Home » বিশেষ নিবন্ধ » পহেলা কার্তিক ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস

পহেলা কার্তিক ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস

ফকির লালন শাহকে ‘বর্তমান’ করে তোলা

ফরহাদ মজহার

fokir-lalon-shahবাজার ব্যবস্থায় সবকিছুই পণ্য হয়ে ওঠে, লালন ব্যতিক্রম কেউ নন। ফলে লালন সাধক ছিলেন বলে তাকে নিয়ে সিডি, ভিডিও বা সিনেমার ব্যবসা হবে না, এই গ্যারান্টি দেওয়া কঠিন। তাকে নিয়ে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য হচ্ছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নাই। লালন সাঁইজীকে বাজারের বিষয়ে পরিণত করার বিরোধিতা করেন অনেকে। অভিযোগ ওঠে, লালন কর্পোরেট বাণিজ্যের বিষয়ে পরিণত হয়ে যাচ্ছেন। আপত্তিকর মনে হয়। আপত্তি ওঠা স্বাভাবিক। ফলে ফকির লালন শাহকে বাজারের দূষণ থেকে বিশুদ্ধ রাখার একটি বাসনা ও চেষ্টা দানা বেঁধে উঠতেই পারে। লালন নিয়ে একটা বাজারি আগ্রহ যেমন তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি একটা উদ্বিগ্নতাও আছে।

পহেলা কার্তিকে ফকির লালন শাহের তিরোধন দিবস। ভাবছি, লালন যখন তিরোহিত, তিনি যখন জীবদেহে স্বয়ং হাজির নাই, তখন তাঁর ডাকনাম কেন্দকানদিকে ফেরালে তাঁকে ‘বর্তমান’ করে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয় বা হতে পারে। লালনকে নানান দূষণ থেকে রক্ষা রেখে বিশুদ্ধ রাখার বাসনার প্রসঙ্গ টানছি আলোচনায় সহজে প্রবেশ করবার জন্য।

বাংলা ১২৯৭ সালে (খ্রিষ্টীয় ১৮৯০) তাঁর তিরোধানের পর ১২৩ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। এই দিনে কুষ্টিয়ার ছে্উঁড়িয়ায় তাঁর ভক্ত, অনুসারী ও অনুরাগীরা ছোটখাট যে অনুষ্ঠান করতেন সেটা এখন লালন একাডেমিক সরকারি অনুষ্ঠানের রূপ নিয়েছে। তিরোধানের দিন তো শোকের দিন। কিন্তু এখন সেটা আর শোকের দিন হিশাবে নয়, রীতিমতো উৎসব হিশাবে পালন করা হয়। এছাড়া ফকির লালন শাহ জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমায় যে ‘সাধুসঙ্গ’ করতেন সেই দিনটি সাধুগুরুরা সাধুসঙ্গ হিশাবেই পালন করে আসছিলেন। কিন্তু সেটাও এখন একটা মেলায় পরিণত হয়েছে। লালন একাডেমি দোলপূর্ণিমাতেও সরকারি ভাবে মেলা বসান। সাধুগুরুদের এখন কমই দেখি। পনের বিশ বছর আগেও ছোট ছোট দলে বিভিন্ন জায়গায় রাতভর গান আর তত্ত্বালোচনা দেখেছি। এখন হল্লা বেড়েছে। সাধুগুরুদের আগমন কমেছে। এলেও তাঁরা একদিন এক রাত থেকে চলে যেতে দেখি। তত্ত্বালোচনা একদমই হয় না, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু তার মগ্নতা ও গভীরতা কমেছে, অন্যদিকে সেটা ক্রমাগত চাপা পড়ে যাচ্ছে কোলাহলে।

গত কয়েক দশকে নিজের চোখের সামনেই ছেঁউড়িয়াকে বদলে যেতে দেখেছি। একই সঙ্গে দেখেছি লালনপন্থী সাধুগুরুদের মধ্যেও লালন চর্চার রূপান্তর। যে জীব চর্চা আগে সম্ভব ছিল, গ্রামে সেই জীবন ধারণ এখন অসম্ভব হয়ে উঠেছে। চর্চাও বৈষয়িক কারণে বদলে যাচ্ছে। লালনের গানচর্চার মধ্যেও রূপান্তর ঘটেছে। আগে শিল্পী গড়ে উঠতো বিভিন্ন সাধুসঙ্গে গান গেয়ে এই ভাবের পরিমন্ডলে পরীক্ষা দিয়ে। এখন কারা উঠে আসতে চায় ‘বাংলাদেশ তোমাকে খুঁজছে’ ধরণের অনুষ্ঠানের বিচারকদের সন্তুষ্ট করে। শিল্পীর খ্যাতি বা সাফল্য লালনপন্থী সাধুগুরুদের সন্তুষ্টি অর্জনের ওপর আর নির্ভরশীল নয়। লালনের গানের সঙ্গে আর লালনের জীবন ও ভাবচর্চার একটা বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছে। ‘লালন গীতি’ নামে সাধকের জীবন চর্চা থেকে আলাদা করে যে ছেদটা টানা হয়েছিল সেটা এখন পূর্ণ বিচ্ছেদে পরিণত হয়েছে। ‘লালন গীতি’ নামে একটা গানের ঘরানা তৈরি হয়েছে যার সঙ্গে সাধক জীবনের কোন সম্পর্ক নাই। ব্যান্ড শিল্পীরাও লালন গাইছেন। নাচাকুঁদা করছেন। নতুন মাধ্যম নতুন যে শ্রোতা শ্রেণী তৈরি করেছে তাদের মনোরঞ্জনের ওপর সেই গীতির গায়কী নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সাধুসঙ্গে যে গান ভাবচর্চার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে নিজের বিকাশ ঘটাত, সেই চর্চার পরিমন্ডল থেকে গান আলাদা হয়ে গিয়েছে। আজকাল আবার ছেঁউড়িয়ায় দেখি হিন্দি গানের দূরে লালনের গান সুর করবার চেষ্টা। মোট কথা, পুরানা সম্পর্ক পুরানা প্রতিষ্ঠানগুলো সব ভেঙে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে। শ্রুতি ও কণ্ঠনির্ভর সংস্কৃতির মধ্যে ভাবচর্চার যে ধারা এতোকাল বিকশিত হতে পেরেছে, অক্ষর, মুদ্রাযন্ত্র বা ডিজিটাল যুগে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা কঠিন। সেটা আদৌ সম্ভব কিনা, কিংবা সম্ভব হলে তার চর্চার রূপ কেমন হবে সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যার মীমাংসা হয়নি।

বাজার এখন সর্বব্যাপী, পুঁজিই এই যুগে ধর্ম। ফলে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ফকির লালন শাহের একটা বদল ঘটবে। ঘটছেও। কিন্তু সব কিছুকে পণ্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়া তীব্র হওয়ার কারণেই ফকির লালন শাহের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কথাটা পুরাপুরি সত্য নয়। বাজার ব্যবস্থা সর্বব্যাপী হয়ে ওঠায় আগেও বদল ঘটছিল। যদি রাষ্ট্রের দিক থেকে দেখি তাহলে দেখব লালন একাডেমি প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে মতিজানলালনের কবর ও স্মৃতিক্ষেত্র থেকে ফকিরদের উৎখাত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে অনেক আগে। গুরুবাদী ফকির লালন শাহ কবর পূজারি ছিলেন না। কিন্তু যেখানে তিনি দেহ রেখেছেন, সেটা এখন ‘মাজার’ হয়ে গিয়েছে। এখন দেখি আরবি লেখা গিলাফ দিয়ে মতিজান ও তাঁর সমাধিও মাঝে মধ্যে ঢাকা হয়। লালনের জীবদ্দশায় মলম শাহের যে বাড়ি তাঁর আখড়া ছিল সেখানে তার চর্চার ধারা আর তাঁর তিরোধানের পরে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে চর্চার ধারার মধ্যেও ছেদ পড়েছিল। তাঁর দুই শিষ্য মনিরুদ্দিন ও ভোলাই শাহের মধ্যে মতপার্থক্য ও আখড়ার মালিকানা নিয়া ঝগড়াবিবাদের ইতিহাস আমাদের জানা। ফকির লালন শাহের নামে তার শিষ্যরা যা টিকিয়ে রেখেছেন তাদের প্রত্যেকে ফকির লালন শাহকে যে যেমন বুঝেছেন তেমনি চর্চা করেছেন। তাঁরাও তাদের মত করেই বাংলার সাধনা বা ভাবচর্চার ধারায় অবদান রেখেছেন। অর্থাৎ লালনের শিষ্যদের মধ্য দিয়ে লালনের বিশুদ্ধ কোন ধারা বহাল থাকে নি। এই বিশুদ্ধতার অনুমানে ফকির লালন শাহ নিজেও সায় দিতেন না। আখেরি নবী সম্পর্কে তাঁর নিজের একটা গান রয়েছে এই রকম :

নবীর সঙ্গে ছিল ইয়ার চারজন

চারকে দিলেন নবী চারমত যাজন

নবীবিনে পথে গোল হোল চার মতে

ফকির লালন বলে যেন গোলে পড়িস নে।

নবীর চার সাহাবাকে নবী চার রকম যাজন বা শিক্ষা দিয়েছিলেন। নবীর তিরোধানের পর চারজন চার ভাবে নবীকে ব্যাখ্যা করেছেন। এই গোলমালে পড়া যাবে না। এটা তো ফকির লালন শাহ সম্পর্কেও সত্য। তার তিরোধানের পর তাঁর শিষ্যরা যে যেমন বুঝেছেন তেমনি করেই লালনকে ব্যাখ্যা করবেন, তাঁর শিক্ষা ও নির্দেশাবলী চর্চা করবেন, এটাই হবার কথা। তেমনি করেই তারা চর্চা করেছেন। যতটুকু তাঁরা বুঝেছেন ততোটুকুই তাঁরা তাঁদের জীবনে ফকির লালন শাহকে ‘বর্তমান’ করে তুলেছেন। ফকির লালন শাহের এখন যে খ্যাতি বা পরিচিতি সেটা তাঁর শিষ্যদের জীবন ও ভাবচর্চার খ্যাতি নয়। লালনের খ্যাতির জন্য তাঁর গানের ভূমিকা মুখ্য। কিন্তু সেই ক্ষেত্রেও কথা আছে। লালনের গান এর আগে খোদা বক্স, মকসেদ আলীসহ আরো অনেকে গেয়েছেন। তাদের একটা পরিচিতিও রয়েছে। লালনকে জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু শহরের মধ্যবিত্তের মধ্যে তাঁরা বিশেষ কোন আবেদন তৈরি করতে পারে নি। এমনকি আবদুল আলিম যখন লালনের গান বেতারে গাইলেন এবং তুলনামূলক ভাবে অধিক জনপ্রিয় করলেন তখন সেই গানগুলো মধ্যবিত্ত শ্রেণী ‘পল্লীগীতি’ হিশাবেই শুনেছে। পল্লীগীতি হিশাবেই কিছু শ্রোতা আবদুল আলিম তৈরি করতে পেরেছিলেন। যেমন, ‘ও যার আপন খবর আপনার হয় না’, ‘কে কথা কয়রে দেখা দেয় না’, ‘চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি’, ‘এই দেশেতে এই সুখ হোল’ ইত্যাদি গান তার মারফত পল্লীগীতি হিশাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ‘লালনগীতি’ নিজের পরিচিতি নিয়ে হাজির হওয়া শুরু করে স্বাধীনতার পর ফরিদা পারভিনের গলা ও গায়কী ধরে। স্বাধীনতা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে নতুন আগ্রহ তৈরি করবার কারণে এটা ঘটেছে, নাকি এই সময় টেপ ও ক্যাসেট রেকর্ডার ভূমিকা রেখেছে সেটা নির্ণয় করা গবেষণার বিষয়।

এই দিকগুলো মনে রাখলে লালনকে বিশুদ্ধ রাখার চিন্তার মুশকিল আমরা ধরতে পারব। আসলে ফকির লালন শাহ তাঁর গানের জন্য যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন সাধক ও ভাবুক হিশাবে প্রতিষ্ঠা পান নি, বললেই চলে। এই অভাবের কথা মনে রেখেই প্রশ্ন তোলা যায় ফকির লালন শাহকে কেন্দ্র করে বাংলার ভাবান্দোলনের যে চর্চা এখন জারি আছে, তার অভিমুখ কোনদিকে ফেরালে তাঁকে ‘বর্তমান’ করে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয় বা হতে পারে। সোজা কথায় লালনকে কিভাবে বুঝলে ও চর্চা করলে তিনি এই কালে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন?

দুই.

শুরুতেই বলা যায় ফকির লালন শাহের বিশুদ্ধতা রক্ষার বাসনা শেষাবধি প্রতিক্রিয়ায় পর্যবসিত হয় কিংবা পর্যবসিত হবার বিপদে পড়ে। এই বাসনা ত্যাগ করা দরকার। লালন যখন জীবিত ছিলেন তখনও তাঁকে কিংবা তার চর্চা ও গানকে বিভিন্ন জাত ও শ্রেণী নিজের নিজের জায়গা থেকেই ব্যাখ্যা করেছে। লিঙ্গভেদে লালনের তাৎপর্যও ভিন্ন হয়েছে। তাহলে বিশুদ্ধ লালনকে খুঁজব কোথায়? অর্থাৎ জাত, শ্রেণী ও নারীপুরুষ ভেদের দিক থেকে বিভিন্ন লালন তো আছেই তার ওপর বাজার লালনের যে ভূত নির্মাণ করে সেটা যেমন আপত্তির, ঠিক একই ভাবে তার বিপরীতে লালনকে ‘বিশুদ্ধ’ ভাবে পাঠ ও হাজির করবার বাসনাও সমান মুশকিলের।

তবে লালনকে বাজারের বিষয়ে পরিণত করার বিরোধিতা মাত্রই নেতিবাচক নয়। ইতিবাচক বিরোধিতার বাসনা ভিন্ন। সেই বাসনাকে বিশুদ্ধ লালন সন্ধানের আকুতির মধ্যে চেনা যাবে না। বরং তার আকুতি বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ ও রূপান্তরের বাসনার মধ্যে। এই বাসনার চরিত্র রাজনৈতিক হতে বাধ্য। সেই বাসনার দিক থেকে দেখলে বাংলার ভাবচর্চার দরকারি অভিমুখটা শনাক্ত করা সহজ হয়। এই পথেই লালনকে বর্তমান করে তুলবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

এই অভিমুখটা স্পষ্ট হলে ফকির লালন শাহ জীবনযাপন ও ভাবচর্চার মধ্যদিয়ে যে জগতটা তৈরি করবার সাধনা করেছেন তাকে চেনা, জানা ও বোঝার চেষ্টা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। নইলে ফকির লালন শাহ এবং তার অনুসারী ও অনুরাগীরা বড়জোর নৃতাত্ত্বিক বা সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয় হয়ে উঠবেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রান্তিক অনুষঙ্গ হিশাবে থাকবেন তারা। বাউল ফকির হিশাবে বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে তাদের অন্তর্গত করে নেবার জন্য যেটা দরকার। এর অধিক কিছু হবে না। বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ ও রূপান্তরের বাসনা থেকে কাজ করা না হলে এখনকার লড়াই সংগ্রামে ফকির লালন শাহ প্রাসঙ্গিক হবেন না। বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ ও রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক করে তোলাকেই আমরা তাঁকে ‘বর্তমান’ করে তোলা বলছি।

কিভাবে এই অভিমুখটা নির্দিষ্ট করা যায় সেই বিষয়ে দুই একটি প্রস্তাব দেবার জন্যই এই লেখা। প্রথমেই যে দিকটা স্পষ্ট করা দরকার সেটা হলো আমাদের কিছু অভ্যাস বদলানো জরুরি। ফকির লালন শাহকে মরমি বা আধ্যাত্মিক পুরুষ হিশাবে ভাবতে আমরা অভ্যস্ত; এই অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। লালন বেদকোরান শাস্ত্রকথা বা কোন কানকথা বা লিখিত কথাকে আক্ষরিক সত্য বলে মেনে নেন নি। আমরা জগতকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক, দৈহিক ও আধ্যাত্মিক ইত্যাদি ভাগে ভাগ করতে অভ্যস্ত। এই অভ্যাসের জায়গা থেকে লালনকে বোঝা কঠিন। লালন মানুষের ভজনা করেছেন। সেখানে ইহলোক পরলোক ভেদ নাই, দেহ ও আত্মার বিভাজন নাই। আমরা যেহেতু আত্মাকে দেহ থেকে আলাদা করে ভাবতে অভ্যস্ত, ফলে দেহসাধনার কথা শুনলে আমরা তাকে দৈহিকতা ছাড়া আর কিছু বুঝি না। এই দৈহিকতার মানেও আমাদের কাছে হয়ে ওঠে যৌনতার চর্চা। এর ফলে দেহের বাইরে যে আসলে ‘মানুষ’ নামক বিমূর্ত কিছু নাই, এই অতি প্রাথমিক ‘বস্তুবাদী’ শিক্ষা আমাদের নজরের আড়ালে চলে যায়। তখন লালনকে বুঝতে গিয়ে আমরা নানান গুহ্য সাধন প্রণালী, চারিচন্দ্র ভেদ ও নানান আচারঅনুষ্ঠানকে মুখ্য জ্ঞান করা শুরু করি। যেহেতু গোপন ও রহস্যময় জগতের দিকে মানুষের একটা স্বাভাবিক কৌতূহল থাকে, তখন গোপন যৌনচর্চার আলোকে লালনকে এক রহস্যময় পুরুষ হিশাবে গড়ে তোলা হয়। এর পরিণতি কি হতে পারে সেটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মনের মানুষ’ উপন্যাস ও সেই উপন্যাস নিয়ে গৌতম ঘোষের বানানো ছবির উল্লেখ করা যেতে পারে। যেখানে লালন চন্দ্র কর নামে এক চরিত্র বানানো হয়েছে যে রীতিমতো রতিগ্রস্ত। তার গুরু তাকে মেয়ে সাপ্লাই দেয়। যৌনতার চর্চা ছাড়া তার অন্য কোন সাধনা নাই। নারী যার কাছে নিছকই সাধনার উপায় বা তথাকথিত ‘সাধনসঙ্গিনী।’ সেখানে লালন এমনই এক ব্যক্তি যেকোন চিন্তা করতে জানে না, গান বা বাক্য তার মধ্যে আপনা আপনি আসে, আপনা আপনি পয়দা হয় ইত্যাদি।

ওপরে ‘বস্তুবাদী’ কথাটা উদ্ধৃতি চিহেৃর মধ্যে রেখেছে এ কারণে যে বস্তু ও ভাবের বিভাজন মেনে ‘বস্তুবাদ’ ও ‘ভাববাদ’ হিশাবে যেভাবে আমরা চিন্তাকে পরস্পর বিরোধী স্রোতে বিভক্ত করি, লালনকে বুঝতে হলে এই বিভাজনের ফাঁদে পা দিলে চলে না। দুইয়ে দুইয়ে জগতকে বিভক্ত করে ভাববার অভ্যাস ত্যাগ করার দিক থেকে থেকে আমরা লালনকে ‘বর্তমান’ করে তোলার অভিমুখ নির্দিষ্ট করবার প্রথম সূত্রটি তাহলে আমরা এখানে পাচ্ছি।

দ্বিতীয়ত, বাংলার ভাবান্দোলনের জাতপাত, শ্রেণী ও নারীপুরুষ ভেদ বিরোধী যে রাজনৈতিক ধারা শ্রীচৈতন্যনিত্যানন্দের আমল থেকে শুরু হয়েছিল ফকির লালন শাহের আবির্ভাব ও বিকাশ নদিয়ার সেই ভাবের মধ্যেই। এই রাজনীতিই লালনের আবির্ভাবকে সম্ভব করে তুলেছে। জাতপাত বিরোধী নদিয়ার এই ভাবের বিকাশের ক্ষেত্রে ফকির লালন শাহের গুরুত্ব অপরিসীম। এর রাজনৈতিক দিকটা বোঝার জন্য শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসটি আমাদের জানা দরকার এবং সেই প্রয়োজনে সুলতানি আমল ও ইসলামের ভূমিকা বোঝা জরুরি। এই ক্ষেত্রে কাজ হয়েছে খুবই কম, যদিও সম্প্রতি কিছু কিছু অগ্রগতি হয়েছে।

যে ভাবগত জায়গায় দাঁড়িয়ে ফকির লালন শাহ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও ভেদবুদ্ধির রাজনীতির বিরোধিতা করেছেন তাকে বিশেষ ভাবে বোঝা দরকার। সেই ক্ষেত্রে তাঁর ভাবুকতা ও রাজনীতিকে আমরা আলাদা করতে পারি না। মানুষের ভজনা করেছেন তিনি, কিন্তু মানুষে মানুষে সমান এই বুর্জোয়া সাম্যবাদ ফকির লালন শাহ প্রচার করেন নি। তার মধ্যে এই প্রকার কোন ‘মানবতাবাদ’ নাই। তাহলে মানুষে মানুষে ভেদাভেদের বিরোধিতার যুক্তিটা তিনি কিভাবে খাড়া করেছেন? তাঁর যুক্তি হচ্ছে, ‘ব্রাহ্মণ, চন্ডাল, চামার, মুচি সকলেই এক জলে সূচি’। সকলেরই সূচনা ‘একই জল’। রজোবীজের প্রাকৃতিকতায় সকল মানুষের সূচনা ঘটেছে ‘একই জলে।’ মানুষের মধ্য দিয়েই মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রকৃতি, প্রক্রিয়া বা প্রাকৃতিকতার দিক থেকে অভেদ প্রতিষ্ঠার এই বিশিষ্টতার দিকে নজর রাখা দরকার। ‘দেহ’ কেন বাংলার ভাবান্দোলনের কেন্দ্রীয় বিষয় সেটা আমরা এই ক্ষেত্রেও দেখছি।

তৃতীয় দিকটা হচ্ছে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’র প্রশ্ন। যে জীবন সাধকরা চর্চা করেছেন সেখানে ত্যাগের ভূমিকা প্রধান, এটা সহজেই বোঝা যায়। সম্পত্তি বা বিষয়আশয় ত্যাগের দিকটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিষয়আশয় ত্যাগ করতে গিয়ে ফকির লালন শাহ ‘বর্তমান’কে ত্যাগ করেন নি। বাস্তব জগতকে ত্যাগ করবার কথা বলেন নি। এখানে শিক্ষণীয় দিকটা হচ্ছে বিপ্লব বা আইন করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি উৎখাত করলে সেটা উৎখাত হয়ে যায় না। সেটা ফিরে আসে। কারণ ব্যক্তিগত সম্পত্তির সঙ্গে ‘আমি বা ‘আমিত্ব’ জড়িত। ‘আমি’র মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা জগতকে ব্যক্তিগতভাবে ভোগদখলের বাসনা থেকে যায়। ‘আমি’ আবার নিজেকে সম্পত্তির দখলদার বা মালিক হিশাবে প্রতিষ্ঠিত করবার ফাঁক পেয়ে যায়। তাহলে বৈপ্লবিক রূপান্তরের প্রশ্ন এই ‘আমি’র সঙ্গ মোকাবেলার প্রশ্ন। বিদ্যমান ব্যবস্থার বৈপ্লবিক রূপান্তরের রাজনীতির মধ্যে ব্যক্তির রূপান্তর প্রধান বিষয় হিশাবে গণ্য করবার একটা শিক্ষা এখানে আমরা পেতে পারি।

লালনকে সহজে বিপ্লবী রাজনৈতিক চর্চার দিক থেকে বোঝার জন্য ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’র দিক থেকে ওপরে কথা পেড়েছি। আসলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রশ্ন মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নির্ণয়ের প্রশ্ন। একই সঙ্গে নিজের সঙ্গে নিজের এবং অপরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নির্ণয়ের প্রশ্নও বটে। এই সম্পর্ক নির্ণয়ের পদ্ধতি কি হবে? এই দিক থেকে যদি ভাবি তাহলে দেখি লালন যখন ‘জ্যান্তেমরা’র কথা বলেন তখন তার একটা গভীর রাজনৈতিক মানে দাঁড়ায়। লালন সাধকদের জ্যান্তে মরবার বা মৃত্যুর আগেই মরে যাবার চর্চা করতে বলেন। এর নগদ লাভ হচ্ছে তখন মানুষের আর মরণের ভয় থাকবে না। মরণের ভয় আছে বলেই মানুষের পরকালের ভয় আছে। পরকালের ভয় থাকার অর্থ হচ্ছে ধর্মতত্ত্ববিদ বা মোল্লাপুরোহিতের বিধান ও হুকুম মেনে নেওয়া। কিন্তু জ্যান্তেমরার অর্থের সন্ধানে আমরা আরও গভীরে যেতে পাই।

ঠিক যে জ্যান্তেমরার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে জীবিত থেকেও মৃত হবার সাধনা করা। কিন্তু জীবিত থেকেও মরে যাওয়া আবার কিভাবে সম্ভব? সহজ কথায় এর অর্থ হচ্ছে জীবের যে জীবমূলক বাসনা তাকে দমন করা। এতে মনে হতে পারে লালন জীবের জীবনকে অস্বীকার করছেন। আসলে তা নয়। আগেই বলেছি লালন ‘বর্তমান’ চর্চা করেন। অতএব জীবের জীবন ছাড়া মানুষের যে কোন জীবন হতে পারে না এই কাণ্ডজ্ঞান তো তাঁর অবশ্যই ছিল। শুধু তাই নয়। জীবের জীবনই সাধনার ক্ষেত্র এটাই তার মৌলিক প্রস্তাব। কারণ যাকে ‘পরম’ বা পরমার্থিক সত্য বলি তার আস্বাদন একমাত্র জীবের জীবনেই সম্ভব। তাহলে ‘জ্যান্তেমরা’ কথাটা জীবের জীবনকে অস্বীকার করা নয় বরং জীবজীবনের সত্যকে নিঃশর্তে মেনে নেয়া। জীবের জীবনে পরমের আস্বাদনের জন্যই পরমকে ‘বর্তমান’ করে তোলার জন্যই জ্যান্তে মরবার চর্চা করতে হবে।

কিন্তু জীবকে তাহলে মরবার সাধনা করতে হবে কেন? অর্থাৎ জীবমূলক কামনাবাসনা ত্যাগ চর্চার কি দরকার? দরকার কারণ মানুষ ‘জীব’ একথা সত্য, কিন্তু মানুষ শুধু জীব নয়। এ এমন এক জীব যার মধ্যে পরমার্থিক সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে। মানুষ মাত্রেই পরম হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির। সেই সম্ভাবনাকে বর্তমান করে তোলা সম্ভব যদি জীবমূলক কামনাবাসনার জায়গায় মানুষ পরমের আকাঙ্খা পরমার্থিক বাসনার চর্চা করতে শেখে। বিদ্যমান ব্যবস্থার রূপান্তর কামনা করা বাংলার ভাবুকতার দিক থেকে পরমার্থিক বাসনা।

অন্যদিক থেকে জীবের বাসনা মূলত ভোগের বাসনা। তাহলে জ্যান্তে মরার অর্থ মানুষের জীবনকে ভোগীর জীবনে পর্যবসিত হতে না দেওয়া। ভোগের জীবন ত্যাগ করার অর্থ হচ্ছে জগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককেও নতুন ভাবে বিন্যস্ত করা। জগত শুধু ভোগের বিষয় নয় এই শিক্ষা দেওয়া। জগত মানুষের কাছ থেকে আলাদা থেকে মানুষের বাইরে মানুষের ভোগের জন্য হাজির এ ভাবনা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পোড়ায় যেমন সক্রিয়, তেমনি পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণও এই জীবমূলক বাসনার মধ্যে। যদি এতটুকু আমরা বুঝি তাহলে জ্যান্তেমরা হবার জন্য খিলকা নিয়ে ফকিরিবেশ ধারণকে আমরা শুধু লালনপন্থীদের একটা আচার আকারে নয়, মানুষের পরমার্থিক সত্যকে বর্তমান করে তোলার আবশ্যিক চর্চা হিশাবে বুঝতে শিখব। ফকিরি রহস্যও আমাদের কাছে গুহ্য কোন ব্যাপার হয়ে থাকবে না।

আরও অনেক দিক নিয়ে আলোচনা দরকার। ওপরে যে তিনটি দিক নিয়ে কথা বলেছি, সেই দিকে আমাদের নজর ফেরাতে পারলে কম অর্জন হবে না। লালন শাহকে নিয়ে অনেকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে আরো হবে। তাঁর সাধক জীবনের চর্চা ও অনুশীলন তিনি যেভাবে করেছেন তাকে যথাসম্ভব জানা দরকার। তাঁর সাধনার আচার, অনুশীলন বিধিবিধান কেমন ছিল? তিনি সাধুসঙ্গ করতেন কিভাবে? তাঁর ‘কালাম বা গানের যথাসম্ভব সঠিক পাঠ নির্ণয়ের উপায় কি? ইত্যাদি দিকগুলো জানা, বোঝা ও আলোচনার দরকার আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই কাজগুলো তখনই এই কালে প্রাসঙ্গিক হবে যখন আমরা বাংলার ভাবান্দোলনের ঐতিহাসিক অভিমুখ ক্রমে ক্রমে নির্দিষ্ট করে তুলতে পারব। লালনের রাজনৈতিকদার্শনিক তাৎপর্য যতো বেশি নিজেদের কাছে আমরা পরিস্কার করে তুলব ততোই ফকির লালন শাহ আমাদের জন্য ‘বর্তমান’ হয়ে উঠবেন।।