Home » রাজনীতি » শেষ পর্যন্ত সমাবেশের অনুমতি, টেলিফোন আলাপ

শেষ পর্যন্ত সমাবেশের অনুমতি, টেলিফোন আলাপ

দেরি করা কি সরকারের কৌশল না নৈতিক পরাজয়

আমীর খসরু

hasina khaledaঅক্টোবরের ২৫ তারিখকে নিয়ে দেশবাসীর আতঙ্ক, উদ্বেগ, আশঙ্কা আর সীমাহীন ভয়ভীতির শেষ ছিল না। এমনিতেই এর শেষ ছিল না কখনই। তার ওপরে এই কয়েকটি দিনে যেটুকু তা ছিল বাড়তি অর্থাৎ আতঙ্কের উপরে বাড়তি আতঙ্ক। প্রথমে বিএনপি ঢাকায় সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিল। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একবার নয় একাধিকবার বলা হলো, এই সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। কেন হবে না তার কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। ব্যাখ্যায় তাদের প্রয়োজন পড়ে না বললেই হয়। এরপরে আবার বলা হলো, সমাবেশে বাধা দেয়া হবে। কেন বাধা দেয়া হবে তারও যথারীতি কোনো ব্যাখ্যা নেই। এর মধ্যেই ঢাকায় ডাকা হলো পাল্টা সমাবেশের কর্মসূচি। অর্থাৎ জোর করে ঝগড়া লাগানো আর কি। আর কোনো কিছু হলেই বলা হয় জঙ্গীবাদ দমনের কথা। কে জঙ্গী কে জঙ্গী নয়, কে জংলি, কে জংলি নয় এরও কোনো পার্থক্য করার সুস্পষ্ট কোনো মানদন্ডও নেই। মানদন্ড একটিই তারা বলে দিলেই হলো। আগেও এমনটি ঘটেছে ঢাকায়, দেশব্যাপী। এরপর যেমনটি হয় এবারও তাই হলো। পুলিশি ফরমান এলো কোনো ধরনের সভাসমাবেশ করতে দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকার আর দলের সবাই একযোগে ওই কোরাস গাইতে শুরু করলেন কেন সমাবেশ করতে দেয়া উচিত নয় এই বলে। এরই মধ্যে চট্টগ্রামেও পাল্টা সমাবেশ ডাকা হলো সেখানেও পুলিশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এভাবে দেশের যে স্থানেই বিরোধী পক্ষ সমাবেশ ডেকেছে সেখানেই পাল্টা সমাবেশ, ১৪৪ ধারা আর সভাসমাবেশ নিষিদ্ধের ঘোষণা দেয়া হলো। পুলিশ যেন বসেই ছিল তড়িঘড়ি করে এ কাজটি করার জন্য। এমন একটা আঁতাত সরকারি দল এবং পুলিশের মধ্যে রয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দল প্রাথমিক কাজটুকু সেরে দেবে, আর বাকি কাজটুকু করবে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবার বিজিবিও।

কিন্তু ২৫ অক্টোবরে এ ধরনের একটি পরিস্থিতির কি আদৌ প্রয়োজন ছিল? বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায় আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার পারদ যেভাবে নেমে গেছে তাতে তাদের এটা বড়ই প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজনটি সৃষ্টি হয়েছে জনপ্রিয়তাহীনতার কারণে নিজেদের উপরে নিজেদের অবিশ্বাস থেকেই। আর এই অবিশ্বাসটির কারণ ওই জনপ্রিয়তায় ব্যাপক ধস। এটা চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। এ বিষয়টি সরকার বুঝতে পেরেছে। যখন জনপ্রিয়তা কমে তখন নির্যাতননিপীড়ন বেড়ে যায়। আবার যখন একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে তখন ওই নির্যাতননিপীড়ন, বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি হয়ে পড়ে একমাত্র হাতিয়ার।

যদি শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশটি করতে দেয়া হতো তাহলে কি হতো? বড়জোর বিএনপির সমাবেশে জনসমাগমের হার আরো বেশি হতো। সারাদেশ থেকে নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসতো। এখন উল্টো সংঘাত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে সারাদেশে, আনাচেকানাচে সর্বত্র। ২৫ অক্টোবর এবং এর আগে দেশের আনাচেকানাচে সভাসমাবেশ নিয়ে সংঘাতসংঘর্ষ হয়েছে, ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হয়েছে। বিরোধী নেতাকর্মীরা যারা এতদিন ছিল অসংগঠিত তারা সরকারি উদ্যোগেই সংগঠিত হতে বাধ্য হয়েছে। এখানেই ২৫ অক্টোবরের মূল বিষয়। কারণ বিএনপির পক্ষে যে কাজটি বহু পরিশ্রমেও করা সম্ভব ছিল না তা আওয়ামী লীগই তাদের করে দিয়েছে। বিএনপির এমন উপকার অজান্তে আওয়ামী লীগ করে দিয়েছে, যার জন্য অন্তত বিএনপির উচিত আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ দেয়া।

কিন্তু সরকার হই হই রই রই করে পুলিশসহ হাজার হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জলকামান, রায়টকারসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে যে কাণ্ডটি করেছে তাতেও কি বিএনপি যে সব সভাসমাবেশ ঢাকায় বা চট্টগ্রামে করতে চেয়েছে তা বন্ধ করা গেছে? যায়নি। কখনো শর্ত সাপেক্ষে, কখনো নানা নাটকীয়তার পরে সমাবেশ করতে দিতে হয়েছে। ২৫ অক্টোবরের সমাবেশের পরে বলা যায় সরকারের নৈতিকসহ নানা দিক দিয়ে পরাজয় হয়েছে। সঙ্গে নানা ক্ষতি হয়েছে একদিকে আওয়ামী লীগের অন্যদিকে সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে জনগণের। দেশের ক্ষতির কথা না হয় বাদই দেয়া গেল। কারণ এই দুর্ভাগা দেশটির ক্ষতি করার আর কোনো বাকি নেই।

কার্যত বিএনপি নয়, সরকারই অঘোষিত অবরোধ পালন করেছে ২৫ অক্টোবর। সরকারই আসলে বিএনপির কর্মসূচিকে প্রকারান্তরে অতিমাত্রায় সফল করে দিয়েছে, যা বিএনপি হয়তো প্রত্যাশাও করেনি।

তবে একটি লাভ ক্ষমতাসীন সরকারের হয়েছে বলে সরকার বাহবা নেয়ার চেষ্টা করছে। ২৫ অক্টোবর কিছুই হয়নি এ কথাটি এখন বলা হচ্ছে। কিন্তু যদি কিছু হতোই বা যতোটুকুই বা হয়েছে তার পুরো দায় আসলে শেষ বিচারে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে গিয়েই পড়েছে। সরকার মনে করেছিল একটা হই হই রই রই কাণ্ড বাধিয়ে দিলে প্রতিপক্ষের ক্ষতি হবে কিন্তু আখেরে তাদের ক্ষতির পাল্লাটাই অনেক ভারি হয়ে গেছে। এবং ইচ্ছা করলে এটা তারা এড়াতেও পারতো।

রাজনীতিতে এখন টেলিফোন তত্ত্বটি নিয়ে অনেকে হাপিত্যেস করছেন। ভাবখানা এমন যে প্রধানমন্ত্রী একটি টেলিফোন দিলেই সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। যারা এটা মনে করছেন তাদের মনে রাখা উচিত, সময় অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার রাতে টেলিফোন করেছেন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে। প্রধানমন্ত্রী রোববার থেকে হরতাল প্রত্যাহার করার অনুরোধ করেছেন এবং সোমবার নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিরোধী দলীয় নেত্রী বলেদিয়েছেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি নীতিগতভাবে মেনে নিলেই সব কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হবে। আর মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় হরতাল শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা এবং সোমবার নৈশভোজে অংশ নেয়া সম্ভব নয়। তারপরেও বিরোধী দলীয় নেত্রী মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার পরে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন। এখন দেখার বিষয়, মঙ্গলবারের আগে এবং পরে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত সরকার সমাবেশ অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রদান, আর সংলাপের আমন্ত্রণ জানানো সবকিছুই করছে, তবে বড্ড দেরিতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই দেরি করা কি কৌশলের অংশ, না বিরোধী দল কিংবা অন্যদিকের চাপের কারণে অথবা নৈতিক পরাজয়? এখন প্রধানমন্ত্রী কি জবাব দেবেন? প্রধানমন্ত্রী যদি বিরোধী দলের প্রস্তাব মেনে নেন তাহলে এটা তার দিক দিয়ে হবে বড় পরাজয়। আর যদি না মানেন তাহলে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হবে। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, এই টেলিফোন কলটি যদি দু’দিন আগে কিংবা ২৫ বা ২৬ অক্টোবর সকালেও করা হতো তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো।

বিএনপি বুঝে হোক, না বুঝে হোক সরকারের দিকেই সবকিছু ঠেলে দিয়েছে। কাজেই ২৫ অক্টোবরের আগে পরের যে সঙ্কট তা রয়েই গেছে। সঙ্কটটি আরো বেড়েছে বলেই মনে হয়।

তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যত বাংলাদেশে বসে নির্ধারিত হচ্ছে না। হচ্ছে প্রতিবেশী দেশটিতে বসে। আর ভবিষ্যত নির্ধারণের কাজটি করছে বিদেশিরা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ দেশের রাজনীতিবিদরা এই প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আগে অতিসংগোপনে এসব বিষয়গুলো হতো, এখন আর বিষয়টি কারো কাছে অজানা থাকছে না। আর এর জন্য ক্ষমতাসীন সরকারটিকেই দায়ী করতে হবে।।

১টি মন্তব্য

  1. আপনার লেখাতে কেবল বিএনপি’র সাফাই গাওয়াটাই লক্ষ্য করছি।
    বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া যে অসভ্যতা দেখিয়েছেন জনগণের উপর হরতালের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে, সে নিয়ে তো লিখলেন না।
    হরতাল প্রত্যাহার না করে জামায়াতের কণ্ঠে কথা বলে তিনি আদতে বিএনপি’কে ব্যাক-ফুটে নিয়ে গেলেন, এটি পিয়াস করিম-ফরহাদ মজহারদের চিন্তার দৈন্যতাকেই প্রকাশ করে। আর এর মাধ্যমে জনগণের সমর্থনকে কাজে না লাগিয়ে হরতাল আর ককটেলের রাজনীতিতে তিনি আওয়ামী লীগকেই ফ্রন্ট-ফুটে ঠেলে দিয়েছেন। মূলতঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র সাথে উনার ফোনালাপ টিভি ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াতে মধ্যশ্রেণীর সমর্থন বা সিম্প্যাথি এখন আওয়ামী লীগের সাথেই থাকবে, যা সামনের তিন দিনে জামায়াতী তাণ্ডবে আরো ন্যায্যতা পাবে।
    তবে মূল ঘটনা হলো, ক্ষমতায় যাওয়াটা এখানে যতোটা না নির্ভর করে জনগণের উপর, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে মার্কিন আর ভারত সরকারের উপর।।