Home » রাজনীতি » দিন যায় – পাপ ক্ষয় হয় না…

দিন যায় – পাপ ক্ষয় হয় না…

আবীর হাসান

police-8দিনগত পাপ ক্ষয়প্রাচীন বাংলা প্রবাদ। মমার্থ : কোন রকম দিন পার করতে পারলে বা সময়ক্ষেপণ করতে পারলে দোষও কমে যায়। বাংলাদেশের মানুষ কি তাই করছে? হয়তো করতে চাচ্ছে কিন্তু দিনের পর দিন যাচ্ছে ঠিকই পাপ বা দোষের যে ক্ষয় হচ্ছে না। দোষটা কবে করেছিল এদেশের মানুষ? এখন নিদ্বির্ধায় বলা যায় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। এর ব্যাখ্যা এখন নিষ্প্রয়োজন, চলমান ঘটনাবলীই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কেমন জটিল হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। জনসাধারণ এখন নিজেদের দোষ বা পাপ মোচনের সুযোগও পাচ্ছে না। ১৯৯০ সালের পর শেষ একটা সুযোগ তৈরি হয়েছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে কিছু একটা করার। কিন্তু সেটাও এই সরকারের আমলে অনিশ্চিত হয়ে গেছে। সমস্যা এখন সঙ্কটে পরিণত। প্রতিটা দিন এখন অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠেছে অন্তত ২৫ অক্টোবরের পর থেকে যেন প্রতিটা মুহূর্তে হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে চেতনায়। সবারই উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। এই সময়ে মনে পড়ছে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের সেই উক্তিটির কথা, বর্তমানের একটা দিন ভবিষ্যতের দুটো দিনের সমান।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের অন্যতম রূপকার ফ্রাঙ্কলিন নিশ্চয়ই এমনি এমনি এই উক্তি করেননি। শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেও বেগ পেতে হয়েছিল সে দেশের নেতৃবৃন্দের। তাদেরকেও প্রতিটা দিনকে মূল্য দিতে হয়েছিল গুরুত্বের সঙ্গে।

আমাদের তিনটি দিন গেল হরতালে প্রাণ গেল বেশ কিছু। মালের ক্ষতি অনেক কিন্তু ফলাফল? – ২৫এ যেখানে ২৯ও সেখানে। সরকার চাপ অনুভব করছে বলে মনে হচ্ছে না বরং অনেকটাই চাপ ঝেড়ে ফেলেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। টেলিফোন আলাপ নিয়ে নানা ব্যাখ্যাঅপব্যাখ্যা দিয়ে সরকার কিছুটা হলেও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পেরেছে। বিরোধী দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব যখন হরতালের মধ্যে বার বার সংলাপের নতুন তারিখ চাচ্ছিলেন তখন খানিকটা দৈন্যতাই যেন প্রকাশ পাচ্ছিল। যদিও অর্থবহ সংলাপ, খোলা মনের সংলাপ এসব দাবি তিনি জানিয়েছিলেন। জনসাধারণের বিভ্রান্তি দূর করার দাবিটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ সত্যিই জনসাধারণ বিভ্রান্ত। নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন, সর্বদলীয় না একদলীয় অন্তবর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক অথবা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক কোনটা যে গ্রহণযোগ্য তা বুঝতে পারছে না জনগণ। দু’পক্ষই যে সব যুক্তি দিচ্ছেন তাতে সারবস্তু অবশ্যই কিছু আছে। যুক্তি দেয়ার লোকের অবশ্য অভাব নেই। প্রতিদিন টেলিভিশন টক শো এবং পত্রিকার কলামে দু’পক্ষীয় যুক্তিবাদীরা হরেক রকম আইডিয়া দিচ্ছেন। এখনকার প্রধান বিষয় অবশ্যই সংলাপ।

তাহলে প্রশ্ন তুলতে হয় টেলিফোনে ৩৭ মিনিটের কথোপকথন কি সংলাপ নয়? সে সংলাপের বয়ান মোটামুটি জানা গেছে। ধরলাম ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় যদি তারা মুখোমুখি বসতেন তাহলে এর বাইরে কি কোন আলাপ হতো? হয়তো হতো ব্যক্তিগত আলাপের ব্যাপ্তিটা বেশি হতো নিঃসন্দেহে। কারণ প্রধানমন্ত্রীর যেমন কিছু অভিমান আছে তেমনি বিরোধী দলীয় নেত্রীরও আছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। আর সে আলোচনার খানিকটা কিন্তু টেলিফোন আলাপেও হয়ে গেছে। তবে যে আলোচনার বিষয়টা জনসাধারণ জানতে চায় সেই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলোচনা কতোদূর এগুতো? এই বিষয়টা নিয়ে সতর্ক শব্দ চয়ন এবং কৌশলী কথাবার্তা বাইরে যা এতোদিন হয়েছে তার বাইরে মুখোমুখি সংলাপে নতুন কিছু বলার কি অবকাশ আছে? ভালো ভালো কথা দু’জনেই বলতে পারেন কিন্তু নিজের নিজের অবস্থান (প্রধানমন্ত্রীর তার নেতৃত্বে সর্বদলীয় সরকার এবং বিরোধী দলীয় নেতার নির্দলীয় তত্ত্বাবায়ক সরকার) থেকে যদি না সরেন তাহলে টেলিফোন সংলাপের মতোই অসার হয়ে যাবে গণভবন সংলাপ।

এই মন্তব্যকে নৈরাশ্যবাদী বলে মনে হতে পারে কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে প্রধানমন্ত্রী ন্যায্য কথা বলে মনে করছেন ‘সংশোধিত সংবিধান মোতাবেক তার নেতৃত্বাধীন সরকারকে’। এখন থেকে তাকে সরাতে হলে কিংবা বেগম জিয়ার ভাষায় একটু সংবিধান সংশোধন করতে হলে হয় প্রধানমন্ত্রীকে চাপ দিয়েই করাতে হবে না হলে কনভিন্স করতে হবে। চাপ প্রয়োগের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই চলছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যে চাপটা ঠিক মতো অনুভব করছেন না এটাই বাস্তবতা। ৬০ ঘন্টা হরতালের পরও পরিস্থিতির ইতর বিশেষ ঘটেনি। হরতালের সার্থকতা উপলব্ধি করে দেশিবিদেশি প্রেসার ফ্যাক্টরগুলোও সক্রিয় নয়। অতঃপর কনভিন্সের পথ যদি ধরতে হয় তাহলেও বেশ আটঘাট বেঁধেই নামতে হবে এবং এমন ক্রাইসিসের মধ্যে সরকারকে ফেলতে হবে যাতে যে জোরে সরকার সংশোধিত সংবিধানের অনুগত থাকার দৃঢ়তা দেখাচ্ছে সেই দৃঢ়তা না থাকে। এটাও সংলাপ দিয়ে হতে পারে তবে তা দ্বিপক্ষীয় সংলাপে হবে বলেও প্রত্যয় হয় না। তাই উচিত হবে প্রেসার ফ্যাক্টরগুলোকে সক্রিয় করে তোলা। যাতে সংশ্লিষ্ট সবাই গোলটেবিল বা জাতীয় সংলাপের মতো একটা পরিস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

ট্রাডিশনাল আন্দোলন জনগণের দুর্ভোগ যতোই বাড়াক এই চরিত্রের সরকারের জন্য চাপ সৃষ্টি করে না। কারণ জনসাধারণ এসব কর্মসূচি আক্ষরিক অর্থে পালন করে না তারা বাধ্য হয় কিংবা সবাইকেই কোল্ড শোল্ডার দেখায়। সরকারকেও ইতোপূর্বে যেসব পক্ষ থেকে চাপ দেয়া হতো সেই পক্ষগুলোও এখন নিষ্ক্রিয়। কাজেই কৌশল যা আছে সরকারই তা বিরোধী দলের ওপর প্রয়োগ করতে পারছে বিরোধী দল পারছে না। তাই দিনগত পাপ ক্ষয় করছে জনগণ কিন্তু বড় ধীরে।।