Home » বিশেষ নিবন্ধ » অশুভ ইঙ্গিত

অশুভ ইঙ্গিত

freedom-of-thoughtসংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদককে অপহরণ করার ব্যর্থ চেষ্টাটি সত্যিকার অর্থেই উদ্বেগজনক। তবে তা নজিরবিহীন নয়, কিংবা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাও নয়। সাম্প্রতিক সময়ে অনেকই, যাদের বেশির ভাগ অত্যন্ত সুপরিচিত বুদ্ধিজীবী, অজ্ঞাত লোকদের গালিগালাজের শিকার হচ্ছেন, এমনকি মৃত্যুর হুমকি পাচ্ছেন, তাদের পরিবার সদস্যদেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যেসব লোক কঠোর হুমকি পাচ্ছেন, তাদের মধ্যে বেশ কিছু মিলও দেখা যায়। তারা বলতে গেলে কোনো দলের অন্ধ ভক্ত নন এবং সাধারণভাবে বলা যায়, তারা কায়েমি স্বার্থবাদী কোনো গোষ্ঠীর অংশবিশেষও নন। দৃশ্যত যুক্তিবাদী মননশীলতার অধিকারী এসব ব্যক্তি সেক্যুলারগণতান্ত্রিক আদর্শ ও মূল্যবোধে আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী। এর চেয়েও বড় কথা হলো, তারা সবসসময় তাদের কথা ও কাজের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ এবং গণবিরোধী নীতির কঠোর সমালোচক করেন, ঠিক যেমন আগের রাজনৈতিক ও রাজনীতিবিরোধী সরকার আমলের সীমা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন।

এ ধরনের, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের কার্যকলাপ ও দৃষ্টিভঙ্গির যেকোনো ধরনের ভিন্ন মত ও অসন্তোষ প্রকাশ, সমালোচনা ও নিন্দা করার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা প্রদর্শনের ফলে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, এসব প্রখ্যাত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার সদস্যদের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ এবং মৃত্যুর হুমকি প্রদান ক্ষমতাসীন শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা সুবিধাভোগী লোকদের কর্ম হতে পারে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দোষী ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে কাঠগড়ায় হাজির করা তো দূরের কথা, আলোচিত ঘটনার যথাযথ তদন্ত করতেও অনীহা প্রদর্শন করছে মনে হওয়ায় ওই ধারণা বদ্ধমূল হয়। এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং তাদের রাজনৈতিক বসরা তথা সরকার এসব ঘটনায় প্রশ্রয় না দিলেও কিংবা এমনকি যোগসাজস না করে থাকলেও এই অনীহা আসলে কৌশলী না দেখার ভান করা।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করার চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা, যদিও এটাই ছিল অনুমিত, মর্মন্তুদ ও বেদনাদায়ক। তারা এর মাধ্যমে অবলীলায় কথা বলার, মতপ্রকাশ, চিন্তা করার বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী চলার সাংবিধানিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনকেও উপেক্ষা করেছেন। আবার এই লোকেরাই টেলিভিশন টকশো, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে কথা বলার সময় এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় লেখালেখিতে এসব আদর্শ নিয়ে বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য দেন। অন্তত এটুকু বলা যায়, এ ধরনের কপটতা বিপজ্জনক। কারণ এটা আরো কঠোরতা এবং নির্মমতার সাথে বিরুদ্ধ কণ্ঠ এবং ভিন্ন মতপ্রকাশকে থামিয়ে দিতে ক্ষমতাসীন এলিটদের আরো উদ্ধত করে তুলতে পারে। দলীয় আনুগত্যের ঠুলিতে অন্ধ এসব লোক এটাও বুঝতে পারেন না যে, দান উল্টে গেলে তারাই আবার এ ধরনের ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়তে পারেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সার্বিকভাবে সমাজে গণতান্ত্রিক ভিন্নমত এবং গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ সঙ্কীর্ণ করাটা চূড়ান্তভাবে শাসিতদের প্রতি শাসকদের গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা অস্বীকার বোঝাতে পারে। অথচ কার্যকর গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান এটি। এ ধরনের জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির ফলে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বৈরশাসনের আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে। ঠিক এই কারণেই দলমত নির্বিশেষে সমাজের সচেতন নাগরিকদের উচিত এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং ক্ষমতাসীনদের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য জনমত গড়ে তোলা যাতে তারা উল্লেখিত গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার আওতার মধ্যে থাকতে ওই ধরনের নির্যাতনমূলক কৌশল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকেন।।

(নিউ এইজ পত্রিকায় ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত সম্পাদকীয়এর অনুবাদ)