Home » প্রচ্ছদ কথা » সংসদ ভাঙবে কিভাবে?

সংসদ ভাঙবে কিভাবে?

আমীর খসরু

constitutionসামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই বিষয়টি এখন দিবালোকের মতো সত্য যে, পরিস্থিতি ক্রমাগত জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এই জটিলতার শেষ সীমানা নির্ধারিত নয়। আর এই জটিলতা এবং বিদ্যমান সাংঘর্ষিক অবস্থাটি যে অনেক অনেক গুণে বেড়ে যাবে তার সমস্ত ইঙ্গিত এবং নিশানা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমজনতাও ইতোমধ্যে জেনে গেছেন তাদের জন্য, দেশের জন্য কোনো সুসংবাদ তো নেই, বরং তারা চিন্তিত দুঃসংবাদের মাত্রাটি কেমন হবে, কতোটুকু হবে তাই ভেবে। তারা বেজায় আতঙ্কিত শঙ্কিত। আর এই আতঙ্ক এবং শঙ্কার পরিস্থিতির মধ্যে তারা বরাবরই রয়েছেন বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই।

বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার দিন থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক দল, মত ও পথের অনুসারী ব্যক্তিদের উপরে সীমাহীন অত্যাচারনির্যাতন চলছে। এর মাত্রা বাড়তে বাড়তে শেষ সময় এসে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যা দমনপীড়ন, অত্যাচারনির্যাতনের শেষ সীমাও যেন অতিক্রম করে ফেলছে।

দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, অবাধ দুর্নীতি, দুঃশাসন থেকে শুরু করে সামগ্রিকভাবে জনজীবনকে বিপর্যস্ত, বিপন্ন করার যাবতীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থাটি নিয়েও এখন চলছে নানাবিধ কাজকারবার, আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন তত্ত্ব আর পথ ও পদ্ধতি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক বাতিলসহ পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের স্বার্থে একটি জটিল অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে এমন কূটিলজটিল ব্যবস্থাদি সন্নিবেশিত করা হয়েছে যার পরিণাম এখন সবাই আপনআপন অবস্থান থেকেই টের পাচ্ছেন।

বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে সরকার একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে চেষ্টা এতোদিন ধরে করে আসছিল, তাতে তারা সফলকাম হবে বলেই মনে করছে। তারা এও মনে করছে, নির্যাতননিপীড়নের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই নির্বাচনটি যদি অনুষ্ঠান করা যায় তাহলে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি বাস্তবায়িত হবে।

নির্বাচন আসলে কবে অনুষ্ঠিত হবে, জাতীয় সংসদ অধিবেশন কতোদিন চলবে, বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল কতোদিন এর কোনোটিই, কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়। প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, ২৪ অক্টোবরের পরে সংসদ আর বসবে না। এরপরে গঠিত হবে ছোট একটি মন্ত্রিসভা। কিন্তু বার বার মতিগতির পরিবর্তনের পরে এখন আবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ২৪ অক্টোবরের পরেও সংসদ চলবে। কতোদিন চলবে তা নিয়েও একেক সময় একেক কথা বলা হচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের কথার আর তত্ত্বের কোনো শেষ নেই। সবশেষ গত রোববার প্রধানমন্ত্রী বললেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত সংসদ চলবে পারবে। কিন্তু তফসিল কবে ঘোষণা হবে আর নির্বাচনটিই বা কবে হবে, তার কোনো আভাসইঙ্গিত দুর্ভাগ্যজনকভাবে মিললো না। এই যে মিললো না, তার কারণ হচ্ছে ওই পঞ্চদশ সংশোধনী। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে তাইই নয়, সংবিধানে নানাবিধ জটিলতা তৈরি করা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে নানা সমস্যার। সংবিধানের ১২৩ ()-এর বলা হয়েছে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে () মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে এবং () মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে।

তাহলে প্রশ্নটি হচ্ছে, সংসদ ভাঙবে কিভাবে? স্বাভাবিক অর্থাৎ মেয়াদ অবসানের কারণে, না, অস্বাভাবিক অর্থাৎ মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে। এই বিষয়টিও স্পষ্ট নয়। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করা হচ্ছে না, তাদের নিজস্ব স্বার্থেই। এই যে ২৪ অক্টোবরের কথাটি বলা হচ্ছে তা ১২৩ ()-এর () অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। কিন্তু সরকার এটা বলছে না যে, তারা এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনটি করবে। এখানেই হচ্ছে ছলচাতুরি। এই ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়ার কারণেই পুরো পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে গেছে। আর পঞ্চদশ সংশোধনীটি এই কারণেই সংবিধানে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে যে সংবিধানটি ছিল তাতে ১২৩এর () অনুচ্ছেদে বলা ছিল মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।

সরকার এবং ক্ষমতাসীনরা পঞ্চদশ সংশোধনীটিকে ‘অতি উত্তম’ একটি সংশোধনী হিসেবে প্রচারপ্রচারণা চালালেও বাস্তবে এর পেছনে কূটকৌশল ছাড়া অন্য কিছুই যে কাজ করেনি তা আগেও যেমন স্পষ্ট ছিল এখন আরো তীব্র আকারে স্পষ্ট হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বলে সরকার তারস্বরে চিৎকার করছে। কিন্তু বাস্তবে অবস্থাটি কি? আসলে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন কিংবা নিরপেক্ষ তো নয়ই বরং সরকারের ইচ্ছায়অনিচ্ছায় চলে, এটাও এখন স্পষ্ট। এখানে সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের কিছুই নেই।

এদিকে ২৫ অক্টোবর ক্ষমতাসীন দল ঢাকায় সমাবেশ করবে এমন ঘোষণা দিয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও একই দিনে সমাবেশ করবে বলে ঘোষণা দিলেও তাদের অনুমতি দেয়া হবে না বলে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। আর এর নির্ঘাত ফলাফল হবে বড় ধরণের সংঘর্ষ এবং সংঘাত।

একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানটি করিয়ে নেয়ার জন্য ইতোমধ্যেই গ্রেফতারসহ ক্ষমতাসীনদের নানা নির্যাতননিপীড়নের কথা বলছে বিরোধী দল। পরিস্থিতি দিনে দিনে যে আরো ভয়াবহ হবে তার যাবতীয় লক্ষণ স্পষ্ট।

একদলীয় নির্বাচনকে ক্ষমতাসীনরা দেখছে তাদের সম্ভাব্য বিজয়ের স্মারক হিসেবে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা কি তাই বলে? কখনই একদলীয় নির্বাচন কিংবা একদলীয় শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এতে নিজেদেরই সীমাহীন ক্ষতি এবং দুর্গতি বাড়ে তামাম দুনিয়ার ইতিহাস সেই স্বাক্ষীই দেয়। যুগে যুগে এমনটাই দেখা গেছে। কিন্তু এটা বোঝার বোধবুদ্ধিটুকু যদি শাসকদের থাকতো তাহলে তারা হয়তো এই পথে যেতেন না। তবে ক্ষমতার অন্ধমোহ চিন্তার নিদারুন বৈকল্য সৃষ্টি করে, বোধবুদ্ধিটুকুও সমূলে কেড়ে নেয়।।