Home » রাজনীতি » আস্থাহীন সরকার

আস্থাহীন সরকার

ফারুক আহমেদ

political-cartoon-5এবার ঈদ,দুর্গা পূজা এবং প্রবারণা তিন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের তিনটি বড় উৎসব প্রায় একই সঙ্গে স¤পন্ন হলো। না,ধর্মীয় দিক দিয়ে এখানকার সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন হানাহানি নেই, কোন বিদ্বেষ নেই। তাই তিনটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব একই সঙ্গে হওয়াতে মানুষের মধ্যে সেদিক দিয়ে কোন উৎকন্ঠা ছিল না। অনেক অপ্রাপ্তির মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের এ এক নিজস্ব অর্জন। শাসক দলগুলোর বার বার ধর্মকে রাজনীতির মধ্যে নিয়ে এসে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার সত্ত্বেও এখানকার অসাম্প্রদায়িকতার শেকড় থেকে এদেশের মানুষের এই নিজস্ব অর্জন অনেক ইন্ধন এবং বাধাবিপত্তির মধ্যেও টিকে আছে।

মানুষের উৎকন্ঠা ছিল অন্য যায়গায়। সেটার কারণ এখানকার শাসক দলগুলোর রাজনীতিহীন অপরাজনীতি। বর্তমান সরকারের মেয়াদ যতই শেষ হয়ে আসছে মানুষের উৎকন্ঠাও বেড়ে চলেছে। নির্বাচন কিভাবে হবে,আদৌ নির্বাচন হবে কিনা? কিন্তু একটি নির্বাচিত সরকারের দেশে নির্বাচন নিয়ে উৎকন্ঠার তো কোন কারণ থাকতে পারে না। নির্বাচনই মানুষের একমাত্র গণতান্ত্রিক অধিকার নয়।একটি গণতান্ত্রিক দেশে মানুষের অনেক গণতান্ত্রিক অধিকার থাকে তার মধ্যে একটি হলো নির্বাচন। যখন শাসক দলগুলোর সরকার মানুষের সেসব অধিকারকে কোন রকমের তোয়াক্কা না করে নির্বাচনকেই গণতন্ত্র চর্চার একমাত্র উপায় হিসেবে নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চায় বা ক্ষমতায় যেতে চায় তখনই এ ধরণের সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষ শাসক দলগুলোর তৈরী করা এই সংকটে লাগাতারভাবে আক্রান্ত হয়ে চলেছে। বাংলাদেশে স্বৈরাচার বলে আখ্যায়িত এরশাদের পতনের পর থেকে নতুন মাত্রায় যে গণতান্ত্রিক যাত্রার কথা বলা হয়ে থাকে সেই গণতন্ত্রের এমন রূপই মানুষ প্রত্যক্ষ করছেন। একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবার পর তার মেয়াদকালে যদি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোর প্রতি দায়ীত্বশীল হয়ে সেগুলো পলনের পদক্ষেপ নেয় এবং পালন করে তবে মানুষের সরকারের প্রতি যেমন আস্থা তৈরী হয় সরকারেরও নিজের প্রতি এবং মানুষের প্রতি আস্থা তৈরী হয়। সেই সরকার মানুষের আরেক গণতান্ত্রিক অধিকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পালন করবেন তা নিয়ে মানুষের কোন দ্বিধা থাকে না। সে ক্ষেত্রে সরকারের যেমন মানুষের প্রতি আস্থা থাকে তেমনই বিরোধী যারা থাকেন তারাও মানুষের জন্য তাদের অধিকারের রাজনৈতিক কর্মসূচী দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে। এর মধ্যদিয়ে জনগণের দ্বারা ক্ষমতার নবায়ন বা বদল ঘটে। তা নিয়ে ক্ষমতাসীন,বিরোধীদল,জনগণ কারোই কোন উৎকন্ঠার কারণ থাকবার কথা নয়। সেদিক দিয়ে দেখলে একটি দেশে নির্বাচন কোন একদিনের ব্যাপার না। নির্বাচন তখন হয়ে ওঠে এক চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু মানুষের অন্য সকল গণতান্ত্রিক অধিকারকে উপেক্ষা করে এবং তার উপর নানা রকমের আক্রমন করে নির্বাচনই যখন শাসক দলগুলোর একমাত্র গণতন্ত্র চর্চা এবং তার মাধ্যমেই ক্ষমতায় থাকা আর ক্ষমতায় যাওয়া নির্ভর করে তখন তাই নিয়ে যে সংঘাত হতে পারে বাংলাদেশে এখন তাই চলছে।

বর্তমান সরকার কি পূর্ববর্তী সরকারগুলোরই ধারাবাহিকতায় মানুষের অনাস্থাই অর্জন করেনি? এ সরকার কি মানুষের যে কোন গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলনে বাধা দেয়নি? বিদ্যুতের দাবিতে রাস্তায় নামা মানুষের উপর কি চড়াও হয়নি? শেয়ার বাজার থেকে সর্বশান্ত মানুষ যখন রাস্তায় নেমেছে তখন কি তাদের ওপর চড়াও হয়নি? বেতনের দাবিতে শিক্ষকরা যখন রাস্তায় নেমেছেন তখন কি তাদের দমন করা হয়নি? তেলগ্যাস সহ জাতীয় স¤পদ রক্ষার আন্দোলনকারীদের উপর কি সরকার বল প্রয়োগ করেনি? একদিকে সব ধরণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন অপরদিকে শেয়ার বাজার কেলেংকারি,হলমার্ক কেলেংকারি,যমুনা সেতু দুর্নীতি, সরকারী দলের লোকদের টেন্ডারবাজী,চাঁদাবাজী ধারাবাহিকভাবে চলছে। দ্রব্যমূল্য ধারাবাহিকভাবে উর্ধ্বমূখীতো বটেই কোন কোন সময় বড় বড় ধাক্কায় মানুষ রীতিমত পর্যুদস্ত। এসব কারণে সরকারের উপর জনগণের এবং জনগণের উপরও সরকারের আস্থা থাকেনি। তাই জনগণের পক্ষে বিরোধীদলের এমন কোন কর্মসূচী না থাকলেও নির্বাচনে হেরে যাবে এতে ক্ষমতাসীন দলের কোন সন্দেহই থাকে না। বাংলাদেশে বার বার ঘুরে ফিরে নির্বাচন নিয়ে শাসক দলগুলোর মধ্যকার সংকট এখানেই। এ সংকট গণতন্ত্রহীন গণতন্ত্র চর্চার মহড়ার সংকট। কিন্তু এ সংকটে জনগণ আক্রান্ত। আর আক্রান্ত বলেই জনগণের উৎকন্ঠা।

এ সব অবস্থা জনগণের অজানা নয়। জনগণের আস্থা ক্ষমতাসীনরা অর্জন করতে না পারলেও উৎকন্ঠা এবং উদ্বেগ জনগণকে এমন এক জায়গায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে যে, জনগণ এখন আলেয়াকেও আলো ভাবতে প্রস্তুত। কারণ জনগণ লাগাতার উৎকন্ঠার আর উদ্বেগের চাপ থেকে একটু স্বস্তি চায় একটু খানি যেন চাপ মুক্ত হতে চায়। সেদিক থেকেই জনগণ জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষনের দিকে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভাষনের পূর্বাপরে মানুষ সরকারের আন্তরিকতার ছোঁয়া কতটুকু পেলেন? প্রধানমন্ত্রী যে প্রস্তাবই দিন না কেন তাই যে চূড়ান্ত কোন কিছু নয় তা ক্ষমতাসীন দলেরও অজানা নয়। মানুষের যা প্রত্যশা ছিল প্রধানমন্ত্রীর ভাষন নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু মানুষ রীতিমত হতাশ হতে শুরু করলেন। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অপরদিকে বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় কার্য্যালয় অবরূদ্ধ করে রাখা। বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ তাই দেখলো। মানুষ আরো দেখলো তাদের পূর্বঘোষিত ২৫ তারিখের কর্মসূচী পালনের পথ বন্ধ করার জন্য সকল ধরণের সভাসমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। এ অবস্থায় মানুষ কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের মধ্যে আন্তরিকতার ছোঁয়া দেখে উদ্বেগ এবং উৎকন্ঠা মুক্ত হতে পারেন? সকল প্রকার সভাসমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সরকার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ তো করলোই সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও প্রমাণ করল যে, বাংলাদেশের মানুষ শুধুমাত্র এই দুই জোটেই বিভক্ত। এই দুই জোটই দেশটাকে যেন ভাগাভাগি করে নেওয়ার অধিকার রাখে। এখানে গণতান্ত্রিকভাবে সংগঠিত হওয়ার কথা বলার আর যেন কারো কোন অধিকারই নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যদিয়ে সরকার তার জোটের বাইরের সকল মানুষকে বি.এন.পির জোটের মধ্যে ঠেলে দিল। অন্ততঃ ভোটদানের ক্ষেত্রে সরকার সেই অবস্থাই সৃষ্টি করল। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের দিক থেকে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, সরকার কি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিজেই নিজের প্রতি অনাস্থা তৈরী করছে না? সরকার বি.এন.পির কর্মসূচীতে বাধা দানের আয়োজন করে নিজেরাই তাকে বেশি শক্তিশালী মনে করছে না?

একদিকে ক্ষমতার পাঁচ বছরের মধ্যে সরকার মানুষের কোন প্রকার গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি দায়ীত্ব পালন এবং শ্রদ্ধাশীল থাকেনি। উপরন্তু জনগণের সকল গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর আঘাত করেছে। নির্বাচনের সময় জনগণকে দিয়ে আসা প্রতিশ্রুতি পালন করেনি। বিদ্যুত, পানি, গ্যাস সংকটের সুরাহা না করে, দ্রব্যমূল্য লাগাতারভাবে বৃদ্ধি করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। পাঁচ বছরে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। উপরন্তু মানুষ নতুন নতুন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। এ অবস্থায় সরকার মানুষকে আস্থায় নিতে পারছে না। অপরদিকে বিরোধী দলও এই পাঁচ বছরে জনগণের এমন কোন আন্দোলন এবং দাবি দাওয়ার সঙ্গে একাত্ম ছিল না যাতে করে জনগণের সক্রিয় স¤পৃক্ততা তাদের সঙ্গে থাকবে। একথা ঠিক যে এরকম পরিস্থিতিতে মানুষ বার বার বিরোধী পক্ষকেই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের শাসক দলগুলোর মধ্যে এ হিসাবে সবচেয়ে দক্ষ দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তাদের এ হিসাব যেমন আছে যে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাদের পরাজয় অনিবার্য। এমন পরিস্থিতিই জনগণের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা সৃষ্টির কারণ। জনগণের উৎকন্ঠার এবং উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ হলো সরকার এবং বিরোধী পক্ষের হিসাব যাই হোক এই পরিস্থিতি দ্বারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত জনগণ। জনগণের উদ্বেগ উৎকন্ঠার কারণ হলো সেই সমঝোতায় পৌঁছানোটা সব সময়ই হয় জনগণের জানমালের মূল্যে।।