Home » রাজনীতি » সব নিষিদ্ধ

সব নিষিদ্ধ

আবীর হাসান

freedom-of-thought-2একটু এদিক ওদিক, ঊনিশ বিশ যদি অল্প পার্থক্যের হয় তাহলে আঠার ঊনিশের পার্থক্যটাও তেমন হওয়া উচিত। কিন্তু দিন তারিখের বেলায় বোধ হয় তেমন হয় না। কারণ আঠার আর ঊনিশ তারিখ যে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো দিন তা বেশ বোঝা গেল। আঠার তারিখে প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের পর চেপে বসে থাকা আশঙ্কার মেঘ পুরোপুরি না কাটলেও খানিকটা আশা জাগিয়েছিল। এও দেখা গিয়েছিল বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে সঙ্গে সঙ্গে একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে যাচাই ও পর্যালোচনার জন্য সময় নিয়েছিল। কিন্তু ঊনিশ অক্টোবর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ – ‘অনির্দিষ্টকাল সভাসমাবেশ নিষিদ্ধের’ যে ঘোষণা দিল তারপর পরিস্থিতি গেল সম্পূর্ণ পাল্টে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর মাত্র আঠার ঘণ্টার ব্যবধানে জনসাধারণ আবার পড়ে গেল শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতির মধ্যে।

ঊনিশে অক্টোবরের পত্রিকাগুলোয় জাতিকে আশঙ্কামুক্ত করার বার্তা ছিল। বিদগ্ধ প্রবীণ নাগরিকরা তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন খানিকটা আশা নিয়েই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তাদের যে বক্তব্য সম্প্রচার হয়েছে তাতেও ছিল আশাবাদ। কিন্তু দুপুরের পর গুড়ে বালি পড়ল।

বিশে অক্টোবরের পত্রিকাগুলো সবিস্তারেই জানাল তাদের আশাভঙ্গের বিষয়টা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক যারা কয়েক ঘন্টা আগেও প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের মধ্যে অনেক আশা সঞ্চারক বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করেছিলেন তারাও জানালেন মোহভঙ্গের কথা। কেউ কেউ বললেন, প্রস্তাবে সদিচ্ছা ছিল না থাকলে এমনটা হতো না।

সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের ভেতরে বা পেছনে কাহিনী থাকলেও মানুষের জানমাল আর সরকারি সম্পত্তি রক্ষার গতানুগতিক অজুহাতের কথাই বলা হলো।

কিন্তু ঘটনাটা কী ঘটলো? প্রধানমন্ত্রী তো তার ভাষণে সর্বদলীয় অন্তবর্তী মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন আলোচনার দরজা খোলা থাকার কথাও। একদিকে ব্যক্তিগত সদিচ্ছা দেখানোর কথা বলে আবার অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অনিচ্ছা দেখানোর ব্যাপারটা যে তার ইচ্ছাতেই হয়েছে সে কথা এ দেশের অতি সাধারণ মানুষটিও বুঝতে পারে। আর এ বিষয়টা সবার জন্যই অস্বস্তিকর। কারণ ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো যে, ‘আমি এই প্রস্তাব দিয়েছি এর বাইরে অন্য কিছু করা যাবে না।’ ওটা আসলে কি ছিল প্রস্তাব না নির্দেশ? এখন হাত পা বেঁধে ওই নির্দেশ মানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিষয়টা হয়ে গেছে ওয়ান ওয়ে টিকিটের মতো যেতে পারবে ফিরতে পারবে না।

এই সিদ্ধান্ত যে গণতান্ত্রিক নিয়ম বহির্ভূত তা কি সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা ভেবে দেখেননি?

আর এটা তো এই প্রথমবার নয়। এর আগেও বিরোধী দলের সমাবেশ বানচাল করতে সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল ঢাকা মহানগরীতে। ১৪৪ ধারা জারির কথাও কোনবারই বলা হয়নি। বলা হচ্ছে না দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে কিনা? আবার বলা হচ্ছে ত্রিশ দিন পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা জারি রাখা যায় পুলিশি বিধানে সরকার চাইলে আরও বাড়তে পারে।

গণতন্ত্র সবল থাকা অবস্থায় সরকার কেমন আচরণ করবে তা জানতে তো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। সভাসমাবেশের অধিকার, বাকস্বাধীনতা সব নিশ্চিত করে নির্বাচনে যেতে পারলে তবেই তো গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলে বিবেচিত হবে। গণতন্ত্র আছে এমন কথা মুখে বললেই তো হয় না এ দেশে পাল্টাপাল্টি আসা সব স্বৈরাচারই গণতন্ত্রের জয়গান গেয়েছে তারাও দাবি করেছে গণতান্ত্রিক নির্বাচন করেছে কিন্তু সেগুলো যে গণতান্ত্রিক হয়নি তা যেমন দেশবাসী জানে তেমনি বিশ্ববাসীও জানে। কারোই এখন নতুন করে আবার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের কায়দাকৌশল শিখতে হবে জনগণকে এ বড় হ্যাপা। মুখে বলা হচ্ছে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার কথা কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে পুলিশ দিয়ে সব কিছু মোকাবেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, ডিজিটাল মতপ্রকাশের বিধিনিষেধ আরোপ করেও তা বাস্তবায়ন করতে পুলিশকেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখন বিরোধী দলের সভাসমাবেশও পুলিশ দিয়ে ঠেকানোর পন্থা অনুসরণ করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রস্তাবের পর বিরোধী দল ২৫ অক্টোবর সমাবেশ করলে কী হতো? তারা হয়তো ওই প্রস্তাবের ভালোমন্দ নিয়ে মন্তব্য করত এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে একেবারে নাকচ করে দিলে তা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত। কিন্তু এখন সভাসমাবেশ নিষিদ্ধের ঘোষণায় বিষয়টা উল্টে গেছে। এই ঘোষণাটা না দিয়ে দেখা উচিত ছিল বিরোধী দল কী করে। দাবল্লম নিয়ে মিছিল করলে জনসাধারণই তাদের নাকচ করে দিত। লগিবৈঠার পুনরাবৃত্তি যেমন আওয়ামী লীগের কাছ থেকেও জনগণ আশা করেনি তেমনি দাবল্লমের নতুন ফর্মূলাও বিএনপির কাছ থেকে আশা করে না। আর বিএনপি দাবল্লম নিয়ে মিছিল করতো ২৫ অক্টোবর এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ এ বিষয়ক উত্তেজিত ঘোষণাটাই তাদেরকে অনেক ব্যাকফুটে নিয়ে গেছে সত্যি সত্যি করলে রাজনৈতিক অপমৃত্যুকেই হয়তো ডেকে আনত তারা।

আপসমূলক প্রস্তাবই যখন সরকার দিয়েছিল তখন তাদের অপেক্ষা করা উচিত ছিল এই কটা দিন। ওই প্রস্তাবকে নির্দেশে পরিণত করে তা মানাতে জবরদস্তি জঙ্গলের আইন জারি এখন হিতে বিপরীত তো হয়েছেই, সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্রের বিষয়টাকেই পুনরায় প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, সেই সঙ্গে আগামী নির্বাচন সম্পর্কে অনিশ্চয়তটাও আবার ফিরে এসেছে।

নির্বাচনের আগেই নতুন সঙ্কট তৈরি হওয়ায় এক হঠকারী সিদ্ধান্ত এই সভাসমাবেশ নিষিদ্ধের ঘোষণা। অধিকন্তু অগণতান্ত্রিক কার্যকারণের উৎস সরকার নিজেই হয়ে উঠবে জনসাধারণ এটা আশা করেনি। সন্দেহ গুজব অবিশ্বাস সব আবার ফিরে এসেছে, মনে করিয়ে দিচ্ছে সামরিক এবং বেসামরিক স্বৈরাচারী আমলের শেষ দিনগুলোর কথা।।