Home » রাজনীতি » সংলাপ : হলেই বা কি হবে

সংলাপ : হলেই বা কি হবে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

red-telephoneসর্বদলীয় সরকার আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ঘোরপ্যাচে তিন দিন ধরেই লাশ পড়ছে বাংলাদেশের আনাচেকানাচে। সকল সাধারন মানুষ আতংকের শেষ সীমায় পৌঁছে অসহায় তাকিয়ে রয়েছে, ক্ষমতার খেলায় আগামী দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে আর কতো লাশ পড়বে? সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় আর কতো মানুষ বলি হবে! টানা ৬০ ঘন্টার হরতালে গত শনিরোববার লাশ পড়েছে কমপক্ষে ১৫টি, বেশুমার ককটেলবোমা পড়েছে সারা দেশে। বিচারপতি, রাজনৈতিক নেতা, সংবাদপত্র, সাংবাদিক, টেলিভিশন, পুলিশ, পরিবহন, জনগন বাদ যাচ্ছে না কেউই। ভাবতে অবাক লাগছে, জনগনকে রক্ষা করার বদলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল মানুষের রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠেছে! কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোন ধরনের অনুশোচনার বদলে রক্তের এই হোলি খেলার মধ্যে সাফল্য দেখছেন। ফলে প্রথমদিনই হরতালের পরে বিএনপি মহাসচিব সারাদেশে ইতিমধ্যেই গণঅভ্যুত্থান ঘটে গেছে বলে সংবাদ মাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন।

বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ফোনালাপের পরে অনেকেই আশা করেছিলেন, সূচনা হিসেবে এটি মন্দ নয়! তবে এ নিয়েও কথা উঠেছে অনেক। প্রধানমন্ত্রী কথা বলবেন বিরোধী দলীয় নেতার সঙ্গে, এর মধ্যে ডেড লাল টেলিফোন বাধা হয়ে দাড়াতে পারে, অথবা কোন মেসেজ পাঠানোর জন্য ফোন ছাড়া অন্য কোন মাধ্যম বেছে নেয়া যেত কিনা কিংবা টেলিফোনটি আরো দু’দিন আগে করলে ফলাফলটি অন্যরকম হতো কিনা, এ নিয়ে মাঠঘাট, হাটবাজার, টিভি টক শো সরগরম হয়ে উঠেছে।

সত্যিই কি আমাদের দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপ হওয়ার সম্ভাবনা আদৌ আছে? অনেকের মতে, নেই। কারণ “বিনা রণে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী” দুই নেত্রীর সামন্ততান্ত্রিক এই চিন্তাই সংলাপের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। গত ১৮ আগষ্ট শেখ হাসিনা যখন ঘোষণা দিয়েছিলেন, সংবিধান থেকে তিনি একচুলও নড়বেন না এবং সবশেষ তত্ববধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না খালেদা জিয়ার এরকম ঘোষণা কি সংলাপের ক্ষেত্র সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে? যদিও শেখ হাসিনা তার ঘোষণার মধ্যে নতুনভাবে সর্বদলীয় সরকার শব্দটি যুক্ত করে সামান্য নমনীয়তা প্রদর্শন করেছেন। এর বিপরীতে খালেদা জিয়া ১৯৯৬ ও ২০০১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের যে প্রস্তাব দিয়েছেন তার বাস্তবতা নিয়েও ইতিমধ্যে সারাদেশে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নিজস্ব বক্তব্য দু’নেত্রীরই অটল থাকার ফলে সংলাপ নিয়ে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা দুর হওয়ার সম্ভাবনা সহসাই দেখা যাচ্ছে না। দু’নেত্রী হয়তো মুখোমুখি আলোচনার টেবিলে বসতে পারেন, নৈশ ভোজে অংশ নিতে পারেন, ভালমন্দ খেতে খেতে রান্নার প্রশংসাও করতে পারেনতাতে আখেরে মূল সংকটের সমাধান কিভাবে হবে, সেটি জনগনের কাছে এখনও বোধগম্য নয়।

প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের বাইরে কোনকিছু করবেন নাতার এই ঘোষণার মূল ভিত্তি হচ্ছে পঞ্চদশ সংশোধনী। যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের বিধান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের ভাষায় তারা কেবল সুপ্রীম কোর্টের রায় অনুসরন করেছেন বলে দাবি করছেন। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের অপর নির্দেশনা অনুযায়ী, আরো দুটি মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যেতে পারে, যদি সংসদে অনুমোদন করেএটি দলীয় স্বার্থে মানতে চাননি। যদিও সুপ্রীম কোর্ট সংবিধানের মূল প্রস্তাবনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রায়ে এই নির্দেশনাটি দিয়েছিলেন। আমাদের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় “জনগনের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ” উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং একটি প্রশ্ন থেকেই যাবে, পঞ্চদশ সংশোধনী কি আসলেই জনগনের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন? নাকি, প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় বা সিদ্ধান্তের প্রতিফলন? প্রশ্নটি সঙ্গত এ কারনে যে, নানা আলোচনা, জরীপ, সুশীল সমাজসহ নানা কর্ম পেশার মানুষ মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কেবল একটি অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। সুতরাং সংবিধানের মৌলিক প্রস্তাবনাকে পাশ কাটিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী আমাদের জাতীয় ইতিহাসে বিতর্কগুলিকে উস্কে দিতেই থাকবে।

বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি’র চরম ব্যর্থতা হচ্ছে এই জায়গায় যে, জনগনের অভিপ্রায়ের বিপক্ষে ক্ষমতাসীন দল শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করার বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করে বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। বিপরীতে তারা লাগাতার সংসদ বর্জন অব্যাহত রেখে ক্ষমতাসীন দলকে ওয়াক ওভার দিয়ে গেছে। পাশাপাশি ক্ষমাহীন ব্যর্থতা দেখিয়েছে রাজপথে গণআন্দোলন সংঘটিত করার ক্ষেত্রে। আজকের সংকটের মূল কারনটি সেখানেই নিহিত এবং বিরোধী দল এর দায়ভার কখনই এড়াতে পারবে না। বিএনপি আরো একটি দায় ঘাড়ে নিয়ে নিয়েছে, সেটি হচ্ছে ১৮ দলীয় জোটের নামে জামায়াতকে আশ্রয় এবং প্রশয় দান। এই প্রশ্নে দলটি কখনই জনগনের কাছে তার অবস্থান সুস্পষ্ট করতে পারেননি। যুদ্ধাপরাধীর বিচার, সরকারের দমনপীড়ন সর্বোপরি জনগনের চাহিদার বিপরীতে দিশেহারা জামায়াত সংগঠিত এবং অপতৎপরতা অব্যাহত রাখতে পেরেছে বিএনপির ঘাড়ে চড়ে। পল্টনের সবশেষ জনসভায় জামায়াতশিবির কর্মীদের সভাস্থলে অবস্থান এবং যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দাবি, বক্তব্য, ক্ষমতায় গেলে রাজবন্দীদের মুক্তি দেয়ার বিষয়ে খালেদা জিয়ার ঘোষণা অনেকের মনে এই ধারনা জন্মে দিয়েছে যে, বিএনপি বোধকরি জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে! এর ফলে জনগনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের দিনরাত কাটছে আতঙ্কের মধ্যে। এই আতঙ্ক নিজের জন্য, সন্তানের জন্য, পরিবারের সকল মানুষের জন্য। জীবন নিয়ে আতঙ্ক, সম্পদ নিয়ে আতঙ্ক, অফিসস্কুলকলেজবাজারঘাট, এমনকি ঘরের বাইরে যাওয়া নিয়েও আতঙ্ক। প্রতি মুহুর্তে আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করতে করতে মানুষ ‘ট্রমাটাইজড’ হয়ে পড়ছে, হারিয়ে ফেলছে মানসিক ভারসাম্য, তার চির পরিচিত চেনাজানা নিরাপত্তার জগত ভেঙ্গে পড়ছে। ঘোষিত কোন যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, অঘোষিত একটি যুদ্ধক্ষেত্রে বসবাস করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষকে। যেখানে প্রৃতিদিন রাজপথে মুড়িমুড়কির মতো ককটেলবোমা ফুটছে, গুলিটিয়ার গ্যাসরাবার বুলেট ছোঁড়া হচ্ছে অবিরাম। প্রতিদিন খবরের কাগজে, টেলিভিশন চ্যানেল খুলেই জনগন দেখতে পাচ্ছে নারকীয় হত্যাকান্ড, যানবাহন পোড়ানো, দেশ জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় যাওয়াএই দুইয়ের ধ্বংসাত্মক লড়াইয়ে গোটা দেশকে করে তুলেছে চরম অস্থিতিশীল। এর মাঝখানে পড়ে একেবারেই চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছে ১৫ কোটি সাধারন জনগন, যাদের ভোটে তারা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতার লড়াইয়ের এই ভয়ংকর উন্মাদনায় অসংখ্য মানুষ মারা পড়ছে অকাতরে, জখম হচ্ছে হাজার হাজার। কোটি কোটি সম্পত্তি বিনষ্ট হচ্ছে। নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারীরা। সমাজের কোন কর্মপেশার মানুষ এই ধ্বংসলীলার বাইরে থাকছেন না।

গোটা দেশের সংঘাতময় এই পরিস্থিতিতে প্রধান দুই দলের অনমনীয় অবস্থান সমঝোতার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে তিরোহিত হচ্ছে। কারন এই সংলাপ শুধুমাত্র আগামী নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশ ও জাতির অস্তিত্বের প্রশ্নে অনেকগুলি মৌলিক প্রশ্ন এই সংলাপের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। সুতরাং যারা এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন, তারা আর যাই হোক মূল সমস্যার ধারেকাছেও যাচ্ছে না। অভ্যন্তরীন সংকট সমাধানের পরিস্থিতি দ্রুতই দেশীয় রাজনীতিবিদদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভারতের রাজনীতির সমীকরন বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব মিশন ও এজেন্ডা রয়েছে। এটা খোলাখুলি হয়ে উঠছে যে, নেপথ্যে তারা দারুন কার্যকর হয়ে উঠছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদুতের দিল্লি সফর সেদিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। বিভক্ত, রক্তাত্ত ও জিঘাংসার রাজনীতি আরো উস্কে দিচ্ছে সেসব পরিস্থিতি। প্রান্তিক সম্ভাবনার যে সুতোর ওপর বাংলাদেশের রাজনীতি এখন দুলছেসেখান থেকে ফেরত আসাটা কতোটা সম্ভব,এই মূহুর্তে তা বোঝা যাচ্ছে না। সুতরাং অনিবার্য ভবিষ্যতই বলে দেবে, কোন পথে হাঁটবে বাংলাদেশ?