Home » রাজনীতি » মনোনয়ন এবং এমপি বেচাকেনার বাণিজ্য সুবিধা

মনোনয়ন এবং এমপি বেচাকেনার বাণিজ্য সুবিধা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

corruption-cartoonআইন যেখানে শাসন করে না সেখানে কোন শাসন ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকে না”

এ্যারিস্টটল (পলিটিকস পুস্তক ৪, অধ্যায় ৪)

বর্তমান সরকার বাংলাদেশের রাজনীতির যাবতীয় ক্ষতি ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডগুলো সম্পন্ন করেছে খুবই চতুরতা এবং কৌশলের সঙ্গে। নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে চরম সঙ্কট সৃষ্টির পরে এখন একদলীয় নির্বাচনের দিকেই জোর কদমে হাটতে শুরু করেছে সরকার। তাদের এই কর্মকাণ্ডের ফলে যে সঙ্কট, সংঘর্ষ, সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে রাজনীতির সীমাহীন ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে জনমনে আতঙ্ক, শঙ্কা এবং সর্বোপরি শুধু রাজনীতিবিদ নয়, সামগ্রিক রাজনীতির উপরে জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সরকার চরম ক্ষতির সম্মুখীন করেছে পুরো জাতিকে। আর এর সবশেষ উদাহরণ সোমবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করা হয়েছে খুবই তড়িঘড়ি করে, বলতে গেলে কাউকে জানান না দিয়ে, কোনো ধরনের আলাপ আলোচনা ছাড়াই। সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে হলে কোনো রাজনৈতিক দলে তিন বছর থাকার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় ছাড়া যে কেউ যে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন। জীবনে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই, সংযোগ নেই এমন যে কারোরই নির্বাচনে যোগ দেয়ার সুযোগ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর ২০০৯ সালের অধ্যাদেশ সংশোধন জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২এর ২০০৯ সালের সংশোধিত বিধানের ১২ ধারায় প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। ওই ধারার () উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসাবে ৩ বছর না থাকলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য হবেন।

কিন্তু এই ধারাটি উঠিয়ে দেয়ার ফলে এখন আর কালো টাকার মালিক, ধনাঢ্য ব্যক্তি থেকে বিত্তশালী কলাকচুর ব্যবসায়ীও প্রার্থী হতে পারবে। অর্থ ও অস্ত্রধারীরাই হয়ে যাবে রাজনীতির সর্বেসর্বা। হয়ে যাবে আইন প্রণেতা। আবার এর ফলে প্রশাসনেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। প্রশাসনে দলীয়করণ বাড়বে। কারণ অবসরে যাবার পরেই যে কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে।

বর্তমান জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য অধিক মাত্রায়। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এক হিসেবে দেখা যায়, ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পাকিস্তানের নির্বাচনে জয়লাভকারীদের মধ্যে ৪ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী, ১৯৭৩ সালে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ৫৩, ১৯৯৬তে এই সংখ্যা ৬০ শতাংশের উপরে উঠে যায়। আর বিগত দুই সংসদে এর সংখ্যা কোনক্রমেই ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশের কম নয়। (তথ্যের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রফেসর তালুকদার মনিরুজ্জামান)। কাজেই রাজনীতি এখন আর একটি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে নানা জেলজুলুম, অত্যাচারনিপীড়ন সহ্য করে রাজনীতি করে আসা পোড় খাওয়া দেশপ্রেমিক ব্যক্তির জন্য নয়। রাজনীতি এখন অর্থেবিত্তে, পেশী আর অস্ত্র শক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তিদের জন্যই। আইনি বাধার ফাকফোকর দিয়ে এতোদিন এটা করা হলেও, এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকার এই হীন ব্যবস্থাটিকেই হালাল ও বৈধ করে দিয়েছেন। রাজনীতিকে কলুষিত করার যাবতীয় ব্যবস্থা তিনি সম্পন্ন করালেন।

রাজনীতি বহুদিন ধরেই জনকল্যাণ আর দেশপ্রেমের বিষয় হিসেবে চিহিৃত হচ্ছিল না। আর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের মাধ্যমে রাজনীতি এখন ব্যবসা বাণিজ্যের আর একটি উর্বর পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে।

নির্বাচন সামনে এলেই মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে বড় দুই দলের অনেকের কপাল ফিরে যায়। হাজার হাজার কোটি টাকা বাতাসে উড়তে থাকে। অন্তত তিন বছরের বাধাটি থাকার কারণে – ‘অর্থ আছে সুতরাং কিনে নিলাম’ জাতীয় বিষয়টিতে কিছুটা হলেও বাধা দেয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু তিন বছরের বাধাটি উঠিয়ে দেয়ার কারণে এখন ছোটখাটো দল তো কোনো ছাড়, বড় দলের মনোনয়ন কেনার পথ সুগম হলো। আর ওই বড় দলটি যদি নির্বাচনে বিজয়ী হয় তাহলে প্রকারান্তরে সংসদ সদস্য পদই কেনা হলো। এই দৃষ্টিতে দেখলে মনোনয়ন এবং এমপি পদ এখন ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে চলে এসেছে অনেকের জন্য। এটা এখন কেনাবেচার বিষয়েই পরিণত হয়েছে। ত্যাগী রাজনীতিক বা রাজনীতির জন্য ত্যাগতিতীক্ষা এখন আর কোনো বিবেচ্য বিষয় থাকছে না। আর রাজনৈতিক দলগুলোও এখন মনোনয়ন এবং এমপি কেনাবেচার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এটা অনেকটা কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো। কুইক মানি, কুইক এমপি পদ।

আগে জাতীয় সংসদে কেউ নির্বাচন করতে চাইলে এলাকায় যেতে হতো এখন আর তার প্রয়োজন পড়বে না। এখন নিয়মিত টাকা পাঠিয়ে দিলেই চলবে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির এতো বড়ো সর্বনাশটি করার পেছনে প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীনদের যে উদ্দেশ্যটি কাজ করেছে তাহলো একদলীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে যদি দল ভাঙা যায়, দল থেকে লোক ভাগিয়ে নেয়া যায় তার পথ খোলা হলো। আর এর টার্গেট প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। অর্থবিত্তসহ নানা সুযোগসুবিধা দিয়ে লোক ভাগানো, জার্সি বদলের এমন কূটকৌশল অতীতে এদেশে আর দেখা যায়নি। প্রধান বড় দলসহ দল ভাঙা ও দল থেকে লোক ভাগানোর চেষ্টার পাশাপাশি নতুন নতুন দলও গজিয়ে উঠবে এর মাধ্যমে। সরকারের পক্ষ থেকে এ চেষ্টাটি নতুন নয়। ইতোমধ্যে বিএনএফ নামে একটি দল গঠন করিয়ে গমের শীষ প্রতীক বরাদ্দের চেষ্টা চালানো হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের বদৌলতে সে চেষ্টা কামিয়াবও হবে।

আর এর মাধ্যমে একদলীয় নির্বাচনটি যে আসলে একদলীয় নয় তা প্রমাণের চেষ্টা হবে। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে বাদ দিয়েই সর্বদলীয় সরকার গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এখন এই সরকারে প্রতিপক্ষের কাউকে ভাগিয়ে এনে অংশীদার করার বিষয়টিও তো বিবেচনায় নিতে হবে। তবে অনেকে বলছেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর ছেলে এবং পরিবারের সদস্যদের জন্যও হতে পারে।

আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদে বিএনপি থেকে হাসিবুর রহমান ও ডা. আলাউদ্দিনকে ভাগিয়ে নিয়ে মন্ত্রিত্ব দেয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য আইন ভঙ্গ করার দায়ে তাদের সদস্য পদ চলে যায়।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ৩ বছরের বাধ্যবাধকতার আরপিওটিকে আইনি বৈধতা দিয়েছিল তা সংসদে পাস করার মধ্যদিয়ে। কিন্তু সেই একই সরকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বিনাশ করার জন্য, কলুষিত করার জন্য এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরো রাজনীতিকেই আরো বিপন্ন, বিপর্যস্ত করে তোলার ব্যবস্থা করেছে।

এই ব্যবস্থার পরে সংসদ সদস্য পদের মানমর্যাদা আর থাকলো কই। কারণ এখন সংসদ সদস্য পদ তো কিনতেই পাওয়া যাবে।।