Home » অর্থনীতি » দেশে দেশে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের হিড়িক

দেশে দেশে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের হিড়িক

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

coal-based-powerবিশ্বজুড়ে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনের মতো দেশের পাশাপাশি চীনও পরিবেশ রক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কয়লার বদলে গ্যাসকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দূষণ প্রতিরোধক না হলে নতুন কোনো কেন্দ্রের অনুমতি দেওয়া হবে না। আবার দূষণ প্রতিরোধ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা বেশ ব্যয়বহুল। ফলে অনেকেই মনে করছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার দিন শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে যেসব কেন্দ্র অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ঘটাচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। এমনকি সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে, এমন কেন্দ্রগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চীন রাজধানী বেইজিংসহ তিনটি নগরীকে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র মুক্ত এলাকা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। কয়লার বদলে গ্যাস কিংবা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, এমন উপাদান ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি মার্কিন পরিবেশ রক্ষা সংস্থা (ইপিএ) জানিয়েছে, কোনো কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রই প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ১,১০০ পাউন্ডের বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করতে পারবে না। এই শর্তের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়াতে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই দুই কেন্দ্রে ৩৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো।

উইমিংয়ের কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর একটি মাত্র দুই বছর আগে চালু করা হয়েছিল। কেন্দ্রগুলো থেকে পরিবেশ কর্তৃপক্ষের বেধে দেওয়া মাত্রার চেয়ে বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করায় বন্ধ করার সিদ্ধান্তই উপযুক্ত মনে করা হয়। বিদ্যুতের চেয়ে পরিবেশই তাদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে।

এ দিকে আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুটস বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ করার কথা ঘোষণা করেছে। এখন থেকেই কেন্দ্রটি বন্ধ করার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ২০১৭ সালের মে মাসে এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এটি ছিল নিউ ইংল্যান্ডের কয়লাচালিত বৃহত্তম ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম। এই কেন্দ্রটি বন্ধ করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে একদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসে উৎপাদিত বিদ্যুতের সাথে দামের দিক থেকে পাল্লা দিতে পারছে না, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্তি পেতে হলে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা সম্ভব নয়। পরিবেশবাদী গ্রুপগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্লান্টটি বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছিল। ২০১১ সালে এটি ম্যাসাচুটসের সবচেয়ে দূষণ সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সম্প্রতি হাতবদল হয়েছিল। নতুন মালিক কোম্পানি চেয়েছিল এটিকে কয়লার বদলে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে চালাতে। এজন্য তারা প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলারও খরচ করেছিল। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। পরিণতিতে এটির মালিক ব্রাইটন পয়েন্ট স্টেশন ২০১৪ সাল নাগাদ তিন বিলিয়ন ডলার ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় জনসাধারণের কাছে বিদ্যুৎ কিংবা চাকরির চেয়ে পরিবেশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার মনে হয়েছে। তারা দেখেছে, বিদ্যুৎ বা চাকরি উভয়টাই বিকল্পভাবে সংস্থান করা যায়। কিন্তু পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা আর অন্য কোনোভাবে পাওয়া যায় না।

কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা মাত্র কনজারভেশন ল ফাউন্ডেশন এটাকে নিউ ইংল্যান্ডে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ‘মৃত্যু পরোয়ানা’ হিসেবে ঘোষণা করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯৬০এর দশকে। এতে ১,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতি বছর কয়েক লাখ টন কয়লা পোড়াতে হয়। চারটি বৃহৎ জেনারেটর ও একটি ছোট ডিজেল জেনারেটর সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানটি ছিল নিউ ইংল্যান্ডের বৃহত্তম কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। ভার্জিনিয়ার ডোমিনিয়ন এনার্জি গত আগস্টে ইকুইপাওয়ারের কাছে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেছিল।

স্ট্যান্ডার্ড টাইমসকে সিএলএফের ক্লিন এনার্জি প্রোগ্রামের পরিচালক জোনাথন পেরেস বলেছেন, ‘ব্রাইটন পয়েন্ট যদি এই প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে লাভজনক করতে না পারে, তবে অন্য কোনো কয়লা প্লান্ট তা পারবে না। এটা নিউ ইংল্যান্ডের কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য মৃত্যুর পরোয়ানা।’

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১২ সালে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮,৮০০ মেগাওয়াট কমেছে। চলতি বছর কমবে আরো ৫,৭৮১ মেগাওয়াট। অদূর ভবিষ্যতে কয়লা ব্যবহার কমার সাথে সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণও বেশ হ্রাস পাবে।

এসএনএলের হিসাব অনুযায়ী, কোলারাডোতে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ছয়টি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাবে। এগুলোতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ৭৭৬ মেগাওয়াট। অবশ্য সবগুলোই বেশ পুরনো। এগুলোর বয়স ৪৫ থেকে ৬৫ বছর। ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ এসব কেন্দ্রে অনেক বেশি।

এসএনএলের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়লা খনিও চালু রাখা যাচ্ছে না। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় ২০১৩ সালে ১৫০টিরও বেশি কয়লা খনি অলস হয়ে পড়ে ছিল।

ইউ এস মাইন সেফটি অ্যান্ড হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে যেখানে ১১.৪ মিলিয়ন টন কয়লা উৎপাদিত হয়েছে, সেখানে ২০১৩ সালে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।

ব্রিটেনেও কয়লার দিন শেষ হয়ে আসছে। এমনকি অনেকে এ প্রশ্নও করছেন, লন্ডনে রাতের অন্ধকারকে ঝলমলে আলোতে রূপান্তরের কাজটি কি থেমে যাবে? হাবভাবে মনে হচ্ছে, অন্ধকার নেমে এলেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকছে না।

ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে কিন্তু অনেকে সেই আশঙ্কাই অনুভব করছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটেনের শিল্প কর্তৃপক্ষ অফজেম মারাত্মক বিদ্যুৎ সঙ্কট আসন্ন বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

এর কারণ হলো দেশটি বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পরিবেশগত আইন অনুসরণ করতে যেয়ে বর্তমান কেন্দ্রগুলোর এক পঞ্চমাংশই আগামী বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আগামী দুই বছরে ব্রিটেনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১২ গিগাওয়াটের বেশি কমবে। বর্তমানে দেশটিতে ১৩টি কয়লা প্লান্ট সক্রিয় রয়েছে। ২০১৫ সাল নাগাদ এর প্রায় অর্ধেকই বন্ধ হয়ে যাবে। আর ২০১৩ সালের মধ্যে বাকিগুলোও বন্ধ করা হবে।

চীনও ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করার লক্ষ্যে ২০১৪ সাল নাগাদ চারটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব কেন্দ্রে গ্যাস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ৮ বিলিয়ন ডলারের বাজেটও প্রণয়ন করা হয়েছে। এই চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে ৯.২ মিলিয়ন টন কয়লা পোড়ানো হতো। রাজধানী বেইজিংয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে এই চারটি কেন্দ্র থেকেই।

সম্প্রতি চীন বেইজিং, সাংহাই ও গুয়াংজুতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিষিদ্ধ করে। পুরো দেশেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সাল নাগাদ বেইজিংয়ের সবগুলো কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হবে।।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)