Home » শিল্প-সংস্কৃতি » হত্যার জন্যে যাদের জন্ম তাদের ছবি – ‘ফুল মেটাল জ্যাকেট’

হত্যার জন্যে যাদের জন্ম তাদের ছবি – ‘ফুল মেটাল জ্যাকেট’

ফ্লোরা সরকার

full-metal-jacket-posterফুল মেটাল জ্যাকেট’ ছবির শেষ দৃশ্যের আগের দৃশ্যে ভিয়েতনামের যোদ্ধা মেয়েটি গুলি খেয়ে মূমুর্ষূ অবস্থায় যখন তাকে ঘিরে রাখা মার্কিন বাহিনীকে ক্ষীণ কন্ঠে বার বার বলে যায় “শুট মি —-শুট মি—”ঠিক তখন মনে পড়ে যায় ছবির প্রথম অংশের একটি দৃশ্যের কথা। যে দৃশ্যে সার্জেন্ট হার্টম্যান মেরিন সেনাদের বা নৌসেনাদের ট্রেনিং শেষে উপদেশ বাণীতে বলেন তোমাদের মধ্যে প্রায় সবাই এখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে যাবে। অনেকে ফিরে নাও আসতে পারে। মেরিনেরা মারা যায়। আর এই মৃত্যুর জন্যেই তাদের এখানে (যুদ্ধের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে) আসা। কিন্তু মনে রেখো একজন মেরিন মারা যেতে পারে কিন্তু মেরিন বাহিনীর কোন মৃত্যু নেই। মেরিনরা অর্থাৎ তোমরা মৃত্যুহীন প্রাণ”। হার্টম্যানের কথাগুলো ছবির সেই দৃশ্যে নায়কের মনে না পড়লেও দর্শকের মনে পড়ে যায় আর তার ঠিক পরেই দেখি নায়ক মেয়েটিকে গুলি করে হত্যা করে। আর এভাবেই শেষ হয় “ফুল মেটাল জ্যাকেট” ছবি। যে হত্যা ছাড়া করণীয় কিছু নেই। সাম্রজ্যবাদী দেশগুলোর যুদ্ধই একমাত্র হাতিয়ার, যে হাতিয়ার নিয়ে তারা টিকে ছিলো এবং থাকে যুগ যুগ ধরে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ১৯৫৫ সালের ১ নভেম্বরে, তারপর আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের মাঝে একে একে আইসেনহাউয়ার (১৯৫৩ ১৯৬১), কেনেডি (১৯৬১১৯৬৩), জনসান (১৯৬৩১৯৬৯), নিক্সান (১৯৬৯১৯৭৪) এর শাসনকাল শেষ হয় কিন্তু যুদ্ধ আর শেষ হয়না। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সময় (১৯৭৪১৯৭৭) অভ্যন্তরীণ এবং বহির্বিশ্বের প্রচন্ড চাপে এবং তাপে ৩০ এপ্রিল, ১৯৭৫ সালে সায়গন থেকে আমেরিকান যোদ্ধাদের তুলে নেয়া হয়। তারপর উত্তর এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের একত্রিকরণের পরের ইতিহাস সবার জানা। ঊনিশ বছরব্যাপী এই যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে তাই ১৯৭৯ সালে লিখিত হয় গুস্তাভ হাসফোর্ডের উপন্যাস “দ্যা শর্ট টাইমার্স” এবং এই উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৮৭ সালে নির্মিত হয় স্ট্যানলি কুব্রিকের “ফুল মেটাল জ্যাকেট”। পরিচালক স্ট্যানলি কুবরিক সিনেমার ইতিহাসে একটি অনন্য প্রতিভার নাম। তার প্রায় সব ছবি নিয়ে আলোচনা হলেও এই ছবিটি বিশেষ আলোচিত নয়। কারণ ছবিটি ইতিহাসখ্যাত ভিয়েনাম যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। যে অনৈতিক যুদ্ধের অনালোকিত দিক পশ্চিমারা উন্মোচন করতে দ্বিধাবোধ করেন। ভিয়েনাম যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও পরিচালক অত্যন্ত চমৎকার ভাবে ছবিটিকে দুই অংশে বিভক্ত করেন। এবং প্রথম অংশ যেখানে যুদ্ধ প্রস্তুতির বিস্তারিত বর্ণনা দেখা যায় তা দ্বিতীয় অংশের চেয়ে অধিকতর চমকপ্রদ মনে হয়। ছবিটির আলোচনায় তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রথম অংশটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ছবির শুরুতেই দেখা যায় একদল নৌবাহিনীর তরুণ সদস্য ভিয়েতনাম যুদ্ধে যাবার জন্যে নর্থ ক্যারোলিনার একটি রাজ্যে প্রশিক্ষণ নিতে এসেছে। প্রশিক্ষক সার্জেন্ট হার্টম্যান অস্বাভাবিক উঁচু ও তীব্র স্বরে সবাইকে নির্দেশ করেন এবং তার কোন প্রশ্নের জবাবে ঠিক সমপরিমাণ উঁচু ও তীব্র স্বরে উত্তর আশা করেন। তাদের এই তারস্বর চিৎকারে ছবির শুরুতেই দর্শককে ভিমড়ি খেতে হয়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ রুক্ষতা, কাঠোরতা, শীতলতা যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেউ যদি কোন বেয়াদবি করে বা প্রশিক্ষণ সময় সামান্য ভুল করে বা কোন কারণ ছাড়াই যে কারোর আসল নাম তুলে নিয়ে তাকে একটা নাম দেয়া হয়। এভাবেই নায়কের নাম রাখা হয় প্রাইভেট জোকার, ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নাম রাখা হয় প্রাইভেট পাইল ইত্যাদি। হার্টম্যান তাদেরকে বলেন এখানে জাতিগত বা শ্রেণীগত কোন বিভেদ নেই, সবাই সমান অপদার্থ।’ সেনাদের আরো বুঝিয়ে দেয়া হয় যে শত্রুকে হত্যার মূহুর্তে যদি কেউ দ্বিধা করে তাহলে সে আর শত্রুকে হত্যা করতে পারবে না আর শত্রুহত্যায় ব্যর্থ সেনা পৃথিবীর যেকোন বিষ্ঠার চেয়েও নিকৃষ্ট। স্মরণ রাখা প্রয়োজন ভিয়েতনাম যুদ্ধ মূলত শীতল লড়াইয়ের সময়ের দুই পক্ষের (কমিউনিস্ট এবং অকমিউনিস্ট ব্লক) লড়াই ছিলো। ক্রিসমাসের সময় হার্টম্যান তাই তার বক্তৃতায় বলেন একটু পরেই তোমাদের একটি বিনোদনমূলক ছবি দেখানো হবে। যেখানে চ্যাপলিন চার্লি (ইচ্ছাকৃত ভাবে চার্লি চ্যাপলিনের নামটা উল্টো করে উচ্চারণ করা হয়) দেখাবেন বিধাতা এবং মাত্র কিছু নৌসেনার সাহায্যে মুক্তো পৃথিবীর কাছে কমিউনিজম কীভাবে পরাভূত হচ্ছে।” যা চ্যাপলিনের কোন ছবিতেই আমরা পাইনা। পৃথিবীর সব মানুষের মগজ ধোলাইয়ের জন্যে মার্কিনবাহিনী সহ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো সমাজতন্ত্রের পতনের পেছনে এভাবেই পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটেছিলো সেইসময়ে, যা বর্তমান পর্যন্ত অব্যহত আছে। ড্রিলের সময় গানের বা কবিতার মাধ্যমে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে পারে এমন সব গান বা কবিতা সেনাদের দিয়ে গাওয়ানো বা আবৃত্তি করানো হয় ছন্দে ছন্দে। যেমন কোন এক সকালে ড্রিলের সময় ছন্দে ছন্দে এগিয়ে যেতে যেতে তারা গেয়ে ওঠে এটা আমার রাইফেল। এটা আমার বন্দুক। এটা যুদ্ধের জন্যে। এটা মজা করার জন্যেও !”অর্থাৎ তাদের হাতের যুদ্ধাস্ত্রটি শুধু যুদ্ধ করার জন্যে নয়, মস্করা করার জন্যেও। যে মস্করার জন্যে হাজার হাজার প্রাণ চলে গেলেও তাতে তাদের কিছু এসে যায় না। সব থেকে মজার কবিতা শোনা যায় রাতে শোবার আগে। সেটা ঠিক কবিতা নয়, প্রার্থনা। বিছানায় সবাই একই সঙ্গে, একই ছন্দে যার যার রাইফেল নিয়ে শুয়ে প্রার্থনায় বলেন এটা আমার রাইফেল। এরকম আরো আছে, কিন্তু এই রাইফেলটি একান্তভাবেই আমার। আমার রাইফেল আমার প্রিয় বন্ধু। এটা আমার জীবন। আমি তার উপর প্রভুত্ব করবো যেভাবে আমি আমার জীবনের উপর প্রভুত্ব করি। আমাকে ছাড়া যেমন আমার রাইফেল অকেজো ঠিক তেমনি ভাবে আমার রাইফেল ছাড়া আমি অকেজো। আমার শক্র আমাকে আঘাত হানার আগে তাকে যেন আমি আঘাত হানতে পারি —-আমাদের শত্রুর প্রভু শুধু আমরাই। আবার আমরা আমাদের এানকর্তাও —-”। প্রার্থনার ভাষাগুলো নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলে কারোর বুঝতে অসুবিধা হয়না, ‘প্রভু’ করে গড়ে তোলার কী দারুণ মন্ত্রণায় দীক্ষা দেয়া হয় আমেরিকান সেনাদের। শুধু তাই নয়, সেনা জীবনের সব থেকে নিকৃষ্ট বন্ধু হিসেবে একমাত্র রাইফেলকে বেছে নেয়া হয়। যে রাইফেলের অভেদ্য গুলিতে শত শত প্রাণের বিনাশ ঘটতে পারে। তবে পরিচালক শুধু যুদ্ধের প্রতীক হিসেবে রাইফেলকে ব্যবহার করেননি। যে রাইফেলের পাঠ নিয়ে সেনাবাহিনী প্রতিরাতে ঘুমাতে যায়, সেই রাইফেলই একদিন প্রতিশোধ নিয়ে বসে। সেনাবাহিনীর কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতার ভার সবাই একই ভাবে নিতে পারেনা। এই রকম একটি অপারগতার চরিত্র ছবিতে আমরা পাই প্রাইভেট পাইলের মাঝে। ট্রেনিং এর শুরু থেকেই পাইলকে দেখি প্রায় সব বিষয়ে অপারগতার পরিচয় দিতে। এই অপারগতার জন্যে সার্জেন্ট হার্টম্যান থেকে শুরু করে দলের সবার কাছে লাঞ্চিত হতে হতে কোন এক রাতে প্রাইভেট পাইল শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে নিজেরই রাইফেল দিয়ে। তার আগে সে হার্টম্যানকে হত্যা করে। আত্মহত্যার আগে অস্বাভাবিক অথচ ধীর, শান্ত স্বরে তার দলের একমাত্র নিকট বন্ধু প্রাইভেট জোকারকে রাইফেলটা দেখিয়ে পাইল বলে ওঠে ফুল মেটাল জ্যাকেট”। যে লৌহ নির্মিত আচ্ছাদনের ভেতর থাকে শুধু মৃত্যুর হিমযুক্ত প্রাণহীন শীতলতা। ঠিক এই মূহুর্তেই ছবিটি যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। হিমযুক্ত জ্যাকেটের (বন্দুক) ভেতর প্রাণহীনতা দেখিয়ে পরিচালক আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন প্রাণবন্ত মানুষের প্রয়োজনীয়তা, জ্যাকেটের শীতলতার উল্টোপিঠে থাকে উত্তাপ মানুষের আবশ্যকতা। ছবিটি এখানে শেষ হলেও কোন ক্ষতি ছিলো না। কেননা যুদ্ধের ভয়াবহতা বোঝার জন্যে রাইফেলের প্রতীকই যথেষ্ট। কিন্তু পরিচালক এখানেই থেমে যান না, যুদ্ধের নির্মমতা আরো স্পষ্ট করার জন্যে চলে যান ছবির দ্বিতীয় অংশে, বাস্তব যুদ্ধের ভেতর।

যে যুদ্ধে বিশাল গণকবরের একটি বিশাল প্যানিং শট আমরা পাই। কম করে হলেও বিশ থেকে ত্রিশজন ভিয়েতনামিদের মৃতদেহ সেই গণকবরে দেখা যায়। তার পাশেই আমেরিকান সেনারা দাঁড়িয়ে, মাটি চাপা দেবার অপেক্ষায়। একজন জেনারেল এসে ছবির নায়ক প্রাইভেট জোকারকে জিজ্ঞেস করেন তার বুকে যে ব্যাচটি দেখা যাচ্ছে তা কিসের প্রতীক?”উত্তরে জোকার বলে “শান্তির”। জেনারেল আবার জিজ্ঞেস করেন তোমার মাথার হেলমেটে কি লেখা?”উত্তরে জোকার জানায়, Born to killঅর্থাৎ হত্যার জন্যে জন্ম”। জেনারেল বেশ রেগে যেয়ে বলেন, এসবের অর্থ কি?”জোকার বলে, “দ্বৈততা। মানুষের ভেতরের দ্বৈততা সার। ইয়ুং যেমন বলেছেন–”জেনারেল তাকে আর কথা বাড়াতে দেন না। কেননা কথা বাড়লেই অনেক সত্য বেরিয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, আরেকটি দৃশ্যে আমরা দেখি, হেলিকপ্টারে করে জোকার তার আরো দুজন সঙ্গী নিয়ে যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়, তখন সঙ্গীদ্বয়ের একজন খামোখা নিরীহ গ্রামবাসীদের উপর রাইফেলের গুলি ছুঁড়তে থাকে আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। জোকার তাকে জিজ্ঞেস করে তুমি কখনো নারী আর শিশুদের গুলি করেছো?”উত্তরে সে জানায় অবশ্যই। জোকার জানতে চায়, তুমি কী করে নারী আর শিশুদের উপর এতো হিংস্র হতে পারো? কিভাবে হত্যা করতে পারো তাদের?”উত্তরে সঙ্গীটি হেসে বলে, খুব সোজা”। যুদ্ধের ভয়াবহতা, হিংস্রতা বোঝাবার জন্যে এর চাইতে ভয়ংকর সংলাপ বোধকরি আর হয়না। যুদ্ধের প্রতি তীব্র ঘৃণা ফুটিয়ে তোলার জন্যে ছবির দ্বিতীয় অংশে পরিচালক এই ধরণের আরো দৃশ্যায়ন তুলে ধরেন।

প্রাইভেট পাইলের মৃত্যু যেমন ছবির প্রথম অংশে রাইফেলের প্রতি কটাক্ষ করে, ঠিক তেমনি ছবির শেষ দৃশ্য জীবনের প্রতি কটাক্ষ করে। ভিয়েনামি মেয়েটিকে যখন হত্যা করে জোকার ফিরে যায় তখন সে তার ডায়রিতে লেখে সত্য এই যে আমি বেঁচে আছি।” আমরা বুঝে যাই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার কাদের জন্যে নির্দিষ্ট হয়ে আছে। শক্তিশালীরা এভাবেই বেঁচে থাকে। অন্যদের দুর্বল থেকে দুর্বলতর করার মধ্যে দিয়ে তারা অনন্তজীবন লাভ করে। হার্টম্যান যেমন বলেছিলেন মেরিনরা মৃত্যুহীন প্রাণ’। মুমূর্ষু মেয়েটিকে হত্যার মূহুর্তে জোকারের মানবিকতা কয়েক মূহুর্তের জন্যে জেগে উঠলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তা নিষপ্রভ হয়ে যায়। ডায়রির খন্ড খন্ড কথন দিয়ে সবটা ছবি সাজিয়ে তোলা হয়েছে। যে ডায়রির এক জায়গায় জোকারকে বলতে শুনি

যুদ্ধের নৌসেনারা কোন রোবট নয়,

যুদ্ধের নৌসেনারা শুধু হত্যা করতে জানে,

যুদ্ধের নৌসেনারা শুধু ধ্বংস করতে জানে,

যুদ্ধের নৌসেনারা সেই মানুষ যে মানুষেরা কখনো ভয়কে ভয় করতে জানেনা”

শ্লেষ মেশানো ডায়রির এই কথাগুলো আমাদের বুঝিয়ে দেয় রাষ্ট্র অমানবিক হলেও তার নাগরিকেরা অমানবিক হতে পারেনা। আর তাই ছবির নায়ক প্রাইভেট জোকার আমাদের কাছে কোন রোমান্টিক নায়ক না হয়ে বাস্তব নায়ক হয়ে উঠেন। যে নায়ক মানবিক হয়েও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অমানবিক হয়ে যেতে হয়।।

১টি মন্তব্য

  1. alochona khub vaalo laaglo!