Home » আন্তর্জাতিক » বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে অন্য শক্তির মতপার্থক্য

বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে অন্য শক্তির মতপার্থক্য

আমীর খসরু

usa-india-chinaবাংলাদেশের চলমান সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে এর ভবিষ্যৎ প্রশ্নে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক শক্তির মধ্যে মতভিন্নতা ও মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে। মূল বিষয়টি হচ্ছে প্রভাব বিস্তার এবং কর্তৃত্ব নিয়ে। অর্থাৎ ভারসাম্যের ক্ষেত্রে পাল্লা কার দিকে ভারি থাকবে। আর এই পাল্লা ভারি রাখতে গিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসন, ভবিষ্যত নির্বাচন এবং আগামীর সরকারটি কেমন হবে সে প্রশ্নটি তাদের কাছে মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে।

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এবং বিশ্লেষকরা গত কয়েকদিন ধরে কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই বলতে শুরু করেছে, বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের যে সুসম্পর্ক তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকুক এবং এমন একটি সরকার ক্ষমতায় আসুক তা তারা চাইছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমি দেশগুলোসহ অন্যান্যরা সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথাই বলছে। ভারতের পক্ষ থেকে ঢাকায় এর ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার সন্দ্বীপ চক্রবর্তী বলেছেন, বাংলাদেশের কোনো দলের সঙ্গে ভারতের বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই।

ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনার সাম্প্রতিক দিল্লি সফর নিয়ে নানা আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে এবং এটা এখনও চলছে। তার দিল্লি সফর ও সে দেশের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকেই মতভিন্নতা ও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠে। এরপর থেকে ভারতীয় বিশ্লেষক ও সংবাদ মাধ্যম এতটাই সরব হয়ে উঠেছে যে, এটা যে কোনো দেশ সম্পর্কে হওয়াটা কাম্য তো নয়ই, সাংবাদিকতার নিয়মনীতিনীতিমালারও পরিপন্থী।

ড্যান মজীনার দিল্লি সফরকালীন সময় ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দীন ওই দেশের সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বাংলাদেশে যা হচ্ছে তা ওই দেশটির নিজস্ব বিষয়। তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ক্রমশই অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। তাই এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র দফতর যথেষ্ট সতর্ক রয়েছে। এদিকে ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতর এ কথাও বলেছে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনার ভারত সফর অস্বাভাবিক কিছু নয়।

ভারতীয় বিশ্লেষক এবং সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশ প্রসঙ্গে দিল্লি এবং ওয়াশিংটনের মনোভাব দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থ একই মাত্রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন বক্তব্যের সঙ্গে ভারত আদৌ একমত নয়। দিল্লির বক্তব্য স্পষ্ট বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব এবং করিডোর, বন্দর ব্যবহারসহ সার্বিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য স্বার্থ রয়েছে। এক্ষেত্রে দু’দেশের অবস্থান এক নয়। ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দিল্লি সফরের সময় বৈঠককালে ভারতীয় কর্মকর্তারা এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ভারত মনে করে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ দমন, মৌলবাদী শক্তির উত্থান রোধ বিশেষ করে উত্তরপূর্বাঞ্চলের দিল্লি বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে দমনে ভারতকে যেভাবে সাহায্যসহযোগিতা করেছে, তা বাংলাদেশে অতীতের কোনো সরকার করেনি। ভারত স্পষ্টভাবে মনে করে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে উন্নতি গত কয়েক বছরে হয়েছে, তারা তা অব্যাহত থাকুক তাই চায়। ভারত মনে করে, এই উপমহাদেশের সার্বিক উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে হৃদ্যতামূলক সম্পর্ক অব্যাহত থাকাটা জরুরি। দিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে এই বার্তাটি পৌঁছে দেয়া হয়েছে যে, ভারত কখনই এটা চায় না যে, বাংলাদেশ কোনো ভাবেই ভারত বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হোক বা এই ভূখণ্ডটি ভারত বিরোধী কর্মকাণ্ডে সহায়ক হোক। তারা এও মনে করে, বর্তমান সরকার বা এ ধরনের একটি সরকার না থাকলে ভারত বিরোধী শক্তি, জঙ্গিবাদ এবং মৌলবাদী কর্মকাণ্ড মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক এবং জামায়াতের সাম্প্রতিক সহিংস কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ভারত খুবই উদ্বিগ্ন। দিল্লি মনে করে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে মনোভাব তা ওই দলটিকে এবং পক্ষকে প্রকারান্তরে সহায়তা করছে।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের কিছু কিছু ভূমিকায় ভারত দারুনভাবে বিরক্ত এবং হতাশ। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোও তাই বলছে। যদিও বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাসের বিষয়টি মাথায় রেখেই তারা বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চালিয়েছিল এবং ২০১২ সালে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া দিল্লি সফর করেছিলেন। কিন্তু দিল্লি বিএনপির ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছে না। এখন আওয়ামী লীগবিএনপিসহ সব দলকে সমান দৃষ্টিতে দেখার মার্কিন ও পশ্চিমি দুনিয়ার মনোভাবের সঙ্গে ভারত কোনোক্রমেই একমত নয়।

নিরাপত্তা কৌশলগত দিক দিয়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে চায়। এক্ষেত্রে চীন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা দুটো কারোরই দিক থেকে কোনো বাধা আসুক বা কেউ তাদের হিসাবনিকাশে বাধা সৃষ্টি করুক তা তাদের কাছে কাম্য নয়। এক্ষেত্রে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা কৌশলগত বিষয়টিকে তারা বেশ বড়ভাবেই গুরুত্ব দিচ্ছে। অভ্যন্তরীণ কারণ বাদেও চীনকে মাথায় রেখেই ভারত অরুনাচলসহ ওই অঞ্চলে সৈন্য শক্তি আগের চেয়ে অনেক বাড়িয়েছে। গত কিছুদিন সময়ের মধ্যে ভারত একটি মাউন্টেন্ট ডিভিশন মোতায়েন করেছে, বিমান শক্তি বাড়িয়েছে আগের তুলনায় বড় আকারে এবং সেনা সংখ্যাও পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং অব্যাহত আছে। নিরাপত্তা কৌশলগত দিক দিয়ে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারত কোনোক্রমেই চায় না এই অবস্থানটি তাদের হাতছাড়া হোক। করিডোর, চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দরের মতো অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক দিয়ে অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হাতে পাওয়া, বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহারের অবাধ সুযোগ ভারত কোনোক্রমেই হাতছাড়া করতে চায় না।

বঙ্গোপসাগর, বিশেষ করে এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের উপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে চট্টগ্রামে প্রস্তাবিত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরটি ভূরাজনৈতিক, নিরাপত্তা কৌশলগত দিক দিয়ে অত্যন্ত ‘মূল্যবান’। ভারত এই বন্দরের মাধ্যমে ওই দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন তো চায়ই, চীনের বিষয়টিও তাদের মাথায় আছে। পক্ষান্তরে, চীনও ওই বন্দরটি পাওয়ার জন্য যারপর নাই উদগ্রীব। চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ব্যাপারে সাধারণত কোনো বক্তব্য, মন্তব্য প্রদান বা কোনোভাবেই প্রকাশ্যে জড়িত হতে চায় না। চীনের বর্তমান রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সুপারিশমূলক যে বিবৃতি ও বক্তব্য, তা ভারত আদৌ পছন্দ করেনি। বার্মার রাজনৈতিক পরিবর্তন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বঙ্গোপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনসহ বিভিন্ন কারণে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় না বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের যে সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, তাতে বিঘ্ন ঘটুক এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হোক কিংবা কোনো একটি দেশের দিকে সম্পর্কের পাল্লাটা মাত্রাতিরিক্তভাবে ভারী হোক।

ভূরাজনৈতিক, নিরাপত্তা কৌশলগত দিক ছাড়াও বঙ্গোপসাগর এলাকায় তেলগ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের যে বিষয়টি রয়েছে তাও বিবেচনায় রেখেছে সব পক্ষগুলো।।

——————————–

আরো বিস্তারিত তথ্যের জন্য, পড়ুন

দিল্লি বৈঠক : দেশের ভাগ্য যখন নির্ধারিত হয় বিদেশে বসে, বিদেশীদের হাতে