Home » অর্থনীতি » লাগামহীন দ্রব্যমূল্য : তিন দিনের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৪ টাকা

লাগামহীন দ্রব্যমূল্য : তিন দিনের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৪ টাকা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

economyচলমান রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়ছে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে। পাইকারি বাজারে এরই মধ্যে কমে গেছে পণ্য সরবরাহ। ভাংচুর ও লুটের আশঙ্কায় রাজধানীমুখী ট্রাক চলাচলও সীমিত হয়ে পড়েছে। সরবরাহসংকটে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তিন দিনের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩৪ টাকা। ৫০৫১ টাকার নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৪৫৫ ও ৪১৪২ টাকার মিনিকেট ৪৪৪৫ টাকায়। মোটা চালের দামও বেড়েছে কেজিতে ২৩ টাকা। প্রতিটি ৫০ কেজি চালের বস্তায় গড়ে ৩০ টাকা করে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। এ সপ্তাহে পাইজাম প্রতি কেজি ৩৮ টাকা, ইরি (মোটা) ৩২ টাকা, মিনিকেট ৪০ টাকা, বেতি ৩৫ টাকা, জিরাশাইল ৪৮ টাকা, পারিজা সিদ্ধ ৩৮ টাকা ও চিনিগুঁড়া বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকায়। এছাড়া আদা ও চিনির দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। কোরবানির ঈদের আগে প্রতি কেজি আদা ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। প্রতি কেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ৪৮ টাকায়, গত সপ্তাহে যা ছিল ৪৪ টাকা। এছাড়া পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮৫ টাকা এবং রসুন ৬০ টাকায়। প্রতি কেজি মসুর ডাল ৯০ টাকা, মুগ ডাল ১২০ টাকা, ছোলার ডাল ৬০ টাকা, ছোলা ৫০ টাকা, ধনিয়া ৭০ টাকা, শুকনা মরিচ ১৪০ টাকা ও রূপচাঁদা সয়াবিন তেলের ১ লিটার প্যাট বোতল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়।

রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে বেড়ে গেছে সব ধরনের সবজির দাম। এছাড়া চাল, আদা ও চিনির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে। ক্রেতাদের জন্য সুখবর শুধু ব্রয়লার ও ডিমের বাজারে। গত সপ্তাহের তুলনায় দাম কমতির দিকে এই দু’টি পণ্যের। ঈদুল আযহার পর থেকেই দেশবাসীর মনে ২৫ অক্টোবর আতঙ্ক ভর করে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ২৫ অক্টোবরের পাল্টাপাল্টি সভাসমাবেশ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানের কারণে দেশবাসীর মধ্যে ছিল উদ্বেগ। তার ওপর টানা তিনদিন হরতালের ডাক দেয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কাঁচা বাজারগুলোতে। এক সপ্তাহের ব্যবধানেই সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা করে।

পুরান ঢাকার কাজীর দেউড়ি বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. দিদার বলেন, সব ধরনের সবজির দাম বাড়তি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য উত্তরবঙ্গ থেকে সবজি আসা কমে গেছে। তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তার দোকানে প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া ৩০ টাকায়, কাঁচা পেঁপে ২০ টাকায়, বেগুন ৫০ টাকায়, মূলা ৪০ টাকায়, ঢেঁড়শ ৫০ টাকায়, টমেটো ১০০ টাকায়, কচুর ছড়া ৪০ টাকায়, পটল ৪০ টাকায়, লাউ ৩৫ টাকায়, শিম ৫০ টাকায়, কাকরোল ৭০ টাকায়, ফুলকপি ৯০ টাকায়, বড় শসা ৫০ টাকায়, চালকুমড়া ৩৫ টাকায়, ঝিঙ্গা ৬০ টাকায়, বরবটি ৬০ টাকায়, আলু ১৬ টাকায়, বাঁধাকপি ৪০ টাকায়, চিচিঙ্গা ৬০ টাকায় ও কাঁচকলা (প্রতি হালি) ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দিদার জানান, প্রতিটি সবজির দর গত সপ্তাহে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা কম ছিল।

মাছের দামও বাড়তির দিকে। গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে দাম বেড়েছে। বড় আকারের (১ কেজি) ইলিশ কেজিতে ৬০০ টাকা, দেশি রুই ২৫০ টাকা, তেলাপিয়া ১৫০ টাকা, বড় পোপা ২২০ টাকা, বড় কোরাল ৪৫০ টাকা, কই ২৫০ টাকা, লইট্ট্যা ১৫০ টাকা, গলদা চিংড়ি ৮৫০ টাকা, সাদা চান্দা (বড়) ৯৫০ টাকা এবং কালো চান্দা (বড়) ৫৫০ টাকায় প্রতি কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

বাবুবাজারের চাল ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে রাজধানীতে চালান আসছে না। মজুদ চাল ফুরিয়ে যাচ্ছে। এতে বাজার ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রাক না পাওয়ায় চালের অন্যতম বৃহৎ মোকাম নঁওগা ও নাটোর থেকে চাল আসতে পারছে না। এ অঞ্চলের প্রতিটি জেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫০৩০০ ট্রাক চাল রাজধানীর উদ্দেশে ছাড়লেও গত দুতিন দিনে তা ১০০এর নিচে নেমে গেছে বলে জানান নাটোরের জোবেদা রাইস মিলের মালিক। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পরিবহনমালিকরা রাস্তায় গাড়ি নামাতে চাইছেন না। ফলে মোকামে চাল থাকলেও ট্রাকের অভাবে তা রাজধানীতে পাঠানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ট্রাককাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ভাংচুর ও লুটতরাজের আশঙ্কায় মালিকরা বেশির ভাগ ট্রাক ঢাকার বাইরে নিয়ে গেছেন। রাজধানী অভিমুখে ট্রাক পাঠাচ্ছেন না তারা।

এদিকে রাজধানীর খুচরা বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের ডালের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ৬১০ টাকা। দেশী মসুর ডাল কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৯৮১০০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে এর দাম ছিল ৮৮৯০ টাকা। পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি ডালের দাম ৪ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৮৫০ টাকায়। রাজধানীর পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম মণপ্রতি বেড়েছে ৬০৭০ টাকা। দুতিন দিন আগে মণপ্রতি সয়াবিন তেল বিক্রি হয় ৩ হাজার ৭৩০ থেকে ৩ হাজার ৭৪০ টাকা। গতকাল তা বেড়ে হয় ৩ হাজার ৮০০ টাকা। এতে খুচরা বাজারে সয়াবিনের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ২ টাকা।

ভোজ্যতেলের পাইকারি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, চলমান অস্থিরতার কারণে মিল থেকে তেল সরবরাহ কমে গেছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে থেকে ক্রেতাও আসছেন না। পাইকারি বাজারে চিনির দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ১২০ টাকা বেড়েছে। আর খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৩৪ টাকা। গতকাল পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি চিনি বিক্রি হয় ২ হাজার ২৪০ টাকায়। ঈদুল আজহার পর এর দাম ছিল ২ হাজার ১২০ টাকা। খুচরা বাজারে গতকাল প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয় ৪৬৪৮ টাকায়; এক সপ্তাহ আগে যা ছিল ৪২৪৪ টাকা।

সরবরাহসংকটে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে পেঁয়াজের বাজার। তিন দিন আগে পাইকারি বাজারে দেশী পেঁয়াজ ৮০৮২ টাকায় বিক্রি হলেও তা বেড়ে ১১০ টাকায় বিক্রি হয়। মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৬৫৭০ থেকে বেড়ে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। খুচরায় দেশী পেঁয়াজ ১১০ ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। শ্যামবাজারের পেঁয়াজ আমদানিকারক আবদুল মাজেদ জানান, বাজারে এমনিতেই পেঁয়াজের সংকট রয়েছে। ঈদের পর ঝুঁকি নিয়ে কেউই পেঁয়াজ আমদানি করেননি। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজারে।

এদিকে বাজারে বেড়েছে সব ধরনের সবজির দাম। গতকাল ছোট আকারের ফুলকপি প্রতিটি ২৫৩০ ও বাঁধাকপি ১৮২০ টাকায় বিক্রি হয়। বরবটি কেজিপ্রতি ৪০৪৫, বেগুন ৪০৪৫, টমেটো ৯০১০০ ও শিম বিক্রি হয় ৫০৬০ টাকায়। সবজি অঞ্চলখ্যাত যশোরের ব্যবসায়ীরা জানান, মোকামে সবজির সরবরাহ পর্যাপ্ত। তবে ট্রাকে মালপত্র তেমন লোড হচ্ছে না। রাজধানী অভিমুখে সবজিবাহী ট্রাক চলাচল কমে গেছে।।