Home » অর্থনীতি » আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (পর্ব – ১০)

আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (পর্ব – ১০)

ডেভিড লে এবং রব ইভানস, দি গার্ডিয়ান থেকে

কাতার চুক্তি : পুলিশকে হাত করার চেষ্টা

bae-systems_3টনি ব্লেয়ার কর্তৃক নিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল লর্ড গোল্ডস্মিথ বিএই’র দুর্নীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত পুলিশি তদন্ত জোর করেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বিএই’র শক্ত রাজনৈতিক সংযোগ সত্ত্বেও ২০০০ সাল থেকেই অস্ত্র ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রশ্নে পুলিশের চাপ বাড়তে শুরু করে। দি সিরিয়াস ফ্রড অফিস (এসএফও)-এর সহকারী পরিচালক হেলেন গার্লিকই প্রথম একটি ঘুষ লেনদেনের তথ্য আবিষ্কার করেন। তিনি দেখান যে, জার্সির গ্রিনল্যান্ড ব্যাংকের মাধ্যমে গোপনে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদকে ঘুষ বাবদ ৭০ লাখ পাউন্ড অর্থ প্রদান করা হয়েছিল। এসএফও বিএই’র সদর দফতরের বিপণন বিভাগের প্রধান হাগ ডিকিনসনের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেন। তারা বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কার্যক্রম চালানোরও চেষ্টা করে। কিন্তু দ্রুতই সেই তৎপরতা থেমে যায়। শেখ হামাদের জাতিভাই কাতারের আমির একিট চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেন, কমিশন লেনদেনের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। হজামাদও অর্থ ফেরতের বিনিময়ে ঝামেলামুক্ত হন। তিনি জার্সি কর্তৃপক্ষের নামে ৬০ কোটি পাউন্ডের একটি চেক লিখে দেন। জার্সি কর্তৃপক্ষও তার ব্যাপারটি তদন্ত করতে তাদের অসুবিধা থাকার কথা জানিয়ে দেয়। এভাবেই কাতার ঘটনা সম্পর্কিত তদন্তটি বাতিল হয়ে যায়।

১৯৯৬ সালে অস্ত্র বেচাকেনা সংক্রান্ত কাতার চুক্তির মূল দলিলটি সই করেছিলেন প্রতিরক্ষা সচিব মাইকেল পার্টিল্লো। চুক্তিটি লন্ডন এবং জার্সিতে বাতিল হয়ে যাওয়ার পর পরই ২০০২ সালে তাকে বিএই’র বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়।

২০০১ সালে এসএফও আরো একটি অভিযোগ পায়। এই অভিযোগে বলা হয়, বিএই সৌদিদের ঘুষ দেয়ার জন্য গোপন একটি তহবিল ব্যবহার করেছে। এসএফও’র উপপরিচালক রবার্ট ওয়ারডল এ ব্যাপারে কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটি করতে গিয়ে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব স্যার কেভিন টেবিটের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এ প্রসঙ্গে টেবিটের মন্তব্য ছিল তিনি ক্ষতিকর কোনা খরগোশকে দৌড়াতে দেবেন না। বিএই প্রাগে ঘুষ লেনদেন করেছে মর্মে যুক্তরাষ্ট্রের আনা অভিযোগটিও টেবিট উড়িয়ে দেন। তবে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে এসে ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যায়।

দি গার্ডিয়ান পত্রিকা বিএই’র বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ফিরিস্তি ধারাবাহিকভাবে ছাপতে শুরু করে। সেখানে বলা হয়, বিএই সৌদিদের বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও বিভিন্ন রকম সুযোগসুবিধাদি প্রদানের জন্য বহির্বিশ্বে অবস্থিত তার অঙ্গ সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করছে। বিএই’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠে, তারা সংস্থার গোপন তহবিল থেকে অর্থ আÍসাত করেছেন এবং একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে বিনামূল্যে অবকাশ যাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন।

পিটার গার্ডিয়ান নামের একজন প্রভাবশালী এ সংক্রান্ত কিছু ভুয়া চালানের প্রমাণপত্র সরবরাহ করেন। গার্ডিয়ান পত্রিকা কর্তৃপক্ষ এসব প্রমাণাদি আবার এসএফও’র কাছে হস্তান্তর করে। ওয়ারডল তখন সংস্থাটির পরিচালক এবং এবার আর কেউ তাকে বাধা দিতে পারে না। তিনি ১৮ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দল গঠন করেন। এ দলে ছিলেন ব্যারিস্টার হেলেন গার্লিক (সিলভি ও বার্লেসকুনির বিরুদ্ধে সংগঠিত তদন্তেও তিনি যুক্ত ছিলেন) এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জালিয়াতিবিরোধী পুলিশ স্কোয়াড প্রধান রব এলানের মতো ব্যক্তিরা। দলটি টিম ল্যাংডেলের কাছ থেকে আইনি পরামর্শ গ্রহণ করে। ল্যাংডেল ব্রিটেনের নামকরা জালিয়াতি বিশ্লেষক। তত্ত্বগতভাবে ওয়ারডল স্বাধীনই ছিলেন। তবে তাকে অ্যাটর্নি জেনারেল লর্ড গোল্ডস্মিথের তত্ত্বাবধানেই কাজ করতে হতো। গোল্ডস্মিথ ছিলেন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া একজন ব্যক্তি।

তদন্ত দলটি ভয়াবহ কিছু জিনিস উদঘাটন করল। এসএফও’র দলটি প্রথমেই লয়েড ব্যাংককে তাদের নথিপত্র প্রদর্শন করতে বলল। এগুলো ছিল বিরাট আকারের এক ভান্ডার। নথিপত্র যাচাই করে তদন্ত দল দেখতে পেল বিএই ৬ কোটি পাউন্ডের একট ‘যুক্তরাজ্য ঘুষ তহবিলই’ কেবল চালু রাখেনি, কোম্পানিটি বিশ্বজুড়ে তাদের দালালদের গোপনে অর্থ প্রদান করে আসছিল। এসব অর্থের অধিকাংশই সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেনামি কোম্পানির নামে পাচার হতো।

এসএফও তদন্ত দলটি এরপরই যায় বিএই কর্তৃপক্ষের কাছে। তারা তাদের আইনি ক্ষমতা বলেই বিএই’র কাছে তাদের দালালদের পরিচয় সংবলিত নথিগুলো দাবি করে। বিএই সরাসরি এ আইনি নির্দেশ পালনে অসম্মতি জানায়। বিএই’র যে সব নির্বাহীকে ইতোমধ্যেই গ্রেফতার এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল তাদেরও আশ্বস্ত করা হয়, বিএই’র রাজনৈতিক সংযোগ বেশ জোরালো। আইনি সূত্রগুলো জানায়, বিএই’র আইন পরামর্শক এলেন অ্যান্ড ওভারি এমন একজন ব্যারিস্টার নিয়োগ দেন, যার সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে এবং তিনি বাড়িতেও তাকে টেলিফোন করতে পারবেন। তবে গোল্ডস্মিথ বলেন, তিনি এ জাতীয় ব্যক্তিগত ও গোপন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

বিএই’র আইনি পরিচালক মাইকেল লেস্টার পরে এ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেন, আইনের প্রতি অনুগত থাকতে গেলে আল ইয়ামামাহ চুক্তির পরবর্তী কাজটি ব্রিটেন হারাবে। বিএই সে সময় টাইফুন জঙ্গি বিমান বিক্রয়ের চেষ্টা করছিল।

বিএই যে তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্ত কার্যক্রমটিকে ভিন্ন কাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছিল তাতে সায় ছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরই। সে সঙ্গে যোগ দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন রিড এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাক স্ট্র। এটি ছিল শীর্ষ পর্যায়ে ব্যতিক্রমধর্মী এক অপতৎপরতার ঘটনা।

এসএফও’তে ওয়ারডল উল্লেখ করেন, ওইসিডি কনভেনশন ঘুষ প্রদানের ঘটনাকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিবেচনা করে ছাড় দিয়ে দিচ্ছে। এই কারণে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন বলেও আভাস দেন। গোল্ডস্মিথ তাকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন। বিএই তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও নথির বাক্সগুলো দেখাতে শুরু করে। নথির বিষয়বস্তু দেখার পর এসএফও’র তদন্তকারীরা মান্টিয়াগো, বুখারেস্ট, জোহান্সেবার্গ, প্রাগ এবং দারএসসালামের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। এসএফও’র তদন্তকারীদের উদঘাটিত তথ্য থেকে জানা যায়, সৌদিদের জন্য বরাদ্দকৃত ও কোটি পাউন্ডের গোপন তহবিল এবং আরো ১০০ কোটি পাউন্ড পরিমাণ অর্থ সুইস ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হয়ে গেছে। এসব অর্থ যাদের কাছে গেছে তাদের মধ্যে অন্তত দুজন ব্যক্তি হচ্ছেন ওয়াফিক সাইদ এবং মোহাম্মদ সাফাদি। এরা উভয়েই সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

অভিযোগ আসে যে, যুবরাজ বন্দর বছরে ১০ কোটি পাউন্ড করে নিজেই সরাসরি গ্রহণ করতেন ওয়াশিংটনের রিপস ব্যাংকের মাধ্যমে। এ অর্থের অনুমোদন দিত যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অস্ত্র বিক্রয় শাখা ডেমো। এই খবরটি বিস্ফোরকের মতো কাজ করে। বন্দরকে দেয়া অর্থ বিষয়ে ডেমো প্রধান এলান গারউড এবং তার সৌদি বাণিজ্যিক পরিচালক স্টিফেন পোলর্ডকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এই জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাকর ও অপ্রীতিকর।

এসএফও সুইস কর্তৃপক্ষের কাছে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ সুইস কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা ব্যাংকের রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করছে। তবে তারা একজন একাউন্টধারী হিসেবে সাইনকেও আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অবহিত করে। সবকিছুই দ্রুত ভন্ডুল হয়ে যেতে শুরু করে। বিএই’র প্রধান নির্বাহী মাইক টার্নার প্রকাশ্যেই জানান, টাইফুন বিক্রয় চুক্তিটি সঙ্কটের মুখে পড়েছে। পার্লামেন্ট সদস্যদের সাবধান করে দেয়া হলো। তাদের নির্বাচনী এলাকার কাজকর্মও স্থবির হয়ে পড়ল। কমনস নেতা জ্যাক স্ট্রর নির্বাচনী এলাকা ব্ল্যাকবার্নের কাছেই বিএই’র একটি কারখানা ছিল। তিনি বিষয়টি নিয়ে আপাত স্বাধীন অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে কথা বলেন।

এ অবস্থায় চাপের মুখে পড়ে ওয়ারডল ল্যাংডেলের আইনি সমর্থন নিয়ে একটি আপোষরফায় সম্মত হন। কথা হয়, তিনি ছোট আকারের গোপন লেনদেনগুলোর ব্যাপারে বিএই’র চেয়ারম্যান ডিক ইভান্সের কাছ থেকে একটি অপরাধমূলক স্বীকারোক্তিপত্র পাবেন। বিনিময়ে বন্দর, সাইদ এবং সাফাদির বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্ত কার্যক্রমগুলো বাতিল করে দেয়া হবে। গোল্ডস্মিথ প্রতমে এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু এ দফায় বিএই’র সমর্থকরা তাদের আগের ভুলটি করতে চাইলেন না এবং তদ্বিরেরও কোনো সুযোগ রাখলেন না। ধারণা করা হয়, বন্দর ডাউনি! স্ট্রিটের সঙ্গেই সরাসরি যোগাযোগ করেছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বরেই টনি ব্লেয়ার গোল্ডস্মিথকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, ব্যাপারটি কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থ বিপন্ন হওয়াই নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও এখন এটি অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

ব্লেয়ারের কথা থেকে মনে হলো, তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, আল কায়দা সম্পর্কিত কোনো গোয়েন্দা তথ্যই আর এখন থেকে সৌদি আরব সরবরাহ করবে না। ফলে আল কায়দার সন্ত্রাসীরা ব্রিটিশদের ওপর যে কোনো স্থানেই হামলা চালাতে পারে।

ওয়ারডল প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে যান। প্রধানমন্ত্রী তাকে জানিয়ে ছিলেন, জীবন এখন হুমকির মুখে। এসএফও’র পরিচালক হিসেবে তার চার বছরের চুক্তি তখন শেষ হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময়েই তার চুক্তির মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর আবেদনটি প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় অ্যাটর্নি জেনারেলের টেবিলেই ছিল। ওয়ারডল নতিস্বীকার করলেন এবং সৌদি তদন্তটি বাতিল করে দেয়ার ব্যাপারে রাজি হলেন। তার বক্তব্যটিই প্রতিধ্বনিত করে গোল্ডস্মিথ পার্লামেন্টকে জানালেন, বড় ধরনের জনস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে আইনের শাসনকে পাশ কাটাতে হয়েছে। ওয়ারডল আÍসমর্পণ করার পরই কেবল গোল্ডস্মিথ পরিচালক পদে তার চাকরির মেয়াদটি নবায়ন করেছিলেন, তবে সেটি মাত্র এক বছরের জন্য।।

(চলবে)