার পরপরই ক্ষমতাসীন নেতারা সে প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। তারা টেনেছেন অতীতের উদাহরণ। সেই ‘জলিল ভূঁইয়া’ সংলাপের বিষয়টা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। মনে আছে ওই সংলাপ নিয়ে অপসাংবাদিকতার রগঢ়ও।

আসলে রূঢ় বাস্তবতাও এটাই যে, ওই মহাসচিব সাধারণ সম্পাদক স্তরের বৈঠক থেকে ফলপ্রসূ কিছু হবে না। হওয়ার অবস্থায় এখন কোনো দলই নেই। কর্ণ যেমন কুন্তীর সন্তান ছিলেন তেমনি প্রধান যোদ্ধাও ছিলেন। আবার কুরুপক্ষের প্রধান মন্ত্রণাদাতা হলেও যুদ্ধের নিয়ামক শক্তি ছিলেন না, তেমনি কুন্তী পান্ডবকূলের অভিভাবক ছিলেন বটে কিন্তু যুদ্ধ ফেরানোর মতো ক্ষমতা তার ছিল না। তেমনি এখনকার আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক কিংবা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব একত্রে বসে কুশল বিনিময় ছাড়া আর কীই বা করতে পারেন। তাদের উভয়ের দলের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা তো তাদের হাতে নেই। বিতর্ক চলতে পারে এই নিয়ে যে কার কতোটুকু বেশি বা কম ক্ষমতা আছে! কিন্তু সঙ্কট যে পর্যায়ে গেছে সে পর্যায়ের সমাধান যে তাদের কাছে নেই তা নিশ্চিত।

কেউ কেউ বলছেন দু’দলের দু’প্রধান যদি বসেন। এই যদিটাই হচ্ছে সব অনিশ্চয়তার মূলে। অপ্রিয় হলেও সত্য এটাই যে, সম্ভাবনা নেই একটুও। অর্থাৎ দুই নেতা ছুটির পর আলোচনায় বসবেন এমন কোন সঙ্কট এখনও সৃষ্টি হয়নি তাদের সামনে। সমাধান তো অনেক দূরের ব্যাপার।

সত্যি সত্যিই আমাদের বুঝতে হবে যে, দুই নেতা এখন পর্যন্ত কোন চাপ অনুভব করছেন না যে তাদেরকে আলোচনায় বসতে হবে কূটনীতিবিদ, জাতিসংঘ মহাসচিব বা বাইরে থেকে যে যাই বলুন না কেন। হ্যাঁ, জনসাধারণের মধ্যে অস্থিরতা, আস্থাহীনতা, আতঙ্ক সবই আছে, তারা দুর্দিনের আশঙ্কাও করছে কিন্তু এমন কোন কাজও তারা করতে পারেনি যাতে দু’নেতা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কায় কোন তৃতীয় রাজনীতি শক্তিকে ঠেকাতে একত্র হবেন! বসবেন এবং সমঝোতায় আসার চেষ্টা করবেন।

আশ্চর্য বা ব্যতিক্রমী মনে হলেও লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, জনস্তরের মনমানসিকতায় দু’দল ভিন্ন এখন পর্যন্ত অন্য কোন প্রভাব নেই। তবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, জনসাধারণ একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করে।

আসলে এই নির্বাচনের আশাটাই হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের মূল গণতান্ত্রিক লক্ষ্য। এদেশের মানুষের মধ্যে রাজনীতিকরণের যে বৈশিষ্ট্য তা নির্বাচনকেন্দ্রীক। এই বিষয়টা শান্তিপূর্ণ থাকলেই তারা সন্তুষ্ট থাকে। এখন প্রশ্ন্ হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের এই মানসিকতার কতোটা মূল্যায়ন করে?

সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে এই মূল্যায়নের বিষয়টা সোজাসুজি নেই। পথটা বিপজ্জনক বাঁক নিয়েছে এবং তাই আশা এবং আশঙ্কার দোলাচলে পড়ে গিয়ে অস্থির সময় কাটাচ্ছে মানুষ। আসলে মানুষ আশা করছে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের রোড ম্যাপের। আগের জামানা নেই, পাল্টাপাল্টি শোডাউন ও সক্ষমতার সবটুকু বোঝাতে পারবে না। উবে গেছে সংলাপের আশাও। তাই এখন যার যে দায়িত্ব তা পালনের বিকল্প নেই। দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে গেলে তা আর পালনযোগ্য থাকে না এটাও সত্যি।

প্রশ্ন উঠতে পারে দায়িত্বশীলরা কোন সীমা লঙ্ঘন করেছেন? সীমাটা হচ্ছে গণতন্ত্রের, যা অলিখিত। হয়তো তাদের একাংশ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে চান কড়াকড়িভাবে। কিন্তু তারা নিজেরাই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সে দায়িত্বের সীমা বা পরিধি বাড়িয়ে ফেলেছেন এবং তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এখন বিতর্ক চলছে। অন্যপক্ষে প্রধান বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির পক্ষে আন্দোলনের দায়িত্ব নিয়ে তাদের দায়িত্বের সীমাও বাড়িয়ে ফেলেছে।

এখন সামনে যেটা লাগবে তা হলো দায়িত্ব পালনের ঠোকাঠুকি। অনেক অনেক শিক্ষার পর গণতন্ত্রের সীমা কোন পক্ষই লঙ্ঘন করবেন না এটাই দেশের মানুষ আশা করে। আন্দোলন নৈরাজ্যিক হবে যদি দমনপীড়ন স্বৈরতান্ত্রিক হয়। দুই প্রবনতাই যে প্রবল হয়ে উঠেছে এটাই অপ্রিয় সত্য। আরও অপ্রিয় সত্য এই যে, দুপক্ষই যেন মনে করছে এটাই শেষ সুযোগ আর কোন সুযোগ আসবে না। তাই দায়িত্বের সীমা তারা বাড়িয়েছেন কিন্তু সে দায়িত্ব পালন তারা করতে পারবেন তো?