Home » অর্থনীতি » কমছে বিনিয়োগ, ডলার আর ভারতীয় রুপির দরপতনেও নেতিবাচক প্রভাব

কমছে বিনিয়োগ, ডলার আর ভারতীয় রুপির দরপতনেও নেতিবাচক প্রভাব

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

economy-cartoon-7অর্থমন্ত্রী ঘোষিত বাজেটে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগের কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বিনিয়োগ কমছে। চলতি অর্থবছরের (২০১৩১৪) প্রথম দুই মাসে দেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৩০ শতাংশ। আর আগস্টে বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ৩ কোটি ডলার। গত জুলাই মাসে এ ধরণের প্রস্তাবের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ কোটি ডলার। সহিংস রাজনীতি, অনিশ্চিত গন্তব্য ও সুশাসনের অভাবে আজকে বিনিয়োগের এ চিত্র। এছাড়াও দুর্নীতি, ব্যাংক জালিয়াতিসহ সার্বিকভাবে অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়ায় অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, শিল্পের মূলধনীযন্ত্রপাতিসহ সামগ্রিক আমদানিও কমে গেছে।

বিনিয়োগ কমে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা, গার্মেন্টে আগুন, ভবন ধস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদ হারকে দায়ী করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের ধারণা, সরকারের শেষ বছর হওয়ায় সব ক্ষেত্রে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। ফলে এমনটি হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ হয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদী। বর্তমান সহিংস রাজনীতির কারণে সে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ সংকোচিত হয়ে গেছে।

বিনিয়োগ বোর্ডের (বিওআই) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে (২০১২১৩) দেশে ৬৬ হাজার ৬৮৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। যা ২০১১১২ অর্থবছরে ছিল ৮৭ হাজার ৮৯৩ কোটি ৭ লাখ। সে হিসাবে দেশে বিনিয়োগ কমেছে ২১ হাজার ২০৭ কোটির টাকারও বেশি। এর মধ্যে দেশি বিনিয়োগ হয়েছে ৪৪ হাজার ৬১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। যা গত অর্থবছরে ছিল ৫৩ হাজার ৪৭৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। আর বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে ২২ হাজার ৭২ কোটি ১২ লাখ টাকা। যা গত অর্থবছরে ছিল ৩৪ হাজার ৪১৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। বিনিয়োগ বোর্ডের ১২ মাস ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সমাপ্ত অর্থবছরে মোট শিল্প নিবন্ধন হয়েছে এক হাজার ৬৭৬টি। যা আগের অর্থবছরে ছিল এক হাজার ৯৫৬টি। সে হিসাবে শিল্প নিবন্ধন কমেছে ২৮০টি। এর মধ্যে দেশি শিল্পের নিবন্ধন হয়েছে এক হাজার ৪৫৭টি। যা গত অর্থবছরে ছিল এক হাজার ৭৩৫টি। সে হিসাবে দেশি শিল্পের নিবন্ধন কমেছে ২৭৮টি। বিদেশী শিল্পের নিবন্ধন হয়েছে ২১৯টি। যা গত অর্থবছরে ছিল ২২১টি। সে হিসেবে বিদেশি শিল্পের নিবন্ধন কমেছে ২টি। বিওআইয়ের জুলাইজুন ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে কর্মসংস্থান হয়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার ৭০৯ জনের। যা গত অর্থবছরে ৪ লাখ ৫১ হাজার ১৫০ জনের। সে হিসাবে দেশে কর্মসংস্থান কমেছে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৪১ জনের। এর মধ্যে দেশি কর্মসংস্থান হয়েছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭১ জনের। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৩৫ জনের। সে হিসাবে দেশি কর্মসংস্থান কমেছে ৫৭ হাজার ৬৬৪ জনের। আর বিদেশি কর্মসংস্থান হয়েছে ৪০ হাজার ৮৩৮ জনের। যা আগের অর্থবছরে ছিল এক লাখ ২৪ হাজার ৬১৫ জন। সে হিসাবে বিদেশি কর্মসংস্থান কমেছে ৮৩ হাজার ৭৭৭ জনের। তবে বিনিয়োগ বোর্ডের দাবি, দেশি বিনিয়োগে কিছুটা সমস্যা থাকলেও বিদেশী বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো। আর দেশীয় যে চিত্র এটি সাময়িক প্রবণতা। এ দিকে শুধু বিনিয়োগের নিবন্ধন নয়,

২১ আগস্ট সাপ্তাহিক ভিত্তিতে তৈরি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিলেকটেড ইনডিকেটর নামক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত অর্থবছরে আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এর মধ্যে চাল ও গম আমদানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির জন্য ঋণপত্র নিষ্পত্তির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ১৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র নিষ্পত্তির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক আড়াই শতাংশ। আমদানির চাহিদা না থাকায় ডলারের বিপরীতে টাকা প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে প্রচুর পরিমাণে ডলার কেনার পরও ডলারের দরপতন ঠেকানো যাচ্ছে না। বিদায়ী অর্থবছরে (২০১২১৩) ব্যাংকগুলোর কাছ ৪৫৩ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে, যা স্থানীয় মূল্য ৩৬ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে ডলার কেনা হয়েছিল ১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকার ডলার। এ হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে ডলার কেনার হার বেড়েছে ২৭ গুণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার না কিনলে প্রতি ডলার ৭০ টাকার নিচে নেমে আসত। অথচ এখনও প্রতি ডলার কিনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যয় করছে ৭৭ টাকা ৭৫ পয়সা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাবাজার হস্তক্ষেপ না করলে অর্থাৎ বাজার থেকে ডলার না কিনলে ডলারের মান পড়ে যেত। শক্তিশালী হতো টাকার মান। মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে টাকার মান শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একারণে মুদ্রাবাজার তার আপন গতিতেই চলতে দেয়া উচিত। তবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংকে বিনিয়োগ চাহিদা নেই বললেই চলে। নতুন নতুন উদ্যোক্তাও আর আসছেন না। যারা আসছেন ব্যবসায়িক মার খাওয়ার আশংকায় তাদেরও ঋণ দেয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ ভালো উদ্যোক্তার অভাব রয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক আমদানি কমে গেছে। আর এতে সমস্যায় পড়েছে ব্যাংকগুলো। অনেকেই প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আহরণ করছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে চাহিদা না থাকায় এখন উচ্চ দরের ডলার এখন তাদের কাছে গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে ডলারের চাহিদা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আসছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক আর আগের মতো ডলারের বিপরীতে টাকা দিচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বিল নামক বন্ড ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে নগদ টাকার ডলার কিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এক মাসের জন্য আটকে যাচ্ছে। এতে তাদের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে চলছে। জানা গেছে, ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করে তার সবটুকু ধরে রাখতে পারে না। এমন পরিস্থিতে আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে ভারতীয় রুপির দরপতনেও বাংলাদেশের বাজারে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জানতে চাইলে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও ইএবির সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, সরকারের শেষ বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগবিমুখ হয়ে গেছেন। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎগ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এসব কারণে অনেক উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে যথাসময়ে পরিশোধ করতে না পারায় শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ অনেক বেড়েছে। আবার সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে ব্যাংকগুলো আগের মতোই উচ্চ সুদে ঋণ দিচ্ছে। এসব কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি সে হারে বাড়ছে না। রুপি ও ডলারের মূল্যপতনে প্রতিযোগী বাজারের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

ব্যাংকগুলো দিন শেষে কী পরিমাণ ডলার ধরে রাখতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তা নির্ধারণ করে দেয়া আছে। কোটার অতিরিক্ত ডলার থাকলে তা বাধ্যতামূলকভাবে বাজারে বিক্রি করতে হয়। বাজারে বিক্রি করতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী আগে ব্যাংকের মোট সম্পদের ৯ শতাংশের বেশি ডলার ধারণ করতে পারত না।

জুলাই শেষে ব্যাংক খাতের ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) নেমে এসেছে ৭৩.৩৪ শতাংশে। এর এক মাস আগেও যা ছিল ৭৪.০১%। আর আগের বছরের জুন শেষে এডিআর ছিল ৭৯.১৫%, যদিও আলোচ্য সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর এডিআর রয়েছে নির্দিষ্ট সীমার বাইরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, আমানত যে হারে বেড়েছে ঋণ সে হারে না বাড়ায় ঋণ আমানতের ব্যবধান কমে আসছে। ব্যাংকগুলোর আমানতের বিপরীতে সমানভাবে ঋণ না বাড়লে মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়। কারণ তারা সুদ ব্যয় করে আমানত সংগ্রহ করে। সংগৃহীত আমানত থেকে ঋণ দিয়ে সুদ আয় করে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই শেষে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ১৭% বিপরীতে ঋণ বেড়েছে ৮ শতাংশের চেয়ে একটু বেশি। এর আগের বছরের জুলাই শেষে আমানতে প্রায় ২০ শতাংশ এবং ঋণে ১৯ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময়ই ব্যাংকের ঋণ ও আমানত প্রবৃদ্ধি সমান তালে এগিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে নানামুখী সঙ্কটের কারণে সামপ্রতিক সময়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগ প্রবণতা কমেছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণের ঋণ অনুমোদনের ফলে দেশীয় ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমছে। চলতি বছর বেসরকারি খাতে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বিদেশী ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর আগে ২০১২ সালে ১৪৯ কোটি ডলার এবং ২০১১ সালে ৮২ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, জুলাই শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ রয়েছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, গত জুন শেষেও আমানত ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এ সময় ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকায়, এক মাস আগেও যা ছিল ৫ লাখ ৭৭ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা। আগের সময়গুলোতে ঋণ ও আমানতের মধ্যে খুব একটা ব্যবধান না থাকলেও সামপ্রতিক সময়ে তা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।।