Home » মতামত » প্রতিক্রিয়া – “এভাবে আতঙ্ক আর দুঃচিন্তার মধ্যে জীবন-যাপন করা যায় না”

প্রতিক্রিয়া – “এভাবে আতঙ্ক আর দুঃচিন্তার মধ্যে জীবন-যাপন করা যায় না”

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

public-3রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়েও নিশ্চিতে থাকতে পারছি না। কখনো কি ঘটে যায় সে চিন্তায় বাসার কাজেও মন বসে না। কখন সন্তানরা বিদ্যালয় থেকে ফিরে আসবে।’ কথাগুলো বলছিলেন মিরপুরের বাসিন্দা গৃহিনী কানিজ মাসুদ আলপনা। তিনি আরো বলেন, স্বামীকে নিয়ে দুঃচিন্তা আরো বেশি। কারণ তার অফিস মতিঝিলে। ফিরতে ফিরতে কখনো কখনো রাত হয়ে যায়। মাঝে মাঝে সেলফোনের নেটওয়ার্ক ডিস্টার্ব করে। সে সময়ে মনে হয় এ বুঝি কিছু ঘটে গেল। এভাবে দুঃচিন্তার মধ্যে জীবনযাপন করা যায় না। আমরা তো কখনোই ক্ষমতায় যাব না, তারপরও কেন এমন আতঙ্কে আমাদের দিনাতিপাত করতে হবে। যাদের আতঙ্কে থাকার কথা, তারা গার্ড নিয়ে চলাফেরা করছে। আইনশৃংখলা রক্ষাকারীবহিনী তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে দিনরাত। আমরা যারা সাধারণ জনগণ, তাদের কি হবে। দেশটা কি আমাদের নয়? রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করছে শুধু ক্ষমতায় যাওয়া বা সেখানে থাকার জন্য। সেখানে জনগণ কোথায়? তারা কি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার সিড়ি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে যাবে। রাজনীতিকদের আজ এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

খুলনার রায়হান বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। গেল দুইতিন মাসে ব্যবসা একেবারে কমে গেছে। ক্রেতারা দোকানে আসছে না। তারাও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে কি হবে? আমরা তো এমন গণতন্ত্র চাইনি সেখানে ঠিকমতো ব্যবসাবাণিজ্য করে সংসারও চালানো যাবে না। নির্বাচন যতদিন অনুষ্ঠিত না হবে ততদিন এমন উৎকণ্ঠা কাটবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানেরও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে অন্তবর্তীকালীন সরকার ও আগামী নির্বাচন, ক্ষমতায় যাবার ইস্যুর সমাধান হলে রক্তপাত হবে বৈকি। উভয় রাজনৈতিক দল মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। কারণ এতে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। মাঝে জনগণ হবে ক্ষতিগ্রস্ত। খুলনার আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অপরাধীরা এখন দিনে দুপুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মানুষ সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে থাকছে না। বাসাও নিরাপদ নয়। সেখানেও হামলা হতে পারে। হঠাৎ শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। এই বুঝি হামলা করা হচ্ছে। এবারের অবস্থা আরো ভয়ানক। এর থেকে মুক্তি চাই।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বসবাস করা সরকারি চাকুরিজীবি আবদুল মান্নান বলছিলেন নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা। চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। বাজার তদারকি নেই। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম হাকাচ্ছে। চালের দাম বেড়ে গেছে। আতঙ্ক সর্বত্র। দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার পুরো বিষয়টি নিয়ে এখনো লুকোচুরি করছে। কবে নির্বাচন হবে, কীভাবে হবে, কারা সে সময়ে দেশ পরিচালনা করবে কোনো ইস্যুরই ফয়সালা হয়নি। সরকার পুরো দুই বছর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে লুকোচুরি করেছে। অথচ তারা বলছে, রাজনীতি করছে তারা জনগণের জন্য। এর চেয়ে হাস্যকর আর কি হতে পারে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী হালিম জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে চরম আতঙ্কে রয়েছি। কখন কি ঘটে যাবে, তার জন্য কোনো পণ্যও আনছি না। আমদানি বন্ধ করে দিয়েছি দুই মাস হলো। গুদামও খালি করে ফেলছি যদি আগুন দেয়া হয়, তবে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব না। দেশ কোন দিকে যাচ্ছে, এখনো নিশ্চিত নয়। কেন তারা ক্ষমতার জন্য জনগণকে বিপদে ঠেলে দিচ্ছে পরিস্কার নয়। যদিও আমাদের রাজনীতি এমনিই। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরছি। কাজ না থাকলে বাইরে যাচ্ছি না। দেখেন না, রাস্তায় গাড়িও কম। এর মধ্যে বিরোধী দলের হরতাল। কী হবে জানি না। সবমিলে চরম আতঙ্কে দিন কাটছে। রাজনৈতিক এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশ ও জনগণের অবস্থা শোচনীয় হবে।

রামপুরার বাসিন্দা খাদিজা বলেন, একের পর এক নৈরাজ্য ঘটানোয় নিম্ন আয়ের কর্মজীবীরা খুবই কষ্টের মধ্যে আছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। কর্মহীন হয়ে তাদের পক্ষে জীবনে চলার মত গতি নেই। সাধারণ খেটে খাওয়া মজুরদের কথা ভাবার মত অবকাশ নেই। এই অব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে যে ধরনের শক্তিমত্তার প্রয়োজন তা কিন্তু এ মুহূর্তে নেই। এদিকে অর্থনীতিতে হরতাল যে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে তার শিকার হচ্ছেন নিম্নবিত্ত থেকে আরম্ভ করে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত সবাই। হরতালের কারণে শিক্ষা ক্ষেত্রে সেশন জটের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা সময়মত পরীক্ষা দিতে পারছেন না। পরীক্ষার্থীরাও হরতাল আতংকে দিন কাটাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিকমত পড়াশোনা হচ্ছে না। একদিকে কোর্স যথাযথভাবে শেষ করতে না পারায় যেমন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তা জাতীয় সমস্যায় রূপান্তরিত হচ্ছে।

সারাদেশে গোলযোগ সৃষ্টি হলে ক্যাম্পাসেও এর প্রভাব পড়বে। আর তাই নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফ। তিনি বলেন, অন্যান্য বছর ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার আগেই হলে ফিরতেন শিক্ষার্থীরা। তবে এবার রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কায় ঈদের পর এক সপ্তাহ পার হলেও এখনো হলে ফিরছেন না তারা। জানা যায়, ছুটি শেষ হলেও পরিস্থিতি শান্ত না হলে তারা ক্যাম্পাসে ফিরবেন না। হামলা, মারামারি ও সংঘর্ষের ভয়ে হল থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরিয়ে রাখছেন শিক্ষার্থীরা। সিট দখলে রাখার জন্য হলে থাকলেও সরিয়ে রাখছেন সার্টিফিকেট, ভর্তির কাগজপত্রসহ নানা নথি ও মালপত্র। যারা ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছেন তারা বাড়িতেই রেখে আসছেন এসব। এছাড়া হলের শিক্ষার্থীরা ঢাকায় অবস্থানরত আত্মীয়স্বজনের বাসায় কাগজপত্র সরিয়ে রাখাছেন।

পুরানো ঢাকার ব্যবসায়ী খালেক বলেন, অক্টোবরকে ঘিরে অর্থনীতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগউৎকণ্ঠা বাড়ছে। এর পর কী হবে? এই প্রশ্ন ব্যবসায়ী মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। চলমান ও আগামী নির্বাচনের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে চরম আতঙ্কে আছেন ব্যবসায়ীরা। বারবার সমাধানের তাগিদ দেয়া সত্বেও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় আগামীতে ব্যবসায়িক অচলাবস্থার আশঙ্কা করছেন তারা। জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। কোনো দলই তার অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নয়। ফলে আগামী নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বেও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক এ অস্থিরতায় দেশে বড় বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যাংকগুলো তাদের অলস টাকার পরিমাণ ক্রমেই বাড়াচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই দলের মধ্যে সমঝোতা না হলে দেশে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তাতে দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সিলেটের অধিবাসী অপু বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে আগামী নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া সিলেটে ১৮ দলের সমাবেশে এবং সর্বশেষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ভোট কেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠনের কথা বলেছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই অর্থাৎ বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ থেকে এক চুলও নড়া হবে না। পাশাপাশি বিরোধী দলের প্রতিহতের ঘোষণায় আওয়ামী লীগ মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে এবং ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে এ কমিটি গঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় দেশবাসীর মধ্যে এক অজানা আতঙ্কউৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। চলমান সংকট আগামী নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে। এ সংকট সমাধানে দেশিবিদেশি উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। তবে, এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। বড় দুই রাজনৈতিক জোট বিশেষ করে দুই নেত্রী চাইলে এখনই সংকট উত্তরণ সম্ভব। গণতন্ত্র ব্যাহত হোক, দেশের মানুষ অস্বস্তিতে ভুগবে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে নিশ্চয়ই রাজনীতিকরা তা চাইবেন না।।