Home » আন্তর্জাতিক » আফগানিস্তানে ড্রোন হামলা : সাক্ষাত মৃত্যুদূত

আফগানিস্তানে ড্রোন হামলা : সাক্ষাত মৃত্যুদূত

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

drone-attackগত ১২ বছরে আফগানিস্তানে আমেরিকার পরিচালিত যুদ্ধে ঠিক কতজন হতাহত হয়েছে বা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার সঠিক কোনো হিসাব আছে কি (কারো কারো মতে সংখ্যাটি কয়েক মিলিয়ন। নিহত হওয়ার বাইরেও অনেক লোক আহত হয়েছে।)? কেবল যুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষের নয়, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কেও কি স্পষ্ট কোনো ধারণা আছে? এমন এক পরিস্থিতিতে সম্প্রতি আমেরিকার মিডিয়া, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষের সাথে আলাপ করে দ্য নেশন সাময়িকী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তারা আশা করেছে, এর ফলে যুদ্ধ নিয়ে চলমান ‘বিবেকহীন ভ্রান্তি’র অবসান ঘটবে।

এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুতের সময় সাময়িকীটি বেসামরিক লোকজনের প্রাণহানি বন্ধ করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সীমাহীন উদাসিনতা লক্ষ করে। এসব লোক নিহত হয়েছে উভয় পক্ষের হাতে। তালেবান এবং তাদের মিত্ররাও কম বেসামরিক লোক হত্যা করেনি। কিন্তু তারপরও এসব লোক হত্যার জন্যও যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের দায়ী করা যায়। কারণ যুদ্ধ না লাগলে এসব লোক নিশ্চিতভাবেই বেঁচে থাকত। ফলে এসব প্রাণহানির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, কেবল ২০১১ সালেই আফগানিস্তানের এক পঞ্চমাংশ মানুষ (২২ শতাংশ) ব্যক্তিগতভাবে তাদের বাড়িতে কোনো না কোনো ধরনের অপরাধ বা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। দেশটির ৩৪টি প্রদেশের সবগুলোতে ৬,৩০০ জনের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে ওই চিত্রটি পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৮ শতাংশ (পাঁচ লাখ) আবার ‘বিদেশী বাহিনী’ তথা মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইসাফের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংখ্যাটা কেবল এক বছরের চিত্র। ১২ বছরের যুদ্ধের হিসাব করলে সংখ্যাটি কত বড় হতে পারে, তা কল্পনাও হয়তো করা যায় না। চেষ্টা করলে হয়তো সত্যিকারের সংখ্যাটা পাওয়া যাবে। তবে সেই হিসাব করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সাধারণভাবে বলা যেতে পারে, মার্কিন ও ইসাফ বাহিনীর হাতে কয়েক মিলিয়ন আফগান নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে, তাদের বাড়িঘর বিধক্ষস্ত হয়েছে, জীবিকা নষ্ট হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, দি সেন্টার ফর সিভিলিয়ানস ইন কনফ্লিক্ট, দ্য ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন ইত্যাদির মতো আন্তর্জাতিক এনজিও মানবাধিকার লঙ্ঘন, যুদ্ধাপরাধ, বড় মাত্রার ঘটনা প্রভৃতি নিয়ে অনেক কাজ করেছে। তবে তাদের কেউই যুদ্ধে বেসামরিক বা সামরিক সদস্যদের প্রাণহানিসংক্রান্ত কোনো ডাটাবেইজ তৈরি করেনি। ব্রিটেনভিত্তিক দি ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম মার্কিন ড্রোন হামলায় বেসামরিক প্রাণহানির ব্যাপকভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করলেও আফগান যুদ্ধে সার্বিক বেসামরিক প্রাণহানি নিয়ে কাজ করেনি। এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কাজ করেছে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ। ‘যুদ্ধের মূল্য’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে ২০০১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এটা হালনাগাদ করা হয়েছে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এতে বলা হয়, এ পর্যন্ত সব পক্ষের হাতে নিহত বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার সংখ্যা ১৯ হাজারের মতো।

ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন জার্নালিমের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত লোকের সংখ্যা ৪০৭ থেকে ৯২৬। এদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা অন্তত ২০০।

এদিকে, ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) সিআইএকে বিশ্বজুড়ে তার বিতর্কিত ড্রোন হামলা কার্যক্রমে সহায়তা করার বিবরণ তুলে ধরেছে।

তবে ওয়াশিংটন পোস্টের বিবরণে বিস্তারিত তথ্য নেই। কেবল যেসব তথ্য চলমান অভিযানগুলোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই এবং যেসব অভিযানের খবর প্রকাশিত হতে জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকিগ্রস্ত হবে না, কেবল সেইসব তথ্যই দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে খোদ মার্কিন সরকারের নির্দেশনায় এবং মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অনুরোধে অনেক তথ্য চেপে যাওয়া হয়েছে।

এত সীমাবদ্ধতার পরও প্রতিবেদনটিতে সিআইএ’র ড্রোন হামলায় এনএসএ’র যোগসাজস নিয়ে দীর্ঘদিনের সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট এনএসএ’র ফাইলগুলো পেয়েছিল গোপন তথ্য ফাঁস করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাবেক মার্কিন সৈনিক অ্যাডওয়ার্ড স্লোডেনের কাছ থেকে। এই তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, এনএসএ’র বিশাল বাজেট এবং তাদের কারিগরী সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে সিআইএ ২০১২ সালে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের উপজাতীয় এলাকায় আল কায়েদার কথিত গুরুত্বপূর্ণ নেতা হাসান গুলকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ড চালাতে সম্ভব সবভাবেই নিয়মনীতি পদদলিত করা হয়েছে।।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)