Home » আন্তর্জাতিক » মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ৫)

মিশর – বিপ্লব না প্রত্যাবর্তন (পর্ব – ৫)

বামপন্থীরাও পুঁজিবাদি পার্লামেন্টারি উচ্চ উদারবাদের ভাষায় কথা বলে

আইজাজ আহমদ

Egypt-13নির্বাচনী ফলাফলকে পবিত্র আমানত জ্ঞান করার বহুলবিস্তৃত ধারণাটির কারণে টাকা শক্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়নসহ বিভিন্ন ধরণের অপব্যবহার করে হলেও ভোট সংগ্রহের দিকে মনোনিবেশন করা হয়। নির্বাচনী পবিত্রতার এই ধারণাটি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরসমর্থিত গণতন্ত্র বিকাশ সূত্রের সঙ্গে মিলে যায়। আর এর ফলেই এখন অদ্ভূত বামডান ঐক্যের সাক্ষাত মিলেছে, যেখানে বামেরাও ঠিক পুঁজিবাদি পার্লামেন্টারি উচ্চ উদারবাদের (‘গণতন্ত্র’ পরিণত হয় পুঁজিবাদী দেশগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সাজসজ্জায়) ভাষায় কথা বলতে থাকে। এর ফলে দুটি পথের সৃষ্টি হয়। যারা সামরিক অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেন, তারা ক্ষমতায় থাকার সময়ে ইখওয়ানের বিধ্বংসী কার্যক্রম এড়িয়ে যান, সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে গণঅভ্যুত্থানের কেন্দ্রিকতা অবমূল্যায়ন করেন এবং মুরসির নির্বাচনী ‘বৈধতার’ ওপর জোর দেন। তারা আসলে যে কথা বলতে চান তা হলো, জনগণ ব্যালট বাক্সে তাদের কর্তব্য সমাপন করার পর বাড়ি ফিরে যাবে এবং তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বকারীরা যত দায়িত্বহীন কাজই করুক না কেন, পরবর্তী রাউন্ড নির্বাচন পর্যন্ত উদাসীনভাবে অপেক্ষা করতে থাকবে। আর যারা সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছে, তারা এখন আশা করছে যে, সেনাবাহিনী সেই উদারবাদী গণতন্ত্রকে আরো স্বচ্ছতা এবং আরো ভালোভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, এমনকি শাসক শ্রেণীর ভিন্ন শাখার আশ্রয় হলেও। এই নতুন ব্যবস্থাও এর সামাজিকঅর্থনৈতিক উপাদান বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোকে খুব বেশি বিচার করা উচিত নয়। বরং একে বিচার করতে হবে উদার নির্বাচনী ব্যবস্থার আদর্শের আলোকে।

আমরা মনে হয় না নিজেদের খুব বেশি জিজ্ঞাসা করেছি, বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় ত্রুটিটি কী এবং এটাকে ‘গণতান্ত্রিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে এর কী কী পাল্টাতে হবে। উদাহরণ হিসেবে অনেক আগের প্যারিস কমিউনে বামদের মধ্যে পদচ্যুৎ করার অধিকারের ধারণাটির কথা বলা যায়। অর্থাৎ কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি জনগণের কাছে করা তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতেন, তবে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার যত কম সময়ই বাকি থাকুক না কেন, জনগণের তখনই তাকে পদচ্যুৎ করার অধিকার ছিল।

এই লেখকের মিশরীয় জেনারেলদের সম্পর্কে কোনোই শ্রদ্ধাভাব নেই। জেনারেল আলসিসিকে নাসেরের পর্যায়ে উন্নীত করার মিশরীয় রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার অব্যাহত প্রচারণাকে সম্পূর্ণ মূর্খতাসূচক কাজ হিসেবে চিহ্নিত না করলেও অন্তত এটাকে খুবই অপরিণামদর্শী বিবেচনা করছে এই লেখক। একটা অতি পরিচিত তথ্য হলো, এলসিসি মিশরের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। আর ওই দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইসরাইল, য্ক্তুরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের গোয়েন্দাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। এই খবরে আত্মবিশ্বাস বাড়ে না। আমাদের মূল কথা হলো, সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার সবসময়েই একটি সুনির্দিষ্ট প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। উদার সাম্রাজ্যবাদীদের প্রণীত গণতন্ত্র স্বৈরতন্ত্র আলোচনা নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। মুরসি ও আলসিসির মতো লোকদের মধ্যকার সঙ্ঘাতকে ন্যায় আর অন্যায়ের মূর্ত প্রতীক বিবেচনা করা উচিত নয়। এগুলো মিশরের সম্ভাবনাময় বিপ্লবকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে সুসংগঠিত ঐতিহাসিক ব্লকগুলোর প্রাণঘাতী খেলা।

বিপ্লব ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা

ইতিহাস অসংখ্য গণআন্দোলনে ভরপুর, যেগুলোকে ইতালির মহান মার্কসবাদী অ্যান্টোনিও গ্রামসি ‘বিপ্লব পুনঃপ্রতিষ্ঠা কর্মশক্তিসম্পন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্য কথায় বলা যায়, সম্পূর্ণ বৈপ্লবিক পরিস্থিতিও আগাম প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে অতি দ্রুত স্থিমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। মূলত ওই আগাম প্রতিবিপ্লব প্রতিরোধ করার মতো সুসংগঠিত কোনো বিপ্লবী শক্তি যদি না থাকে। মিশরের দুর্ভাগ্য হলো, যে দুটি শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের মতো সুসংগঠিত, উভয়টিই ডানপন্থী। এই দুই শক্তিকে চরম ডানপন্থী হিসেবেও অভিহিত করা যায়। এরা হলো ইখওয়ান এবং সামরিক বাহিনী ও তার মোবারকপন্থী মিত্ররা। এদের বিপরীতে বৃহত্তম শক্তিটি হচ্ছে গণআন্দোলন। কিন্তু তারা খুবই অসংগঠিত, খুব বেশি মাত্রায় বিভক্ত, আদর্শগতভাবে অত্যন্ত অপরিপক্ক। এমন একটি আন্দোলনের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ অসম্ভব ব্যাপার। তারা কেবল তাদের গণআন্দোলনের ফলে খুলে যাওয়া দরজা দিয়ে অন্যদের ক্ষমতায় যাওয়া দেখতে পারে। গণআন্দোলনের আগ্রাসী অবস্থা অব্যাহতভাবে রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে আসতে থাকে। পরিণতিতে তারা কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে ক্রমাগত প্রান্তিক পর্যায়ে সরে পড়তে বাধ্য হতে থাকে। ফলে তারা আর কিছু করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে এবং দুটি সংগঠিত শক্তির কোনো একটিকে প্রভাবান্বিত ও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে।

এই কাঠামোগত দুর্বলতার ফলে সাম্রাজ্যবাদী/জায়নবাদী/রাজতন্ত্রী জোটকে সুবিধাজনক সময়ে কোন ডানপন্থী শক্তিকে তারা টিকে থাকতে সহায়তা এবং অর্থ দিয়ে সাহায্য করবে তা নির্ধারণ করার সুযোগ এনে দিয়েছে। এমনটা ঘটার বেশ ভালো আশঙ্কাই রয়েছে যে, নৃশংস সামরিক স্বৈরাচার কাঁধে চেপে বসবে কিংবা বর্তমান সরকার যদি গণদাবির ব্যাপারে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়, তবে ইখওয়ানও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে ইখওয়ানের প্রত্যাবর্তন হতে পারে ডানপন্থী কারো সঙ্গে পার্লামেন্টারি জোট গঠন করে এবং ইসরাইল ও আইএমএফকে আরো সুরক্ষিত নিশ্চয়তা প্রদানের মাধ্যমে। এটা হলো বিকল্প কাঠামো যা যুক্তরাষ্ট্র/ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন/ইসরাইল/তুরস্ক/সৌদি আরব সম্মিলিতভাবে কার্যকর করার চেষ্টা করছে। অদূর ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের সফলতার দেখা পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

অবশ্য, ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ যত সমস্যাই থাকুক না কেন, এসব গণঅভ্যুত্থানের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল ১৯১৯ সালের বিপ্লবের চেয়ে কম তাৎপর্যপূর্ণ হবে না। মিশর প্রায় ৪০ বছর স্বৈরশাসন ও হতাশাজনক সময় পাড়ি দিয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে অব্যাহতভাবে পরিচালিত তাদের সংগ্রামগুলোকে তারা জাতীয় পর্যায়ে উপনীত করতে পারেনি, তারা পরাজিত হয়েছে। কিন্তু তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠ মিশরীয় জেগে ওঠেছে, তাদের নিজেদের ইতিহাস আঁকড়ে ধরেছে। তারা দেখেছে, গণমানুষের ঐক্য কী করতে পারে। মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে দুটি স্বৈরতন্ত্রকে উৎখাত করা সামান্য ব্যাপার নয়। এগুলো ঐতিহাসিক সাফল্য। আমাদের কোনো অবস্থাতেই মিশরীয় সামরিক বাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা এবং একইসঙ্গে ইখওয়ান ও অন্যান্য ইসলামপন্থীদের সহিংস কার্যাবলী (বিশেষ করে কপ্টিক সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে) এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।

মিশরীয় গণমানুষের বেশ বিশাল অংশ প্রায় দুই বছর ধরে আন্দোলন পরিচালনা করে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে এবং তারা এখনো অত্যন্ত সচেতন। সামরিক বাহিনীর বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা স্রেফ আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনবে কিংবা গণদাবিগুলোর অন্তত কিছু অংশও বাস্তবায়িত করে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার কোনো চেষ্টা করবে নাএমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে তারা কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে তার ওপরই নির্ভর করছে গণআন্দোলন কোন পথে যাবে। সামরিক বাহিনী, ইখওয়ান, মোবারকপন্থী বুর্জোয়া বা নাসেরবাদীকোনো প্রাধান্য সৃষ্টিকারী শক্তিই কোনোভাবেই গণবিদ্রোহ সৃষ্টিকারী বিদ্যমান আর্থসামাজিক সঙ্কট নিরসন করতে পারবে না। স্থানীয় শ্রেণী সম্পর্কের পূর্ণ পুনঃকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন না হলে সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে গিয়ে গৃহযুদ্ধ নেমে আসার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।।

(চলবে…)

(ফ্রন্টলাইন পত্রিকা থেকে)