Home » রাজনীতি » সরকারের বৈপরীত্য – পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া

সরকারের বৈপরীত্য – পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া

হায়দার আকবর খান রনো

police-on-action-1প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শুক্রবার সন্ধ্যায় যখন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে নির্বাচনকালীন অন্তবর্তীকালীন সর্বদলীয় সরকারে যোগদানের জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন ঠিক তখনি ঢাকার নয়াপল্টনস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস ঘেরাও করে রেখেছে পুলিশ। বিএনপির নেতাকর্মীরা যেতে পারছেন না। একদিকে মন্ত্রিসভায় যোগদানের জন্য আহ্বান যা শুনে অনেকে মনে করেছেন যে, নতুন করে সংলাপের ও স্বস্তির পরিবেশ ফিরে এলো, অপরদিকে বিরোধী দলের প্রতি মারমুখী ভাব অব্যাহত রয়েছে। সহজেই দৃশ্যমাণ এমন বৈপরীত্য রাজনীতিকে বরং আরও খানিকটা ঘোলাটে করে তুলেছে। ভাষণের ঠিক পরদিন ঢাকা মহানগরের প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ নগরে সভাসমাবেশেমিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। সরকারি ও প্রধান বিরোধী দল ২৫ অক্টোবর একই সঙ্গে সভা ডাকায় একটি আতঙ্কজনক অবস্থা তৈরি হয়েছিল। সেই অজুহাতে সকল সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করলো কর্তৃপক্ষ। এটা না বোঝার কোনো কারণ নেই যে, সরকারই পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করার মতো একটা অজুহাত তৈরি করেছে।

প্রথমে সভা ডেকেছিল বিএনপি। তার পরপরই একই তারিখে সরকারি দলও সভা ডাকলো। কেন একই তারিখে? একদিন আগে অথবা একদিন পরেও তারা সভা ডাকতে পারতেন না? বিএনপির প্রতি আমার বিন্দুমাত্র সমর্থন নেই। আওয়ামী লীগের প্রতিও কোন সহানুভূতি নেই। আমার কাছে দুটোই লুটেরা ধনীক শ্রেণীর দল, হাড়ে হাড়ে দুর্নীতিবাজ ও গণবিরোধী। কিন্তু আমি দুই দলসহ সকল দলেরই, সকল ব্যক্তি ও সংগঠনের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের এবং সাংবিধানিক অধিকারসহ সুযোগ রক্ষার পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাড়াতে চাই। নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। বিএনপি প্রধান বিরোধী দল। তাকে সভা করতে দেবে না, অথচ সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, এটা কেমন করে আশা করা যায়? এটা না বোঝার কোনো কারণ নেই যে, বিএনপি কর্তৃক ২৫ অক্টোবরে সভা আহ্বানের পরপরই আওয়ামী লীগ কর্তৃক একই দিনে সভা আহ্বান ছিল একটি নোংরা চালাকি মাত্র।

সরকারি দলের এই রকম চালাকির কৌশল আগেও দেখেছি। মনে আছে, বর্তমান সরকারের আমলেই বিএনপি একবার ঢাকায় বড় সমাবেশের আয়োজন করেছিল। সেই সভা ভন্ডুল করতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এক অভিনব কৌশল নিয়েছিল। সরকার প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে ঢাকাগামী সকল বাস, লঞ্চ, ট্রাকের ঢাকা প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছিল। ঢাকার অভ্যন্তরেও বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। আরও আশ্চর্যের কথা, পুলিশকে দিয়ে ঢাকার আবাসিক হোটেলগুলোকে শাসানো হয়েছিল যাতে নির্দিষ্ট তারিখে কোন লোককে থাকতে না দেয়া হয়। ভয় ছিল, হয়তো বিরোধী দল আগেভাগে লোক নিয়ে এসে ঢাকার হোটেলগুলোতে রাখবে। এমনকি ঢাকার রেস্তোরাগুলোকেও বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়েছিল, যাতে মিটিংয়ে আসা লোকজন খেতে না পারে। লোকে বলতো, এটা সরকারি হরতাল। বিরোধী দলের সভা পন্ড করতে সরকার প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে সরকারি হরতাল করার এই যে অভিনব দৃশ্য তার কোন নজির পৃথিবীতে আরও কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। যতই অভিনব হোক, এটা যে গণতন্ত্রের প্রতি কুঠারাঘাত ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এবারও প্রায় অনুরূপ কায়দায় পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া বাঁধিয়ে একই তারিখে সভা ডেকে আসলে সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করার যে অপকৌশল তার দ্বারা শুধু বিএনপি নয়, সমগ্র জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকেই কেড়ে নেয়া হয়েছে। দুই বড় দলের দ্বন্দ্বের কারণে এবং সরকারি দলের ও সরকারি প্রশাসনের নোংরা কৌশলের কারণে ২৬ অক্টোবর আহূত সিপিবির জনসভাও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ে গেল। সরকারের এই আচরণ নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় এবং সর্বতোভাবে অগণতান্ত্রিক। সামনে নির্বাচন। ঠিক তখনই সভাসমাবেশে নিষিদ্ধের ঘোষণায় বোঝা যায়, এই সরকারের অধীনে নির্বাচন কতোটা অবাধ ও গণতন্ত্রসম্মত হবে। আরও বোঝা যায় মাত্র একদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব কতোটা ভাওতাপূর্ণ।

প্রসঙ্গক্রমে প্রধানমন্ত্রী ভাষণ সম্পর্কেও দুটো কথা বলতে হয়। প্রধানমন্ত্রী তার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণের অর্ধেক সময় ব্যয় করেছেন নিজ সরকারের আমলে কতোটা উন্নয়ন হয়েছে এবং মানুষ কতোটা স্বস্তিতে বসবাস করছে তার বিবরণ তুলে ধরার জন্য। তিনি উন্নয়নের চিত্র বাড়তি করে বলেছেন এবং জনগণ যে আসলে চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে এবং ছাত্রলীগের মাস্তানদের দাপট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্যমূল্য, নানাবিধ দুর্নীতি, শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি ইত্যাদি তথ্যসমূহ এড়িয়ে গিয়ে তিনি যে চিত্র তুলে ধরেছেন তা ছিল সত্যের অপলাপ। বস্তুতঃ তিনি নির্বাচনী বক্তৃতা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সুযোগ ও মিডিয়াকে ব্যবহার করে সরকারি ভাষণের নামে নির্বাচনী প্রচার কিন্তু নির্বাচনী বিধিবিধানের বরখেলাপ। অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়। সরকার ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে যে নতুন ব্যবস্থা চালু করতে চলেছেন, তাতে নির্বাচনে সকলের জন্য সমান সুযোগ থাকছে না। কারণ সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিরা স্বপদে বহাল থেকেই নির্বাচন করবেন। ফলে বহুল আলোচিত লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড আর থাকছে না। গণতন্ত্রের স্বার্থে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আবশ্যক। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা দরকার. যে ব্যবস্থা ভারতে অথবা বৃটেনে আছে।

তাছাড়া নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান আরও দুটি নির্বাচনে রাখা দরকার। সুপ্রিমকোর্টের রায়েও এই আকাঙ্খা প্রকাশ করা হয়েছিল। তবু অন্য কোন ফর্মূলায় যদি সমঝোতা হয়, যদি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তবে আমরা সন্তুষ্ট হবো। কারণ ফর্মূলার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের মধ্যে তেমন সমাধানের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং রাজধানীতে সভাসমাবেশের উপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা, তাও আবার নির্বাচন যখন ঘনিয়ে এসেছে ঠিক সেই সময় সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এখনই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে এই সরকারের অধীনে, এমনকি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীনে তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারের অধীনেই বা নির্বাচন কতোটুকু অবাধ হবে, নির্বাচনের সময় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কতোটুকু রক্ষিত হবে? এই সংশয় দূর করতে না পারলে নির্বাচন যেমন গ্রহণযোগ্য হবে না, তেমনই দেশের ভবিষ্যতও অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। সেটা নিশ্চয়ই আমাদের কাম্য নয়।।

১টি মন্তব্য

  1. Amader police vaider unorod korchi , apnara eidesher sebok,jonogoner sebok kono doler noi, kintu akhon apnader kajkormo dekhe mone hoi apnara bishes ak doler gulami korchen, apnarai paren akta sundor desh gorte