Home » অর্থনীতি » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

লুমুমবার ঔপনিবেশিকতা আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম

ফারুক চৌধুরী

lumumbaসময় ১৯৬০ সালের ৩০ জুন। কঙ্গো স্বাধীন হলো। প্যাট্রিস লুমুমবা প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট লোসেক কামাভুবু। সময় : ১৯৬০ সালের জুলাই মাস। স্বাধীন কঙ্গোর সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ তৈরি করা হলো, মোশো শোম্বে কঙ্গোর খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ কাটাঙ্গা অঞ্চলকে ঘোষণা করলো স্বাধীন। ষড়যন্ত্রকবলিত কঙ্গোর অসহায় মাটিতে আবার পদাপর্ণ ঘটল বেলজিয়ামের সৈন্যদের। এবারের যুক্তি নতুন। সে নয়া যুক্তি হচ্ছে : বেলজীয় নাগরিকদের ও বেলজীয় খনি স্বার্থরক্ষা করতে হবে। সময় : ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর। প্রেসিডেন্ট কামাভুবু প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে বরখাস্ত করলেন লুমুমবাকে। সময় : ১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাস। লুমুমবাকে গ্রেফতার করা হলো। সময় : ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। লুমুমবাকে খুন করা হলো। খুন করল সেনাপ্রধান জোসেফ মুবুতুর অনুগত সৈন্যরা।

রাজনীতির স্পষ্টভাবে বললে বলতে হয়, সম্পদ লুটের রাজনীতির আরেকবার বিজয় ঘটল। বিদায় করে দেয়া হলো লুটের রাজনীতি প্রতিরোধের আর নবজীবন গড়ার রাজনীতির নায়ককে। কিন্তু কবিতায় যেমন বলা হয়েছে, হাত দিয়ে সূর্যের আলো রোধ করা যায় না, তেমনি সত্য আড়াল করা যায় না। লুমুমবা হত্যার তথ্য কিছু কিছু করে প্রকাশিত হলো। নানা খবরে বলা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের যোগসাজশে লুমুমবাকে হত্যা করা হয়েছে। লুমুমবাকে হত্যার জন্য দায়ী করা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামকে। এ সংশ্লিষ্ট ঘটনা প্রবাহের একপর্যায়ে রহস্যজনকভাবে ‘নিহত’ হলেন তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব দ্যাগ হ্যামারশোল্ড। এত মিথ্যা প্রচার, ষড়যন্ত্র ও হত্যার মধ্যেও লুমুমবা হয়ে উঠলেন নায়ক, আফ্রোএশিয়ালাতিন আমেরিকায় নয়। উপনিবেশবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান পেলেন প্যাট্রিস লুমুমবা।

কঙ্গোর প্রসঙ্গ উঠলেই লুমুমবার নাম চলে আসে। স্বাধীনতা ঘোষণার অনুষ্ঠানে বেলজিয়ামের রাজা ঔপনিবেশিক শাসন, লুণ্ঠন, নির্বাচন, হত্যার জন্য কোনো অনুতাপ প্রকাশ করলেন না, চাইলেন না ক্ষমা। তিনি কঙ্গোকে ঔপনিবেশ বানানোর ‘বিচক্ষণতা’র প্রশংসা কররেন। বেলজিয়ামের বদান্যতাও নানা ‘শুভ’ কাজের স্তুতি গাইলেন। জবাবে অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে লুমুমবা উপবিশেবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে বললেন, বলপ্রয়োগ করে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অবমাননাকর দাসত্বের অবসান ঘটানোর জন্য সংগ্রাম অবিচ্ছেদ্য, অনিবার্য। আমাদের ক্ষত এখনো মুকিয়ে যায়নি। আমাদের যন্ত্রণা প্রবল। আমরা নিগ্রো তাই সকালে, দুপুরে, রাতে আমাদের মার খেতে হতো, অপমান সইতে হতো। এ নির্মম পরিহাস। আমরা দেখেছি, আমাদের দেশ লুট করে নেয়া হয়েছে, তা করা হয়েছে আইনের কথা বলে। সে আইন কেবল একটি বিষয়ই স্বীকার করে, তা হচ্ছে শক্তিধরের অধিকার আমরা আইনের নানারূপ দেখেছি। সাদার ক্ষেত্রে এক রকমের আইন, কালো মানুষের ক্ষেত্রে আরেক রকম। আমরা জেনেছি রাজনৈতিক অভিমতের কারণে বন্দিদের নির্মম দুর্ভোগের কথা। তাদের ভাগ্য ছিল মৃত্যুর চেয়েও মন্দ। সেই গুলি চালনার কথা কে ভুলবে, যে ঘটনায় আমাদের এত ভাইয়ের মৃত্যু ঘটেছিল? কে ভুলবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া এত ভাইয়ের কথা, যারা অবিচার, নিপীড়ন, শোষণ শাষনের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাননি? আর আমাদের দমিয়ে রাখার পন্থাই তো ছিল এগুলো।

লুমুমবার ভাষণে রাজা রুষ্ট হলেন। প্রায় ৪১ বছর পরে ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কঙ্গোর নেতা ফ্যাট্রিস লুমুমবাকে হত্যার জন্য বেলজিয়াম ক্ষমা চায়। কঙ্গোর দৈনিক টেমপেট ডেস ট্রপিকম শিরোনাম লেখে আততায়ী দিয়ে লুমুমবাকে খুন ব্রাসেলস অন্তত নিজ দায়িত্ব স্বীকার করছে। লা পটেনশিয়াল পত্রিকা শিরোনাম লেখে : খুন হওয়া মানুষের পরিবার ও কঙ্গোর জনগণের কাছে বেলজিয়াম অপরাধ স্বীকার করছে। লা রেফারেন্স প্লাস শিরোনাম লেখে : বেলজিয়াম আমকস ফরগিভনেস, বেলজিয়াম ক্ষমা চায়।

কিন্তু ইতিহাস ক্ষমা করে না। মানুষ ভোলে না। কঙ্গোর বয়স্ক মানুষের মন থেকে মোছে না তাদের নেতাকে খুনের ঘটনা; ঔপনিবেশিক শাসন আমলে আজকের রাজধানী কিনশাসায় রাতে থাকার জন্য বেলজীয় প্রভুদের কাছ থেকে পারমিট নেয়ার বিধান, মজুরদের পিঠে বেলজীীয় প্রভুদের চাবুকের দগদগে ঘা।।

(চলবে)