Home » রাজনীতি » একদলীয় নির্বাচন – মেসেজটি জনগণের কাছে পৌঁছে গেছে

একদলীয় নির্বাচন – মেসেজটি জনগণের কাছে পৌঁছে গেছে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

publicবাঙালী জাতির প্রাত:স্মরণীয় মানুষদের একজন প্রয়াত অধ্যাপক ড. আহমেদ শরীফ, যাকে স্মরণ করে বাঙালীর মন ও মনন ধন্য হয়ে ওঠে সবসময়। তার সময়ে দাঁড়িয়ে সমসাময়িক ও সম্ভবত: ভবিষ্যত বাংলাদেশের রাজনীতির পরিনাম তিনি এভাবেই দেখেছিলেন; তার ভাষায়, “আজ আমাদের ডানেবামে কোন নেতা নেই। এই মূহুর্তে আমাদের রাষ্ট্র যেন স্থির সমুদ্রে ছেঁড়া পাল, ভাঙা দাঁড় ও হৃতহাল একটি নৌকা। ঝড় উঠলে কি হবে কেউ জানে না। আমাদের কিশোরতরুনদের অনেকেই দেশের কাজ তথা জনগণ ও রাষ্ট্রের সেবা করতে চায়, কিন্তু আস্থা রাখবার মত, বলভরসা পাবার মত নেতা খুঁজে পায় না বলে নৈরাশ্যে ভোগে এবং পরে একসময় ভাবেচারিদিককার সব শক্তিমান সাহসী ও বুদ্ধিমান চালিয়াতরা বেপরোয়া, জোরজুলুম ও বেধড়ক লুটপাট চালাচ্ছে যখন, তখন আমি একা সৎ ও আদর্শনিষ্ঠ থেকে কি ফায়দা! সেও তখন জুটে যায় খুনজখমরাহাজানির পেশায়, নাম লেখায় ভাড়াটে গুন্ডার তালিকায়, হয়ে ওঠে মজুতদার, ঠিকাদার চোরাচালানদার ভেজালদার কিংবা মানুষ বেচার আড়তদার। এখানে দলপতিও মন্ত্রীত্বের মূলার আকর্ষণে দলত্যাগ করে লুটিয়ে পড়ে সরকার প্রধানের কোলে। সামরিক নায়কশাসকের আহবানে মন্ত্রী হয়ে হয় কৃতার্থ। আমাদের রাজনৈতিক দল কর্মসূচির জনপ্রিয়তা যৌক্তিকতা নিয়ে নয়টিকে থাকে প্রাক্তন রাষ্ট্র প্রধানের স্ত্রী বা কন্যার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নেতৃত্বে।”

. আহমেদ শরীফ একথাগুলো বলেছিলেন, বাংলাদেশ তখন ছিল সামরিক সরকারদের দ্বারা শাসিত এবং শোষিত। ৯০ সালের পরে সামরিক শাসকদের হটিয়ে গণঅভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে যে নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রের দিকে যে অভিযাত্রাটি শুরু হয়েছিল বারবার সিভিল শাসকদের ক্ষমতায় থাকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের চেষ্টার ফলে তাও এখন ধুকপুক করছে। তার মূল কারন হচ্ছে, মানুষ হিসেবে যারা অযোগ্য, অদক্ষ, অকর্মন্য, অসৎতাদেরই নাম রাজনীতিবিদ। অন্তত: বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে হাতে গোনা দুচারটি ব্যাতিক্রম ছাড়া এই বলয়ের বাইরে রাজনীতি এবং রাজনীতিকরা বের হয়ে আসতে পারছেন না।

এর নিট ফলাফল হচ্ছে, এই অযোগ্য লোকদের দ্বারাই জনগণ শাসিত এবং শোষিত হচ্ছে। নিজেদের অযোগ্যতা আড়াল করার জন্য রাজনীতিবিদরা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। তাদের আশ্রয়প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠে গণবিরোধী শক্তি। এর অনিবার্য পরিনতিতে সমাজের দেখা দেয় ভয়াবহ অস্থিরতা, যার মূল শিকার নিরীহ জনগণ। দুর্নীতিলুটপাট, হত্যাধর্ষণ, ছিনতাইরাহাজানি হয়ে ওঠে জনজীবনের অনুসঙ্গ। রাজনীতিবিদরূপী মানুষেরা সমাজের ওপরতলায় অবস্থান নিয়ে নিয়ন্ত্রন করে গণবিরোধী এই শক্তিকে। এই রাজনীতিকদের ভিন্ন ভিন্ন দলীয় পরিচয় থাকলেও তাদের সবার আচারআচরণ, কথাবার্তা, বক্তব্যবিবৃতি ও উদ্দেশ্যের মধ্যে তেমন একটা অমিল দেখা যায় না। সে কারনে যে দল যখনই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, নির্দিষ্ট সময়ে জনগনের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। পাঁচ বছর পরে জনগনের সামনে একটিই সুযোগ আসে তাদের পছন্দমত নেতৃত্ব বেছে নেয়ার। যদিও তাতে তেমন কোন পরিবর্তন ঘটে না, তারপরেও একটি সুযোগ অন্ততঃ তৈরী হয়। ২০১৩ সালের বাংলাদেশে সেটিও এখন অনিশ্চিয়তার কবলে।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভাষণ, সর্বদলীয় সরকার গঠনের আহবান এবং পরেরদিনই রাজধানীতে সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আসল মেসেজটি জনগনের কাছে পৌঁছে গেছে। জনগণ অনেকটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, বর্তমান সরকার তাদের সুবিধামত একটি সময়ে নির্বাচন আয়োজন করবে এবং সেখানে যদি প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহন নাও করে, একটি একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি আরো পরিষ্কার হয়ে যায়, ২০ অক্টোবর সন্ধ্যায় মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টির সঙ্গে লোক দেখানো সংলাপ অনুষ্ঠানের পরে। যদিও পরের দিনই আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফকে অসত্য ভাষনের দায়ে অভিযুক্ত করে এরশাদ অবস্থান উল্টে দিয়ে বলেছেন, কারো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা নাকি সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হবেন না। জনগণ কিন্তু এটি বিশ্বাস করে না। তাদের অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এরশাদ রাতে যা বলেন দিনের বেলায় সেটি উল্টে দিতে পারে। সুতরাং আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে অংশ নিলে জাতীয় পার্টিও এককভাবে অংশগ্রহন করবে। সেক্ষেত্রে, যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়, অংশ নিলে জাতীয় পার্চি মহাজোট বা বিএনপির সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে জনগণ অন্তত: তাই মনে করে।

অন্যদিকে, সোমবার খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনকালীন সরকারের যে প্রস্তাবটি হাজির করেছেন, তা তত্বাবধায়ক সরকার দাবিরই নামান্তর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবের সার কথা ছিল, সব দলের সমন্বয়ে সরকার গঠিত হবে, ২৫ অক্টোবর থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর তিন দিন পরে খালেদা জিয়া যে পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছেন তার সার কথা হচ্ছে, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্বাবধায়ক সরকারের ২০ জন উপদেষ্টার মধ্য থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ৫ জন করে নাম দেবে। তাঁরাই নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা হবেন। ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে এদের মধ্যে একজন সবার কাছে গ্রহনযোগ্যতিনি সরকার প্রধান হবেন, সংসদ যেভাবে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করে, সেভাবে প্রয়োজনে এই ১১ জনকে নির্বাচিত করে আনা যেতে পারে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খালেদা জিয়ার প্রস্তাব মেনে নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এখন দেখা যাক, এ বিষয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর পরে সংবিধান কি বলছে; সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিন এবং অন্য কোন কারনে সংসদ ভেঙ্গে গেলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। আগের ৯০ দিনের মধ্যে হলে সংসদ বহাল থাকবে এবং সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীবর্গ স্বপদে বহাল থাকবেন। আর পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে হলে সংসদ সদস্যরা স্বপদে থাকবেন না। তবে ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভেঙ্গে যাওয়া সংসদের সদস্যদের মধ্যে থেকেই নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রী পরিষদ গঠন করতে হবে। এ অবস্থায় জনগনের কাছে ধারনাটি স্পষ্ট অবয়ব পেতে শুরু করেছে যে, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বিপরীতমুখী প্রস্তাবের মিমাংসা সম্ভব নয়। এর কারন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী সংবিধান থেকে না নড়ার প্রশ্নে অনড় রয়েছেন, অন্যদিকে বিরোধী নেতা তত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তাদের দু’জনার প্রস্তাবের মধ্যে ব্যবধান এত বেশি যে, কোন অবস্থাতেই সমঝোতা সম্ভব নয়। অতীত অবস্থান থেকে বের করার জন্য পর্দার অন্তরালে একটি সমঝোতা সম্ভব হলে সংকট দুর হবে। অন্যথায় সংঘাত অনিবার্য বলে সকলেই বুঝে গেছেন।

২৫ অক্টোবর ঢাকায় বিরোধী দল ও সরকারী দল আহুত সমাবেশ অনুষ্ঠান কেউই এখনো অনুমোদন পায়নি। পুলিশ রাজধানীতে সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়ে নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রের যাত্রায় যে বাধার সৃষ্টি করেছে তা দুর হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উল্টে সোমবার রাতে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় অফিস থেকে বেরোনোর মুখে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর পুলিশি হামলা এবং ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিকে গ্রেফতারের ঘটনাকে অনেকেই চরম উস্কানী বলে মনে করছেন। অন্যদিকে, চট্টগ্রামে লালদিঘি ময়দানে বিএনপি আহুত জনসভাস্থলে আওয়ামী লীগের জনসভা আহবানের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো উস্কে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ২৫ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপি’র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে না দিলে রাজনীতির সহিংসতা ও ভয়াবহতা নতুন মোড় নেবে বলে জনগণ আশংকা করছে। বিএনপি আগেই জানিয়ে দিয়েছে, এ কর্মসূচিতে বাধা দিলে ২৭ অক্টোবর থেকে তারা লাগাতার হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশ অচল করে দেবে। এ অবস্থায় সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের শুভবুদ্ধির দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া জনগনের আর কোন উপায় নেই। যদিও জনগণ জানে, ক্ষমতালিপ্সু অসৎ রাজনীতিবিদরা যতোটা ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেয়, ঠিক ততটাই অবহেলার পাত্র তাদের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ।

সুতরাং, জনগণ এখনও প্রতি মূহুর্তে এই আশংকায় রয়েছে যে, ২৫ অক্টোবরের পরে বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেবে। মঞ্চে যারা এই মূহুর্তে অভিনয় করছেন, অদৃশ্য সুতোর নাচনে নাচছেন, তারা কি তাদেরই সৃষ্ট সংকটের সমাধান করতে পারবেন? নাকি, মঞ্চের নেপথ্য কুশীলবরা নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে আরো একবারের মত গোটা জাতির ওপরে অন্ধকার নামিয়ে এনে তাদের স্বার্থ চরিতার্থ অব্যাহত রাখবেন। দুটি ক্ষেত্রেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হবে জনগণ, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আর কতোকাল! ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে?