Home » প্রচ্ছদ কথা » একদলীয় নির্বাচনের পথেই সরকার

একদলীয় নির্বাচনের পথেই সরকার

ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

আমীর খসরু

political-cartoon-2২৫ অক্টোবর নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাল্টা সমাবেশ ডেকে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে, দেশব্যাপী বিরোধী পক্ষ ঠেকাও বলে যে আয়োজন চলছে তাতে জনগণের ঈদপূজা পার্বনের আনন্দ ম্লান হয়েছে তো ঠিকই, এখন মানুষ আরো বেশি শঙ্কিত, আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন এবং তার চেয়েও কিছু বেশি। ঈদের দু’দিন পরে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন বলে ঘোষণাটি আসার পরে হয়তো কারো কারো মনে মৃদু আশার সঞ্চার হয়েছিল। কারণ তারা প্রত্যাশা করেছিলেন সমঝোতার পথ হয়তো খুললেও খুলতে পারে। যদিও তারা পুরোপুরি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছিলেন না। অবশ্য এর কিছু দিন আগে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অধিবেশন থেকে ফিরে এসে বলেছিলেন, শিগগিরই তিনি তার অবস্থান জাতির উদ্দেশে ব্যাখ্যা করবেন। এতেই স্পষ্ট হয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণটি ওই দিকে যাবে এবং গেছেও। তবে দু’একজনের মনে আশা সঞ্চারী যে প্রত্যাশা তা ধপ করেই নিভে গেলো ভাষণটির শুরুতেই।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতা শুরু করতে না করতেই স্পষ্ট বলে দিলেন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা আর ফিরে আসছে না, আসবে না। তখনই যারা বোঝার তারা ঠিকই বুঝে গিয়েছিলেন পুরো বক্তৃতাটি কোনদিকে যাচ্ছে। পুরো বক্তৃতায় তিনি বিরোধী দলকে মুলতবী প্রস্তাব সংসদে দেয়ার সেই পুরনো কথাই আবার উল্লেখ করলেন। আরো প্রস্তাব দিলেন, সর্বদলীয় সরকারের। বিএনপির এমপিরাও ইচ্ছা করলে ওই মন্ত্রিসভায় থাকতে পারে বলে তিনি নাম চাইলেন। এটাও নতুন কোনো ফর্মুলা বা প্রস্তাব নয়। জাতীয় সংসদসহ কয়েকটি স্থানে ভাষণেবক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী একই কথা আগেও উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নতুন করে দেয়া পুরনো প্রস্তাবে সরকার প্রধান কে হবেন, কতোজন মন্ত্রী থাকবেন, বিএনপি বা বিরোধী দলের ভূমিকা ওই মন্ত্রিসভায় কি হবে, কতোটুকুই বা তারা ক্ষমতা ভোগ করবেন এসব নিয়ে খোলাসা করে তিনি কিছুই বললেন না। সর্বদলীয় সরকারের রূপরেখা নিয়েও কোনো একটি কথা উল্লেখ করেননি। পরে প্রধানমন্ত্রী তার উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এবং মন্ত্রী হাছান মাহমুদকে দিয়ে ব্যাখ্যা করালেন ‘কি করিলে কি হইবে’ জাতীয় বিষয়গুলো। হয়তো প্রধানমন্ত্রী নিজের নাম নিজে বলতে কিছুটা লজ্জিত হচ্ছিলেন। ওই দিনের বক্তৃতাটি ছিল আসলে পুরোপুরি নির্বাচনকেন্দ্রীক এবং রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে নির্বাচনী বক্তৃতা। জাতির উদ্দেশে দেয়া বক্তৃতার নামে তিনি একটা সুযোগ নিলেন মাত্র। ওই বক্তৃতায় তিনি অবশ্যই তারই বহুল উচ্চারিত আকাঙ্খা প্রকাশ করলেন এই বলে যে, ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি দেশ এবং জাতির সেবা করতে চান। অর্থাৎ ভিশন ২০২১। এই ভিশন ২১ জনগণকে ভীষণভাবে আতঙ্কিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতাটিতে সর্বদলীয় সরকারের বিষয়ে অস্পষ্টতা ও গোজামিল থাকলেও, স্পষ্ট ছিল তার সমঝোতা এবং আন্তরিকতার অভাবে। তিনি যে প্রস্তাবটি বিদ্যমান সঙ্কট নিরসনের উদ্দেশে দেননি সে বিষয়টি পরিস্কার। প্রধানমন্ত্রী যখন তার বক্তৃতায় ‘সংঘাতের পথ পরিহার করুনশান্তির পথে আসুন’ বলে আহ্বান জানাচ্ছিলেন তখনও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি ছিল পুলিশ দিয়ে ঘেরা।

ভাষণের পরে বিরোধী দল যখন তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে, এ নিয়ে তার ভাষণ পর্যবেক্ষণপর্যালোচনা করছে তখনই অতীতের কয়েকবারের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ এই সরকার ঢাকা শহরে সভাসমাবেশ, মিছিলসহ রাজপথের পুরো কর্মসূচির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করলো। অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এমন যে, এখন রাজপথে ধর্মীয় কোনো অনুষ্ঠান, এমনকি দোয়াখায়েরের সুযোগটুকু পর্যন্ত আর নেই। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঘরের মধ্যে তো কোনো বাধা নেই। স্বৈরাচারী সেনা শাসনগুলোতে ঘরোয়া রাজনীতির প্রচলন ছিল। এখন ঘরোয়া রাজনীতিও শর্ত সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে বিরোধী দলীয় নেত্রী পেশাজীবীদের একটি অনুষ্ঠানে যোগদান করতে পেরেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অতিশয় কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত সভাসমাবেশ অনুষ্ঠানও নিয়ন্ত্রণ করবে এটা ভাবাও কঠিন। এটা তো পুলিশের মধ্য পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ হওয়ার কথা।

প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের ১২৩এর () – সহ সংবিধানের দোহাই দিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যে সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়েছিলেন ২০০৯ সালে, সে সংবিধানে কিন্তু এসব বিষয়গুলো ছিল না। এ সবই সন্নিবেশিত করা হয়েছে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেয়ার দুই বছরেরও বেশি সময় পরে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এমনভাবে সংবিধান ব্যাখ্যা করছেন যে, এই সংবিধান রাষ্ট্রটির জন্মলগ্ন থেকে এক, অভিন্ন এবং অকৃত্রিম অবস্থায় রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই যে সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়েছে তিনি কখনই তা বলেন না। তিনি বলেন, জনগণ চায়। এটা কোন জনগণ? তিনি কিভাবে বুঝে নিলেন জনগণ আসলেই চায় কোন মানদন্ডে কিংবা কোন পালাপাথরে এটা বিচার করা হয়েছে। জনগণের জনপ্রিয়তা রয়েছে কিনা তা বিচারের জন্য গণভোট দেয়া হলো না কেন?

সঙ্কট সমাধানের ক্ষেত্রে, সমঝোতায় পৌঁছানোর পরিবর্তে লোক দেখানো অবস্থাই এখন চলছে। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রস্তাবে কমছেকম ৭২ ঘন্টার পরে বিরোধী দলীয় নেত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পাল্টা ফর্মূলা দিলেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী যেমন তার অবস্থান থেকে নড়েননি, তেমনি তিনিও তার অবস্থানে অনঢ় থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে ৫ জন করে নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা বললেন। এরপর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংলাপ চেয়ে চিঠি দেয়া হলো। পুরো বিষয়টি সরকার এবং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে লোক দেখানো, তা সবাই বোঝে এবং ভালো করেই বুঝতে পারে। যদি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ‘সহি’ এবং ‘আন্তরিক’ প্রস্তাব আসতো তাহলে রাজনীতিতে খেলো এবং এসব লোক দেখানো বিষয়গুলো আসতে পারতো না।

আগামী দিনগুলোতে মুহূর্তে মুহূর্তে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে থাকবে। এ অবস্থায় সত্যিকার সংলাপ প্রয়োজনীয় ছিল। কারণ বিএনপি যদি ২৪ অক্টোবর সংসদ থেকে পদত্যাগ করে তাহলে পরিস্থিতি আরেকদিকে মোড় নেবে।

সংলাপের কথা দু’পক্ষ বললেও সংলাপের প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে ফলাফল এবং ইতিহাস এ দেশে কখনই ভালো হয়নি। এটা স্যার নিনিয়ান স্টিফেনই হোন বা জলিলমান্নান ভূঁইয়ার সংলাপই হোক। তাহলে একশ্রেণীর সুশীল নামধারী সংলাপ সংলাপ করছে কেন? কেন তারা দুই নেত্রীর বৈঠক চাচ্ছে। দেখাসাক্ষাত বা সংলাপের আগে প্রয়োজনীয় ঐক্যমত্যের এবং প্রকৃত সমঝোতায় আসা প্রয়োজন লোক দেখানোর জন্য নয়। আশাহীন, ভরসাহীন, উদ্বেগাকুল জনগণের মনে আশা জাগিয়ে তা ধপ করে নিভিয়ে দিলে অগণতান্ত্রিক শক্তিই লাভবান হবে। কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় এ সংলাপের বিষয়টি লোক দেখানোই থেকে যাবে।

সরকার কি এসব কথা বোঝে না। নিশ্চয়ই বোঝে। এত সব বুঝেও সরকার কেন নিষেধাজ্ঞার ঘেরাটপের মধ্যে দেশকে আরো দিকদিশাহীন সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? ২৫ অক্টোবর বা অন্য যে কোনো সময় সমাবেশ যদি হয়ই তাতে কি সরকারের পতন হবে বলে তারা মনে করে? কখনই না। যতোক্ষণ পর্যন্ত না জনগণ পরিপূর্ণভাবে সম্পৃক্ত হবে ততোক্ষণ পর্যন্ত না। কিন্তু সরকারের মধ্যে সেই বিশাল ভয়, আতঙ্ক, শঙ্কা কাজ করছে। সরকার নিজের উপরেই নিজে আস্থাশীল নয়। আস্থাশীল নয় তার জনপ্রিয়তার ব্যাপারে। এই নিষেধাজ্ঞা, বাধা, সংঘর্ষ লাগিয়ে দিয়ে একদলীয় নির্বাচনের দিকেই সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। আর এটা করা হচ্ছে ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদী কিংবা চিরস্থায়ী করার মানসে। এসব কি তারই বন্দোবস্ত? কিন্তু তা কি কখনও কোথায়ও দীর্ঘস্থায়ী কিংবা চিরস্থায়ী হয়েছে?