Home » মতামত » অভিমত: ক্ষমতাসীনদের খুঁটির জোর বনাম জনমত

অভিমত: ক্ষমতাসীনদের খুঁটির জোর বনাম জনমত

মাকসুদুল আলম, টোকিও থেকে

freedom-of-speechবিগত পাঁচ বছর বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ভারতকে যেভাবে সহযোগিতা করেছে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সম্প্রতি একটি প্রকাশ্য সমাবেশে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীলকুমার শিন্দে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভারতের আপনজন’ বলে উল্লেখ করেছেন। দু’দেশের বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ‘যেন এপার বাংলারই মেয়ে’ বলেছেন। সন্দেহ নেই পাশাপাশি দু’টি দেশের বন্ধুত্ব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ভৌগলিক নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। তা খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশের সবগুলো নদীবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও আকাশপথ ভারতের ব্যবহারের জন্য বিনা শুল্কে খুলে দেয়া হয়েছে। চড়া মূল্যে ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে বিদ্যূৎ। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয়েছে। সুরাহা হয়নি তিস্তা ও ফারাক্কার জলচুক্তি বা দু’দেশের দীর্ঘ স্থলসীমান্তের চুক্তির। সীমান্তে সন্ত্রাস ও অপরাধ দমন, ভারতের জঙ্গি সংগঠনগুলোকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হয়েছে। ক্ষেত্র ও ইস্যু বিশেষে বিধ্বংসী ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময় ভারত সরকার তা অকপটে স্বীকারও করেছে। ঢাকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, গতমাসে ভারতের আসাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক নববার্তা বাংলাদেশের আগামী সাধারণ নির্বাচন নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে ওই রিপোর্টে বলেছিল ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ জোটকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে চায় ভারত। এজন্য দিল্লি খরচ করবে ১ হাজার কোটি রুপি’। দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যে এ ব্যয়ের প্রস্তাব পাস করেছে বলে ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল। নববার্তা প্রসঙ্গ ছাড়াও টাইমস অব ইন্ডিয়াও জানিয়েছে ‘বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে ভারত তার দীর্ঘ দিনের পরীক্ষিত ও পুরনো বন্ধুপ্রতিম দলকেই পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে চায়। দিল্লির স্বার্থ রক্ষায় এই সিদ্ধান্তের কোনো বিকল্প নেই’। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিতএসব খবর সত্য হলে তা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি স্বরূপ। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমের প্রতি চপেটাঘাত। আপনজনকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সে দেশের সাধারণ নির্বাচনে হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ করা যুক্তিযুক্ত কিনা? জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে নির্বাচনে জনগনের ভোটাধিকারের পরিবর্তে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণ দেয়া সঠিক কিনা? যে কোনভাবেই হোক বন্ধুপ্রতিম দলকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা গণতন্ত্র নয়। এগুলো নির্ঘাত ষড়যন্ত্র।

বাংলাদেশের প্রাকনির্বাচনী রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বেপরোয়া হয়ে উঠছে আমাদের এই প্রতিবেশী রাষ্ট্র। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে, জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটলে স্বার্থ রক্ষা হবে না ভেবেই তাদের চিন্তা। সম্প্রতি পাবনার সাঁথিয়ায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও মন্দির ভাংচুর করা হয়েছে। তাতে লুটপাট চালানো হয়েছে। সন্ত্রাসীরা প্রতিমন্ত্রীর পাশে পুলিশ পাহারায় ঘুরে বেড়ালেও তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় প্রশ্রয় দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু এই দাবি করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে এই দল দুটি।

নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে তৃতীয় দফায় টানা ৭২ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট।। ৭২ ঘণ্টার হরতাল ঘোষণার পরপরই বিরোধীদলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ পাঁচজন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি নেতাদের বাড়িতেও পুলিশি তল্লাশি চালানো হয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছে তারা। শুক্রবার থেকেই বিরোধীদলীয় নেত্রীর গুলশান কার্যালয় ও নয়াপল্টনে অবস্থিত বিরোধীদলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নজরদারিতে রাখা হয়েছে তাঁকে। বিরোধীদলীয় নেত্রীকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি ভেবে দেখা হচ্ছে বলে দম্ভ করেছে তথ্যমন্ত্রী। নির্দলীয় সরকারের দাবি পূরণে লাগাতার হরতাল ছাড়াও অবরোধ, ঘেরাও এমনকি গণকারফিউ দেয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত পূর্ব ঘোষিত ৭২ ঘণ্টার হরতালের সঙ্গে ১২ ঘণ্টা যোগ করে ৮৪ ঘণ্টার হরতাল পালিত হচ্ছে।

প্রতিদিনের হরতালে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে তা নিয়ে নতুন করে লেখার প্রয়োজন নেই। ব্যবসায়ী মহলের জরিপ অনুসারেই একদিনের হরতালে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমান দেড় হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা। সন্দেহ নেই হরতালকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, আমদানিরফতানি, রেমিটেন্স প্রবাহ সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বর্তমানে আমাদের রাজনীতি হরতালেই ঘুরপাক খেলেও বাস্তবে দেখা যায় হরতালের ঘোষণা দিয়ে ঘরে বসে টিভি দেখে সময় কাটানো হচ্ছে। শীর্ষ নেতানেত্রীরা রাজপথে নামে না। ঘোষিত সময় নির্দিষ্ট থাকলেও আগেরদিন থেকেই শুরু হয় গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও যানবাহন ভাঙচুরের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। পত্রিকায় প্রকাশিত সংখ্যা অনুযায়ী নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। হরতালের আগেরদিন রাজপথে তান্ডব চালিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা, রাস্তাঘাট অবরোধ করা, যানবাহনে ইটপাটকেল ছোড়া, সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদেরকে লাঞ্চিত করা, সাধারণ নাগরিকের গাড়িতে আগুন দিয়ে নাশকতা চালানো এখন রীতিমত ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো কোনমতেই দাবি আদায়ের গ্রহনযোগ্য মাধ্যম হতে পারে না। সহিংসতা ও নাশকতাকে কোনমতেই বরদাশত করা যায় না। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় জীবন বাজি রেখেই খেটে খাওয়া মানুষকে হরতালের মধ্যে আতংক নিয়ে চলাফেরা করতে হয়। জানের মায়া ছেড়ে রাস্তায় বের হতে হয়। বাসায় আদৌ ফেরা যাবে কিনা তা নিয়ে ভাবতে হয়। টানা হরতালে ব্যাহত হয় স্বাভাবিক জনজীবন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। ভোগান্তিতে পড়তে হয় অভিভাবকদের।

খুঁটির জোরে কঠোর অবস্থানে ক্ষমতাসীন সরকার। বিরোধীদলের আন্দোলন কঠোর হাতে দমনের পরিকল্পনা তাদের। নির্বাচনকালীন সংকট নিরসনে কোনো প্রচেষ্টাই নেই। মন্ত্রীদের কেউ কেউ তোষামোদ করে আগুনে ঘি ঢালছেন। বলছেন ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা যখন বলেছেন তখন নির্বাচন হবেই। বিধি মতোই নির্বাচন হবে। ক্ষমতাভোগী ও সুবিধাবাদী মন্ত্রীএমপিদের তোষামোদের কারণেই সরকারপ্রধান নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের জনদাবি প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। ঢাকার একটি প্রভাবশালী দৈনিকের সবশেষ জনমত জরিপেও দেখা গেছে যে দেশের ৭৭ শতাংশ মানুষই আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হওয়া উচিত বলে মনে করে। এই ৭৭ শতাংশ মানুষ সবাই নিশ্চয় বিরোধীদলের সমর্থক নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের জনমত উপেক্ষা করে একদলীয় নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকার। ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে প্রধান দু’দলের মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপের কথা থাকলেও তাতে কোনো ফল হয়নি। নভেম্বরের মাঝামাঝিতে গঠন করা হতে পারে মহাজোট সরকারের মিনি ক্যাবিনেট। এতে অংশ নেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বিরোধীদলীয় জোট। নির্বাচন বয়কট না করে বিরোধী দলকে সংলাপে বসার তাগিদ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

সংলাপ নিয়ে টেলিফোনে একদফা বাহাস হয়েছে। হয়েছে বাদানুবাদ। আমন্ত্রণের নামে কৌশলে চালানো হয়েছে আক্রমন। অসৎ উদ্দেশ্যে লোকদেখানো আমন্ত্রণ জানিয়ে দেশবাসীর সমবেদনা সংগ্রহের বৃথা চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘ কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। যা জনগণের হাসির খোরাক যুগিয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে যে, ফোনালাপের পুরো প্রচেষ্টাই ছিল একটি প্রহসনমূলক নাটক। বাস্তবে চলমান সংকট আরও ঘনীভূত করেছে। বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিকে পুতুল নাচের সঙ্গে তুলনা করেছে। এক প্রতিবেদনে দুই শীর্ষনেত্রীর ফোনালাপকে ‘স্রেফ ঝগড়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে চলমান রাজনৈতিক সংকট, দীর্ঘ অচলাবস্থা ও বর্তমান সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে উচ্চ আদালতের আংশিক রায়ের দোহাই দিয়ে নিজেদের সুবিধামত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে পছন্দমত সংবিধান সংশোধন করার ফলে। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দলীয়করণ করার ফলে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে জনমত উপেক্ষা করে স্বৈরাচারী আচরণ করার ফলে। ভিন্নমত দমনে অসহিষ্ণু ও বেপরোয়া হওয়ার ফলে। প্রকাশ্যে এমনকি ঘরোয়া পরিবেশেও সভাসমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরার ফলে। সাধারণ জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে অন্য কিছু নয় দেশে একটি গ্রহণযোগ্য সরকার চায়। চায় না হরতাল ও হরতালপূর্ব সহিংসতাও। দেখতে চায় না কোনো মরণকামড়।।

১০ নভেম্বর ২০১৩, টোকিও